ই-কমার্স সুবিধায় গ্রামীণ নারী

ইরানী বিশ্বাস

সমাজে পিছিয়ে পড়া নারীদের সঙ্গে আর্থিক সংযোগ তৈরি ও নারী উদ্যোক্তাদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে বাংলাদেশ সরকার নিরলস কাজ করে যাচ্ছে। এরই ধারাবাহিকতায় মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয় থেকে ‘তথ্যআপা’ নামক একটি ই-মার্কেট প্লেস ঘোষণা করা হয়েছে। এখানে ‘তথ্যআপা’ প্রকল্পাধীন ৪৯০টি তথ্যকেন্দ্র থেকে মোট ১৪৭০ জন ই-কমার্স বিষয়ক প্রশিক্ষিত তথ্যসেবা কর্মকর্তা রয়েছেন। তথ্যসেবা সহকারীগণ নারী উদ্যোক্তাদের রেজিস্ট্রেশন, পণ্যের ছবি ও বিবরণী সংযোজন সহায়তা প্রদান করেন। মার্কেট প্লেসের পেমেন্ট ও ডেলিভারির ক্ষেত্রেও ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে ‘তথ্যআপা’ প্রকল্প।

গ্রামীণ পর্যায়ের নারীদের ই-কমার্সের অন্তর্ভুক্ত করতে কৃষি অধিদপ্তর উদ্যোগ নিয়েছে। এখানে মাঠ পর্যায়ে নারীদের নিজেদের উৎপাদিত ফসল ই-কমার্সের অন্তর্ভুক্ত করতে প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা হয়েছে। এই সঙ্গে বিভিন্ন বিষয়ে প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে। প্রশিক্ষণ শেষে কৃষি ঋণের ব্যবস্থা করা হচ্ছে। যা ব্যবসায়ের মূলধন হিসেবে ব্যবহার করতে পারবে। এছাড়া ব্যবসায়ের কাজে যন্ত্র বা যন্ত্রাংশ কিনতে সহায়তা করা হয়।

সমাজে অনেকেই আছেন যারা শিক্ষিত চাকরি করার আগ্রহ আছে বা যারা স্বাবলম্বী হতে চায়। তবে সন্তান-সংসার সামলানোর জন্য ঘরের বাইরে গিয়ে তা সম্ভব নয়। আবার অনেকেই আছেন যারা বিয়ের আগে চাকরিতে যোগদান করেছেন। বিয়ের পর সংসার এবং সন্তান সামলাতে গিয়ে অতিরিক্ত কাজের চাপ নিতে হয়। অনেক সময় এই দুইয়ের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করতে না পেরে বাধ্য হয়ে চাকরি ছেড়ে দিতে হয়। আবার অনেকে শিক্ষিত হয়েও ঘরের বাইরে গিয়ে চাকরি করার নিষেধাজ্ঞা থাকায় মানসিকভাবে হীনমন্যতায় ভোগেন। অন্যের অধীনে চলা এবং দিনশেষে নিজের কোনো পরিচয় না থাকায় হতাশায় ভুগতে থাকেন। এসব নারীদের জন্য ই-কমার্স একটি বিশেষ সমাধান।

ইন্টারনেটের মাধ্যমে প্রযুক্তি ব্যবহার করে যেকোনো ব্যবসা করাটা ই-কমার্স নামে পরিচিত। আবার ফেসবুকের মাধ্যমে অনেকে ব্যবসা করেন। যা এফ-কমার্স নামে পরিচিত। অনলাইনভিত্তিক এক জরিপে বলা হয়েছে, বাংলাদেশে ফেসবুক ব্যবহারকারীদের শীর্ষে রয়েছে নারী। যে কেউ চাইলে অযথা ফেসবুক ঘাটাঘাটি না করে, এই ই-কমার্স ব্যবহার করে নারী উদ্যোক্তা হতে পারেন। তাতে নিজের সংসার, সন্তান সামলে পরিবারে থেকেও অর্থ উপার্জন করতে পারেন। গৃহিনী, শিক্ষার্থী বা চাকরিজীবী যে কেউই ই-কমার্স বা এফ-কমার্সে উদ্যোক্তা হয়ে দিনশেষে নিজের পরিচয়ও তৈরি করতে পারেন।

ই-কমার্স ব্যবসায়ের প্রধান সুবিধা হলো, এটি সহজেই পরিচালনা করা যায়। মাউসের এক ক্লিকেই বিপণন এবং ব্যবসা পরিচালনা করা সম্ভব। একই সাথে কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে লক্ষ ক্রেতার পরিমণ্ডলে পৌঁছানো যায়। এছাড়াও খুব তাড়াতাড়ি টার্গেট অডিয়েন্স সনাক্ত করা যায়। এমনকি তাদের চাহিদামতো সহজেই সাহায্য করা সম্ভব। মাউসের ক্লিকের মাধ্যমে বাজার গবেষণা করা সম্ভব। এই গবেষণার মাধ্যমে উদ্যোক্তা সহজেই নিজের ক্রেতা চিহ্নিত করতে সক্ষম হয়।

করোনার সময়ে অনেক পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তির চাকরি চলে গেছে। অনেকের বেতন কমে গেছে। এই বিপদের দিনে অনেক পরিবারেই নারীরা ই-কমার্সের মাধ্যমে ব্যবসা করে সংসারের হাল ধরেছেন। বর্তমান সময়ে পোশাক, শাড়ি-গয়না থেকে শুরু করে খাদ্যসামগ্রী, ঘর সাজানোর পণ্য, শিশু খাদ্য, প্রসাধন সামগ্রীসহ এমন কিছু নেই যা অনলাইনে বেচা-কেনা হচ্ছে না। দিন দিন ই-কমার্সে নারী উদ্যোক্তাদের অংশগ্রহণ বেড়েই চলছে।

নারী উদ্যোক্তাদের এগিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে সামাজিক প্রতিবন্ধকতা, অপর্যাপ্ত মূলধন, লিঙ্গ বৈষম্য, জ্ঞান ও পরিচালনা দক্ষতার অভাব, প্রশিক্ষণ ও প্রযুক্তি সহায়তার অভাব, তথ্য প্রাপ্তি ও আর্থিক সুযোগ-সুবিধায় সীমিত প্রবেশাধিকার ইত্যাদি সমস্যা রয়েছে। ঋণপ্রাপ্তির ক্ষেত্রে অনেক বাধা-বিপত্তির সম্মুখীন হবার কারণে অধিকাংশ ক্ষেত্রে নারীদের নিজস্ব সামান্য সঞ্চয় থেকে বিনিয়োগ করতে হয়। কিন্তু, নারীরা এসব চ্যালেঞ্জকে সম্ভাবনায় পরিণত করে অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছে এবং নিজেদের প্রচেষ্টায় নারী উদ্যোক্তা হিসেবে যথাযোগ্য স্থান করে নিচ্ছে। নারী উদ্যোক্তাগণ হাল ছাড়বে না, তারা তাদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখবে।

বাংলাদেশে গত কয়েক বছরে ব্যক্তিপর্যায়ে ফেসবুকভিত্তিক অনেক পেজ তৈরি হয়েছে। এসব পেজ থেকে বিভিন্ন ধরনের পণ্য বিক্রি করছে। এসব ক্রেতা এবং বিক্রেতাদের বেশির ভাগই নারী। অধিকাংশই গৃহিণী এবং ছাত্রী। সামাজিক মাধ্যমকে কাজে লাগিয়ে বর্তমান সময়ে নারীরা হয়ে উঠছে ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা। এদের ব্যবসায়িক পণ্যের মধ্যে রয়েছে শাড়ি-ড্রেস, গয়না, রূপসজ্জা সামগ্রী, ব্যাগ-জুতা, খাবার, বেকারি, মিষ্টি জাতীয় পণ্য। এছাড়াও রয়েছে মসলা, ঘি, মধু, তেল, গ্রোসারি আইটেম, ঘর সাজানোর যাবতীয় জিনিস। মানুষ স্বাস্থ্য সচেতন হওয়াতে অর্গানিক পণ্যের চাহিদা বেড়েছে। সে কারণে ঢেঁকিছাটা লাল চাল, লাল চিনি, লাল আটার চাহিদা বেড়েছে। এ ছাড়াও ভেষজ সামগ্রীর চাহিদা রয়েছে প্রচুর। এসব চাহিদাসম্পন্ন পণ্য ই-কামর্সে বেশি বিক্রি হয়। যারা অনলাইনে ব্যবসা করছেন তাদের ৮/১০ ঘণ্টা সময় ঘরের বাইরে ব্যয় করতে হয় না। ঘরে বসে সংসার-সন্তান সমলে অনলাইনে দুনিয়াজুড়ে ব্যবসা করা যায়। ই-কমার্স উদ্যোক্তাদের অনলাইন প্লাটফরম ‘উই’ অর্থাৎ অনলাইন প্ল্যাটফর্ম উইমেন অ্যান্ড ই-কমার্স ফোরাম। যা বর্তমানে দেশের ৬৪ জেলার ক্ষুদ্র নারী উদ্যোক্তাদের অন্যতম ভরসার প্ল্যাটফর্ম হয়ে দাঁড়িয়েছে।

নারী উদ্যোক্তাদের প্রধান বাধা পুরুষতান্ত্রিক দৃষ্টিভঙ্গি। যারা নারীদের একটি সুনির্দিষ্ট ভূমিকা পালন দেখতে অভ্যস্ত। তার ব্যতিক্রম হলেই দোষ খোঁজা শুরু হয়ে যায়। বর্তমান সময়ে একার আয়ে সংসার চালানো কঠিন হয়ে পড়ছে। তাই অর্থ উপার্জনে নারীর অংশগ্রহণ ইতিবাচক ভাবেই দেখা হচ্ছে। ৩০ বছর আগের অর্থনীতি আর বর্তমান অর্থনীতি একেবারেই ভিন্ন। বর্তমান সময়ে পুরুষের পাশাপাশি নারী সবক্ষেত্রে তাদের দক্ষতা প্রমাণ করতে সক্ষম হয়েছে। শুধুমাত্র পণ্য বিক্রি বা কেনা নয়। অনেকে অনলাইনে গিটার, নাচ, আবৃত্তি, গান শিখিয়ে অর্থ উপার্জন করছে। কয়েকদিন আগে মিররের এক প্রতিবেদনে প্রকাশিত হয়েছিল, অনলাইনে শুক্রাণু কিনে এক নারী গর্ভধারণ করেছে। এ খবর থেকে বোঝা যায় বিশ্ব এখন ই-কমার্স নির্ভরশীল। ভেনচার ক্যাপিটাল রিসার্চ ডেটাবেজ থেকে প্রকাশিত প্রতিবেদনে জানা যায়, পৃথিবীর মাত্র ২ শতাংশ নারীর কাছে ব্যবসা পরিচালনা করার মূলধন থাকে। যেখানে পুরো পৃথিবীতে প্রতি ১০০ জনে দুই জনই উদ্যোক্তা সেখানে বাংলাদেশের মোট উদ্যোক্তার শতকরা ৬০ ভাগই নারী উদ্যোক্তা। এ বিষয়টি অবশ্যই বাংলাদেশের জন্য গর্বের।

ই-কমার্সে ওয়েবসাইট পেমেন্ট একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। যেকোনো পণ্য ক্রয় থেকে শুরু করে সেই পণ্যটির মূল্য কিভাবে গ্রহণ করবেন অথবা ক্রেতা কিভাবে সেই মূল্য পরিশোধ করবেন সেটি আগেই ঠিক করে নিতে হবে। পেমেন্ট অনেক ধরনের হতে পারে। দেশে ক্যাশ অন ডেলিভারির মাধ্যমেই বেশি লেনদেন সম্পন্ন হয়। এছাড়া মোবাইল ব্যাংকিং, ইলেকট্রনিক ফান্ড ট্রান্সফার, ডেবিট এবং ক্রেডিট কার্ডের মাধ্যমে লেনদেন হয়ে থাকে। একটা কথা মাথায় রাখা জরুরি, ওয়েবসাইটে অবশ্যই মূল্য পরিশোধের জন্য একাধিক মাধ্যম থাকা জরুরি। কারণ ক্রেতা যেন খুব সহজেই তার মূল্য পরিশোধ করতে পারে।

ই-কমার্সে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো প্রোডাক্ট ডেলিভারি। যেকোনো পণ্য অর্ডার থেকে শুরু করে কতো সময়ের মধ্যে এবং কোন মাধ্যমে ক্রেতার কাছে পৌঁছে যাবে তা নিয়ে অবশ্যই পরিকল্পনা করা উচিত। যদি নিজের ডেলিভারি ব্যবস্থা না থাকে তাহলে অবশ্যই ডেলিভারি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে আলোচনা করে যথাসময়ে পণ্য ডেলিভারির ব্যবস্থা করতে হবে। ই-কমার্স থেকে ক্রেতারা পণ্য অর্ডার করেন সাধারণত যথাসময়ে হাতে পাওয়ার জন্য। তাই যেকোনো পণ্য সঠিকভাবে মান যাচাই করে ক্রেতার হাতে তুলে দিতে হবে। লক্ষ্য রাখতে হবে, পণ্য সরবরাহে যেন কোনো ভুল না হয়। ক্রেতার হাতে যেন অর্ডারের সঠিক পণ্যটি পৌছায়। পণ্য বিক্রয় পরবর্তী সেবা নিশ্চিত করতে ক্রেতাকে সঠিক তথ্য সরবরাহ করা আবশ্যক। এমন অনেক পণ্য থাকে যা প্রয়োজনে পরিবর্তন হতে পারে। সে ক্ষেত্রে এসব নিয়মকানুন উল্লেখ রাখা প্রয়োজন। কখনোই ক্রেতাকে ভুল তথ্য দিয়ে বিভ্রান্তিকর পরিস্থিতি তৈরি করা উচিত না। এতে ব্যবসার উপর নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।

ই-কমার্স খাতকে বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে একটি সম্ভাবনাময় খাত হিসেবে ধরা হচ্ছে। এর পেছনে মজবুত ভিত হিসেবে রয়েছে উর্ধ্বমুখী প্রবৃদ্ধি রেখা। এ খাতে আগামী পাঁচ বছরে পাঁচ কোটি গ্রাহকের প্রত্যাশা রয়েছে। বাংলাদেশ সরকার ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। ই-কমার্স খাত এক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা পালন করছে। আগামী দিনগুলিতেও এ ভূমিকা আরও প্রকট হবে বলে আশা করা যাচ্ছে। বর্তমান সময়ে বাংলাদেশের ই-কমার্স খাতে আর্ন্তজাতিক প্রতিষ্ঠানগুলো বিনিয়োগের আগ্রহ প্রকাশ করছে। অবশ্যই বিষয়টি অত্যন্ত ইতিবাচক।

দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে পৌঁছে গেছে ইন্টারনেট সুবিধা। এই সুবিধার ধারাবাহিকতায় প্রতিটি গ্রামের ঘরে ঘরে পৌঁছে গেছে ই-কমার্স। এখন গ্রামের অধিকাংশ নারী নিজের বাড়ির আঙ্গিনায় হাঁস-মুরগির খামার করছে। বিভিন্ন শাক-সবজি চাষ করছে। ই-কমার্সের মাধ্যমে নিজের হাতের রান্না করা খাবার পৌঁছে দিচ্ছে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে। কেউ কেউ দেশি মুড়ি ভেজে ই-কমার্সের মাধ্যমে পৌঁছে দিচ্ছে গ্রাহকের কাছে। ই-কমার্সে এমন অনেক সুবিধা তৈরি হয়েছে গ্রামীণ নারীদের ক্ষেত্রে।

লেখাটির পিডিএফ দেখতে চাইলে ক্লিক করুন: নিবন্ধ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

16 − eleven =