এবার বিশ্ব জলবায়ু সম্মেলন কতটুকু সফল হবে?

মুশফিকুর রহমান

এ বছরের বিশ্ব জলবায়ু সম্মেলন (কপ২৯) অনুষ্ঠিত হবে আজারবাইজানের রাজধানী বাকু’তে। গত বছর ডিসেম্বরে সংযুক্ত আরব আমিরাতের দুবাই নগরীতে অনুষ্ঠিত কপ২৮-এ সিদ্ধান্ত হয়েছিল, কাস্পিয়ান সাগরের তীরে তেলসমৃদ্ধ আজারবাইজানের রাজধানীতে (১১-২২ নভেম্বর ২০২৪ সময়ে) অনুষ্ঠিত হবে এবারের বিশ্ব জলবায়ু সম্মেলন (কপ২৯)। এবারের অনুষ্ঠিতব্য বিশ্ব জলবায়ু সম্মেলনকে জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত মোকাবেলায় অর্থায়নের পথ অন্বেষণের আন্তর্জাতিক সম্মেলন হিসেবে দেখা হচ্ছে। প্যারিস জলবায়ু সম্মেলনে (কপ১৫) জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত মোকাবেলায় বছরে ১০০ বিলিয়ন মার্কিন ডলার মূল্যমানের তহবিল গড়ে তোলার  কথা ছিল। উল্লিখিত তহবিলের সামান্যই সংগৃহীত হয়েছে। বৈশ্বিক জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত মোকাবেলার টেকসই ব্যবস্থাপনা গড়ে তুলতে এখনকার হিসেবে আরও অনেক বেশি তহবিল প্রয়োজন। বিশ্ব জলবায়ু সম্মেলনের সদস্য দেশসমূহ বাকু সম্মেলনে বৈশ্বিক জলবায়ু তহবিলের নতুন আকৃতি ও তার গঠন কাঠামো কেমন হবে সে আলোচনায়  মিলিত হবেন বলে আশা করা হচ্ছে ।

জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাতে কেবল বৈশ্বিক পর্যায়ে আবহাওয়ামণ্ডলীর বিপর্যয় নয়, স্থানীয় পর্যায়ে নানামুখী উন্নয়ন চ্যালেঞ্জ দেখা যাচ্ছে। দুর্বল অর্থনীতির দেশগুলোতে বৈশ্বিক জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাতে খাদ্যনিরাপত্তা, জনস্বাস্থ্য ও অভ্যন্তরীণ শরণার্থীর চাপ, তীব্রতর দুর্যোগ, বিকৃত নগরায়ন অবধারিত হয়ে উঠছে। আজারবাইজানের প্রতিবেশ মন্ত্রী ও কপ২৯-এর সভাপতি মুখতার বাবায়েভ উন্নয়নশীল দেশসমূহের সরকারি প্রতিনিধি দলকে আহ্বান জানিয়েছেন, যেন তারা সম্মেলনে আসবার সময় নিজ দেশে গ্রিন হাউজ গ্যাস নিঃসরণ সঙ্কুচিত করার সুনির্দিষ্ট অগ্রগতি এবং জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্কট মোকাবেলার তহবিল ব্যবস্থাপনার স্বচ্ছ রিপোর্ট নিয়ে সম্মেলনে যোগ দেন।

বিষয়টি এ কারণে প্রাসঙ্গিক যে, উন্নয়নশীল দেশসমূহ বৈশ্বিক জলবায়ু পরিবর্তনের দুর্ভোগের কারণ হিসেবে দীর্ঘদিন ধরে শিল্পোন্নত দেশসমূহের ক্রমাগত পরিবেশ দূষণ, ভোগবাদি জীবনব্যবস্থাকে সাধারণভাবে দায়ী করে আসছে। সেই সাথে উন্নয়নশীল দেশগুলো তাদের জলবায়ু পরিবর্তনজনিত দুর্ভোগ থেকে উত্তরণে সম্পদশালী দেশসমূহের কাছে বর্ধিত সহায়তা, ক্ষতিপূরণ দাবী করে। শিল্পোন্নত দেশসমূহ ঢালাওভাবে উন্নয়নশীল দেশসমূহের অভিযোগ মানতে নারাজ। তারা উন্নয়নশীল দেশগুলোর মধ্যে বিভিন্ন স্তর বিভাজন, পরিবেশ দূষণে বিভিন্ন দেশের বিভিন্ন মাত্রার দায় এবং জলবায়ু পরিবর্তন সংশ্লিষ্ট তহবিল ব্যবস্থাপনার স্বচ্ছতার দাবী জোরদার করছে।

২০১৫ সাল থেকে এখন অবধি বছরে ১০০ বিলিয়ন ডলারের তহবিল গঠনের লক্ষ্যমাত্রার সামান্যই অর্জিত হয়েছে। উন্ননয়নশীল দেশের নেতৃবৃন্দের অনেকে বৈশ্বি^ক জলবায়ু সঙ্কটের ব্যাপ্তি ও বহুমুখিতার কারণে বছরে অন্তত এক ট্রিলিয়ন ডলারের তহবিল গঠনের প্রয়োজনের কথা বলছেন। এত বড় তহবিল কে যোগান দেবে সেটি এক বড় জিজ্ঞাসা। তহবিলের যোগান কোন খাত থেকে আসবে তা-ও অমীমাংসিত। কেউ কেউ দাবী করেন, প্রধানত জীবাশ্ম জ্বালানি উৎপাদক ও তার বিস্তারের সাথে যারা জড়িত তাদের ক্রমবর্ধমান মুনাফার অংশবিশেষ বৈশ্বিক উষ্ণায়ন ও জলবায়ু পরিবর্তনের বিরুদ্ধে লড়াই সফল করতে বরাদ্দ দেওয়া প্রয়োজন। জীবাশ্ম জ্বালানির উৎপাদক ও সরবরাহকারীদের বিশ্ব জলবায়ু সম্মেলনে বড় আকারেই সম্পৃক্ত করা হচেছ। জলবায়ু সম্মেলনে জীবাশ্ব জ্বালানি উৎপাদকদের অংশগ্রহণ জীবাশ্ম জ্বালানি ব্যবসা সঙ্কুচিত করতে বা জলবায়ু খাতে তহবিল যোগাতে সামান্যই নিশ্চয়তা দিচ্ছে।

মুখতার বাবায়েভ জলবায়ু সঙ্কটের তহবিল যোগানোর বিষয়টি একটি ত্রিভুজের মতো বলে উল্লেখ করেছেন। তার মতে, জলবায়ু তহবিল ব্যবস্থাপনার স্বচ্ছতা, পক্ষসমূহের মধ্যে তহবিল যোগানের জন্য আস্থা ও গ্রিন হাউস গ্যাস নিঃসরণে জাতীয়ভাবে নিরুপিত লক্ষ্যমাত্রা নিয়ে যে ত্রিভুজ; তা যথাযথভাবে প্রতিষ্ঠিত না হলে জলবায়ু তহবিল যোগানদাতা ও তহবিলের ব্যবহারকারীর মধ্যে দূরত্ব বাড়বে। অপরদিকে, বিশ্ব জলবায়ু সম্মেলন নিছক বিতর্ক ক্লাবে পর্যবসিত হবে যদি সে সম্মেলন পক্ষসমূহের মধ্যে বোঝাপড়ার মাধ্যমে জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত মোকাবেলার তহবিল ও প্রযুক্তি সহায়তার সুযোগ সৃষ্টি করতে ব্যর্থ হয়। বাকু’তে অনুষ্ঠিতব্য বিশ্ব জলবায়ু সম্মেলনে (কপ২৯) সে কারণে গ্রিন হাউস গ্যাস নিঃসরণ হ্রাসের আলোচনা ছাপিয়ে জলবায়ু পরিবর্তন অভিঘাত মোকাবেলার তহবিল যোগান ও তার সরবরাহ সংক্রান্ত আলোচনায় রূপান্তরিত হবার সম্ভাবনা রয়েছে।

জলবায়ু পরিবর্তন নিয়ে যে বৈশ্বিক সঙ্কট তীব্র হয়ে উঠছে তাতে পক্ষসমূহের মধ্যে রাজনৈতিক বোঝাপড়া ও উপযুক্ত তহবিলের যোগান নিশ্চিত করার মাধ্যমে সঙ্কট মোকাবেলার পথ খুঁজে পাওয়া সম্ভব। এ জন্য জলবায়ু তহবিল ব্যবস্থাপনার স্বচ্ছতার প্রশ্ন এবার জোরে সোরে সামনে এসেছে। উন্নয়নশীল দেশসমূহ উপযুক্ত মাত্রার জলবায়ু তহবিল গঠন, সে তহবিলে ন্যায্য অংশীদারিত্ব ও গ্রহণযোগ্য শর্তে তহবিলের প্রাপ্য অংশ ব্যবহারের সুযোগ পেতে আগ্রহী।

বিশ্বজুড়ে রাষ্ট্রসমূহের মধ্যে সম্পর্কের টানাপোড়েন ও তীব্র আঞ্চলিক রক্তাক্ত সংঘাত (প্যালেস্টানের গাজা, ইউক্রেইন) এবং সে সঙ্কটের প্রধান ইন্ধন দাতাদের ভূমিকা জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত মোকাবেলায় সহায়তার পরিবেশকে বিষিয়ে  তুলেছে। এ বছর অনেকগুলো ধনী ও অগ্রসর অর্থনীতির দেশে এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নের পরিকল্পিত নির্বাচনে, ক্ষমতার সম্ভাব্য পরিবর্তন বৈশ্বিক জলবায়ু পরিবর্তনে ক্ষতিগ্রস্থ মানুষদের আশঙ্কিত করছে। জলবায়ু সঙ্কটে রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত নিতে প্রভাবশালী ও বিত্তবান দেশগুলোর সম্ভাব্য রাজনৈতিক নেতৃত্বের পরিবর্তন কীভাবে প্রভাবিত হবে সে সম্পর্কে এখনই মন্তব্য করা দুরূহ। সে পটভূমিতে বিশ্ব জলবায়ু সম্মেলনের (কপ২৯) সাফল্য সম্পর্কে পুরোপুরি আশাবাদী হতে হলে বড় বাজি ধরতে হবে।

লেখাটির পিডিএফ দেখতে চাইলে ক্লিক করুন: পরিবেশ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

5 × 5 =