জিম্বাবুয়ের কাছে হোঁচট: বাংলাদেশ ক্রিকেটের ছন্দপতনের কারণ কী?

বাংলাদেশ ক্রিকেটের কী হলো? গত কয়েক বছরে ধারাবাহিক উন্নতির যে চিত্র দেখা গিয়েছিল, হঠাৎ করেই যেন তার ছন্দপতন ঘটেছে। জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে একমাত্র টেস্টে ইনিংস ব্যবধানে পরাজয় এবং তিন ম্যাচের ওয়ানডে সিরিজের প্রথম ম্যাচে ১৪১ রানের সহজ লক্ষ্য তাড়া করতে ব্যর্থ হওয়া বাংলাদেশের ক্রিকেটের জন্য বড় ধরনের সতর্কবার্তা।

ফিফা বিশ্বকাপ ফুটবলের উন্মাদনায় দেশের ক্রীড়াঙ্গনে এই ব্যর্থতা হয়তো খুব বেশি আলোচিত হয়নি। কিন্তু ক্রিকেটীয় বাস্তবতায় এই ফলাফল গভীর বিশ্লেষণের দাবি রাখে।

সম্প্রতি টেস্ট, ওয়ানডে ও টি-টোয়েন্টি—তিন সংস্করণেই বাংলাদেশ উন্নতির ধারায় ছিল। পাকিস্তানের মাটিতে ঐতিহাসিক সিরিজ জয়, নিউজিল্যান্ড ও অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ পারফরম্যান্স দেশের ক্রিকেটকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাওয়ার আশা জাগিয়েছিল। পেস আক্রমণে নাহিদ রানা, তাসকিন আহমেদ ও শরিফুল ইসলামের উত্থান, স্পিনে মেহেদী হাসান মিরাজ ও তাইজুল ইসলামের ধারাবাহিকতা এবং ব্যাটিংয়ে নাজমুল হোসেন শান্ত, মুশফিকুর রহিম, মোমিনুল হক ও লিটন দাসের অবদান বাংলাদেশকে আত্মবিশ্বাসী করে তুলেছিল।

কিন্তু সেই দলই জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে টেস্টে কার্যত লড়াই করতে পারেনি। পেস-সহায়ক উইকেটে বাংলাদেশের বোলিং আক্রমণ ছিল নিষ্প্রভ। প্রশ্ন উঠতেই পারে, কেন দলে অভিজ্ঞ পেসার তাসকিন আহমেদ কিংবা গতিময় বোলার নাহিদ রানাকে রাখা হয়নি? দল নির্বাচন এবং কৌশল—দুই ক্ষেত্রেই টিম ম্যানেজমেন্টের সিদ্ধান্ত নিয়ে প্রশ্ন উঠছে।

ব্যাটিং ব্যর্থতাও ছিল উদ্বেগজনক। প্রথম ইনিংসে মোমিনুল হকের লড়াকু ইনিংস ছাড়া আর কোনো ব্যাটার দায়িত্বশীল পারফরম্যান্স দেখাতে পারেননি। দুই ইনিংসেই ব্যাটিং ধস প্রমাণ করে, শুধু প্রযুক্তিগত নয়, মানসিক প্রস্তুতিরও ঘাটতি ছিল।

ওয়ানডে সিরিজের প্রথম ম্যাচের চিত্র আরও হতাশাজনক। নাহিদ রানার দুর্দান্ত বোলিংয়ে জিম্বাবুয়েকে মাত্র ১৪১ রানে অলআউট করার পরও বাংলাদেশ লক্ষ্য তাড়া করতে ব্যর্থ হয়। তানজিদ তামিম, নাজমুল হোসেন শান্ত, তাওহীদ হৃদয় ও মেহেদী হাসান মিরাজের দায়িত্বজ্ঞানহীন শট নির্বাচন সহজ ম্যাচকে কঠিন করে তোলে। শেষ পর্যন্ত ২৫ রানের হার বাংলাদেশের ব্যাটিং দুর্বলতাকেই সামনে নিয়ে আসে।

সিরিজ বাঁচাতে দ্বিতীয় ওয়ানডে বাংলাদেশের জন্য ‘ডু অর ডাই’ ম্যাচ। এই ম্যাচে ব্যাটারদের দায়িত্বশীল হতে হবে। টপ অর্ডারের অন্তত দুজনকে দীর্ঘ সময় উইকেটে থেকে ইনিংস গড়তে হবে। দ্রুত ৩০-৪০ রান নয়, বরং ৬০-৭০ রানের ইনিংসই দলের ভিত শক্ত করবে। কারণ আসন্ন ওয়ানডে বিশ্বকাপ অনুষ্ঠিত হবে জিম্বাবুয়ে, দক্ষিণ আফ্রিকা ও নামিবিয়ায়—যেখানে একই ধরনের পেস-সহায়ক উইকেটে খেলতে হবে।

দল নির্বাচনেও কিছু পরিবর্তনের সুযোগ রয়েছে। এই ধরনের কন্ডিশনে চার পেসার নিয়ে নামা যুক্তিযুক্ত হতে পারে। তাসকিন আহমেদ, মুস্তাফিজুর রহমান, নাহিদ রানা ও শরিফুল ইসলামকে একসঙ্গে খেলানো যেতে পারে। স্পিন বিভাগে মেহেদী হাসান মিরাজের সঙ্গে মোসাদ্দেক হোসেন দায়িত্ব সামলাতে পারবেন। প্রয়োজনে রিশাদ হোসেনকে বিশ্রাম দিয়ে অতিরিক্ত একজন পেসার অন্তর্ভুক্ত করা যেতে পারে।

সম্ভাব্য বাংলাদেশ একাদশ: তানজিদ হাসান তামিম, সৌম্য সরকার, নাজমুল হোসেন শান্ত, নুরুল হাসান সোহান, তাওহীদ হৃদয়, মেহেদী হাসান মিরাজ, মোসাদ্দেক হোসেন, তাসকিন আহমেদ, শরিফুল ইসলাম, মুস্তাফিজুর রহমান ও নাহিদ রানা।

বাংলাদেশের সামনে এখন ঘুরে দাঁড়ানোর সুযোগ রয়েছে। তবে তার জন্য প্রয়োজন আত্মবিশ্বাস, দায়িত্বশীল ব্যাটিং, সঠিক দল নির্বাচন এবং পরিস্থিতি অনুযায়ী কৌশল প্রয়োগ। সিরিজে টিকে থাকতে হলে আজকের ম্যাচে জয় ছাড়া বাংলাদেশের সামনে আর কোনো বিকল্প নেই।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

seventeen + 15 =