ফ্রান্স ও স্পেনে ভয়াবহ দাবানল : প্রায় ২ লাখ ৬০ হাজার মানুষকে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে

ঢাকা, ২৬ জুলাই, ২০২৬ – ফ্রান্সের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চল এবং স্পেনের রাজধানী মাদ্রিদের আশপাশে ভয়াবহ দাবানল নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাওয়ায় প্রায় ২ লাখ ৬০ হাজার মানুষকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। পরিস্থিতি মোকাবিলায় ফ্রান্স সরকার সেনাবাহিনী মোতায়েন করেছে।

খবর বার্তা সংস্থা এএফপিকে উদ্ধৃত করে এ খবর প্রকাশ করেছে বাসস

ফ্রান্সের জনপ্রিয় পর্যটন এলাকা বোর্দোর আশপাশ থেকে শুরুতে প্রায় ১ লাখ ৯৭ হাজার মানুষকে সরিয়ে নেওয়া হয়। শান্তিকালীন সময়ে এটি দেশটির ইতিহাসে সবচেয়ে বড় জনসাধারণ সরিয়ে নেওয়ার ঘটনাগুলোর একটি। তবে পরে পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হওয়ায় প্রায় ৩ হাজার মানুষকে নিজ নিজ বাড়িতে ফিরতে দেওয়া হয়।

অন্যদিকে, স্পেনে মাদ্রিদের পশ্চিমাঞ্চলের বিভিন্ন গ্রাম থেকে প্রায় ৬০ হাজার মানুষকে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। আগুনের পরিস্থিতি দেখতে ঘটনাস্থল পরিদর্শনে গিয়ে দেশটির প্রধানমন্ত্রী পেদ্রো সানচেজ বলেন, এই মুহূর্তে সবচেয়ে বড় অগ্রাধিকার হলো মানুষের জীবন রক্ষা করা।

মাদ্রিদের পশ্চিমে অবস্থিত ব্রুনেতে শহরের মেয়র মার নিকোলাস এএফপিকে বলেন, তিনি খুবই উদ্বিগ্ন। তিনি বলেন, প্রতি বছরই আগুন লাগে, কিন্তু এবারের আগুন ভয়াবহ। এটি একটি বিপর্যয়।’

স্পেনের পূর্বাঞ্চলীয় শহর ভ্যালেন্সিয়ার কাছেও আরেকটি দাবানলে একজনের মৃত্যু হয়েছে। তবে ফায়ার সার্ভিসের সদস্যরা পরে আগুনটি নিয়ন্ত্রণে আনতে সক্ষম হন।

ফ্রান্স ও স্পেনের শত শত দমকলকর্মী টানা কয়েক দিন ধরে দিন-রাত আগুন নিয়ন্ত্রণে কাজ করলেও এখনো পুরোপুরি সফল হতে পারেননি। বোর্দোর কাছে আগুন নেভাতে গিয়ে চলতি সপ্তাহের শুরুতে দুই ফরাসি দমকলকর্মীও নিহত হন।

শনিবার সকালে দুই দেশের কর্তৃপক্ষ জানিয়েছিল, কিছু এলাকায় আগুনের তীব্রতা কমেছে। তবে পরিস্থিতি এখনো পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আসেনি।

ফ্রান্সের প্রধানমন্ত্রী সেবাস্তিয়ান লেকর্নু সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক বার্তায় সতর্ক করে বলেন, আবহাওয়ার পূর্বাভাস আবারও প্রতিকূল হয়ে উঠছে। আগামী কয়েক ঘণ্টা কঠিন হতে পারে।

স্পেনের প্রধানমন্ত্রী সানচেজও সতর্ক করে বলেন, সামনে আরও কিছু কঠিন সময় অপেক্ষা করছে।

মাদ্রিদের কাছে নাভালাগামেয়া গ্রামের বাসিন্দা ৩৮ বছর বয়সী জ্যাকলিন ভিলাফ্রাঙ্কা শুক্রবার বাড়ি ছেড়ে আশ্রয়কেন্দ্রে যান। তিনি বলেন, ‘ধোঁয়ায় পুরো গ্রাম ঢেকে গেছে। তিনি বলেন, মনে হয়েছিল সবকিছু বাড়িঘরসহ পুড়ে যাবে।’ বর্তমানে তিনি একটি জিমনেশিয়ামে তৈরি অস্থায়ী আশ্রয়কেন্দ্রে অবস্থান করছেন।

ফ্রান্স ও স্পেনের দাবানল দ্রুত ছড়িয়ে পড়ার পেছনে রয়েছে দীর্ঘদিনের তাপপ্রবাহ ও শুষ্ক আবহাওয়া। মে মাস থেকে দুই দেশই একাধিক তীব্র তাপপ্রবাহের মুখোমুখি হয়েছে, যার ফলে বনাঞ্চল অত্যন্ত শুষ্ক হয়ে আগুন ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি বেড়েছে।

বিজ্ঞানীরা বলছেন, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে খরা বাড়ছে এবং চরম আবহাওয়ার ঘটনা আরও ঘন ঘন ও ভয়াবহ হয়ে উঠছে। ইউরোপ বিশ্বের সবচেয়ে দ্রুত উষ্ণ হয়ে ওঠা মহাদেশগুলোর একটি।

দাবানল মোকাবিলায় ইউরোপীয় ইউনিয়নের সহায়তায় বিভিন্ন দেশ থেকে অগ্নিনির্বাপক বিমান পাঠানো হয়েছে।

ফ্রান্স বোর্দোর কাছে আগুন নিয়ন্ত্রণে সহায়তার জন্য ১ হাজার ৫০০ সেনাসদস্য এবং ১ হাজার ৭০০ নিরাপত্তাকর্মী মোতায়েন করেছে। শনিবার একটি এ৪০০এম সামরিক পরিবহন বিমানও আগুন নেভানোর কাজে যুক্ত হয়েছে।

প্যারিস থেকেও অতিরিক্ত দমকলকর্মী পাঠানো হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী লোকর্ন জানান, বর্তমানে মোট ১ হাজার ৪০০ দমকলকর্মী আগুন নিয়ন্ত্রণে কাজ করছেন।

দক্ষিণ-পশ্চিম ফ্রান্সে স্থানীয় প্রশাসন স্কুল ও জিমনেশিয়ামগুলোতে জরুরি আশ্রয়কেন্দ্র তৈরি করেছে। সেখানে পর্যটক ও স্থানীয় বাসিন্দারা আশ্রয় নিয়েছেন।

৭৫ বছর বয়সী আইরিশ পর্যটক নুয়ালা কেলি বলেন, ‘আমি জীবনে কখনো এমন কিছু দেখিনি। পৃথিবীর অনেক জায়গায় ভ্রমণ করেছি, নানা পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়েছি, কিন্তু এমন দৃশ্য আগে দেখিনি।’

ফ্রান্সের মেরিনিয়াক গ্রামের বাসিন্দা অলিভিয়ার স্টুয়ার্ট স্ত্রী ও ছোট সন্তানদের নিয়ে বাড়ি ছেড়ে আশ্রয় নিয়েছেন। তিনি বলেন, ‘সবচেয়ে বেশি ভয় পেয়েছে শিশুরা। তারা ভাবছে আগুনে আমাদের বাড়ি পুড়ে যাবে। তবে আমরা পরিস্থিতি সামলানোর চেষ্টা করছি।’

প্রধানমন্ত্রী লোকর্ন আরও জানান, যেসব বাড়িতে পোষা প্রাণী আটকে পড়েছে, সেগুলো উদ্ধারের পরিকল্পনাও করা হচ্ছে।

ফ্রান্সে দাবানলে রেকর্ড পরিমাণ এলাকা পুড়ে গেছে

ফ্রান্সের দাবানলে প্রায় ৯৮ হাজার হেক্টর (প্রায় ২ লাখ ৪২ হাজার একর) এলাকা পুড়ে গেছে। দেশটির স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী লরাঁ নুনেজ এটিকে ‘ঐতিহাসিক রেকর্ড’ হিসেবে উল্লেখ করেছেন।

শুধু দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলেই আগুনে ৩২ হাজার হেক্টরের বেশি এলাকা ধ্বংস হয়েছে, যা প্যারিস শহরের আয়তনের প্রায় তিন গুণ। এতে অন্তত ১০০টি ভবন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

ফরাসি প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁ বলেছেন, ‘দেশটি আবারও ঘুরে দাঁড়াবে।’

স্পেনের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, মাদ্রিদের পশ্চিমাঞ্চলের দাবানলে প্রায় ২৫ হাজার হেক্টর এলাকা পুড়ে গেছে।

সেখানকার তিনটি বড় দাবানলের মধ্যে দুটি একত্রিত হয়ে গেছে। ফলে রাজধানী মাদ্রিদ থেকে মাত্র কয়েক কিলোমিটার দূরে আরও বড় ধরনের অগ্নিকাণ্ডের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

10 − six =