এলপিজি অপারেটরদের লাইসেন্সিং প্রক্রিয়া সহজ করার দাবি
আসন্ন রমজান মাসে এলপিজির (তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাস) সংকট থাকবে না বলে আশ্বাস দিয়েছেন বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি)-এর চেয়ারম্যান জালাল আহমেদ। তিনি বলেন, সংকটটি সাময়িক; তবে দীর্ঘমেয়াদি সমাধানের জন্য একটি সমন্বিত কর্মপরিকল্পনা প্রয়োজন।
এনার্জি অ্যান্ড পাওয়ার ম্যাগাজিন আয়োজিত “এলপিজি বাজারে নিয়ন্ত্রক চ্যালেঞ্জ” শীর্ষক এক গোলটেবিল বৈঠকে তিনি এসব কথা বলেন।
সেমিনারে বক্তারা এলপিজি খাতের নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা সংস্কারের ওপর জোর দেন। তারা বলেন, খাতটির কার্যকারিতা বাড়াতে নিয়ন্ত্রক কাঠামোয় পরিবর্তন আনতে হবে। জনগণ ও এই খাতে কর্মরত কোম্পানিগুলোর স্বার্থ বিবেচনায় রেখে আইন ও বিধিমালা প্রণয়ন করা জরুরি। বক্তারা সতর্ক করে বলেন, গ্যাসের মূল্যবৃদ্ধি নিয়ন্ত্রণ করা না গেলে সব প্রচেষ্টাই ব্যর্থ হবে।
এনার্জি অ্যান্ড পাওয়ার ম্যাগাজিনের সম্পাদক মোল্লা আমজাদ হোসেন গোলটেবিল আলোচনাটি পরিচালনা করেন। তিনি বলেন, দৈনন্দিন ব্যবহারের পর্যাপ্ত গ্যাস পাচ্ছে না মানুষ। তিনি বলেন নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা যেন পরিচালনা সহায়ক হয়, প্রতিবন্ধক না হয়ে ওঠে সেদিকে লক্ষ্য রাখতে হবে। তিনি এলপিজি খাতে একক নিয়ন্ত্রক ব্যবস্থা প্রচলনের প্রস্তাবও দেন।
জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ড. এম তামিম বলেন, এলপিজি খাতে নিয়ন্ত্রক কাঠামো ও ব্যবস্থায় নানা সমস্যা রয়েছে। তিনি সব ধরনের কাজ একক নিয়ন্ত্রক কর্তৃপক্ষের আওতায় আনার সুপারিশ করেন এবং একটি সমন্বিত নিয়ন্ত্রক কাঠামোর প্রয়োজনীয়তার কথা উল্লেখ করেন।
তিনি বলেন, এলপিজি খাতে সংকট আগেও ছিল, তবে সম্প্রতি তা আরও গভীর হয়েছে। বাংলাদেশে এলপিজির ব্যবহার দ্রুত বাড়ছে। বর্তমানে প্রায় ২০ লাখ গ্রাহক রয়েছে, যা অল্প সময়ের মধ্যেই ৩৫ লাখে পৌঁছাবে।
ড. তামিম বলেন, বাংলাদেশের বহু-সংস্থাভিত্তিক নিয়ন্ত্রণ কাঠামো একটি বড় সমস্যা। লাইসেন্সিং প্রক্রিয়াও অত্যন্ত জটিল ও ব্যয়বহুল। এই ব্যয় কমানো না হলে তা মূল্য কাঠামোর ওপর চাপ সৃষ্টি করবে, যার বোঝা শেষ পর্যন্ত ভোক্তাদের ওপরই পড়বে। তিনি আরও বলেন, এলপিজির পরিবেশগত ক্ষতি খুবই কম, তাই এর ব্যবহার বাড়ানো উচিত। তিনি লাইসেন্স নবায়নের মেয়াদ বাড়িয়ে পাঁচ থেকে দশ বছর করার প্রস্তাব দেন, যাতে অপারেটরদের ঝামেলা কমে। একই সঙ্গে বিধিনির্ভর ব্যবস্থার পরিবর্তে নিরাপত্তাভিত্তিক নিয়ন্ত্রক ব্যবস্থা চালুর পরামর্শ দেন।
কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ক্যাব)-এর সভাপতি এএইচএম শফিকুজ্জামান বলেন, এলপিজিকে অত্যাবশ্যকীয় পণ্য হিসেবে ঘোষণা করা উচিত। তিনি মূল্য নির্ধারণ প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার দাবি জানান। তার মতে, সরকার পরিচালিত প্রতিষ্ঠানগুলোকে এলপিজি ব্যবসায় যুক্ত না হয়ে বেসরকারি খাতকে সুযোগ দেওয়া উচিত। একক নিয়ন্ত্রক ব্যবস্থা চালু হলে ভোক্তারা ন্যায্যমূল্যে ও ঝামেলাহীনভাবে এলপিজি পাবে বলেও তিনি মত দেন।
বিইআরসি চেয়ারম্যান জালাল আহমেদ বলেন, সরকার নিয়ন্ত্রক সংস্কারে কাজ করছে এবং অপারেটরদের সুবিধার্থে প্রক্রিয়া সহজ করার উদ্যোগ নেবে, যা শেষ পর্যন্ত ভোক্তাদেরই উপকারে আসবে। তিনি জানান, নানা কারণে গত কয়েক মাসে এলপিজি আমদানি কিছুটা কমেছে, তবে অল্প সময়ের মধ্যেই সরবরাহ ব্যবস্থা স্বাভাবিক হবে বলে তিনি আশাবাদী।
তিনি বলেন, অনেক কোম্পানি নির্ধারিত সীমার চেয়েও বেশি এলপিজি আমদানি করছে। আমদানি সীমিত করা হয়েছে এমন ধারণা সঠিক নয়। ভবিষ্যতে সংকট থাকবে না বলেও তিনি আশা প্রকাশ করেন। এছাড়া লাইসেন্সের মেয়াদ বাড়ানো ও অপারেটরদের জন্য অনলাইন সেবা চালুর উদ্যোগ নেওয়া হবে বলে জানান তিনি।
আমদানি সংক্রান্ত সমস্যা দূর করা এবং স্থানীয় বাজারে মূল্য নিয়ন্ত্রণে সরকার পদক্ষেপ নেবে বলেও জানান জিালাল আহমেদ বলেন, বিইআরসির দক্ষতা ও কর্তৃত্ব বাড়ানোর চেষ্টা চলছে। “আমরা আরো সক্রিয় হওয়ার চেষ্টা করছি,” বলেন তিনি। তিনি আশা করেন, সবার সহযোগিতায় সংকট কাটিয়ে ওঠা সম্ভব হবে এবং ভবিষ্যতে এমন সমস্যা আর হবে না।
বাংলাদেশ এলপিজি অপারেটরস অ্যাসোসিয়েশন (লোয়াব)-এর সভাপতি আমিনুল হক বলেন, এলপিজি খাত বর্তমানে এক সংকটকাল অতিক্রম করছে। এটি দীর্ঘদিনের সমস্যা। আন্তর্জাতিক ও স্থানীয় উভয় বাজারেই অপারেটররা চাপে রয়েছেন। তিনি বলেন, নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার জটিলতা দূর না হলে বিনিয়োগ বাড়বে না। লাইসেন্সিং প্রক্রিয়া, উচ্চ নবায়ন ফি এবং কার্গো খালাসের স্থানসংক্রান্ত সমস্যাগুলো দ্রুত সমাধান না হলে সংকট চলতেই থাকবে।
পরিবেশ অধিদপ্তরের উপপরিচালক শামসুজ্জামান সরকার জানান, এলপিজি বোতলজাতকরণ কারখানাগুলোকে ‘লাল’ থেকে ‘হলুদ’ শ্রেণিতে আনা হয়েছে। তিনি বলেন, এলপিজি শিল্পকে ‘সবুজ শিল্প’ হিসেবে ঘোষণার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে এবং সাত কার্যদিবসের মধ্যেই পরিবেশগত ছাড়পত্র দেওয়ার আশ্বাস দেন।
জ্বালানি বিভাগের যুগ্ম সচিব ফজলুল হক বলেন, এলপিজি খাতের জন্য একটি সমন্বিত নীতিমালা প্রণয়নে কাজ চলছে। তিনি জানান, এলপিজি শিল্পের জন্য সবুজ ব্যাংকিং সুবিধা চালু করতে বাংলাদেশ ব্যাংককে অনুরোধ করা হয়েছে।
আলোচনায় অংশ নিয়ে বিএনপি নেতা জহিরউদ্দিন স্বপন বলেন, প্রতিটি সরকারেরই জ্বালানি খাত সম্প্রসারণে সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা থাকা উচিত এবং তা জনগণের স্বার্থকে সামনে রেখে প্রণয়ন করতে হবে। তিনি এলপিজি খাতে নিয়ন্ত্রণ কমানোর পরামর্শ দেন।
সিপিবির সাবেক সাধারণ সম্পাদক রুহিন হোসেন প্রিন্স বলেন, অনেক সময় কৃত্রিম সংকট তৈরি করে মুনাফা অর্জনের চেষ্টা করা হয়। তিনি এলপিজি খাতকে সরকারি নিয়ন্ত্রণে আনা এবং জনগণের অধিকার নিশ্চিত করতে গ্যাস রপ্তানি বন্ধের প্রস্তাব দেন।
সাংবাদিকরা সাম্প্রতিক সময়ে এলপিজির অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। অপারেটর ও অন্যান্য অংশীজনরা বলেন, আন্তর্জাতিক বাজার থেকে পর্যাপ্ত গ্যাস না পাওয়াসহ অবতরণ স্থানের স্বল্পতা ও মূল্য ব্যবস্থাপনার দুর্বলতার কারণে সংকট তৈরি হয়েছে। তারা বলেন, আন্তর্জাতিক বাজার থেকে যে দামে এলপিজি কেনা হচ্ছে, সেই অনুযায়ী মূল্য নির্ধারণ করা উচিত।
ইউনিভার্সাল গ্যাসের শাহজাহান সাজু বলেন, মাত্র ছয়টি কোম্পানি বাজারে আধিপত্য বিস্তার করছে; বাকি অপারেটরদের তেমন প্রভাব নেই। ইউনিটেক্স এলপিজির সাকিব আহমেদ সিদ্দিকী বলেন, বাজারে পর্যাপ্ত পণ্য পাওয়া যাচ্ছে না। “আমরা বেশি দামে পণ্য কিনে কম দামে কীভাবে বিক্রি করব?” প্রশ্ন তোলেন তিনি।
মেঘনা ফ্রেশ গ্যাসের আবু সাঈদ রাজা বলেন, আন্তর্জাতিক ও স্থানীয় উভয় পর্যায়েই তারা সমস্যার মুখে। মূল্য কাঠামোকে যৌক্তিক করা জরুরি। যমুনা স্পেস-টেকের বেলায়েত হোসেন বলেন, অপারেটররা রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সমস্যার পাশাপাশি আমদানি জটিলতার মুখে পড়ছেন।
জেএমআই-এর চেয়ারম্যান আবদুর রাজ্জাক বলেন, ২৭টি কোম্পানির মধ্যে মাত্র পাঁচটি এলপিজি আমদানির সক্ষমতা রাখে। বাকি কোম্পানিগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। পরিস্থিতি এভাবে চলতে থাকলে পুরো বাজারই সংকটে পড়বে বলে তিনি সতর্ক করেন।
এছাড়াও আলোচনায় অংশ নেন ব পেট্রোবাংলার সাবেক পরিচালক আলী ইকবাল মোহাম্মদ নুরুল্লাহ এবং বিস্ফোরক অধিদপ্তরের প্রধান পরিদর্শক মো. আবুল হাসান।