কৃষিপ্রধান বাংলাদেশে কৃষকদের জীবনমান উন্নয়নে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে বিএনপির দেওয়া ইশতেহার বাস্তবায়নের অংশ হিসেবে আজ (মঙ্গলবার) কৃষক কার্ড বিতরণ কার্যক্রমের উদ্বোধন করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। খবর বাসস
বাংলা নববর্ষ ১৪৩৩ উপলক্ষে দেশের ১০টি জেলায় ১১টি উপজেলায় পরীক্ষামূলকভাবে ১৫ জন প্রান্তিক কৃষকের হাতে ‘কৃষক কার্ড’ তুলে দেয়ার মাধ্যমে সারাদেশে প্রি-পাইলট প্রকল্পের উদ্বোধন করেন প্রধানমন্ত্রী।
আজ মঙ্গলবার টাঙ্গাইলের শহীদ মারুফ স্টেডিয়ামে কৃষক কার্ড বিতরণের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়।
বেলা ১২টা ২২ মিনিটে প্রধানমন্ত্রী ল্যাপটপের বাটন চাপার সঙ্গে সঙ্গে টাঙ্গাইলসহ দেশের ১১টি উপজেলার ২২ হাজার ৬৭ জন কৃষকের প্রত্যেকের কাছে মোবাইলের মাধ্যমে ব্যাংক একাউন্টে আড়াই হাজার টাকার নগদ অর্থ চলে যায়। টাঙ্গাইলে ১ হাজার ৪৫৩ জন কৃষক-কৃষাণী এই অর্থ পাবেন।
কৃষক কার্ড বিতরণ অনুষ্ঠানে ১৫ জন কৃষক-কৃষাণী প্রধানমন্ত্রীর হাত থেকে সরাসরি এ কার্ড নেন। তারা হলেন- টাঙ্গাইলে মো. আবু কায়সার, মো. রোমান, শাহনুর আলম, মো. শাহ আলম, জুলেখা আখতার, নাসিমা খানম সুমনা, শিল্পী, আমেনা বেগম, নবাব আলী, মোহাম্মদ আলী, কবির হোসেন, মোছাৎ মনোয়ারা আখতার, শামীমা আখতার, লায়লা বেগম ও তাহমিনা।
পরে কৃষক সমাবেশে বক্তব্য দেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। এর আগে, বেলা ১১টা ২০মিনিটে প্রধানমন্ত্রী শহীদ মারুফ স্টেডিয়ামে প্রবেশ করেন তিনি। অনুষ্ঠানস্থলে পৌঁছে সরাসরি মঞ্চে উঠে কৃষক-কৃষাণীদের হাত নেড়ে শুভেচ্ছা জানান প্রধানমন্ত্রী।
পরে পবিত্র কোরআন, গীতা, বাইবেল ও ত্রিপিটক পাঠের মধ্যে দিয়ে শুরু হয় অনুষ্ঠানের মূল কার্যক্রম।
কৃষি মন্ত্রণালয় আয়োজিত এই রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠানে কৃষক-কৃষাণীসহ কয়েক হাজার নেতা-কর্মী ও সমর্থক সমবেত হন। পুরো স্টেডিয়ামের মাঠে এবং মঞ্চের সামনে ছাড়াও গ্যালারিতেও লোকজনের উপস্থিতি দেখা যায়।
কৃষিমন্ত্রী আমিন উর রশিদের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রীর শিল্প বিষয়ক উপদেষ্টা ও বিএনপি সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব অ্যাডভোকেট রুহুল কবির রিজভী আহমেদ; মৎস্য ও প্রাণী সম্পদ প্রতিমন্ত্রী ও স্থানীয় সংসদ সদস্য সুলতান সালাউদ্দিন টুকু; জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা (এফএও) প্রতিনিধি জিয়াওকুন শি ও কৃষি সচিব রফিকুল ই মোহামেদ উপস্থিত রয়েছেন।
পরে তারেক রহমান পৌর উদ্যানে কৃষিমেলার উদ্বোধন করেন।
বাংলাদেশের অর্থনৈতিক মেরুদণ্ড হিসেবে পরিচিত কৃষক সমাজের সরাসরি ক্ষমতায়নের লক্ষ্যে পহেলা বৈশাখ থেকে টাঙ্গাইলে আনুষ্ঠানিকভাবে যাত্রা শুরু করল তারেক রহমান ঘোষিত ঐতিহাসিক ‘কৃষক কার্ড’ কর্মসূচি।
প্রাক-পাইলট পর্যায়ে পঞ্চগড় জেলার সদর উপজেলার কমলাপুর ব্লক; বগুড়া জেলার শিবগঞ্জ উপজেলার উথলি ব্লক; ঝিনাইদহ জেলার শৈলকূপা উপজেলার কৃপালপুর ব্লক; পিরোজপুর জেলার নেছারাবাদ উপজেলার রাজাবাড়ি ব্লক; কক্সবাজার জেলার টেকনাফ উপজেলার রাজারছড়া ব্লক; কুমিল্লা জেলার আদর্শ সদর উপজেলার অরণাপুর ব্লক; টাঙ্গাইল জেলার টাঙ্গাইল সদর উপজেলার সুরুজ ব্লক; রাজবাড়ি জেলার গোয়ালন্দ উপজেলার তেনাপঁচা ব্লক; মৌলভিবাজার জেলার জুড়ী উপজেলার ফুলতলা ব্লক; পঞ্চগড় জেলার বোদা উপজেলার পাঁচপির ব্লক ও জামালপুর জেলার ইসলামপুর উপজেলার গাইবান্ধা ব্লকে এ কার্যক্রমের উদ্বোধন করা হয়।
প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মুখপাত্র মাহদী আমিন বলেন, নির্বাচনে জয়ের মাত্র দু’মাসের মাথায় প্রধানমন্ত্রী তাঁর ইশতেহারে দেওয়া প্রতিশ্রুতিগুলো একে একে বাস্তবায়ন করছেন। এ কর্মসূচির মূল লক্ষ্য কৃষকদের অধিকার রক্ষা এবং তাদের জীবনযাত্রার মানোন্নয়ন করা।
তিন ধাপে পর্যায়ক্রমে সারাদেশের সব কৃষককে ‘কৃষক কার্ড’ দিচ্ছে সরকার। পাঁচটি শ্রেণিতে ভাগ করে দেওয়া হবে এই কার্ড। এর মাধ্যমে ন্যায্যমূল্যে কৃষি উপকরণ, সেচ সুবিধা, সহজ শর্তে কৃষিঋণসহ ১০ ধরনের সুবিধা পাবেন কার্ডধারীরা।
কৃষিমন্ত্রী মোহাম্মদ আমিন উর রশিদ জানান, কৃষক কার্ড বিতরণ তিন ধাপে বাস্তবায়িত হবে। এগুলো হল, প্রাক পাইলট (পরীক্ষামূলক), পাইলট এবং দেশব্যাপী কার্যক্রম।
প্রাক পাইলট পর্যায়ে ১০টি জেলার ১১টি উপজেলার ১১টি ব্লকে ফসল উৎপাদনকারী কৃষকের পাশাপাশি মৎস্যচাষি বা আহরণকারী; প্রাণিসম্পদ খাতে নিয়োজিত খামারি ও দুগ্ধ খামারিসহ ভূমিহীন, প্রান্তিক, ক্ষুদ্র, মাঝারি ও বড় শ্রেণির কৃষককে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। প্রযোজ্য ক্ষেত্রে লবণচাষীও এতে অন্তর্ভুক্ত হয়েছেন।
প্রাক পাইলট পর্যায়ের জন্য ব্যয় হবে প্রায় ৮ কোটি ৩৪ লাখ টাকা। এই পর্যায় শেষ হওয়ার পর আগামী আগস্ট পর্যন্ত ১৫টি উপজেলায় পাইলট কার্যক্রম শুরু করা হবে। এর অভিজ্ঞতার আলোকে আগামী চার বছরে সারাদেশে এই কার্ড বিতরণ ও তথ্য ভা-ার তৈরির কাজ পর্যায়ক্রমে সম্পন্ন করার পরিকল্পনা হাতে নেওয়া হয়েছে।
প্রাক পাইলট পর্যায়ে ওই ১১টি ব্লকের কৃষক, মৎস্যচাষি, প্রাণিসম্পদ খামারি ও লবণচাষিকে ‘কৃষক কার্ড’ দেওয়া হবে। এটি একটি ব্যাংকিং ডেবিট কার্ড। সোনালী ব্যাংকের স্থানীয় পর্যায়ের শাখায় সংশ্লিষ্ট কৃষকদের নামে এই কার্ডের বিপরীতে ব্যাংক হিসাব খোলা হয়েছে। ১১ এপ্রিল পর্যন্ত ২২ হাজার ৬৫ জন কৃষকের তথ্য সংগ্রহ করা হয়েছে। এর মধ্যে ভূমিহীন কৃষক ২ হাজার ২৪৬ জন; প্রান্তিক কৃষক ৯ হাজার ৪৫৮ জন; ক্ষুদ্র কৃষক ৮ হাজার ৯৬৭ জন; মাঝারি কৃষক ১ হাজার ৩০৩ এবং বড় কৃষক ৯১ জন।
এর মধ্যে ভূমিহীন, প্রান্তিক ও ক্ষুদ্র কৃষকদের কার্ডের মাধ্যমে বছরে আড়াই হাজার টাকা করে নগদ দেওয়া হবে। ২২ হাজার ৬৫ জনের মধ্যে এই সংখ্যা ২০ হাজার ৬৭১ জন।
কার্ড পাওয়া কৃষকেরা ১০ ধরনের সুবিধা পাবেন। সেগুলো হল- ন্যায্যমূল্যে কৃষি উপকরণ; ন্যায্যমূল্যে সেচ সুবিধা; সহজ শর্তে কৃষিঋণ; স্বল্পমূল্যে কৃষি যন্ত্রপাতি প্রাপ্তি; সরকারি ভর্তুকি ও প্রণোদনা; মোবাইল ফোনে আবহাওয়ার পূর্বাভাস ও বাজার তথ্য; কৃষি বিষয়ক প্রশিক্ষণ; ফসলের রোগ-বালাই দমনের পরামর্শ; কৃষি বিমা সুবিধা এবং ন্যায্যমূল্যে কৃষিপণ্য বিক্রয়ের সুবিধা।
কৃষিমন্ত্রী আরও জানান, কার্ডের মাধ্যমে কৃষকেরা সংশ্লিষ্ট ডিলারের কাছে সরবরাহ করা পয়েন্ট অব সেল (পিওএস) মেশিন ব্যবহার করে সার, বীজ,মৎস্য বা প্রাণীখাদ্যসহ বিভিন্ন কৃষি উপকরণ কিনতে পারবেন।
এর আগে দায়িত্ব নেওয়ার মাত্র ২১ দিনের মাথায় গত ১০ মার্চ নারীপ্রধান পরিবারের নামে পরীক্ষামূলকভাবে ‘ফ্যামিলি কার্ড’ চালু করে সরকার। এ কর্মসূচির আওতায় প্রতিটি পরিবার মাসিক আড়াই হাজার টাকা করে পাচ্ছেন।
পরীক্ষামূলকভাবে প্রথম পর্যায়ে ৩৭ হাজার ৫৬৭ জন উপকারভোগীকে এই ভাতা দেওয়া হচ্ছে। পরবর্তী সময়ে পর্যায়ক্রমে দেশের ৪ কোটি পরিবারকে এ কর্মসূচির আওতায় আনার পরিকল্পনা রয়েছে সরকারের।
এছাড়াও ক্রীড়াকে পেশা ও জীবিকার মাধ্যম হিসেবে গড়ে তুলতে সরকার প্রথম পর্যায়ে ১২৯ জন ক্রীড়াবিদকে ক্রীড়া কার্ড দিয়েছে। বেতনের পাশাপাশি সরকারের পক্ষ থেকে তাদের সম্মাননাও প্রদান করা হয়েছে। একই সঙ্গে ক্রীড়াবিদদের বেতন কাঠামোর আওতায় আনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
গত ৩০ মার্চ ক্রীড়াকার্ড ও ভাতা প্রদান কার্যক্রমের উদ্বোধন করেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। এসময় ১২৯ ক্রীড়াবিদের হাতে ক্রীড়া কার্ড তুলে দেন তিনি।
এর আগে প্রধানমন্ত্রী ইমাম, মুয়াজ্জিন ও বিভিন্ন ধর্মের ধর্মীয় নেতাদের জন্য সরকারি সম্মানী চালু করেন। গত ১৪ মার্চ রাজধানীর ওসমানী স্মৃতি মিলনায়তনে এ কার্যক্রমের উদ্বোধন করেন তারেক রহমান।
সরকারের এই উদ্যোগের আওতায় দেশজুড়ে ৪ হাজার ৯০৮টি মসজিদের ইমাম, মুয়াজ্জিন ও খাদেমদের পাশাপাশি ৯৯০টি মন্দিরের পুরোহিত ও সেবাইত, ১৪৪টি বৌদ্ধবিহারের অধ্যক্ষ ও উপাধ্যক্ষ এবং ৩৯৬টি গির্জার যাজকসহ উপাসনালয়ের সংশ্লিষ্ট দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তিরা সম্মানী পাচ্ছেন।
এই কর্মসূচির মধ্য দিয়ে মসজিদের ইমাম-মুয়াজ্জিন এবং মন্দির, বৌদ্ধবিহার ও গির্জার যাজকরা প্রথমবারের মতো সরাসরি রাষ্ট্রীয় ভাতার আওতায় এসেছেন।