মো. আবুবকর সিদ্দীক
আল্লাহর বিধান অনুসারে দিন যায়, দিন আসে। একটি মাসের পর আসে আরেকটি মাস। কিন্তু একটি মাসের জন্য মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.) প্রতীক্ষায় থাকতেন। সেই মাসটি পাওয়ার জন্য আল্লাহর কাছে দোয়া ও প্রর্থনা করতেন। সেই মাসটির নাম হলো রমযান। হিজরি বর্ষপঞ্জির নবম মাস রমযান। রজব মাস থেকেই রাসূল (সা.) রমযানের প্রস্তুতি নিতেন। সকল ব্যস্ততা কমিয়ে আনতেন। হযরত আনাস ইবনে মালেক (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, যখন পশ্চিম আকাশে রজবের বাঁকা চাঁদ দেখা যেতো, তখন রাসূল (সা.) দরদমাখা কণ্ঠে মহান প্রভুর কাছে বারবার এ দোয়া করতেন- ‘হে আল্লাহ আমাদের জন্য রজব ও শাবান মাসকে বরকতময় করে দিন। আর আমাদের হায়াত রমযান মাস পর্যন্ত পৌঁছে দিন।’ একটি নির্দিষ্ট মাস পেতে এই ব্যাকুলতার থেকেই রমযানের গুরুত্ব ও তাৎপর্য সহজেই অনুমেয়।
রমযান অত্যন্ত পবিত্র, ফজিলত ও বরকতময় মাস। এই মাসে মহান আল্লাহপাক মহাপবিত্র আল- কোরআন নাজিল করেন। এ মাসের শেষ দশকে রয়েছে মহিমান্বিত রজনী লাইলাতুল ক্বদর যে রজনী হাজার মাসের চেয়েও উত্তম। এ মাসে রোযা পালন করা প্রত্যেক প্রাপ্তবয়স্ক ও সুস্থ মুসলমানের জন্য ফরয।
ইসলামের মৌলিক পাঁচ স্তম্ভের অন্যতম রোযা। ঈমান, নামায ও যাকাতের পরই রোযার স্থান। রোযার আরবি প্রতিশব্দ সওম, যার আভিধানিক অর্থ বিরত থাকা। ইসলামি পরিভাষায় সুবহে সাদিক থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত রোযার নিয়তে পানাহার, স্ত্রী সহবাস, পাপাচার, অশ্লীল ও অন্যায় কাজ থেকে বিরত থাকার নামই রোযা। আল্লাহ তাআলা পবিত্র কোরআনে ইরশাদ করেছেন- ‘হে ঈমানদারগণ! তোমাদের উপর রোযা ফরয করা হয়েছে, যেমন ফরয করা হয়েছিল তোমাদের পূর্ববর্তীদের উপর, যেন তোমরা মুত্তাকী হতে পার।’
পবিত্র কোরআনের এই বাণী থেকে তিনটি বিষয় স্পষ্টত রোযা ফরজ এটা হযরত মুহাম্মদ (স.) এর আগে যেসকল নবী-রাসুল পৃথিবীতে প্রেরিত হয়েছিলেন তাঁদের উম্মতদের ওপরও রোযা ফরজ ছিলো এবং রোযা পালনের মাধ্যমে মুত্তাকী বা তাকওয়া অর্জন করা যায়।
তাকওয়া ব্যতীত মু’মিন হওয়া যায় না। আর এই তাকওয়া অর্জনের মাধ্যম হিসেবে রোযার গুরুত্ব সর্বাধিক। কেবল সুবহে সাদিক থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত পানাহার থেকে বিরত থাকার নাম রোযা নয়, বরং পানাহার থেকে বিরত থাকার পাশাপাশি স্ত্রী সম্ভোগ ও সকল ধরনের অশ্লীল ও পাপকার্য থেকে বিরত থাকার নামই রোযা।
রোযা রাখা অত্যন্ত পূণ্যের কাজ। রোযার বিষয়ে আল্লাহ তাআলার পক্ষ হতে বিশেষ ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। সহীহ বুখারীতে বর্ণিত আছে, আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘প্রত্যেক ইবাদতই ইবাদতকারী ব্যক্তির জন্য, পক্ষান্তরে রোযা আমার জন্য। আমি নিজেই এর প্রতিদান দিব’। এ কথার বিশেষ তাৎপর্য রয়েছে। যদিও প্রকৃতপক্ষে সকল ইবাদতই আল্লাহর সন্তুষ্টি ও নৈকট্য লাভের উদ্দেশ্যেই হয়ে থাকে। তবুও রোযা ও অন্যান্য ইবাদতের মধ্যে একটি বিশেষ পার্থক্য রয়েছে। তা হলো অন্যান্য ইবাদতের কাঠামোগত ক্রিয়াকলাপ, নিয়ম-পদ্ধতি এমন যে, তাতে আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের উদ্দেশ্য ছাড়াও ইবাদতকারীর নফসের স্বাদ গ্রহণের সুযোগ থাকে। মুখে প্রকাশ না করলেও অনেক সময় তার অন্তরে লোক দেখানোর ভাব সৃষ্টি হতে পারে। কিন্তু রোযা এমন এক পদ্ধতিগত ইবাদত যেখানে আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের উদ্দেশ্য ব্যতীত ইবাদতকারীর নফসের স্বাদ গ্রহণের সুযোগ নেই বিন্দুমাত্র। রোযাদার নিজে প্রকাশ না করলে আল্লাহ তাআলা ব্যতীত কারো নিকট প্রকাশিত হওয়া সম্ভব নয়। তাই রোযার রাখার মাধ্যমে আল্লাহর আনুগত্যের বিষয়টি একনিষ্ঠভাবে প্রতীয়মান হয়।
রোযা মূলত মুত্তাকী হওয়ার অনুশীলন। অন্যায়, অশ্লীলতা ও পাপাচার থেকে নফসকে বিরত রাখার চর্চা। শুধু হারাম বর্জন নয়, হালাল থেকেও নফসকে বিরত রাখার প্রশিক্ষণ পাওয়া যায় রোযার মাধ্যমে। রোযাদারের জন্য হালাল খাবার ও স্ত্রী সম্ভোগ নির্দিষ্ট সময় ব্যাপী নিষিদ্ধ। রোযার এই বাধ্যবাধকতার মধ্যে মুসলমানদের জন্য অতি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা রয়েছে। আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন করাই মু’মিনদের একমাত্র লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য। তার সন্তুষ্টির জন্য মু’মিনদের অসাধ্য কোনো কিছু থাকতে পারে না। রোযা তেমনই একটি ইবাদত।
রোযার পরিপূর্ণ ফজিলত ও বরকত লাভের জন্য শরিযত সম্মতভাবে রোযা পালন করতে হবে। রোযার পবিত্রতা ও হক আদায় করতে হবে। আপাতদৃষ্টিতে রোযার পবিত্রতা বলতে অনেকেই রোযার সময় দিনের বেলা হোটেল-রেস্তোরা এবং প্রকাশ্যে ধুমপান বন্ধ রাখাকে বুঝে থাকেন। অনেকে আরেকটু বৃহৎ পরিসরে ব্যক্তিগত পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতাসহ পারিপার্শ্বিক পরিবেশ সুন্দর ও নির্মল রাখাকে রোযার পবিত্রতা বজায় রাখার অনুষঙ্গ হিসেবে মনে করে থাকেন। প্রকৃতপক্ষে রমযানের পবিত্রতা হলো, আল্লাহ তাআলা রোযা অবস্থায় যেসকল কাজ থেকে বিরত থাকার নির্দেশ দিয়েছেন সেসকল কাজ পরিত্যাগ করা। যেসব পাপকর্ম আল্লাহ তাআলা সব সময়ের জন্য নিষিদ্ধ করেছেন যেমন-সুদ, ঘুষ, জুয়া, ব্যভিচার, শিরক, মদ্যপান, মিথ্যা বলা, প্রতারণা, আমানতের খেয়ানত, আত্মসাৎ, গিবত, ঝগড়া-বিবাদ, হত্যা, অশ্লীলতা, হারাম খাদ্য গ্রহণ, নাটক-সিনেমা দেখা প্রভৃতি শরিয়ত পরিপন্থি কাজ পরিহার করা অপরিহার্য। হযরত আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘যে ব্যক্তি রোযা রেখে পাপ, মিথ্যা কথা, অন্যায় ও মূর্খতাসুলভ কাজ ত্যাগ করতে পারে না, তার পানাহার ত্যাগ করাতে আল্লাহর কোনো প্রয়োজন নেই।’ সহীহ বুখারীতে একটি হাদীসে বর্ণিত হয়েছে- ‘সুতরাং যখন তোমাদের কারো রোযার দিন আসে, সে যেন অশ্লীল কথা না বলে এবং অনর্থক শোরগোল না করে। যদি কেউ তাকে গালি দেয় অথবা তার সঙ্গে ঝগড়া করতে চায়, সে যেন তাকে বলে দেয়, আমি একজন রোযাদার।’
রোযার আবশ্যিক বিধানের মাধ্যমে মহান আল্লাহ মুসলমানদেরকে হেদায়েতের পথে ফিরিয়ে আনা এবং সত্য ও ন্যায়ের পথে অবিচল থাকার শিক্ষা দিয়েছেন। এজন্য রমযান মাসে সকল মুসলমানের জন্য আবশ্যিক কাজ হলো রোযা রাখা এবং সকল ধরনের অশ্লীল, অন্যায় ও পাপাচার থেকে বিরত থাকা। শরিয়তের অনুসরণে ব্যক্তিগত, পারিবারিক, সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় কাজ কিংবা দায়িত্ব পালন করা। রমযানের সর্বোচ্চ ফজিলত অর্জনের জন্য, অতীতের যাবতীয় পাপমোচন ও সুন্দর আগামীর জন্য আল্লাহর ইবাদতে নিবেদিত থাকা। এমাসে সাধ্যমত দান-সদ্কা করা, দরিদ্র-অসহায়-মিসকিনের পাশে দাঁড়ানো ও আর্তের সেবা করা। সকল পাপ-পঙ্কিলতা থেকে মুক্ত থেকে আত্মশুদ্ধি ও আত্মসংযমের মাধ্যমে উন্নত চরিত্র গঠন করা এবং তার ওপর আজীবন দৃঢ় থাকার মাধ্যমেই রোযার পবিত্রতা ও হক আদায় হয়।
রমযানে গুনাহ মাপ কিংবা আত্মশুদ্ধির সুযোগ যারা কাজে লাগাতে পারলো না তাদের বিষয়ে মহানবী (স.) অভিসম্পাত দিয়েছেন। হযরত আবু হুরায়রা (রাঃ) হতে বর্ণিত, রাসুল (সাঃ) বলেছেন, অপদস্থ হোক সেই ব্যক্তি, যার সম্মুখে আমার প্রসঙ্গ উত্থাপিত হলো অথচ সে আমার প্রতি দরুদ পাঠ করলো না। অপদস্থ হোক সেই ব্যক্তি, যে ব্যক্তি রমযান মাস পেলো কিন্তু গুনাহ মাপ করাতে পারলো না। অপদস্থ হোক সেই ব্যক্তি, যে ব্যক্তি পিতামাতা উভয়কে অথবা যে কোনো একজনকে তাদের বার্ধ্যকের অবস্থায় পেলো অথচ সে তাদের খিদমত ও সন্তুষ্টির মাধ্যমে জান্নাতে প্রবেশের যোগ্যতা অর্জন করতে পারলো না।’ এই সহীহ হাদিসটির গুরুত্ব ও তাৎপর্য উপলব্ধি করতে হবে। রোযা রাখা ও রোযার পবিত্রতা পরিপূর্ণভাবে আদায় করে প্রকৃত মুত্তাকী হতে হবে এবং পিছনের সকল গুনাহ মাপের জন্য আল্লাহর নিকট প্রার্থনা করতে হবে। মহান আল্লাহ পবিত্র মাহে রময়ানে সকলকে মুত্তাকী হওয়ার তৌফিক দান করুন।
লেখক: জনসংযোগ কর্মকর্তা, ধর্ম বিষয়ক মন্ত্রণালয়