ভরাডুবির ব্যাবচ্ছেদ

সালেক সুফী

ভারতের সঙ্গে ৬ উইকেটে এবং নিউ জিল্যান্ডের সঙ্গে ৫ উইকেটের উপর্যুপরি পরাজয়ের পর আইসিসি চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফি থেকে ছিটকে পড়েছিল বাংলাদেশ। পাকিস্তানের বিরুদ্ধে  সম্মান রক্ষার শেষ ম্যাচটিও রসিক প্রকৃতি ধুয়ে দিল। সান্তনা উন্নত রান রেটের কারণে গ্রূপের তলানিতে শেষ করেনি বাংলাদেশ। কিন্তু এমন অনাকাঙ্খিত অবস্থান নিয়ে গর্ব করার কিছু নেই। অধিনায়ক নাজমুল হোসেন শান্ত কিন্তু টুর্নামেন্টের শুরুতে চ্যাম্পিয়ন হয়ে ফেরার  হাক ডাক দিয়েছিলো উঁচু গলায়। আমি বলবো রাওয়ালপিন্ডির বৃষ্টি বাংলাদেশকে চূড়ান্ত লজ্জা থেকে বাঁচিয়েছে।খেলা হলেই বাংলাদেশ জিতে যেত এমন ভাবনার নিশ্চয়তা ছিল না। টুর্নামেন্টের আরেক দুর্বল দল পাকিস্তানকে হারানো বাংলাদেশের জন্য আদৌ সহজ ছিল না।

এবারের টুর্নামেন্টে আইসিসি র‍্যাংকিংয়ে থাকা সেরা আট দল খেলেছে দুটি গ্রূপে বিভক্ত হয়ে. গ্ৰুপ এ তে ছিল ভারত পাকিস্তানের সঙ্গে নিউজিলান্ড এবং বাংলাদেশ। দুটি করে ম্যাচ খেলার পর নিউজিলণ্ড এবং ভারত পাকিস্তান এবং বাংলাদেশকে নক আউট করে দেয়। বাকি ছিল শেষ ম্যাচে নির্ধারণ করা কোন দলটি গ্রূপের তলানিতে থাকবে। বৃষ্টি বাগড়া দিয়ে সেটি হতে দিলো না। অপর গ্রুপ বি তে আজ মুখমুখী হবে আফগানিস্তান অস্ট্রেলিয়া। বিজয়ী দল উন্নীত হবে সেমিফাইনালে। কে হবে বিজয়ী দলের সঙ্গী সেটি ইংল্যান্ড দক্ষিণ আফ্রিকার ম্যাচ থেকে নির্ধারিত হবে।

আমি এই টুর্নামেন্টে বাংলাদেশের হতাশা জনক পারফরমেন্স দেখে আদৌ বিস্মিত হয় নি। পুরোপুরি অপ্রস্তুত হয়ে খেলতে যাওয়া বাংলাদেশ এমনি করবে সেটি স্বাভাবিক। টুর্নামেন্টের আগে বাংলাদেশ ৫০ ওভারের ম্যাচ খেলেনি। খেলেছে সাধারণ মানের নানা বিতর্কে কলংকিত বিপিএল।  বিসিবির ব্যার্থতার কারণে বাংলাদেশ ক্রিকেটের কিংবদন্তি সাকিব আল হাসান এবং তামিম ইকবালকে স্কোয়াডে রাখা সম্ভব হয় নি।  প্রমাণিত মানসম্পন্ন উইকেট কিপার ব্যাটসম্যান লিটন কুমার দাসকেও ফর্মে না থাকার অজুহাতে দলে নেয়া হয় নি। অন্যানো দলগুলো নানাভাবে ম্যাচ খেলে নিজেদের ঝালিয়ে নিলেও বিসিবি বাংলাদেশের জন্য কোনো অনুশীলন ম্যাচ আয়োজন করতে পারেনি। পাকিস্তান শাহীনের বিরুদ্ধে একমাত্র ম্যাচটিকে আমি আদৌ গুরুত্ব দিবো না। তামিম, সাকিবের অনুপস্থিতি টুর্নামেন্টে ভালোভাবে অনুভব করা গাছে। টুর্নামেন্টের দুটি ম্যাচে ভারত এবং নিউ জিলণ্ড বোলিং মোকাবেলায় ধসে পড়েছে বাংলাদেশ ব্যাটিং। প্রথম ম্যাচে টপ অর্ডার দ্বিতীয় ম্যাচে মিডল অর্ডার কর্পূরের মত উবে গাছে। প্রথম ম্যাচে রোহিত শর্মা জাকের আলীর সহজ ক্যাচ ফেলে না দিলে হয়তো শত রানের নিচে গুটিয়ে যেত বাংলাদেশ। যাহোক তাওহীদ হৃদয় এবং জাকের আলীর মাইল ফলক জুটি টুর্নামেন্টে বাংলাদেশের আধার ঘরে পূর্ণিমার আলো ছিলো। বাংলাদেশের সামান্য পুঁজি প্রতিরক্ষায় লড়াই করেছিল বোলিং ইউনিট। দ্বিতীয় ম্যাচে ভালো সুচনার পর মিডল অর্ডার ধস্যে পরে তাসের ঘরের মত ব্রেসওয়েলের ঘূর্ণি বলের মোকাবেলায়। একমাত্র সান্তনা ছিল নাজমুল শান্তর ফর্মে ফেরা আর জাকের আলীর ধারাবাহিক ভালো ব্যাটিং। এবারেও বাংলাদেশের মামুলি স্কোর তাড়া করে হেসে খেলে ম্যাচ জয় করেছে নিউ জিলণ্ড। মুশফিক মাহমুদুল্লার যাবার সময় হয়ে গাছে। স্বসম্মানে বিদায় নেয়া ওদের জন্য সমীচীন। বোলিং ইউনিট খারাপ করেনি। আধুনিক ওডিআই ক্রিকেটে ২৮০-৩০০ রান না করলে বড় দলের সঙ্গে লড়াই করা যায় না। পারে নি বাংলাদেশ মূলত ব্যাটিং ব্যার্থতার কারণে। ব্যাটসম্যানদের সামর্থের সীমাবদ্ধতা প্রকট। মেন্টোরিংয়ে ঘাটতি ছিল।

ফিরে তাকেই দেখি টুর্নামেন্টের অন্যানো দলের তুলনায় গুনে মানে শারীরিক এবং মানসিক দৃঢ়তায় যোজন যোজন পিছিয়ে বাংলাদেশ। এই ধরণের বৈষয়িক টুর্নামেন্টে ম্যাচ জয়ের যোগ্যতাই নেই বর্তমান বাংলাদেশ দলের। না আছে টপ অর্ডার, না মিডল অর্ডার। এই ধরণের ধরি মাছ না ছুই পানি দিয়ে আধুনিক বিশ্ব ক্রিকেটে দারুন পেশাদার দলগুলোর বিরুদ্ধে ম্যাচ জয় করার চিন্তা করাই অবান্তর। টুর্নামেন্টের আগেই অস্ট্রেলিয়ান কিংবদন্তি রিকি পন্টিং বাংলাদেশকে টুর্নামেন্টের সবচেয়ে দুর্বল দল বলেছিলো। বাংলাদেশ সেটি ভুল প্রমান করতে পারলো না।

সরকারের পট পরিবর্তনের পর নাজমুল হাসান পাপনের স্থানে বিসিবি সভাপতি হয়ে এসেছে ফারুক আহমেদ। এসেছে নাজমুল আবেদীন ফাহিম। দুজনই অনেক বাগাড়ম্বর করেছে। অর্জন শূন্য। হেড কোচ সহ কোচিং স্টাফ পরিবর্তন হয়েছে। অর্জন একটি অসংখ বিতর্ক নিয়ে কলংকিত বিপিএল। জানিনা কেন বিসিবি কোন প্রস্তুতি না নিয়েই চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফি খেলতে গেলো? দেশের ভাবমূর্তি রক্ষার কি কোনো দায়িত্ব নেই ফারুক ফাহিম নিয়ন্ত্রিত বিসিবির। বাংলাদেশ ক্রিকেটে এখন রূপান্তরের পালা। ঘরোয়া ক্রিকেটের আমূল পরিবর্তন না হলে বাংলাদেশ ক্রিকেট অচিরে জিম্বাবুয়ে এবং কেনিয়ার পর্যায়ে উপনীত হবে। ক্রিকেট প্রেমিক বাংলাদেশিদের কাছে বিসিবির উচিত ক্ষমা প্রার্থনা করা।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

19 − 9 =