শ্যারেন্টিংয়ের প্রভাব

ময়ূরাক্ষী সেন

রিমা এবং সায়েম সবে বাবা-মা হয়েছেন। প্রথম বাবা-মা হওয়ার মধুর মুহূর্ত সোশ্যাল মিডিয়া শেয়ারের মাধ্যমে শুরু হয় তাদের শ্যারেটিং (সোশ্যাল মিডিয়ায় বাচ্চাদের ছবি বেশি বেশি শেয়ার করা) এর যাত্রা। এরপর সন্তানের বেড়ে ওঠার প্রতিটি মুহূর্তই তারা সোশ্যাল মিডিয়ায় প্রতিনিয়ত পোস্ট করতে থাকেন।

প্রথম যেদিন তাদের সন্তান কথা বলতে শুরু করে, প্রথম যেদিন ভাত খায়, প্রথম স্কুলে যাওয়া থেকে শুরু করে সব কিছুই তারা সোশ্যাল মিডিয়ায় বন্ধুদের জানাতে থাকে। সেসব পোস্টের কমেন্টে অন্য বন্ধুদের অভিনন্দন এবং অনেক শুভেচ্ছা বার্তা পায়। যা তাদের আরও আগ্রহী করে তোলে, সন্তানের ছবি বেশি করে শেয়ার করতে। তাদের অজান্তেই তারা সন্তানের জন্য বিপদ ডেকে আনছে কী? কোনো বাবা-মা সন্তানের বিপদ চায় না। কিন্তু আনন্দের মুহূর্ত সবার মাঝে ভাগাভাগি করতে গিয়েই বিপদ আসতে পারে। কারণ আপনি জানেন না সোশ্যাল মিডিয়ার যুক্ত থাকা বন্ধুরা আসলেই প্রকৃত বন্ধু কিংবা প্রকৃতপক্ষে আপনার ভালো চায় কি না।

সন্তানের ছবি বা ভিডিও কনটেন্ট বানিয়ে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করাকে শ্যারেন্টিং বলে। সোশ্যাল মিডিয়ার প্লাটফর্ম শেয়ার করার জন্যই। সবাই নিজের ভালো-মন্দ সুখ-দুঃখের স্মৃতি সবার মাঝে ভাগাভাগি করে নেয়। কিন্তু সন্তানই যখন হয় সোশ্যাল মিডিয়ার মূল সাবজেক্ট এবং তাকে ঘিরে প্রত্যেকটি পোস্ট আপনি শেয়ার করেন তখন তাকে শ্যারেন্টিং বলে। শ্যারেন্টিং শব্দটি শেয়ারিং ও প্যারেন্টিং এই শব্দ দুটির মিশ্রণে এসেছে।

সোশ্যাল মিডিয়ায় নিজের ভালো মুহূর্ত শেয়ার করে প্রশংসা পেতে সবারই ভালো লাগে। আর সন্তানের অর্জন নিজের যেকোনো অর্জনের চেয়ে অনেক বেশি পছন্দের। তাই সন্তানের যেকোনো তথ্য সবার মাঝে ভাগাভাগি করে নেওয়া খারাপ কিছু নয়। কিন্তু আতঙ্কের বিষয় তখনই হয় যখন এই শেয়ার অতিরিক্ত হয়ে যায়। বাবা-মায়েরা বুঝতেও পারেন না অনেক সময়। এই ওভার শেয়ারের কারণে সন্তান ধীরে ধীরে তাদের কাছ থেকে দূরে সরে যেতে থাকে। সোশ্যাল মিডিয়াতে নানা রকম অপরাধের জন্য শাস্তির ব্যবস্থা রয়েছে। কিন্তু নিজের সন্তানের অতিরিক্ত ছবি সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করে তার বিপদ ডেকে আনার জন্য শাস্তির ব্যবস্থা নেই। এর জন্য যার যার জায়গা থেকে এই বিষয়ে সতর্ক হতে হবে। দুঃখজনক হলেও সত্য, কিছু বাবা-মা সোশ্যাল মিডিয়াতে তার সন্তানের ছবি বা ভিডিও শেয়ার করেন শুধুমাত্র তাদের ভিউ কিংবা দর্শক এনগেজমেন্টের জন্য। যারা এনগেজমেন্টের জন্য সোশ্যাল মিডিয়ার সন্তানের অতিরিক্ত ছবি বা ভিডিও শেয়ার করেন তারা নিজেদের সন্তানদের এক প্রকার কনটেন্ট হিসেবে ব্যবহার করেন। এটি এক রকম আসক্তিও বলা যায়। বাবা-মায়েরা নিজেদের নিয়ন্ত্রণ করতে পারেন না সন্তানের যেকোনো তথ্য সোশ্যাল মিডিয়ায় দেওয়া থেকে।

এক জরিপে দেখা গেছে, করোনার সময় যখন বিশ্বজুড়ে সবাই আইসোলেশনে ছিল তখন শ্যারেন্টিংয়ের পরিমাণ সবচেয়ে বেশি বেড়েছে। কারণ স্বাভাবিকভাবে সে সময় সন্তান এবং বাবা-মা সবাই বাড়িতে থাকতো এবং ইন্টারনেটই ছিল একমাত্র বিনোদনের ব্যবস্থা। সময় কাটাতে হোক কিংবা অন্যকে আনন্দ দিতে হোক, তারা বাচ্চার নানা রকম কার্যকলাপ সোশ্যাল মিডিয়াতে দিতে থাকেন এবং তা এক রকম আসক্তিতে পরিণত হয়। বেশিরভাগ বাবা-মা সন্তানের অতিরিক্ত তথ্য সোশ্যাল মিডিয়াতে দেওয়াতে যে ক্ষতি হচ্ছে তা বুঝতেই পারেন না।

তারা মনে করেন, আনন্দের জন্য মজার ছলে দিচ্ছেন, এখানে ক্ষতির কি আছে? কিন্তু কখনওই সোশ্যাল মিডিয়াতে ওভার শেয়ারিং ভালো কিছু নিয়ে আসে না। প্রত্যেক বাবা-মা’র উচিত সোশ্যাল মিডিয়া সম্পর্কে সতর্ক থাকা। খেয়াল রাখতে হবে, সাময়িক বিনোদনের জন্য সন্তানের নিরাপত্তা কিংবা তার মানসিক অবস্থার যেন ক্ষতি না হয়।

সন্তানের উপর শ্যারেন্টিংয়ের প্রভাব

আপনার সন্তান হয়তো এখন ছোট, ইন্টারনেট ব্যবহারের উপযোগী নয়। কিন্তু কয়েক বছর পর প্রয়োজনে কিংবা বিনোদনের জন্য সেও ইন্টারনেট দুনিয়ার অংশ হবে। আপনি হয়তো সব কিছু সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পছন্দ করেন। কিন্তু আপনার সন্তান এই ব্যাপারটি পছন্দ না-ও করতে পারে। পরবর্তীতে সে যখন ইন্টারনেট ব্যবহার করবে এবং আপনার পোস্ট করা ছবি দেখতে পারবে তখন সে বিব্রত বোধ করতে পারে। তার বন্ধু মহল এবং ব্যক্তিজীবনে এর প্রভাব পড়বে। প্রত্যেকের আলাদা পছন্দ থাকে এবং একেকজন ব্যক্তি একেকভাবে নিজের সোশ্যাল মিডিয়া নিয়ন্ত্রণ করে। সোশ্যাল মিডিয়াতে অতিরিক্ত শেয়ারের ভয়ে সন্তান হয়তো আপনার কাছ কথা লুকাবে এবং নিজের ব্যক্তিগত জীবনের অনেক কিছু শেয়ার করবে না। এতে ধীরে ধীরে সন্তান আপনার কাছ থেকে দূরে সরে যেতে থাকবে। সোশ্যাল মিডিয়াতে বন্ধু মহলের মাঝে আপনি হয়তো সন্তানের একটি পারফেক্ট ইমেজ তৈরি করে রেখেছেন। সন্তানের ইতিবাচক দিকটি হয়তো আপনি সোশ্যাল মিডিয়াতে তুলে ধরছেন। কোনো মানুষই পুরোপুরি পারফেক্ট হয় না। কিন্তু সোশ্যাল মিডিয়াতে আপনি তার পারফেক্ট ইমেজ ক্রিয়েট করে রাখার জন্য বন্ধু মহলে যখন আপনার বাচ্চা যাবে তখন সে মানসিক চাপ অনুভব করবে। সোশ্যাল মিডিয়ার সেই পারফেকশন সবার মাঝে তুলে ধরতে না পারলে সে উদ্বিগ্ন হয়ে যাবে। হয়তো আপনি যেমন করে সন্তানকে সোশ্যাল মিডিয়া তুলে ধরছেন সামনাসামনি তাকে যখন দেখবে অন্যরকম, তখন এটি নিয়েও অনেকে হাসি তামাশা করতে পারে যা আপনার সন্তানের মনের উপর বিরূপ প্রভাব ফেলবে।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে বাচ্চার নিরাপত্তা। সোশ্যাল মিডিয়াতে আপনি কোনো তথ্য শেয়ার করা মানে হাজার হাজার মানুষকে তা দেখার সুযোগ করে দেওয়া। আপনি হয়তো একটা সময় পোস্ট ডিলিট করে দিবেন, কিন্তু সেই তথ্য কিন্তু অনেকের কাছে থেকেই যাবে। যেমন আপনার বাচ্চা ভালো রেজাল্ট করলে কিংবা স্কুলে ভালো পারফরম্যান্স করলে স্কুলের নাম এবং স্থানসহ সোশ্যাল মিডিয়াতে দিয়ে দেওয়া, বাচ্চা অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হলে হাসপাতালের নাম প্রকাশ করা, বাচ্চার বন্ধুদের সঙ্গে ছবি পোস্ট করা ইত্যাদি। এ ধরনের কাজ সন্তানকে ঝুঁকির মুখে ফেলে। কারণ আপনি জানেন না এই তথ্যগুলো কে নিজের স্বার্থে ব্যবহার করবে! আপনি হয়তো সবাইকেই নিজের প্রকৃত বন্ধু মনে করে সন্তানের ভালো মন্দ ভাগাভাগি করে নিচ্ছেন। কিন্তু আদৌ আপনি জানেন না যে কে আপনার ক্ষতি চায়! তাই এ ক্ষেত্রে বিশেষভাবে সতর্ক থাকা জরুরি।

শ্যারেন্টিং রোধে করণীয়

আবারও বলছি সন্তান সম্পর্কে সোশ্যাল মিডিয়াতে কথা বলা খারাপ কিছু নয়। অবশ্যই আপনি ভালো মুহূর্ত বন্ধুদের সঙ্গে ভাগাভাগি করে নিবেন। কিন্তু মনে রাখতে হবে অতিরিক্ত কোনো কিছুই ভালো নয়। অনেক বিশ্বসেরা সেলিব্রিটিরাও নিরাপত্তার জন্য নিজের সন্তানকে সোশ্যাল মিডিয়াতে নিয়ে আসে না। কারণ এর প্রভাব শিশুর সামাজিক ও মানসিক সম্পর্ক এবং গোপনীয়তার উপর পড়ে।

সন্তানের কোনো তথ্য সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করার আগে কিছুক্ষণ থামুন এবং চিন্তা করুন। এই তথ্যটি শেয়ার করা আসলেই জরুরি কি না কিংবা এ তথ্যের প্রভাব আপনার সন্তানের নিরাপত্তার উপর পড়বে কি না এবং ভবিষ্যতে সে যখন আপনার এই পোস্টটি দেখবে তখন সে বিব্রত বোধ করবে কি না।

অবশ্যই আপনার সন্তানের পুরো নাম, স্কুলের নাম এবং তার ব্যক্তিগত তথ্য দেওয়া থেকে বিরত থাকুন। সন্তানের সবচেয়ে বেশি মঙ্গল কামনা আপনিই করেন। তার জীবনের প্রত্যেকটি সিদ্ধান্ত নেওয়ার ব্যাপারে আপনি যেমন আপস করেন না তেমন সোশ্যাল মিডিয়াতেও পোস্ট করার আগে আপোস করা যাবে না। আনন্দ ভাগাভাগি করতে গিয়ে সন্তানের যাতে ক্ষতি না হয় সেই বিষয়টি লক্ষ্য রাখার দায়িত্ব আপনার।

লেখাটির পিডিএফ দেখতে চাইলে ক্লিক করুন: স্বাস্থ্য কথা

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

16 + six =