এইতো প্রেম

মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে পূর্ণদৈর্ঘ্য-স্বল্পদৈর্ঘ্য কাহিনীচিত্র, প্রামাণ্য-তথ্যচিত্র নির্মিত হয়েছে অনেক। মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে প্রথম চলচ্চিত্র নির্মিত হয় ১৯৭১ সালে যুদ্ধ চলাকালীন সময়ে। সেই ধারাবাহিকতায় এখনো নির্মিত হচ্ছে মুক্তিযুদ্ধের চলচ্ছিত্র। তরুণ প্রজন্মকে এই চলচ্চিত্রগুলোর সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেওয়ার লক্ষ্যে মাসুম আওয়ালের প্রতিবেদনে রঙবেরঙ নিয়মিত মুক্তিযুদ্ধের চলচ্চিত্র নিয়ে আয়োজন করে আসছে। এ পর্বে আমরা জানবো ‘এই তো প্রেম’ চলচ্চিত্রটি সম্পর্কে।

মুক্তির আলোয়

‘এইতো প্রেম’ চলচ্চিত্রটি মুক্তির আলোয় আসে ২০১৫ সালের ১৩ মার্চ। ভালোবাসার গল্পে বোনা একটি ভিন্ন ধরনের মুক্তিযুদ্ধের চলচ্চিত্রটি। ১৩৫ মিনিট দৈর্ঘ্যরে এই চলচ্চিত্রটি দর্শকের মন জয় করেছিল। এখনো সেই সিনেমার গান মানুষের মুখে মুখে ফিরে। চলচ্চিত্রটির কাহিনী, চিত্রনাট্য, সংলাপ, গান রচনা ও পরিচালনা করেন সোহেল আরমান। প্রযোজক ছিলেন শাহিন কবির টুটুল। ২০১৩ সালের বিজয় দিবস উপলক্ষ্যে চলচ্চিত্রটি মুক্তির পরিকল্পনা থাকলেও, পরবর্তীতে নানা কারণে মুক্তি দিতে দেরি হয়। পরে ২০১৫ সালের ১৩ মার্চ চলচ্চিত্রটি দেশের ১১২টি প্রেক্ষাগৃহে মুক্তি পায়। ২০১৩ সালের ১৪ মার্চ বাংলাদেশ জাতীয় জাদুঘরের উদ্যোগে চলচ্চিত্রটির বিশেষ প্রর্দশনী করা হয়। প্রর্দশনীতে উপস্থিত ছিলেন তৎকালীন তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনু, মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রী আ. ক. ম. মোজাম্মেল হক, সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রী আসাদুজ্জামান নূর ও মির্জা আজম এমপি। এরপর ২০১৫ সালে চলচ্চিত্রটি জি-সিরিজের ব্যানারে ডিভিডি আকারে প্রকাশ পায়। চলচ্চিত্রটির চিত্রগ্রাহক ছিলেন এ আর স্বপন। সম্পাদক ছিলেন মুজিবুর রহমান দুলু, প্রযোজনা ও পরিবেশক কোম্পানির নাম সিলভার স্ক্রিন প্রোডাকশন।

কী আছে এ চলচ্চিত্রে

চলচ্চিত্রের কাহিনীতে দেখা যায়, একজন হিন্দু পুরোহিতের মেয়ে মাধবী (আফসানা আরা বিন্দু)। তাকে ভালোবাসে একই গ্রামের স্কুল শিক্ষকের ছেলে সূর্য (শাকিব খান)। মাধবীও একসময় সূর্যকে ভালোবেসে ফেলে। এরই মধ্যে একদিন গ্রামে ঢোকে পাকিস্তানি বাহিনী। এক দিকে দেশ বাঁচানোর যুদ্ধ, অন্য দিকে এক জোড়া মনের যুদ্ধ। পাকিস্তানি বাহিনী সূর্যর বাবা-মা-বোনকে হত্যা করে। দেশকে শত্রুমুক্ত করতে মাধবীকে রেখে ছেলেটি চলে যায় যুদ্ধ করতে। সে কি আর ফিরে আসবে? এটি জানার জন্য দেখে নিতে হবে চলচ্চিত্রটি।

যারা অভিনয় করেছেন

এই চলচ্চিত্রে শাকিব খান অভিনয় করেছেন সূর্য চরিত্রে। তার বিপরীতে মাধবী চরিত্রে অভিনয় করেছেন বিন্দু। অমিত হাসানকে পাওয়া যায় জাভেদ নামের একটি গুরুত্বপূর্ণ চরিত্রে। গুণী অভিনেতা সৈয়দ হাসান ইমাম অভিনয় করেছেন লতিফ মাস্টার চরিত্রে। এই মাস্টারের ছেলে সূর্য (শাকিব খান)। গুণী অভিনেত্রী আফরোজা বানুর চরিত্রটির নাম রাবেয়া। সূর্যের মায়ের চরিত্রে পাওয়া যায় তাকে। বিশিষ্ট নাট্যজন রামেন্দু মজুমদারও অভিনয় করেছেন এই চলচ্চিত্রে। মাধবীর বাবার চরিত্রে পাওয়া যায় তাকে। শহীদুজ্জামান সেলিম চৌকিদার চরিত্রে, খুরশীদুজ্জামান উৎপল মেজর চরিত্রে ও মাসুম আজিজ আলতাফ কমান্ডার চরিত্রে অভিনয় করেছেন। চলচ্চিত্রটিতে আরও অভিনয় করেছেন লায়লা হাসান, শিপু, সিরাজ হায়দার, প্রাণ রায়, সাইদ বাবু, শ্যামল জাকারিয়া, কোহিনুর, শরিফ সারোয়ার, বিনয় ভদ্র, সাজ্জাদ রেজা, প্রিথু ও জুয়েল আহমেদ।

চলচ্চিত্রের গান

চলচ্চিত্রটির সবকটি গান লিখেছেন পরিচালক সোহেল আরমান নিজেই। সুর ও সংগীতায়োজন করেছেন হাবিব ওয়াহিদ। চলচ্চিত্রটিতে মোট সাতটি গান আছে। হাবিব ওয়াহিদ প্রায় নয় মাস সময় নিয়ে গানের সংগীত করেছিলেন। ২০০৯ সালের শেষদিকে গানগুলো অডিও আকারে সঙ্গীতা মিউজিকের ব্যানারে প্রকাশ করা হয়। প্রায় সব গানই সমালোচকদের দ্বারা প্রশংসিত হয়। এর মধ্যে ‘আমি তোমার মনের ভেতর’ গানটি গেয়েছিলেন  হাবিব ওয়াহিদ এবং নাজমুন মুনিরা ন্যান্সি। ‘জোসনা দেব’ গানটিও ছিল ন্যান্সির কণ্ঠে। ‘যাক না উড়ে’ শিরোনামের একটি গানে কণ্ঠ দিয়েছিলেন মিলন মাহমুদ। ‘মধুবনের ফুল’ গেয়েছিলেন ডলি সায়ন্তনী। ‘হৃদয়ে আমার বাংলাদেশ’ গেয়েছিলেন হাবিব ওয়াহিদ ও আরফিন রুমি। চলচ্চিত্রটির আবহসংগীত করেছেন অদিত রহমান। চলচ্চিত্রটির সবচেয়ে ভালো দিক এর গান। অসাধারণ গানগুলোই চলচ্চিত্রটির সবচেয়ে বেশি আকর্ষণীয় দিক। এ চলচ্চিত্রের প্রত্যেকটি গানই দর্শক শ্রোতারা পছন্দ করেছেন। পরিচালক গানগুলোকে চিত্রায়নও করেছেন দারুণ ভাবে।  ‘আমি তোমার মনের ভিতর’ গানটি চলচ্চিত্র মুক্তির অনেক আগেই মানুষের মন জয় করে নিয়েছিল। আর দেশের গানটি হলের দর্শকদের হৃদয় কাঁপিয়ে দিয়েছিল। সুন্দর গানের সাথে সুন্দর লোকেশন এবং শাকিব-বিন্দুর পারফরমেন্স, লুক, সবই মন জয় করেছিল দর্শকদের।

নির্মাণে ছয় বছর

‘এই তো প্রেম’ চলচ্চিত্রটির নির্মাণ কাজ শুরু হওয়ার পর মুক্তির আলোয় আসতে লেগেছিল ছয় বছর। টানা ছয় বছর সময় নিয়ে নির্মাতা সোহেল আরমান তৈরি করেছেন চলচ্চিত্রটি। এক গণমাধ্যমে এই সিনেমার নায়িকা বিন্দু বলেছিলেন, ‘এইতো প্রেম’ চলচ্চিত্রর নাম শুনলেই এখন বেশ ভয় হয়। কারণ, অনেক আশা নিয়ে সাইন করেছিলাম। প্রথমদিন হেলিকপ্টারে করে শুটিং করতে গিয়েছিলাম। এখন সেই ধরনের কোনো আশা একেবারেই নেই। কারণ, এটি নির্মাণে এতো সময় লেগেছে, যাতে কোনো কিছুর ওপর আশা ভালোবাসা একেবারেই উঠে যায়। এখন শুধুই কাজ শেষ করা এই আর কি। অন্যদিকে একটি চলচ্চিত্রের পেছনে ছয় বছর সময় লাগার কারণ নিয়ে সোহেল আরমান বলেন, ‘তিনটি কারণে এই ছবি তৈরিতে এতো সময় লেগেছে। প্রথম কারণ হলো, এর গান। হাবিব ওয়াহিদের সঙ্গে ২০০৯ সালে টানা নয় মাস সময় নিয়ে ছবির গান ও আবহ সংগীত তৈরি করেছি। দ্বিতীয়ত, এই ছবির দৃশ্যধারণের জন্য সময় লেগেছে তিন বছর। কারণ, ছবির কন্টিনিউইটি ঠিক রাখার জন্য আমরা শুধু শীতকালেই শুটিং করেছি। তাই পুরো ছবির দৃশ্যধারণের জন্য আমাদের পর পর তিনটি শীতে কাজ করতে হয়েছে। এ ছাড়া কিছু কারিগরি কারণ ছিল।’

শুটিংয়ের গল্প

২০০৯ সালের নভেম্বরে চলচ্চিত্রটির নির্মাণ কাজ শুরু হয়। এরপর ২০১০ সালে মানিকগঞ্জের কৈরি গ্রামে এই চলচ্চিত্রের প্রথম দৃশ্যায়ন শুরু হয়। অংশ নেন এর প্রধান অভিনেতা শাকিব খান ও আফসানা আরা বিন্দু। বালিয়াটি প্রাসাদ, হরিরামপুরের হরিণারচরে এই চলচ্চিত্রের উল্লেখযোগ্য দৃশ্যধারণের কাজ করা হয়। ২০১২ সালের ৮ নভেম্বর চলচ্চিত্রের দৃশ্যধারণের কাজ সম্পন্ন হয়।

বিশেষ গানে নিপুণ

মধু বনের ফুল গো আমি মধু বনের ফুল/ আমার রঙে পাগল হাওয়া সুবাসিত চুল/ মধুর স্বাদ কে নিবা গো কইরো না তো ভুল/ মধু বনের ফুল গো আমি মধু বনের ফুল/ বাবো বলে ভালে বাড়ে দিলওয়ালে/ নেশেমে রঙ্গিলে পেঁয়াস মিটালে/ মধু বনের ফুল গো আমি মধু বনের ফুল…, এমন কথার একটি বিশেষ গান ব্যবহার করা হয়েছে এই চলচ্চিত্রে। গানটিতে কণ্ঠ দিয়েছেন ডলি সায়ন্তনী। আর এই গানের সঙ্গে পারফর্ম করেছেন চিত্রনায়িকা নিপুণ।

নির্মাতা সোহেল আরমান

অভিনেতা-নির্মাতা, নাট্যকার ও গীতিকার সোহেল আরমান। প্রয়াত কিংবদন্তি নির্মাতা আমজাদ হোসেনের ছেলে। বাবার পথ ধরেই নির্মাণ ও অভিনয়ে আসেন তিনি। ১৯৯২ সালে সোহেল আরমানের গল্পে প্রথম নাটক নির্মাণ হয় বাংলাদেশ টেলিভিশনে। নাটকের নাম ‘সবুজের হলুদব্যাধি’। এটি প্রযোজনা করেন ফারুক ভূঁইয়া। নাটকটিতে অভিনয় করেন তৌকীর আহমেদ ও আফসানা মিমিসহ অনেকে। ১৯৯৪ সালে নাট্যকার থেকে  অভিনেতা ও নির্মাতা হিসেবে অভিষেক হয় সোহেল আরমানের। প্রথম নাটকটি বাংলাদেশ টেলিভিশনের জন্যই নির্মাণ করেন। ‘বিবর্ণ প্রজাপতি’ শিরোনামের নাটক দিয়ে দর্শকের মনে জায়গা করে নেন। এ পর্যন্ত তিনি ১৬০টির অধিক নাটক নির্মাণ করেছেন। এরপর মাঝে টানা কয়েক বছর ছোট পর্দা থেকে দূরে ছিলেন আমজাদ হোসেনের এই উত্তরসূরি। ২০১১ থেকে ২০১৪ সাল পর্যন্ত বড় পর্দার কাজ নিয়ে ব্যস্ত থাকার কারণে ছোট পর্দায় তাকে পাওয়া যায়নি। এই সময়ে তিনি ‘এই তো প্রেম’ সিনেমাটি নির্মাণ করেন। এরপর আবারও ছোট পর্দার কাজ নিয়েই ব্যস্ত হয়ে পড়েন। অভিনেতা-নির্মাতার বাইরে সোহেল আরমানের আরো একটি পরিচয় আছে। সেটি হলো অনেক জনপ্রিয় গানের গীতিকার তিনি। ‘আমি তোমার মনের ভেতর একবার ঘুরে আসতে চাই’, ‘তুমি আমার ঘুম’, ‘যাক না উড়ে’, ‘বেশ বেশ সাবাস বাংলাদেশ’ গানগুলো তারই লেখা। বর্তমানে মুক্তির অপেক্ষায় আছে তার পরিচালিত দ্বিতীয় চলচ্চিত্র ‘ভ্রমর’।

পেছনের অজানা কথা

পরিচালক সোহেল আরমান জানান, আমার মনে আছে, মাত্র কয়েক মিনিটের জন্য কাহিনী শোনার জন্য এসেছিলেন শাকিব। কাহিনী শোনার পর কিছুক্ষণ পরপর তার মুখ থেকে বেরিয়ে আসছিল ‘তারপর!’ এদিকে কাজের তাড়া দিতে অনেকে ডাকলেও শাকিব তাদের গাড়ির ভেতর থেকেই ইশারায় জানিয়ে দেন ‘আসছি’। পুরো গল্প শোনার পর সূর্য ডুবে যাচ্ছিল। গল্পটা শেষ হতেই শাকিবের চোখ ছলছল করলো। তার সময় পাওয়া অনেক মুশকিল ছিল তখন। তবুও শাকিব বললেন, ‘ছবিটিতে কাজ করতে চাই।’ একই সময়ে আফসানা আরা বিন্দু ‘জাগো’ চলচ্চিত্রের চিত্রায়ণ চলাকালে এই চলচ্চিত্রের জন্য চুক্তিবদ্ধ হন।

লেখাটির পিডিএফ দেখতে চাইলে ক্লিক করুন: মুক্তিযুদ্ধের সিনেমা

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

3 × two =