ঈদে বাহারি পোশাক

নীলাঞ্জনা নীলা

ঈদুল আজহার সময় সবাই কোরবানি নিয়ে ব্যস্ত থাকলেও নতুন পোশাক কিংবা নতুন কোনো অনুষঙ্গ কিন্তু কেনা হয়। কোরবানির ঈদে পোশাকের প্রতি বিশেষ আকর্ষণ না থাকলেও ঘরের ছোট শিশুর জন্য সব ঈদেই পোশাক কেনার তাড়না থাকে বাবা-মায়েদের।

আবার অনেকে যেকোনো উৎসবে নিজেকে সুন্দর করে সাজাতে ভালোবাসেন। তাইতো ফ্যাশন হাউসগুলো দেরি না করে ঈদুল আজহার জন্য নতুন কালেকশনের পসরা সাজিয়ে বসে পড়েছে। দেশের স্বনামধন্য ফ্যাশন হাউজগুলো ঘুরে ক্রেতাদের মোটামুটি ভিড় লক্ষ্য করা যায়।

দেশীয় ফ্যাশন ব্রান্ড দেশালে কথা হয় তাসলিমা রুপার সাথে। স্বামী-স্ত্রী দুজনই ব্যাংক কর্মকর্তা হবার কারণে প্রচুর ব্যস্ত সময় পার করেন। তাই একটু আগেভাগে নিজেদের কেনাকাটা করতে চলে এসেছেন। নিজেদের জন্য খুব বেশি কিছু না কিনলেও কেনাকাটায় প্রাধান্য দিচ্ছেন সাত বছরের মেয়ে রাইসাকে। কারণ এ বছর সে ভালো করে ঈদ বুঝতে শিখেছে। ঈদে তার চাই নতুন জামা। মূলত মেয়ের জন্য সময় করে এসে বিভিন্ন ফ্যাশন হাউজগুলো ঘুরে ঘুরে দেখছেন।

অন্যদিকে ফ্যাশন ব্র্যান্ড সাদাকালোতে সাংবাদিক রুবেল এসেছেন তার মায়ের জন্য ঈদের শাড়ি কিনতে। অফিস থেকে তিনি শুধু ঈদুল আজহায় ছুটি পান। এই ঈদে গ্রামে যাওয়া হয়। তাই মায়ের জন্য শাড়ি কিনে নিয়ে যাচ্ছেন। বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া অনন্যা এসেছেন নিজের জন্য সুতির জামা কিনতে। কারণ ঈদ উপলক্ষ্যে কেনাকাটা করলেও তিনি এমন পোশাক বেছে নেন যা সারা বছর ক্লাসে কিংবা অন্যান্য কাজে পরে যেতে পারবেন।

ঈদুল আজহার কেনাকাটায় সবার প্রাধান্য থাকে হালকা রঙ ও সুতির কাপড়ের পোশাকে। একটা সময় সুতির পোশাককে খুব সাদামাটা মনে করা হতো এবং ভাবা হতো এটি কোনো বিশেষ আয়োজনে পরিধান করা যায় না। কিন্তু বর্তমানে দেশে সুতি কাপড়ের ব্যাপক চাহিদা লক্ষ্য করা যায়। চাহিদার কথা চিন্তা করে ডিজাইনাররা সুতি কাপড়ের মধ্যে নানা ধরনের বৈচিত্র্য ও ভিন্নতা নিয়ে আসছেন সবার দৃষ্টি আকর্ষণের জন্য। সুতির পোশাকের মধ্যে করা হচ্ছে বিভিন্ন ধরনের হাতের কাজ, এমব্রয়ডারি ও নানা ধরনের নতুন কাট।

ফ্যাশন হাউসগুলোতে ক্রেতাদের সাথে কথা বলে জানা যায় সুতির ফেব্রিক প্রাধান্য দেওয়ার কারণ হচ্ছে গরমে আরাম দেয়। এছাড়া এখন সুতির পোশাকগুলো এমন করে তৈরি করা হচ্ছে যা যেকোনো অনুষ্ঠানে পরা যেতে পারে। তাই ছোট-বড় সবার জন্যই নির্দ্বিধায় সুতির কাপড় বেছে নিচ্ছেন। ঈদের সময়টা বৃষ্টি এবং গরম দুটোই থাকবে; আবহাওয়া থাকবে কিছুটা ভ্যাপসা ও স্যাঁতস্যাঁতে। আবহাওয়ার কথা খেয়াল রেখে ডিজাইনাররা পোশাকের রেখেছেন বিভিন্ন রঙের মোটিফ। পোশাকে প্রকৃতির ছোঁয়া দেওয়ার জন্য লতাপাতা, ফুল ইত্যাদির ছবি দেখা যায়। এছাড়া কিছু পোশাকে ফান ভাইব আনার জন্য তরমুজ, পাখি কিংবা পাখার ছবি তুলে ধরা হয়।

বেশ কয়েক বছর ধরেই মেয়েদের কাছে জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে শর্ট এবং লং কুর্তি। কুর্তি জনপ্রিয় হবার কারণ হচ্ছে এটি নিত্য ব্যবহারের জন্য বেশ উপযোগী। ক্লাস, বন্ধুদের সাথে আড্ডায় বা যেকোনো জায়গায় যাওয়ার জন্য চটজলদি কুর্তি পরে নেওয়া যায়। কুর্তির মধ্যে ভিন্নতা নিয়ে আসার জন্য বিভিন্ন ধরনের নকশা ও রঙের খেলা করা হয়। কুর্তির বুকে দেখা যায় এমব্রয়ডারি কিংবা সুই সুতার কাজ। অনেক সময় কুর্তিতে কলার দেওয়া থাকে। হাতায় বৈচিত্র্য আনতে একটু ঝোলানো বড় হাতা লক্ষ্য করা যায়। কুর্তির ক্ষেত্রে নিজের সাইজ থেকে দুই সাইজ বড় ওভারসাইজের জনপ্রিয়তা সবচেয়ে বেশি। সুতি কাপড়ের পাশাপাশি জর্জেট, লিলেন ইত্যাদি ফেব্রিক দিয়ে কুর্তি তৈরি করা হয়ে থাকে। কুর্তিতে দেশীয় ছোঁয়া আনতে জামদানি মোটিফ কিংবা কাতান কাপড় দিয়েও তৈরি করা হয়।

ঈদুল আজহাকে কেন্দ্র করে তরুণীদের কাছে বেড়েছে কুর্তির চাহিদা। ফ্যাশন ব্রান্ড আড়ং এর একটি বড় অংশ জুড়ে রয়েছে মেয়েদের কুর্তি। সেখানে ৭০০ টাকা থেকে শুরু করে ১৫০০ টাকার মধ্যে বেশ আকর্ষণীয় নকশার কুর্তি পাওয়া যায়। তাই তরুণীদের ভিড় লক্ষ্য করা যায় ব্যাপক। এছাড়া ফ্যাশন হাউজ দেশালে লক্ষ্য করা যায় শর্ট কুর্তির চাহিদা। শর্ট কুর্তিগুলো গোল কিংবা শার্টের প্যাটার্ন তৈরি করা হয়ে থাকে। যারা ওয়েস্টার্ন পোশাক পরতে পছন্দ করেন কিন্তু রাখতে চান দেশীয় ঐতিহ্যের ছোঁয়া, তারা বেছে নিতে পারেন দেশালের এসব ওয়েস্টার্ন প্যার্টানের কুর্তিগুলো। এছাড়া আড়ং তাগা সেকশনে বিভিন্ন প্যার্টানের টপস, শর্ট কাফতান, কটি ইত্যাদি লক্ষ্য করা যায়।

যতই বাহারি পোশাকের কালেকশনই থাকুক না কেন অনেকের কাছে ঈদের সকাল মানেই সালোয়ার কামিজ। ঈদ মৌসুমে ফ্যাশন হাউজগুলোর প্রাধান্যই থাকে সালোয়ার কামিজ তৈরিতে। তবে চেষ্টা করা হয় কিছুটা হালকা রঙ ও হালকা কাজের সালোয়ার কামিজ তৈরি করতে। বুকে ও হাতায় হালকা কাজের সালোয়ার কামিজের প্রাধান্য এবার বেশি। বেশিরভাগ সালোয়ার কামিজের পায়জামা করা হয় প্যান্ট ডিজাইনে। পোশাক সুতির হলেও ওড়নায় অনেক সময় ভিন্নধর্মী ফেব্রিক রাখা হয়।

এবছর দেখা যাচ্ছে ফ্যাশন হাউসগুলোতে হালকা রঙ প্রাধান্য দেওয়া হয়েছে। যেমন সাদা, আকাশি, হালকা গোলাপি, জলপাই ইত্যাদি রঙ। অনেক ধরনের রঙের ভিড়ে কালো রঙ অনেকের প্রিয়। তাই ফ্যাশন হাউজগুলোর একটি অংশ জুড়ে লক্ষ্য করা যায় কালো কিংবা গাঢ় রঙের পোশাক। যেহেতু ঈদুল আজহা বৃষ্টির মৌসুমে তাই উজ্জলতা বাড়াতে অনেকে লাল, মেরুন, হলুদ, কমলার মতো গাঢ় রঙ বেছে নিচ্ছেন।

ঈদের কেনাকাটায় অনেকে শাড়ি রাখতে পছন্দ করেন। নারীর জীবন জুড়ে শাড়ি জড়িয়ে আছে। ব্যস্ততার কারণেই ঈদের দিন শাড়ি না পরলেও ঈদের দ্বিতীয় কিংবা তৃতীয় দিন দাওয়াতে গেলে শাড়ি পরতে ভুলেন না অনেকে। ঈদকে কেন্দ্র করে ফ্যাশন হাউজগুলোতে দেখা যায় সিল্ক, হাফসিল্ক, তাঁত ও মসলিনের বাহারি শাড়ি। ঈদের সময় সুতির উপরে ব্লকের কাজ করা শাড়ির চাহিদা বেড়ে যায়। কারণ এটি দামেও যেমন অন্যান্য শাড়ির তুলনায় সাশ্রয়ী এবং পরতেও আরাম। শাড়ির উপর দেখা যায় হ্যান্ড পেইন্ট, স্ক্রিন প্রিন্ট, ব্লক, কাঁথার ফোঁড় ও এমব্রয়ডারির কাজ। এছাড়া জামদানির কাঁথা স্টিচ এবং কাতান শাড়ির চাহিদাও রয়েছে। যারা শাড়ি পরতে ভালোবাসেন কিন্তু পরার ঝামেলার জন্য শাড়ি এড়িয়ে যান তাদের জন্য রয়েছে রেডি টু ওয়্যার শাড়ি, যা খুব সহজেই পরিধান করা যায়।

ঈদের সকালে ছেলেদের কাছে পাঞ্জাবি যেন একটি অনিবার্য পোশাক। ছেলেদের ঈদে পাঞ্জাবি ছাড়া চলবেই না। তাই ফ্যাশন হাউসগুলোতে ছেলেদের কালেকশনের বড় অংশ জুড়ে থাকে পাঞ্জাবি। এক রঙা পাঞ্জাবির চাহিদা সবচেয়ে বেশি। বিক্রেতাদের সাথে কথা বলে জানা যায়, ছেলেরা গাঢ় রঙের ও কম নকশা আছে এমন পাঞ্জাবি বেশি পছন্দ করে থাকে। ফ্যাশন হাউজগুলোর একটি সেকশনে শুধু সাদা পাঞ্জাবির উপরে কালো সুতার কাজ লক্ষ্য করা যায়। একটা সময় শুধু বয়স্করা সাদা পাঞ্জাবি পরলেও এখন সববয়সী ছেলেরা সাদা পাঞ্জাবি পরিধান করে থাকে। এছাড়া ফ্যাশন হাউজগুলোতে পাঞ্জাবি ছাড়াও দেখা যায় টি-শার্ট, পলো-শার্ট, ফরমাল শার্ট, ক্যাজুয়াল শার্ট, কটি, কাবলি-পাঞ্জাবি ও প্যান্টসহ আরও অনেক কিছু। টি-শার্টের মধ্যে নান্দনিক হ্যান্ড পেইন্ট ও বিভিন্ন ধরনের নকশাও এখন বেশ জনপ্রিয়।

বড়দের মতো ছোটদেরও রয়েছে বিভিন্ন ধরনের কালেকশন। মা-বাবারা স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন শিশুর জন্য শুধুমাত্র সুতির পোশাক কিনতে। শিশুদের পাঞ্জাবি, শার্ট, সালোয়ার কামিজ, কুর্তি, ফতুয়া, টপস বেশিরভাগই দেখা যায় সুতি কাপড়ের তৈরি।

লেখাটির পিডিএফ দেখতে চাইলে ক্লিক করুন: ফ্যাশন

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

13 + 17 =