এসিড সহিংসতার শিকার: নারী ও শিশু

সেলিনা আক্তার: পারিবারিক কলহের জেরে মধ্যরাতে ঘুমন্ত পুত্রবধূর গায়ে এসিড ছুঁড়ে মারেন শাশুড়ি। মা আমেনার সঙ্গে তরল আগুনে পুড়ে যায় শিশু রাসেলের কোমল শরীর, মাথা ও মুখের চামড়া। পুত্রবধূ আমেনা শরীরে জ্বালা-পোড়ার যন্ত্রণা নিয়েই সংসার করে চলেছেন। কেউ বাঁচার আশা না করলেও পোড়া মাথা-মুখের চামড়া নিয়ে বেড়ে ওঠছে রাসেল। নিজের ঝলসানো শরীর মেনে নিলেও সন্তানের দিকে তাকালে দিশেহারা হয়ে ওঠেন মা আমেনা। প্রায় দুই দশক আগে, ২০০২ সালে এসিড সন্ত্রাসের উল্লম্ফন নাড়া দিয়েছিল সারা দেশকে। এরপর আন্দোলন, সচেতনতামূলক ক্যাম্পেইন এবং আইনের কড়াকড়িতে নেমে আসতে থাকে ঘটনার সংখ্যা। এরপরও এ নিষ্ঠুরতা ঘটে চলেছে, যার প্রধান শিকার হচ্ছেন নারী ও শিশু।

অধিকাংশ ক্ষেত্রে প্রেমে প্রত্যাখ্যানের মতো ঘটনার জেরে এসিড নিক্ষেপের মতো বীভৎস অস্ত্রের আশ্রয় নিয়ে মুহূর্তেই শেষ হয়ে যায় বহু তরুণীর স্বপ্ন। সহিংসতা, প্রতিশোধ, শত্রুতার কারণেও এসিড নিক্ষেপের মতো ঘটনা ঘটে। এই বীভৎস এসিড সন্ত্রাস সমাজের চলমান অস্থিরতা, অশিক্ষা, বেকারত্ব, মাদকদ্রব্যের ব্যবহার, আঞ্চলিক প্রভাব, অর্থের দৌরাত্ম্যসহ নানাবিধ সামাজিক অনাচারের ফল। সমাজে মানবিক ও নৈতিক মূল্যবোধের ব্যাপক অবক্ষয়ের ফলে সার্বিকভাবে এসিড সন্ত্রাসের মতো সন্ত্রাসের বিস্তৃতি ঘটছে।

এসিড লাগলে হাসপাতালে পৌঁছানোর আগে পর্যন্ত কী করা উচিত, অনেকেই তা জানেন না। এসিড ক্ষতে পানি লাগলে ক্ষতি হবে, এমন ভ্রান্ত ধারণাও আছে কোথাও কোথাও। প্রাথমিক অবস্থায় শরীরের যেখানে এসিড লাগবে, সেখানে অনবরত পানি ঢালতে হবে। এসিড-আক্রান্তকে নিয়ে হাসপাতালে পৌঁছানোর আগে পর্যন্ত ক্ষতস্থানে পানি ছাড়া যেন আর কিছুই দেওয়া না হয়, তাতে আক্রান্তকে চিকিৎসা দিতে সুবিধা হয়।

এসিড সহিংসতার বিরুদ্ধে কাজ করা এসিড সারভাইভারস ফাউন্ডেশন (এএসএফ) নিজেদের মনিটরিং সেল, সংবাদ মাধ্যম, বিভিন্ন এনজিও ও ভুক্তভোগীদের কাছ থেকে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে ১৯৯৯ সাল থেকে এই অপরাধমূলক ঘটনার পরিসংখ্যান সংরক্ষণ করে আসছে। তাদের তথ্য অনুযায়ী, এ পর্যন্ত ৩ হাজার ৪২২টি এসিড হামলার ঘটনায় আক্রান্ত হয়েছেন ৩ হাজার ৮শ’ ২ জন। এসিড সারভাইভারস ফাউন্ডেশনের তথ্য মতে, এসিড সহিংসতার শিকার ৯৯ শতাংশ নারী হলেও গত কয়েক বছরে পুরুষও আক্রান্ত হচ্ছেন। এছাড়া মোট ভুক্তভোগীর এক চতুর্থাংশ শিশু; যারা ঘটনার সময় মায়ের কোলে বা কাছাকাছি থাকায় এ ধরনের সহিংসতার শিকার হয়েছে। এসিড সহিংসতায় আক্রান্তদের বেশিরভাগের বয়স ১৩ থেকে ৩৫ বছরের মধ্যে।

এএসএফ-এর ভাষ্য মতে, পারিবারিক কলহ, যৌতুক, জমি সংক্রান্ত বিরোধ, বিয়ে বা প্রেম প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান, মামলা প্রত্যাহারে রাজি না হওয়া, স্বামীকে তালাক এবং স্বামীর দ্বিতীয় বিয়েতে বাধা দেওয়ার কারণে বরাবরই নারীরা এ ধরনের সহিংসতার শিকার হন। এদিকে আইন ও সালিশ কেন্দ্রের পরিসংখ্যান বলছে, যৌন সম্পর্কে রাজি না হলেও নারীকে জব্দ করতে এসিড নিক্ষেপ করা হয়। ২০০২ সালে এক বছরেই ৪শ’ ৯৪টি এসিড সহিংসতার ঘটনা রেকর্ড করেছিল সংস্থাটি। এর আঠার বছর পর ২০২২ সালের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত ২১টি ঘটনা রেকর্ড করেছে তারা। এসিড সারভাইভারস ফাউন্ডেশনের তথ্য অনুযায়ী উচ্চ আদালত ও বিচারিক আদালত মিলিয়ে এসিড সহিংসতার প্রায় ৬শ’ মামলা বিচারাধীন রয়েছে।

২০০২ সালে এসিড হামলার ঘটনা ছিলো গত দুই দশকের মধ্যে সর্বোচ্চ। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে কঠোর হতে এসিড অপরাধ দমন আইন করে সরকার। আইন অনুযায়ী এসিড সংক্রান্ত অপরাধের বিচার এসিড অপরাধ দমন ট্রাইব্যুনালে হয়ে থাকে। এই বিচার প্রক্রিয়া শেষ হতে হবে ৯০ কর্মদিবসের মধ্যে। এই আইনের ১৬ ধারায় বলা আছে, ট্রাইব্যুনালে কোনো মামলার শুনানি শুরু হলে শেষ না হওয়া পর্যন্ত প্রতি কর্মদিবসে টানা চলে এর বিচার প্রক্রিয়া। এসিড অপরাধ দমন আইনে এ ধরনের সহিংসতার জন্য সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ড। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, এসিড নিক্ষেপের মামলায় গত আঠারো বছরে (২০০২ সালে এসিড অপরাধ দমন আইন প্রণয়নের পর) ১৪ জন আসামিকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছে। এসিড নিয়ন্ত্রণ আইনের একটি উদ্দেশ্য ছিল, এসিডের অবাধ কেনাবেচা নিয়ন্ত্রণ। এসিড বিক্রিতে যেসব নিয়ম-নীতি অনুসরণ করতে হয় সেগুলো সবসময় মানা হয় না, ফলে অনেক অনিরাপদ হাতে চলে যায় দাহ্য এই তরল।

এসিড নিয়ন্ত্রণ আইনের উদ্দেশ্য পূরণে জাতীয় এসিড নিয়ন্ত্রণ কাউন্সিল গঠন করা হয়েছে। এসিডের উৎপাদন, পরিবহণ, মজুদ, বিক্রয় ও ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ, এসিডে ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তিদের চিকিৎসা, পুনর্বাসন ও আইনগত সহায়তা দিতে এ কাউন্সিল কাজ করছে। এছাড়া, সরকার নারী ও শিশুর উন্নয়নে বেশকিছু আইন, নীতি ও বিধিমালা তৈরি করেছে। এরমধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো- জাতীয় নারী উন্নয়ন নীতি ২০১১, জাতীয় শিশু নীতি ২০১১, শিশুর প্রারম্ভিক যত্ন ও বিকাশের সমন্বিত নীতি ২০১৩, জাতীয় নারী উন্নয়ন নীতি বাস্তবায়নকল্পে কর্মপরিকল্পনা ২০১৩-২০১৫, পারিবারিক সহিংসতা (প্রতিরোধ ও সুরক্ষা) আইন ২০১০, ডিঅক্সিরাইবোনিউক্লিক এসিড (ডিএনএ) আইন ২০১৪, পারিবারিক সহিংসতা (প্রতিরোধ ও সুরক্ষা) বিধিমালা ২০১৩ এবং বাল্যবিবাহ নিরোধ আইন ২০১৭ উল্লেখযোগ্য এবং সরকারের অত্যন্ত প্রশংসনীয় উদ্যোগ।

মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের অধীনে এসিড সন্ত্রাসসহ বিভিন্ন ধরনের নারী নির্যাতন প্রতিরোধকল্পে মাল্টিসেক্টরাল প্রোগ্রাম নেয়া হয়েছে। এসব কর্মসূচি নারী ও শিশু নির্যাতন হ্রাস এবং সেবা কার্যক্রম জোরদারের গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছে। মাল্টিসেক্টরাল প্রোগ্রামের আওতায় ঢাকা, রাজশাহী, চট্টগ্রাম, সিলেট, খুলনা, বরিশাল, রংপুর ও ফরিদপুর মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ওয়ান-স্টপ ক্রাইসিস সেন্টার (ওসিসি) স্থাপন করা হয়েছে। স্বাস্থ্যসেবা, পুলিশি ও আইনি সহায়তা, মানসিক ও সামাজিক কাউন্সেলিং, আশ্রয়সেবা এবং ডিএনএ পরীক্ষার সুবিধা ইত্যাদি ওসিসি হতে প্রদান করা হয়। দেশব্যাপী নির্যাতনের শিকার নারী ও শিশুদের সেবাপ্রাপ্তির সুবিধার্থে দেশের ৪০টি জেলা সদর হাসপাতাল এবং ২০টি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ২০১২ সালে ওয়ান-স্টপ ক্রাইসিস সেল স্থাপন করা হয়েছে।

সরকার সমাজকল্যণ মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন এসিডদগ্ধ ব্যক্তিদের পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করছে । এছাড়াও এসিডদগ্ধদের দ্রুত চিকিৎসার ব্যবস্থা নিশ্চিত করাসহ তার পরিবারকে ক্ষুদ্রঋণ সহায়তা প্রদান করা হচ্ছে। এসিডদগ্ধ দরিদ্র ব্যক্তিকে এককালীন ৫ হাজার টাকা থেকে ১৫ হাজার টাকা পর্যন্ত অনুদান প্রদান করছে। সরকার ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পাশাপাশি এসিড হামলার মতো প্রতিহিংসামূলক কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে ব্যাপক জনমত গড়ে তুলতে হবে। এ লক্ষ্যে সমাজের বিবেকভান মানুষ, জনপ্রতিনিধি, শিক্ষক, ধর্মীয় নেতা, সমাজকর্মী, রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব ও গণমাধ্যমকর্মীদের সম্মিলিতভাবে কাজ করতে হবে। গণপ্রতিরোধ ও গণসচেতনতা সৃষ্টি করে এসিড অপরাধীদের সামাজিকভাবে বয়কট করার পাশাপাশি তাদেরকে আইনের আওতায় নিয়ে আসতে ঐক্যবদ্ধ প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে। এসিড সন্ত্রাসীদের দ্রুত বিচার নিশ্চিত করতে হবে। কেউ যাতে এ ধরনের ঘৃণ্য অপরাধের সাথে জড়িত হওয়ার সাহস না পায়, তা নিশ্চিত করতে হবে। শুধু তাহলেই এসিড সহিংসতা থেকে মুক্তি পাবে আমাদের নারী ও শিশুরা।

লেখক: তথ্য সহকারী, পিআইডি, ঢাকা।

 

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

2 + 1 =