কার হাতে উঠছে শিরোপা

নিবিড় চৌধুরী

কাতার বিশ্বকাপের শুরুর আগে চোখ আটকে থাকা একটি ছবির কথা মনে পড়ছে। দাবার বোর্ড সামনে দুই পাশে চিন্তামগ্ন হয়ে বসে ফুটবলের দুই মহারাজা লিওনেল মেসি ও ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো। সেটি অবশ্য ছিল একটি বিজ্ঞাপনী দৃশ্য। তারপরও ফুটবল ইতিহাসের দুই মহাতারকাকে এভাবে দাবা বোর্ডের সামনে বসে থাকা কিছু না বলেও বুঝিয়ে দেয় অনেক কিছু। এরপরের ইতিহাস সকলের জানা। তেমনি এই তো এপ্রিলে, এ মৌসুমের শেষ আন্তর্জাতিক বিরতির সময় ‘তিন কোণা’ শতরঞ্জি সামনে পেতে পেপ গার্দিওলা, ইয়ুর্গেন ক্লপ ও মিকেল আর্তেতা যেভাবে বসলেন; সেটিও কী কম আইকনিক!

অবশ্য সত্যটা হলো এভাবে তিন কোচ কখনো দাবা খেলতে বসেননি। আর তিন কোণা দাবাই কে দেখেছে আজ পর্যন্ত! এ মৌসুমে প্রিমিয়ার লিগে যেভাবে ত্রিমুখী লড়াই জমে উঠেছে সেটি বুঝাতে ‘ব্লিচার ফুটবল’ এভাবে তিন কোচকে নিয়ে এমনটা সাজিয়েছে। অবশ্য মনে মনে এই তিন কোচ নিজেদের মধ্যে সেই শুরু থেকে দাবা খেলছে। প্রিমিয়ার লিগের শেষটা যেভাবে উঠেছে, তাকে এক কথায় আগাথা ক্রিস্টির রহস্যোপন্যাসের সঙ্গে তুলনা করতে হয়।

‘জমে ক্ষীর’ বলে বাংলায় যে প্রবাদ তার যেন মোক্ষম উদাহরণ হয়ে থাকল ২০২৩-২৪ মৌসুমের প্রিমিয়ার লিগ। গত মৌসুমে আর্তেতার আর্সেনাল শুরু থেকে পয়েন্ট তালিকায় শীর্ষে থাকলেও শেষ দিকে গার্দিওলার ম্যানচেস্টার সিটি শেষ কদিন শীর্ষে ওঠে হ্যাটট্রিক লিগ জিতে নেয়। আর ক্লপের অধীনে লিভারপুল কাটিয়েছিল সবচেয়ে বাজে মৌসুম। বেশ কয়েকজন তারকার চলে যাওয়া, চোট, ফর্মহীনতা ভুগিয়েছে অলরেডদের। তবে এবার লিগের অন্যতম দাবিদার তারা। এই লেখা যখন লিখতে বসার সময় প্রিমিয়ার লিগের পয়েন্ট তালিকাটা এমন Ñ সমান ২৯ রাউন্ড শেষে ৬৭ পয়েন্ট নিয়ে শীর্ষে লিভারপুল, ৬৫ পয়েন্ট নিয়ে দুইয়ে আর্সেনাল, ২ পয়েন্ট কম নিয়ে তিনে সিটি। বাকি ৯ রাউন্ডের মধ্যে কেউ পয়েন্ট হারানো মানে শিরোপা দৌড় থেকে এক প্রকার ছিটকে যাওয়া।

২০০৪ সালে আর্সেন ওয়েঙ্গারের অধীনে সবশেষ লিগ জিতেছিল আর্সেনাল। গত মৌসুমে খুব কাছে গিয়েও সেই অপেক্ষা ঘুচাতে পারেনি গানাররা। এবারও পয়েন্ট তালিকার শীর্ষে ওঠা-নামা করেছে। ২০ বছরের অপেক্ষার ইতি টেনে আর্তেতার শিষ্যরা কি এমিরেটসে উৎসব সারতে পারবে? নাকি আবারও সিটির হাতে মাটি হবে তাদের সব আয়োজন? গত মৌসুমে ইংলিশ ফুটবলের দ্বিতীয় দল হিসেবে ট্রেবল জিতেছে। এবারও সে সুযোগ আছে তাদের। তবে এক্ষেত্রে সিটিজেনদের বড় বাধা লিভারপুল। গার্দিওলার কোচিং ক্যারিয়ারে সবচেয়ে বেশি হেরেছেন ক্লপের কাছে। আর এই ক্লপের এটিই শেষ মৌসুম অ্যানফিল্ডে। বিদায়ী মৌসুমে জার্মান মাস্টারমাইন্ডকে কি হাসিমুখে বিদায় দিতে পারবেন  মোহামেদ সালাহরা। ৩০ বছর পর অলরেডদের তিনিই যে লিগ জিতিয়েছেন!

প্রিমিয়ার লিগ মানেই তুমুল লড়াই। ইউরোপের শীর্ষ পাঁচ লিগের আর কোথাও এমনটা আর দেখা যায় না। মৌসুমের শেষ দিকে এসে বাকি চার লিগ নিয়ে মোটামুটি ভবিষ্যদ্বাণী করা যায়। লা লিগায় রিয়াল মাদ্রিদ, সিরি আয় ইন্তার মিলান, বুন্দেসলিগায় বেয়ার লেভারকুজেন ও লিগ আঁয় পিএসজি। কোনো অঘটন না ঘটলে এই ভবিষ্যদ্বাণী ফলে যেতে পারে।

এই লেখার সময় গতবারের চ্যাম্পিয়ন বার্সেলোনার চেয়ে ৮ পয়েন্ট এগিয়ে রিয়াল। ৩০ রাউন্ড শেষে লস ব্লাঙ্কোসদের পয়েন্ট ৭৫। সিরি আয় ৩০ ম্যাচ শেষে ৭৯ পয়েন্ট নিয়ে শীর্ষে ইন্তার। দুইয়ে থাকা নগর প্রতিদ্বন্দ্বী এসি মিলানের চেয়ে এগিয়ে ১৪ পয়েন্ট। বুন্দেসলিগায় বায়ার্ন মিউনিখের একচ্ছত্র আধিপত্য ভাঙতে বসেছে লেভারকুজেন। যারা কি না কোনোদিন লিগ না জেতায় উপহাস করে সবাই বলত ‘নেভারকুজেন’, তারা লিগ জয়ের পথে এগিয়ে গেছে অনেক। ২৭ ম্যাচে তাদের পয়েন্ট ৭৩, বায়ার্নের ৬০। গত ১১ মৌসুম ধরে জার্মান শীর্ষ লিগের শিরোপা অ্যালিয়েঞ্জ অ্যারেনার বাইরে যায়নি। তবে এবার সেই অসম্ভবকে সম্ভব করার পথে জাবি আলোনসো। লেভারকুজেনকে প্রথম লিগ জয়ের স্বপ্নদ্রষ্টা যে সাবেক এই স্প্যানিশ মিডফিল্ডার!

বুন্দেসলিগার মতো লিগ আঁতেও একচ্ছত্র আধিপত্র পিএসজির। ২০২০-২১ মৌসুমে ফরাসি জায়ান্টদের সেই রাজত্বে হানা দিয়েছিল লিলে। তবে পরের দুই মৌসুমে ঠিকই শিরোপা গেছে প্যারিসিয়ানদের হাতে। এবারও শীর্ষে তারা। ২৭ ম্যাচে পিএসজির পয়েন্ট ৬২। দুইয়ে থাকা ব্রেস্টের চেয়ে এগিয়ে ১২ পয়েন্ট। পার্ক দে প্রিন্সেসে নিজের শেষ মৌসুমে হ্যাটট্রিক লিগ জয়ের উদযাপনে মাতার অপেক্ষায় কিলিয়ান এমবাপ্পে। আগামী মৌসুমে ফরাসি ফরোয়ার্ডকে দেখা যাবে রিয়ালের জার্সিতে।

ইউরোপের শীর্ষ লিগের বাইরে বাকিদের কী খবর? পর্তুগাল প্রিমেইরা লিগে চলছে দ্বিমুখী লড়াই। সেটি স্পোর্টিং সিপি ও বেনফিকার মধ্যে। ডাচ ইরেদিভিসিতে শিরোপা দৌড়ে গতবারের চ্যাম্পিয়ন ফেইনুর্দের চেয়ে অনেক দূর এগিয়ে গেছে পিএসভি আইন্দোফেন। আর তুরস্কের সুপার লিগে গ্যালাতাসারাইয়ের হাতে উঠতে পারে শিরোপা। দেখা যাক কী হয়…

লেখাটির পিডিএফ দেখতে চাইলে ক্লিক করুন: খেলার মাঠ ২

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

sixteen − 4 =