ফিমেল হাইজিন

ময়ূরাক্ষী সেন

সুস্থ থাকার জন্য প্রত্যেকের হাইজিন মেইনটেইন করা প্রয়োজন। হাইজিন মেইনটেইন করে জীবনযাপন করলে দীর্ঘদিন সুস্থ থাকা যায় এবং শরীরে সহজে ভাইরাস কিংবা ব্যাকটেরিয়া আক্রমণ করার সুযোগ পায় না। সুস্থ থাকার পাশাপাশি মানসিক স্বাস্থ্য ও আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে চলাফেরার জন্যও প্রফেশনাল জীবনে হাইজিন মেইনটেইন করা প্রয়োজন। একজন অপরিষ্কার মানুষকে সবাই এড়িয়ে চলে এবং তার ব্যাপারে খারাপ ধারণা পোষণ করে। হাইজিন মেইনটেইন করা নারী-পুরুষ সকলের জন্য অপরিহার্য। কিন্তু নারীদের শরীর যেহেতু জন্মগত ভাবে সংবেদনশীল তাই তাদের প্রয়োজন বাড়তি যত্ন। একজন নারী যদি তার সঠিক হাইজিন মেইনটেইন না করে তাহলে তার যেকোনো ধরনের রোগে আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কা বেড়ে যায়। জেনে নেওয়া যাক কিভাবে ফিমেল হাইজিন মেইনটেইন করা উচিত।

পিরিয়ডকালীন সময়ে

প্রাকৃতিক ভাবে একজন নারীর মাসের নির্দিষ্ট একটি সময় মাসিক বা পিরিয়ড হয়। যা নারীর জীবনচক্রে অত্যন্ত স্বাভাবিক একটি ঘটনা। একজন নারী অন্যান্য সময় থেকে এই মাসিককালীন সময়ে সবচেয়ে বেশি সংবেদনশীল থাকে এবং যেকোনো রোগে আক্রান্ত হয়ে যাওয়ার ঝুঁকি বেশি থাকে। এ সময়টা নারীর প্রয়োজন নিজের বাড়তি যত্ন নেওয়া। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্যি যে অনেকে এ সময়ে নিজের তেমন যত্ন করে না। মাসিকের সময় নিজের বাড়তি যত্ন না নিলে বড় ধরনের রোগের সম্ভাবনা থাকে। পিরিয়ডের কথা বললেই প্রথমে বলতে হবে প্যাডের কথা। এই সময়ে এসেও অনেকে প্যাড ব্যবহার না করে কাপড় কিংবা তুলা ব্যবহার করে, যা অত্যন্ত অস্বাস্থ্যকর। ২০১৩ সালের এক জরিপে দেখা গেছে, বাংলাদেশের শতকরা ৮৬ ভাগ নারী মাসিকের সময় স্যানিটারি প্যাড ব্যবহার না করে পুরানো কাপড় বা ন্যাকড়া ব্যবহার করে। পুরাতন কাপড় ব্যবহারের ফলে জরায়ুতে ইনফেকশন হতে পারে। এছাড়া জ্বর, তলপেটে ব্যথা ও মূত্রনালীতে সংক্রমণ হতে পারে। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, পিরিয়ডের সময় অপরিষ্কার থাকলে জরায়ু ক্যান্সার হওয়ার আশঙ্কা বেড়ে যায়। গ্রামের নারীরা প্যাড কেনার টাকার অভাবে কাপড় ব্যবহার করে। তবে কাপড় ব্যবহার করতে চাইলে অবশ্যই কিছু নিয়ম মেনে ব্যবহার করতে হবে। যেমন ব্যবহারের জন্য নেওয়া কাপড়টি অবশ্যই পরিষ্কার হতে হবে। ব্যবহারের পর সেটি সাবান ও গরম পানি দিয়ে খুব ভালোভাবে ধুয়ে নিতে হবে। এরপর ইস্ত্রি করে কাপড়টি জীবাণুমুক্ত করার ব্যবস্থা করতে হবে। এছাড়া কয়েকবার ব্যবহারের পর কাপড়টি ফেলে দিতে হবে। না হলে  ইনফেকশনের আশঙ্কা থাকবে।

তবে যতই নিয়ম মেনে কাপড় ব্যবহার করা হোক না কেন বিশেষজ্ঞদের মতে প্যাড ব্যবহার করাই সবচেয়ে বেশি নিরাপদ। প্যাড ব্যবহারের ক্ষেত্রেও কিছু নিয়ম অনুসরণ করতে হবে। তা না হলে প্যাড ব্যবহার করেও অসুস্থ হয়ে যেতে হবে। একটি প্যাড কখনো ৬ ঘণ্টার বেশি পরিধান করে থাকা উচিত নয়। এমনকি রক্তপাত কম হলেও। ৩/৪ ঘণ্টা পর পর প্যাড বদলে ফেলতে হবে, তবে রক্তপাত বেশি হলে আরও দ্রুত প্যাড বদলে ফেলতে হবে। দীর্ঘ সময় এক প্যাড পরিধান করে থাকলে ব্যাকটেরিয়া সংক্রমণ হওয়ার আশঙ্কা থাকে। প্যাড কেনার আগে অবশ্যই মেয়াদ দেখে কিনতে হবে। মেয়াদ উত্তীর্ণ প্যাড ব্যবহার করলে নানা ধরনের রোগ হতে পারে। ব্যবহারের আগে হাত ভালো করে সাবান দিয়ে ধুয়ে নিতে হবে। প্যাডের প্যাকেট খোলার পর খোলা স্থানে রাখা যাবে না, এতে প্যাডের মধ্যে ধুলাবালি পড়তে পারে এবং পরে সেই প্যাড ব্যবহারের ফলে ইনফেকশন হতে পারে। অনেকেই এক প্যাড বেশি সময় ব্যবহার করার জন্য প্যাডের উপর টিস্যু ব্যবহার করে, যা নিরাপদ নয়। প্যাড ব্যবহারের পর সঠিক নিয়ম মেনে ফেলে দেওয়াও হাইজিনের অংশ। তাই প্যাড ব্যবহারের পর ভালো করে কাগজ দিয়ে মুড়িয়ে ডাস্টবিনে ফেলে দিতে হবে।

আন্ডার গার্মেন্ট

প্যাড পরিধানের জন্য আন্ডার গার্মেন্ট ব্যবহার করা হয়। সেই আন্ডার গার্মেন্টও যাতে পরিষ্কার থাকে সেদিকে লক্ষ্য রাখতে হবে। ভেজা আন্ডার গার্মেন্ট ব্যবহার করলে ব্যাকটেরিয়া আক্রমণ করতে পারে। এছাড়া চুলকানির বা র‌্যাশের মতো নানা ধরনের রোগ হতে পারে। অনেকে সিনথেটিক আন্ডার গার্মেন্ট ব্যবহার করে। কিন্তু নিয়মিত ব্যবহারের জন্য কটন আন্ডার গার্মেন্ট ব্যবহার করতে হবে। এ সময় নিজের সঠিক যত্ন না নিলে সংক্রমণ জটিল আকার ধারণ করে ডিম্বনালি পর্যন্ত আক্রান্ত হতে পারে। আন্ডার গার্মেন্ট নিয়মিত গরম পানি দিয়ে ধুয়ে নিতে হবে। গরম পানি ব্যবহার করলে ব্যাকটেরিয়া শেষ হয়ে যাবে। এক আন্ডার গার্মেন্ট বেশিক্ষণ পরিধান করা যাবে না, ঘেমে গেলে তা দ্রুত বদলে ফেলতে হবে।

অন্যান্য হাইজিন

মাসিক ছাড়াও নারীদের অন্যান্য হাইজিনের দিকেও নজর দিতে হবে। নারীরা নিজেদের প্রাইভেট অংশ কিংবা শরীরের বিভিন্ন স্থানের হেয়ার রিমুভ করে। বাড়িতে রেজার ব্যবহার করে হেয়ার রিমুভ করলে কিছু বিষয় খেয়াল রাখতে হবে। যেমন এক রেজার বার বার ব্যবহার করা যাবে না। প্রতিবার নতুন রেজার ব্যবহার করতে হবে। অনেকদিন এক রেজার ব্যবহার করলে ব্যবহারকৃত স্থানে ইচিং হতে পারে। অনেক সময় হেয়ার রিমুভিং ক্রিম ব্যবহার করা হয়। সেইসব ক্রিমের রিয়াকশন স্কিনে হয়। তাই ব্যবহারের আগে ক্রিমে কোনো ক্ষতিকারক উপাদান আছে কি না সেদিকে লক্ষ্য রাখতে হবে। কোনো প্রকার রিয়াকশন দেখা দিলে সেই ক্রিম ব্যবহার করা বন্ধ করে দিতে হবে। সেলুনে গিয়ে ওয়াক্সিং করালে অবশ্যই পেশাদারদের মাধ্যমে করাতে হবে। তা না হলে স্কিনে নানা ধরনের সমস্যা দেখা হবে। সেক্ষেত্রে ভালো মানের সেলুন বেছে নিতে হবে। বাড়িতেও ওয়াক্সিং করা সম্ভব। তবে সঠিক পদ্ধতি জেনে করতে হবে। ভুল নিয়মে ওয়াক্স করলে চামড়া উঠে এসে রক্ত বের হতে পারে। প্রাইভেট অংশে কোনোমতেই অ্যালকোহল যুক্ত প্রোডাক্ট ব্যবহার করা উচিত নয়, এতে ইনফেকশন হতে পারে।

নিয়মিত গোসল করা

হাইজিন মেইনটেইন করার জন্য নিয়মিত গোসল করা প্রয়োজন। বিশেষ করে মাসিকের সময় কোনোভাবেই গোসল এড়িয়ে যাওয়া নয়। নিয়মিত গোসল করলে শরীর ফ্রেশ থাকবে, লুকিয়ে থাকা ব্যাকটেরিয়া এবং ভাইরাস ধ্বংস হয়ে যাবে। গোসলের সময় ভালো মানের বডি ওয়াশ ব্যবহার করতে হবে কিংবা জীবানু ধ্বংসকারী সাবান ব্যবহার করতে হবে। অনেকে শীতকালে গোসল করতে চায় না। কিন্তু এর ফলে শরীরে নানা ধরনের রোগ হতে পারে। তাই চেষ্টা করতে হবে ঠান্ডায় উষ্ণ গরম পানি দিয়ে গোসল করতে। গোসলের পর পরিষ্কার টাওয়াল ব্যবহার করতে হবে। প্রাইভেট অংশ মোছার জন্য সুতির পরিষ্কার কাপড় ব্যবহার করতে হবে। এ জন্য আলাদা কাপড় রাখতে হবে।

চুল ও নখ

হাইজিনের অংশ চুল ও নখ। নিয়মিত নখ কেটে ছোট রাখতে হবে ও নখ পরিষ্কার রাখতে হবে। তা না হলে নখ থেকে নানা ধরনের রোগ ছড়িয়ে পড়বে। তাই আলাদা করে নখের প্রতি বিশেষ যত্ন নিতে হবে। মাঝে-মধ্যে পেডিকিউর মেনিকিউর করা যেতে পারে, এটি নখের সৌন্দর্য বজায় রাখতে সাহায্য করে। চুলেরও আলাদা যত্ন নিতে হবে। নিয়মিত চুলে শ্যাম্পু করতে হবে এবং চুল কাটতে হবে। চুলের যত্ন না নিলে চুলে খুশকি হবে যা চুলের ক্ষতি করবে। ফলে চুল পড়ে যেতে পারে। তবে চুলে গরম পানি ব্যবহার করা উচিত নয়, এতে চুল আরও বেশি রুক্ষ হয়ে যায়।

পরিষ্কার পোশাক

পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন কাপড় পরিধান করাও হাইজিনের অংশ। পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন কাপড় পরিধান না করলে দেখতে যেমন ভালো লাগবে না তেমনি এর মাধ্যমে রোগ ছড়িয়ে পড়বে। তাই নিয়মিত কাপড় পরিষ্কার করতে হবে। ঘামযুক্ত কাপড় পরিধান করা যাবে না।

লেখাটির পিডিএফ দেখতে চাইলে ক্লিক করুন: অঙ্গনা

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

sixteen − one =