অভিনয়ে দর্শকদের মুগ্ধ করেছেন চঞ্চল চৌধুরী

মঞ্চ, ছোট পর্দা, বড় পর্দা, ওটিটি প্ল্যাটফর্ম সব মাধ্যমেই নানা চরিত্রে অভিনয় করে বারবার দর্শকদের মুগ্ধ করেছেন তিনি। পরিচালকদের কাছে দারুণ এক আস্থার নাম চঞ্চল চৌধুরী। এখন তার নামই একটা ব্র্যান্ড। তার অভিনীত অধিকাংশ টেলিভিশন নাটকই হয়েছে সুপার ডুপার হিট। ছোট পর্দা থেকে বড় পর্দায় গিয়ে অনেক বাঘা শিল্পী হালে পানি পাননি। কিন্তু বড় পর্দাতেও বাজিমাত করেছেন চঞ্চল চৌধুরী। ‘মনপুরা’, ‘আয়নাবাজি’ থেকে শুরু করে নিজের অভিনীত প্রতিটি চলচ্চিত্রেই প্রশংসা কুড়িয়েছেন চঞ্চল। ব্যবসাসফল হয়েছে তার অভিনীত বেশির ভাগ সিনেমা। এই জুন মাসেই জন্ম নিয়েছিলেন গুণী এই অভিনেতা। রঙবেরঙ এর পক্ষ থেকে তাকে জন্মদিনের শুভেচ্ছা। শুভ জন্মদিন সবার প্রিয় চঞ্চল চৌধুরী। কেমন করে বড় মাপের একজন অভিনেতা হলেন তিনি তা জেনে আসা যাক।

পাবনার ছেলে

চঞ্চল চৌধুরী পাবনা জেলার সুজানগর উপজেলার নাজিরগঞ্জ ইউনিয়নের কামারহাট গ্রামে ১৯৭৪ সালের ১ জুন জন্মগ্রহণ করেন। তার পিতার নাম রাধা গোবিন্দ চৌধুরী এবং মায়ের নাম নমিতা চৌধুরী। তার ছেলেবেলা কেটেছে পাবনাতেই। কামারহাট সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে প্রাথমিক এবং উদয়পুর উচ্চ বিদ্যালয় থেকে মাধ্যমিক এবং রাজবাড়ী সরকারি কলেজ থেকে উচ্চমাধ্যমিকে পড়াশোনা করেন চঞ্চল।

ঢাকায় নতুন জগৎ

উচ্চমাধ্যমিক শেষ করার পর চঞ্চল চৌধুরী ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে চারুকলায় ভর্তি হন। ছোটবেলা থেকেই তার গান, আবৃত্তি আর নাটকের প্রতি নেশা ছিল। পরে তার মঞ্চ নাটকের প্রতি আগ্রহ সৃষ্টি হয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলার শিক্ষার্থী চঞ্চল চৌধুরী বিভিন্ন বাদ্যযন্ত্র বাজানো, অভিনয়, গান, ছবি আঁকা সবকিছুতেই সমান পারদর্শী। তবে অভিনয় তাকে টানতো আলাদা ভাবে। চঞ্চল চৌধুরীর অভিনয় জীবন শুরু হয় চারুকলার ছাত্র থাকাকালীন সময়েই আরণ্যক নাট্যদলে।

মঞ্চে প্রথম অভিনয়

১৯৯৬ সালে মামুনুর রশীদের আরণ্যক নাট্যদলের সাথে কাজ করার মধ্য দিয়ে অভিনয় জীবন শুরু হয়। তার অভিনীত প্রথম নাটক ‘কালো দৈত্য’। পরবর্তীতে এই নাট্যদলের সাথে সংক্রান্তি, রাঢাঙ, শত্রুগণ সহ আরও অনেক নাটকে অভিনয় করেন।

প্রথম টেলিভিশন নাটক

ফরিদুর রহমানের ‘গ্রাস’ নাটক দিয়ে টেলিভিশনে কাজ শুরু করেন চঞ্চল চৌধুরী। তিনি মোস্তফা সরওয়ার ফারুকীর ‘তাল পাতার সেপাই’ নাটক দিয়ে দর্শকের কাছে পরিচিত হয়ে ওঠেন। তারপর থেকেই তিনি মঞ্চের পাশাপাশি বিরামহীন কাজ করতে থাকেন টিভি নাটকে। অনেক নাটক ও টিভি সিরিজে অভিনয় করে দর্শকপ্রিয় হয়েছেন। তার অভিনীত জনপ্রিয় টেলিভিশন নাটকগুলোর মধ্যে আছে – নিখোঁজ সংবাদ, ওয়ারেন, ছায়াবাজি, গাধা নগর, সম্পত্তি, হপাই, প্রেম সৈনিক, অফ সাইড, প্রযত্নে ভালোবাসা, তৃতীয় পুরুষ, তিন গাধা, সিন্ধুকনামা, প্রাইভেট রিকশা, বউ, পাত্রী চাই, প্রেম কুমার প্রভৃতি। তার অভিনীত জনপ্রিয় টেলিভিশন ধারাবাহিকগুলো হলো – ঝুলন্ত বাবুরা, ভবের হাট, ঘর কুটুম, দশ হাজার এক টাকা, কথা দিলেম তো, সাকিন সারিসুরি, হিরো, মোহর শেখ, হার কিপটে, তোমার দোয়ায় ভালো আছি মা, জামাই মেলা, সোয়া পাঁচ আড়াই লেন, চরিত্র: স্বামী প্রভৃতি।

চলচ্চিত্রে অভিনয়

চঞ্চলের বড়পর্দায় অভিষেক হয় ২০০৬ সালে তৌকির আহমেদ পরিচালিত ‘রূপকথার গল্প’ দিয়ে। তিনি ২০০৯ সালে গিয়াস উদ্দিন সেলিম পরিচালিত ‘মনপুরা’ ছবিতে সোনাই চরিত্রে অভিনয় করেন। এই ছবিতে অভিনয়ের মাধ্যমে তিনি ৩৪তম জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারে ফেরদৌসের সাথে যৌথভাবে শ্রেষ্ঠ অভিনেতার পুরস্কার লাভ করেন। পরের বছর গৌতম ঘোষ পরিচালিত বাংলাদেশ-ভারত যৌথ প্রযোজনার ‘মনের মানুষ’ চলচ্চিত্রে অভিনয় করেন। ২০১৬ সালের অক্টোবরে চঞ্চলকে অমিতাভ রেজা চৌধুরী পরিচালিত ‘আয়নাবাজি’ চলচ্চিত্রে দেখা যায়। এই ছবিতে তিনি নাম চরিত্রসহ ছয়টি চরিত্রে অভিনয় করেন। চলচ্চিত্রটির জন্য তিনি শ্রেষ্ঠ অভিনেতা বিভাগে তার দ্বিতীয় জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার লাভ করেন। ২০১৮ সালে হুমায়ূন আহমেদের উপন্যাস দেবী অবলম্বনে নির্মিত একই নামের চলচ্চিত্রে মিসির আলি চরিত্রে অভিনয় করেন। এরপর ২০২২ সালে ‘হাওয়া’ সিনেমাতেও মুগ্ধতা ছড়িয়েছেন চঞ্চল চৌধুরী। ২০২৩ সালে ‘মুজিব: একটি জাতির রূপকার’ সিনেমাতেও প্রাঞ্জল তিনি। ২০২৪ সালে নির্মাতা মোস্তফা সরয়ার ফারুকীর ‘মনোগামী’ সিনেমায় অভিনয় করেও প্রশংসা কুড়িয়েছেন। ঈদে পাওয়া চরকি’র ছবিটি নিয়ে দর্শকমহলে আলোচনা চলছে; আলোচনার অনেকটা জুড়ে আছেন চঞ্চল।

নতুন চমকের অপেক্ষায়

নির্মাতা সৃজিত মুখোপাধ্যায়ের ‘পদাতিক’ সিনেমার টিজার প্রকাশ্যে এসেছে সম্প্রতি। এই সিনেমায় চঞ্চল চৌধুরী মৃণাল সেনের চরিত্রে অভিনয় করেছেন। টিজার দেখেই চমকে গেছে সবাই। সিনেমাটি এখন মুক্তির অপেক্ষায়। চঞ্চলের কথায়, ‘মৃণাল সেন চলচ্চিত্র জগতের একজন দিকপাল। শ্রেষ্ঠতম একজন পরিচালকের চরিত্রে অভিনয় করা মানে একটা ইতিহাসের অংশ হয়ে থাকা। ভালো-মন্দ এটা পরের বিষয়। ছবির মৃণাল সেন হয়ে ওঠা প্রসঙ্গে চঞ্চল বলেন, ‘আমাকে কিছু বইপত্র দেওয়া হয়েছে, কিছু ভিডিও দেওয়া হয়েছে। সেটা তো একটা ব্যাপার। কিন্তু মানুষটার ভেতরটা, মানুষটার দৃঢতা, মানুষটার অন্তরটা তো দেখা যায় না। এই বিষয়গুলো আসলে অনুভব করতে হয়।’ মুক্তির অপেক্ষায় আছে ‘তুফান’। সিনেমাটি ঈদুল আজহায় মুক্তির কথা রয়েছে। চঞ্চল এই সিনেমায় একটি বিশেষ চরিত্রে অভিনয় করেছেন।

ওটিটি প্ল্যাটফর্মে

চঞ্চল চৌধুরী ওটিটি প্ল্যাটফর্মেও সমানতালে কাজ করে যাচ্ছেন। তার জনপ্রিয় কিছু ওয়েব সিরিজ – কারাগার ১, কারাগার ২, বলি, মুন্সিগিরি, তাকদির, উনলৈকিক, ডার্ক রুম প্রভৃতি। ‘কারাগার’ দেখে ভূয়সী প্রশংসা করেন ওপার বাংলার গুণী পরিচালক সৃজিত মুখার্জি। চঞ্চলের অভিনয়ে মুগ্ধ হয়ে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারজয়ী এই নির্মাতা ফেসবুক পোস্টে লিখেছিলেন, ‘পরবর্তী প্রজন্মকে অভিনয় শেখানোর জন্য চঞ্চল চৌধুরীর চোখ অভিনয় শেখার প্রতিষ্ঠানে সংরক্ষণ করা উচিত। এমন স্ট্যাটাসে চঞ্চল চৌধুরী ধন্যবাদ দিয়ে লেখেন, ‘এত বড় মূল্যায়ন! কৃতজ্ঞতা ও ভালোবাসা দাদা।’ জবাবে সৃজিত লেখেন, ‘আপনার মতো শিল্পীর মূল্যায়ন করার দৃষ্টতা আমার নেই। শুধু সাধারণ দর্শক হিসেবে আমার মনে হলো আপনি আমাদের গোটা উপমহাদেশের গর্ব।’ সর্বশেষ গত ঈদে হইচই প্ল্যাটফর্মে মুক্তিপ্রাপ্ত ডিটেকটিভ ওয়েব সিরিজ ‘রুমি’ দিয়েও মুগ্ধ করেছেন চঞ্চল চৌধুরী। সিরিজে চঞ্চল চৌধুরীকে সিআইডি কর্মকর্তা রুমির চরিত্রে দেখা যায়।

গায়ক

গান গেয়েও দর্শক-শ্রোতাদের মাতান অভিনেতা চঞ্চল চৌধুরী। তার কণ্ঠে ‘ধর বন্ধু আমার কেহ নাই’, ‘ফুল ফুটেছে, গন্ধে সারা মন’, ‘জল ভরো জল ভরো রাধে’, ‘বকুল ফুল বকুল ফুল’ – গানগুলি দারুণ উপভোগ করেন শ্রোতারা। চঞ্চলের গলায় ভূপেন হাজারিকার গাওয়া ‘মেঘ থম থম করে, কেউ নেই’, ‘মানুষ মানুষের জন্য’ গানগুলিও শ্রোতাদের মুগ্ধ করে। নানা সময় ‘হাওয়া’ সিনেমার ‘সাদা সাদা কালা কালা’ গানটিও গেয়ে শোনান তিনি। সম্প্রতি ‘বাজি’ শিরোনামের একটি গান নিয়ে সবার সামনে হাজির হন চঞ্চল চৌধুরী। গানটির গীতিকার ও সুরকার হাশিম মাহমুদ।

প্রাপ্তি-অপ্রাপ্তি

অভিনয়ের স্বীকৃতি হিসেবে শ্রেষ্ঠ অভিনেতা বিভাগে দুইবার জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার এবং সেরা অভিনেতা বিভাগে মেরিল-প্রথম আলো দর্শক জরিপ পুরস্কার ও দুটি সমালোচক পুরস্কার লাভ করেন। তিনি মোট ১২ বার মেরিল-প্রথম আলো পুরস্কারের মনোনয়ন লাভ করেন। এছাড়া আরটিভি স্টার অ্যাওয়ার্ড, সিজেএফবি পারফরম্যান্স পুরস্কার, চ্যানেল আই ডিজিটাল মিডিয়া পুরস্কার, ব্লেন্ডারস চয়েস-দ্য ডেইলি স্টার ওটিটি অ্যান্ড ডিজিটাল কনটেন্ট পুরস্কার পান।

পরিবার

২০০৫ সালে চঞ্চল চৌধুরী যখন মোস্তফা সরয়ার ফারুকীর পরিচালনায় গ্রামীণফোনের বিজ্ঞাপনটা করে সবে পরিচিতি পেতে শুরু করেছেন সেই সময় তার বাবা বাংলামোটরের একটি হাসপাতালে ভর্তি ছিলেন। চঞ্চলের বড় ভাই তখন পুরান ঢাকার ন্যাশনাল মেডিকেল কলেজে পড়ান। শান্তা চৌধুরী ছিলেন তার ভাইয়ের ছাত্রী। সেই সুবাদেই চঞ্চলের বাবাকে হাসপাতালে দেখতে এসেছিলেন শান্তা। সেই সময় প্রথম চঞ্চল চৌধুরীর সাথে প্রথম দেখা হয় তার। প্রথম দেখাই পরে পরিণয়ে রুপ নেয়। ২০০৭ সালের ২২ আগস্ট তারা কোর্ট ম্যারেজ করেন। আর ২৭ আগস্ট মন্দিরে গিয়ে ধর্মীয় আনুষ্ঠানিকতা শেষ হয়। ২০০৯ সালে তাদের ঘর আলো করে আসে ছেলে শুদ্ধ। এখন শুদ্ধও অভিনয় করে মাঝে মধ্যে। সব মিলিয়ে দারুণ সংসার জীবন কাটছে চঞ্চল চৌধুরীর।

শেষ কথা

চঞ্চল চৌধুরীকে পরিচালক অমিতাভ রেজা একবার বলছিলেন, ‘কেউ বলে ভালো অভিনেতা, কেউ বলে ভালো গান গায়, কেউ তো ওনার কথায় হাসতে হাসতে মরে যায়, আমি মুগ্ধ হয়ে দেখি আর বলি – হি ইজ অ্যান আর্টিস্ট। একজন সহজ মানুষ যা পাওয়া যায় না, এই শহরে।’ আসলেই তাই। নিজগুণেই সবাইকে মুগ্ধ করে রাখতে পারেন চঞ্চল চৌধুরী। জন্মদিন নিয়ে এই অভিনেতা বলেন, ‘জন্মদিনে এত এত মানুষের উইশ আর ভালোবাসা পাওয়া সত্যি ভাগ্যের ব্যাপার। তাই মনে হয় মানুষের জন্মদিন নিয়ে নানা ভাবনা থাকলেও কর্মটাই আসল। আমাকে দেওয়া এ ভালোবাসা কর্মের জন্যই। আগে তো জন্মদিন পালন হতো না বা জন্মদিন উপলক্ষ্যে এত কিছু হবে, ভাবতামও না। এখন সবাই যখন শুভেচ্ছা জানায় তখন মনে হয় এ কর্মফল ছাড়া আর কিছু না।’  আরও অনেক ভালো ভালো কাজ উপহার দিতে থাকুক সবার প্রিয় অভিনেতা। সবশেষে আবারও রইলো জন্মদিনের অনেক অনেক শুভেচ্ছা।

লেখাটির পিডিএফ দেখতে চাইলে ক্লিক করুন: শুভেচ্ছা

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

fourteen − 4 =