অগ্নিকান্ডের ঘটনায় একটি এফএসআরইউর বন্ধের কারণে গ্যাস সরবরাহে বড় ধাক্কা, সরবরাহ নেমে এসেছে ২২০০ এমএমসিএফডিতে

ঢাকা, ২২ জুলাই: মহেশখালীতে মার্কিন কোম্পানি এক্সিলাটে এনার্জির ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল (এফএসআরইউ)-এ অগগ্নকান্ডের কারণে জাতীয় গ্যাস সরবরাহে বড় ধরনের সংকট তৈরি হয়েছে। টার্মিনালটি থেকে সরবরাহ বন্ধ থাকায় দৈনিক প্রায় ৪৫০-৫০০ মিলিয়ন ঘনফুট (এমএমসিএফডি) গ্যাস জাতীয় গ্রিডে কম সরবরাহ হচ্ছে। এর ফলে শিল্পকারখানা, বিদ্যুৎকেন্দ্র, সিএনজি স্টেশন এবং আবাসিক গ্রাহকরা তীব্র গ্যাস সংকটের মুখে পড়েছেন।

বুধবার এক অনুষ্ঠানে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ উপদেষ্টা ইকবাল হাসান মাহমুদ বলেন, টার্মিনালে সৃষ্ট কারিগরি সমস্যার কারণে গ্যাস সরবরাহে উল্লেখযোগ্য ঘাটতি তৈরি হয়েছে। তিনি জানান, ঘটনাকালে এলএনজিবাহী জাহাজ টার্মিনালের সঙ্গে সংযুক্ত না থাকায় বড় ধরনের দুর্ঘটনা এড়ানো সম্ভব হয়েছে।

তিনি বলেন, গ্যাস সরবরাহ কমে যাওয়ায় ময়মনসিংহসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় আবাসিক গ্রাহক, শিল্প প্রতিষ্ঠান এবং সিএনজি স্টেশনগুলো মারাত্মক সমস্যার সম্মুখীন হচ্ছে। কোথাও কোথাও গ্যাস সংকটের কারণে জনভোগান্তি ও সড়ক অবরোধের ঘটনাও ঘটছে।

মন্ত্রী বলেন, এ ধরনের পরিস্থিতি ভবিষ্যতে এড়াতে দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান ও উৎপাদন বাড়ানোর কোনো বিকল্প নেই। একই সঙ্গে এলএনজি আমদানির অবকাঠামো আরও শক্তিশালী ও বহুমুখী করতে হবে, যাতে একটি স্থাপনায় সমস্যা দেখা দিলেও সারা দেশে গ্যাস সরবরাহ ব্যবস্থা ভেঙে না পড়ে।

অন্যদিকে জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগের জরুরি সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, এফএসআরইউটির কারিগরি ত্রুটি দ্রুত মেরামতে সংশ্লিষ্ট সংস্থা ও বিশেষজ্ঞরা কাজ করছেন। সীমিত গ্যাস সরবরাহ সর্বোচ্চ দক্ষতার সঙ্গে ব্যবস্থাপনা করে বিদ্যুৎকেন্দ্র, শিল্প এবং অন্যান্য অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত খাতে সরবরাহ বজায় রাখার চেষ্টা চলছে।

জ্বালানি বিভাগের মুখপাত্র ও যুগ্মসচিব মনির হোসেন চৌধুরী বলেন, বর্তমান সংকটের তাৎক্ষণিক কারণ একটি এফএসআরইউর কারিগরি ত্রুটি হলেও দীর্ঘদিনের আমদানিনির্ভর জ্বালানি ব্যবস্থা এর প্রভাবকে আরও তীব্র করেছে। তিনি বলেন, দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান ও উৎপাদনে দীর্ঘ সময় পর্যাপ্ত গুরুত্ব না দেওয়ায় এলএনজির ওপর নির্ভরতা বেড়েছে এবং আমদানি অবকাঠামোর যেকোনো সমস্যাই এখন জাতীয় সরবরাহ ব্যবস্থায় বড় প্রভাব ফেলছে।

তিনি জানান, সরকার দেশীয় গ্যাস উৎপাদন বাড়াতে স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি কর্মসূচি বাস্তবায়ন করছে। এর অংশ হিসেবে ১০০টি গ্যাসকূপ খননের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। বুধবার একনেক সভায় নোয়াখালীর বেগমগঞ্জ ও সুনামগঞ্জ এলাকায় ৭২৯ কোটি টাকা ব্যয়ে তিনটি অনুসন্ধান কূপ খনন প্রকল্প অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি স্থলভাগ ও সমুদ্র এলাকায় গ্যাস অনুসন্ধানে আন্তর্জাতিক দরপত্র আহ্বানসহ দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণের উদ্যোগ চলমান রয়েছে।

সরকার গ্যাস সরবরাহের নিরাপত্তা বাড়াতে চতুর্থ এফএসআরইউ স্থাপন, মালয়েশিয়া থেকে আইএসও ট্যাংকে এলএনজি আমদানির সম্ভাব্যতা যাচাই, ভোলার গ্যাস মূল ভূখণ্ডে আনার জন্য পাইপলাইনসহ বিকল্প পরিবহন ব্যবস্থা, দেশীয় গ্যাসক্ষেত্রে নতুন কূপ খনন ও পুরোনো কূপ পুনরুজ্জীবন এবং জ্বালানি আমদানির উৎস বহুমুখীকরণের মতো উদ্যোগও বাস্তবায়ন করছে।

একসময় দেশীয় গ্যাসক্ষেত্র থেকে দৈনিক প্রায় ২,৮০০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস উৎপাদিত হলেও বর্তমানে তা নেমে এসেছে প্রায় ১,৬৪৫ মিলিয়ন ঘনফুটে। উৎপাদন ঘাটতি পূরণে ২০১৮ সালে এলএনজি আমদানি শুরু হয়। বর্তমানে দেশের দুটি এফএসআরইউ থেকে সর্বোচ্চ প্রায় ১,১০০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ করা সম্ভব হচ্ছে।

বর্তমানে দেশের মোট গ্যাসের চাহিদা প্রায় সংযুক্হ ৫,৫০০ এমএমসিএফডি। যদিও পেট্রোবাংলার দাবি চাহিদা ৪০০০ এমএমসিএফডি। অথচ আমদানিকৃত এলএনজি ও দেশীয় উৎপাদন মিলিয়ে সরবরাহ করা যাচ্ছে মাত্র প্রায় ২,৬০০ মিলিয়ন ঘনফুট। এর মধ্যে একটি এফএসআরইউর সরবরাহ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় জাতীয় গ্যাস সরবরাহ আরও কমে গিয়ে পরিস্থিতি সংকটাপন্ন হয়ে উঠেছে। আজ মোট গ্যাস সরবরাহ ছিল ২২০০ এমএমসিএফডি।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

three × four =