বাংলাদেশের জ্বালানি নিরাপত্তার জন্য অপরিহার্য দক্ষ ব্যাবস্থাপনা

যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল ইরান আক্রমণ থেকে সূচিত যুদ্ধ গোটা আরব বিশ্ব পারস্য উপসাগর এলাকায় ছড়িয়ে পড়ার প্রতিক্রিয়ায় বিশ্বব্যাপী জ্বালানি সংকটের মহা আতঙ্ক দেখা দিয়েছে। উপসাগরীয় দেশগুলো এবং ইরান বিশ্বের জ্বালানি চাহিদার সিংহভাগ মিটিয়ে থাকে। যুদ্ধের কারণে সংশ্লিষ্ট দেশসমূহে জ্বালানি স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় এবং বিশেষত গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালী দিয়ে জাহাজ চলাচল সীমিত হওয়ার কারণে একদিকে যেমন জ্বালানি মূল্য আকাশ পানে ছুটে চলেছে অপরদিকে সাপ্লাই চ্যানেল ভেঙে পড়ায় গভীর সংকটে পড়েছে জ্বালানি আমদানিকারী দেশগুলো।

বিশেষ করে হরমুজ প্রণালির মতো গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ কার্যত স্থবির হয়ে পড়ায় এবং তেল শোধনাগারগুলোতে উপর্যুপরি হামলার ফলে বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম অস্বাভাবিকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। এরই মধ্যে ব্রেন্ট ক্রুড অয়েলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১১৫ ডলার অতিক্রম করেছে এবং পরিস্থিতি শান্ত না হলে এটি ১৫০ ডলার পর্যন্ত পৌঁছানোর আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। এই যুদ্ধের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ প্রভাবে বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল ও জ্বালানি আমদানিনির্ভর দেশগুলো এক ভয়াবহ সংকটের সম্মুখীন হচ্ছে, যার প্রভাব প্রতিটি খাতে গভীরভাবে অনুভূত হচ্ছে।

আমরা জানি ভ্রান্ত জ্বালানি নীতি আর আমলা নির্ভর অদক্ষ ব্যাবস্থাপনার কারণে বাংলাদেশ নিজেদের জ্বালানি সম্পদ আহরণ এবং উন্নয়ন অবজ্ঞা করে অন্ধের মতো জ্বালানি আমদানির দিকে ছুটেছে। যার পরিণতি ৫৫%+ আমদানিকৃত জ্বালানি (কয়লা, এলএনজি, এলপিজি, তরল জ্বালানি) নির্ভর হয়ে পড়া। বাংলাদেশ কিন্তু  নানা কারণে বিক্ষুব্ধ হয়ে পড়া বিশ্ব  জ্বালানি বাজরের মূল্যবৃদ্ধি বা ভূরাজনৈতিক সংঘাতের কারণে সাপ্লাই চেন ভেঙে পড়ার মতো চুক্তিগুলো অনুধাবন করে কোন আপতকালীন পরিকল্পনা করেনি। কোভিড১৯ বা রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের প্রতিক্রিয়া থেকে সৃষ্ট জ্বালানি সংকট থেকেও শিক্ষা নেয়নি। বাংলাদেশের জ্বালানির স্ট্রাটেজিক রিজার্ভ অত্যন্ত সীমিত। না আছে পর্যাপ্ত অপরিশোধিত তেল রিজার্ভ ব্যবস্থা, না আছে এলএনজি, এলপিজি রিজার্ভ সুবিধা। এমতাবস্থায় যুদ্ধ কিছুটা দীর্ঘস্থায়ী হলে বাংলাদেশের জন্য মহাসঙ্কট সৃষ্টির সম্ভাবনা আছে।

পেট্রোবাংলা, বিপিসির অদক্ষ দুর্বল ব্যাবস্থাপনা নতুন সরকারকে সঠিক তথ্য প্রদানে বার্থ হওয়ায় এবারের যুদ্ধের সূচনায় জনমনে জ্বালানি বিষয়ে প্যানিক সৃষ্টি হয়। বাংলাদেশে কিন্তু পেট্রল, অকটেন, কেরোসিন নিয়ে সহসা সংকটের কারণ নেই। ভয় আছে ডিজেল নিয়ে। অন্তর্বর্তীকালীন সরকার ভারতবিদ্বেষী মনোভাবের কারণে আসামের নুমালিগড় রিফাইনারি থেকে পাইপলাইন দিয়ে ডিজেল আমদানি স্থগিত করেছিল। নতুন সরকারের অনুরোধে পুনরায় ডিজেল আমদানি শুরু হওয়ায় সংকটের কিছুটা সমাধান হবে।

কিন্তু বিপিসির ভুল তথ্যে বিচলিত হয়ে জ্বালানি মন্ত্রী জ্বালানি সংকটের আভাস দেওয়া এবং অতি দ্রুত অপ্রয়োজনীয় জ্বালানি রেশনিং শুরু ভোক্তাদের মাঝে আতংক ছড়ায়। একইভাবে পেট্রোবাংলা ব্যাবস্থাপনা এলএনজি সাপ্লাই লাইন সঠিকভাবে মনিটরিং না করেই অধিকাংশ সার কারখানায় দ্রুত গ্যাস সরবরাহ বন্ধ করে দেওয়ায় আসন্ন নিবিড় কৃষি মৌসুমে সার সংকটের আশংকা সৃষ্টি হয়েছে। হরমুজ প্রণালী দিয়ে বাংলাদেশের জন্য জ্বালানি পরিবহনকারী তেল, এলএনজি জাহাজ চলাচলে সমস্যা নাই। এখন দেখতে হবে পেট্রোবাংলা এবং বিপিসি ব্যাবস্থাপনা কতটা দক্ষতার সঙ্গে জ্বালানি আমদানি আর সাশ্রয়ী ব্যবহার নিশ্চিত করতে পারে।

যুদ্ধ না হলেও কিন্তু এবারের গ্রীষ্ম মৌসুমে জ্বালানি সংকটের কারণে সর্বস্তরে জ্বালানি বিদ্যুৎ ব্যবহারে কৃচ্ছতা আর দক্ষ ব্যবহার নিশ্চিত করা অত্যাবশ্যক ছিল। সরকার সঠিকভাবেই যানবাহনে জ্বালানি ব্যবহার সীমিত রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। বিদ্যুৎ উৎপাদন এবং রান্নার কাজে গ্যাস ব্যবহারের বিকল্প থাকায় পেট্রোবাংলা অগ্রাধিকার ভিত্তিতে সার উৎপাদন আর শিল্পে গ্যাস সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে নিবিড় মনিটরিং নিশ্চিত করতে হবে। মনে রাখতে হবে জ্বালানির পাশাপাশি বিশ্ববাজারে কিন্তু সারের মূল্য বৃদ্ধি পেয়েছে। বাংলাদেশকে কিছুতেই খাদ্য নিরাপত্তা বিঘ্নিত করা যাবে না।

নতুন সরকার হয়ত অনুধাবন করছে কেন জ্বালানি বিদ্যুৎ স্ট্রাটেজিক সেক্টর বিবেচনা করে আপৎকালীন পরিকল্পনাসহ সঠিক বাস্তবায়নযোগ্য জ্বালানি পরিকল্পনা প্রণয়ন আর বাস্তবায়ন দীর্ঘস্থায়ী অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য জরুরি। এই পরিকল্পনায় বিশেষ গুরুত্ব দিতে হবে নিজস্ব জ্বালানি কয়লা ও গ্যাসসম্পদ দ্রুত অনুসন্ধান, জ্বালানি ব্যাবহারে দক্ষতা অর্জনে। এনার্জি ট্রানজিশনের ধুয়া তুলে বাংলাদেশের জন্য কয়লা আর গ্যাস মাটির নিচে রেখে দেওয়া আত্মঘাতী হবে। বাংলাদেশের অদূর ভবিষ্যতে জিরো এমিশন অর্জন করা দিবাস্বপ্ন। কিন্তু সৌর এবং বায়ু বিদ্যুৎ সম্ভাবনার পাশাপাশি দ্রুত রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ উপাদান শুরু করতে হবে।

আমি সমালোচনাকারীদের দৃষ্টি আকর্ষণ করছি। পায়রা, রামপাল, মাতারবাড়ি, আনোয়ারায় নির্মিত কয়লা বিদ্যুৎ কেন্দ্র এবং ভারত থেকে বিদ্যুৎ এবং ডিজেল আমদানির যুগান্তকারী কার্যক্রম বাস্তবায়ন না করলে কি অবস্থা হতো এখন?

যাহোক শুরু করেছি ব্যাবস্থাপনা নিয়ে। ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা থেকেই জানি বাংলাদেশের জ্বালানি বিদ্যুৎ সেক্টর দুর্বল ব্যাবস্থাপনার কারণে এখনো একটি অশুভ সিন্ডিকেট নির্ভর হয়ে আছে। সরকার আসে সরকার যায় আমলা নিয়ন্ত্রিত সিন্ডিকেট অভিশাপ থেকে মুক্ত হয় না সেক্টর। তাই সরকারের সদিচ্ছা থাকা সত্ত্বেও সঠিক পেশাদারি দায়িত্বশীল নেতৃত্ব থেকে জ্বালানি বিদ্যুৎ সেক্টর মুক্ত হতে পারে নি। দুর্নীতি আর অপশাসন সেক্টরকে অক্টপাসের মতো বেঁধে রেখেছে। নতুন সরকারের অন্যতম প্রধান চ্যালেঞ্জ হবে সেক্টরে দক্ষ, জবাবদিহিমূলক গতিশীল নেতৃত্ব সৃষ্টি।  আধুনিক বিশ্বে টেকনোলোজি অনেক এগিয়ে গাছে। জ্বালানি বিদ্যুৎ সাপ্লাই চেন এখন বিজ্ঞাননির্ভর। এখানে দক্ষ সঠিক পেশাদারি নেতৃত্ব অপরিহার্য।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

three + 10 =