১৮ মাস পর স্যামসাংয়ের উৎপাদন পুনরায় শুরু, ইলেকট্রনিক্স উৎপাদন হাবে পরিণত হওয়ার পথে বাংলাদেশ

ঢাকা, ২৭ জুলাই, ২০২৬ – প্রায় ১৮ মাস বিরতির পর বাংলাদেশে আবারও উৎপাদন কার্যক্রম শুরু করেছে দক্ষিণ কোরিয়ার প্রযুক্তি জায়ান্ট স্যামসাং। সরকারের দীর্ঘমেয়াদি নীতিগত সহায়তা ও বিনিয়োগ প্রণোদনার ফলে ২০৩০ সালের মধ্যে বাংলাদেশকে বৈশ্বিক ইলেকট্রনিক্স উৎপাদন কেন্দ্রে পরিণত করার লক্ষ্যে এ পদক্ষেপ নতুন গতি সঞ্চার করবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। খবর বাসস

ইতোমধ্যে নরসিংদীর শিবপুরে ফেয়ার ইলেকট্রনিক্সের কারখানায় স্যামসাং ব্র্যান্ডের রেফ্রিজারেটর উৎপাদন শুরু হয়েছে। আগামী সেপ্টেম্বরে ওয়াশিং মেশিন এবং নভেম্বরে স্মার্টফোন উৎপাদন শুরু হবে। আগামী বছরের জানুয়ারিতে দেশে তৈরি স্যামসাং স্মার্টফোন বাজারে আসার আশা করছে প্রতিষ্ঠানটি।

ফেয়ার গ্রুপের প্রধান বিপণন কর্মকর্তা (সিএমও) মোহাম্মদ মেসবাহ উদ্দিন বাসসকে বলেন, ইলেকট্রনিক্স শিল্পে সরকারের সাম্প্রতিক নীতিগত উদ্যোগ স্থানীয় উৎপাদন ও বিনিয়োগে ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে। এতে উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান যেমন উপকৃত হবে, তেমনি ভোক্তারাও তুলনামূলক কম দামে পণ্য কিনতে পারবেন।

তিনি জানান, ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে দেশে উৎপাদিত রেফ্রিজারেটর, ফ্রিজার, এয়ার কন্ডিশনার ও কম্প্রেসরের ওপর ভ্যাট ১৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে সাড়ে ৭ শতাংশ করা হয়েছে। এর ফলে এসব পণ্যের দাম গড়ে প্রায় ৫ শতাংশ পর্যন্ত কমতে পারে।

সরকার পোশাক শিল্পের মতো ইলেকট্রনিক্স ও ভোক্তা ইলেকট্রনিক্স খাতেও দীর্ঘমেয়াদি প্রণোদনা দেওয়ার কৌশল নিয়েছে। এর লক্ষ্য স্থানীয় উৎপাদন, বিনিয়োগ ও রপ্তানি বাড়িয়ে দশকের শেষ নাগাদ বাংলাদেশকে একটি আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক প্রযুক্তি উৎপাদন কেন্দ্রে পরিণত করা।

ফেয়ার ইলেকট্রনিক্স ২০১৭ সালে দেশে স্যামসাং স্মার্টফোন সংযোজন শুরু করে এবং ২০১৮ সালে বাজারে আনে প্রথম স্থানীয়ভাবে সংযোজিত স্যামসাং স্মার্টফোন। প্রতিষ্ঠানটি ২০১৪ সাল থেকে বাংলাদেশে স্যামসাংয়ের আনুষ্ঠানিক পরিবেশক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছে।

মেসবাহ উদ্দিন বলেন, টাকার তীব্র অবমূল্যায়নের কারণে ২০২৪ সালের মাঝামাঝি থেকে ২০২৫ সালের শেষ পর্যন্ত স্যামসাং স্মার্টফোন উৎপাদন বন্ধ ছিল। এছাড়া ৪জি থেকে ৫জি প্রযুক্তিতে রূপান্তরের জন্য নতুন প্রযুক্তি ও পরীক্ষণ সরঞ্জাম স্থাপনের প্রয়োজন হওয়ায় উৎপাদন পুনরায় শুরু করতে কিছুটা সময় লেগেছে।

তিনি জানান, ৫জি পরীক্ষার যন্ত্রপাতি স্থাপনের কাজ শেষ পর্যায়ে রয়েছে। এসব স্থাপনের পর নভেম্বরে স্মার্টফোন উৎপাদন শুরু হবে।

বর্তমানে সীমিত পরিসরে রেফ্রিজারেটর উৎপাদন চলছে। আগামী বছর ৪০ থেকে ৫০ হাজার ইউনিট স্যামসাং রেফ্রিজারেটর উৎপাদনের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। যদিও কারখানাটির বছরে প্রায় ২৫ লাখ মোবাইল ফোন উৎপাদনের সক্ষমতা রয়েছে, তবে প্রথম বছরে পূর্ণ সক্ষমতা ব্যবহার করা হবে না।

ফেয়ার গ্রুপ ইলেকট্রনিক্স উৎপাদনে প্রায় এক হাজার কোটি টাকা বিনিয়োগ করেছে, যার মধ্যে প্রায় ৩০০ কোটি টাকা স্মার্টফোন উৎপাদনে ব্যয় করা হয়েছে। এই বিনিয়োগের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানটি আধুনিক উৎপাদন অবকাঠামো গড়ে তুলেছে।

স্যামসাংয়ের পাশাপাশি ফেয়ার ইলেকট্রনিক্স চীনের হিসেন্স ব্র্যান্ডের পণ্যও উৎপাদন করছে। ২০২৭ সালের মধ্যে দুটি ব্র্যান্ড মিলিয়ে বছরে প্রায় দেড় লাখ রেফ্রিজারেটর উৎপাদনের পরিকল্পনা রয়েছে।

বর্তমানে কারখানাটি শুধু পণ্য সংযোজনেই সীমাবদ্ধ নয়। স্বয়ংক্রিয় উৎপাদন লাইনে ধাতব বডি তৈরি, যন্ত্রাংশ সংযোজন, ফোম ইনসুলেশন, কম্প্রেসর স্থাপন এবং চূড়ান্ত মান যাচাইসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ উৎপাদন কার্যক্রম দেশেই সম্পন্ন হচ্ছে।

প্রতিষ্ঠানটির সম্প্রসারণ পরিকল্পনা অনুযায়ী, ২০২৭ সালের শুরুতে দেশে এয়ার কন্ডিশনার, টেলিভিশন এবং আরও বিভিন্ন মডেলের স্মার্টফোন উৎপাদন শুরু হবে।

২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে ইলেকট্রনিক্স ও ভোক্তা ইলেকট্রনিক্স উৎপাদনকে তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি খাতের চারটি প্রধান অগ্রাধিকার খাতের একটি হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে। একই সঙ্গে মোবাইল ফোন, রেফ্রিজারেটর, এয়ার কন্ডিশনার, ওয়াশিং মেশিন, কম্পিউটার ও অন্যান্য ডিজিটাল পণ্য উৎপাদনের কাঁচামালের ওপর শুল্ক ছাড়ের সুবিধা ২০৩০ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত বাড়ানো হয়েছে এবং স্থানীয় উৎপাদনকে উৎসাহিত করতে বিভিন্ন উৎপাদন উপকরণের ওপর করও কমানো হয়েছে।

গত ২২ জুলাই কারখানা পরিদর্শনকালে বাংলাদেশে নিযুক্ত দক্ষিণ কোরিয়ার রাষ্ট্রদূত জিজুন কিম ফেয়ার ইলেকট্রনিক্সকে বাংলাদেশ ও দক্ষিণ কোরিয়ার মধ্যে প্রযুক্তি হস্তান্তর এবং শিল্প সহযোগিতার সফল উদাহরণ হিসেবে উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, বাংলাদেশের বৃহৎ কর্মশক্তি এবং কোরিয়ার প্রযুক্তি ও বিনিয়োগের সমন্বয়ে দেশটি কোরীয় কোম্পানিগুলোর জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ আঞ্চলিক উৎপাদন কেন্দ্রে পরিণত হতে পারে।

ফেয়ার গ্রুপের চেয়ারম্যান রুহুল আলম আল মাহবুব অবৈধ ও গ্রে মার্কেটের মোবাইল ফোন আমদানি রোধে আরও কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বান জানিয়ে বলেন, সহায়ক নীতিগত পরিবেশ নিশ্চিত করা গেলে স্থানীয় উৎপাদন, বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান এবং সরকারের রাজস্ব—সবই উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পাবে।

স্যামসাং বাংলাদেশ-এর ব্যবস্থাপনা পরিচালক জুংমিন জুং বাংলাদেশে দীর্ঘমেয়াদি কার্যক্রম পরিচালনার অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করে বলেন, ফেয়ার ইলেকট্রনিক্সের সঙ্গে অংশীদারিত্বের মাধ্যমে বৈশ্বিক মান বজায় রেখে স্থানীয় উৎপাদন আরও সম্প্রসারণে স্যামসাং কাজ করে যাবে।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

six + seven =