ক্রিকেট ইতিহাসের অন্যতম স্মরণীয় টেস্ট জয় করলো বাংলাদেশ

অস্ট্রেলিয়া বাংলাদেশ টেস্ট সিরিজ শুরুর প্রাক্কালে এমনকি প্রথম দিনে টস জয়ী অস্ট্রেলিয়ার ব্যাটিং সূচনায় ম্যাচের ফলাফলের পূর্বাভাসে অস্ট্রেলিয়ার জয় ধরা হয়েছিল ৯৫% , বাংলাদেশ ৩% এবং ড্র ২০%। সেই বাংলাদেশ নিজেদের সামর্থের সব কিছু নিংড়ে দিয়ে অস্ট্রেলিয়াকে ৯ উইকেটে পরাজিত করে বিশ্ব ক্রিকেটে আলোড়ন সৃষ্টি করেছে। বাংলাদেশ পেস ত্রয়ী হাসান মাহমুদ (৬/৫৮) , এবাদত হোসেন (২/৩৯) এবং তাসকিন আহমেদের ( ২/৫৮) আগুনে বোলিং তুখোড় অস্ট্রেলিয়া ব্যাটিং বিপর্যস্ত করে ১৯৮ রানে ইনিংস গুটিয়ে দেয়।

একই উইকেটে বর্তমান বিশ্ব ক্রিকেটের তর্ক সাপেক্ষ সবচেয়ে সফল বোলিং ইউনিটকে ঘাম ঝরিয়ে ১৩৮ ওভার মাঠে রেখে ৪২৬ রানের বিশাল স্কোর করে ২২৮ রানের বিশাল লিড অর্জন করে। হতবাক অস্ট্রেলিয়া অধিনায়ক ৮ জন বোলার ব্যবহার করেও বাংলাদেশের নিবেদিত পারফরম্যান্সকে ম্লান করতে পারে।

বিস্মিত হতাশ অস্ট্রেলিয়া দ্বিতীয় ইনিংসেও মরণপণ চেষ্টা করেও মেহেদী মিরাজের ঘূর্ণি (৫/৬৬) আর হাসান মাহমুদের নিখুঁত পেসের সামনে দাঁড়াতে না পেরে ইনিংস পরাজয় এড়িয়ে সংগ্রহ করে ২৮৪। বিজয় নেশায় মত্ত বাংলাদেশ ৫৭/১ করে অস্ট্রেলিয়াকে ধরাশায়ী করে। বাংলাদেশের সামনে সুযোগ নিজেদের মাঠে প্রতাপশালী অস্ট্রেলিয়াকে সিরিজে চুনকালি মেখে দেওয়ার।

বিশ্ব টেস্ট ক্রিকেট পরিবারের প্রান্তিক দল বিবেচনায় বাংলাদেশকে কম গুরুত্ব দিয়ে টেস্ট ক্রিকেটের কুলিন দলগুলো অস্ট্রেলিয়া, ইংল্যান্ড দ্বিপাক্ষিক সিরিজে বাংলাদেশকে আমন্ত্রণ জানায় না। অস্ট্রেলিয়া আমন্ত্রণ জানালেও মেলবোর্ন, সিডনি, ব্রিসবেন, এডিলেড, পার্থ বা হোবার্ট ভেনুতে খেলা বাহুল্য মনে করে।

এমনি অবহেলা করা দলটি এভাবে ঘুরে দাঁড়িয়ে পূর্ণশক্তির অস্ট্রেলিয়া দলকে শক থেরাপি দিবে হয়ত স্বপ্নেও ভাবেনি অস্ট্রেলিয়ান ক্রিকেট পরিবার যার অন্যতম সদস্য লেখক নিজেও। আমার মায়ের দেশ এবং বাংলাদেশ ক্রিকেট দলের আজীবন শুভাকাঙ্ক্ষী বাংলাদেশ দলের ঐতিহাসিক জয়ে আমি উৎফুল্ল, বিমোহিত।

২৬ বছর টেস্ট ক্রিকেট খেলেছে। মাত্র দ্বিতীয় অস্ট্রেলিয়া সফরে বর্তমান আইসিসি টেস্ট রাংকিংয়ের শীর্ষে থাকা পূর্ণ শক্তির অস্ট্রেলিয়া দলকে  সিরিজের প্রথম টেস্টে দাপটের সঙ্গে ৯ উইকেটের বিশাল ব্যাবধানে হারিয়ে বিশ্ব ক্রিকেট পরিমণ্ডলে আলোড়ন সৃষ্টি করেছে বাংলাদেশ।

জীবনে প্রথম বার অস্ট্রেলিয়ায় টেস্ট ক্রিকেট খেলতে আসা বাংলাদেশ দল ডারউইন টেস্টের সূচনা থেকে শেষ নাগাদ দাপুটে ক্রিকেট দল হিসাবেই যোগ্যতর দল হিসাবেই টেস্ট জিতেছে। তবে সাম্প্রতিক অতীত, দুই দলের পারস্পরিক ভারসাম্য তুলনামূলক বিবেচনায় বাংলাদেশের জয় অবশ্যই টেস্ট ক্রিকেট ইতিহাসের অন্যতম আপসেট হিসাবে, বাংলাদেশ ক্রিকেট ইতিহাসের অন্যতম মাইলফলক হয়ে থাকবে।

বাংলাদেশ এই গৌরবজ্জল জয়ে গোটা দলের প্রায় সবার অবদান থাকলেও বিশেষভাবে উল্লেখ করতে হবে উভয় ইনিংসে হাসান মাহমুদের দুর্দান্ত বোলিং, তানজিদ তামিমের শত রান, শান্ত, মোমিনুল, মুশফিকের লড়াকু ব্যাটিং, মেহেদী মিরাজের চৌকষ নৈপুণ্য। এই জয় অনেক প্রশ্নের জবাব দিয়েছে, অনেক সমীকরণের সমাধান দিয়েছে। টেস্ট ক্রিকেটের রমণীয় রূপ সুষমা উপহার দিয়েছে। বাংলাদেশ ক্রিকেটের আদি থেকে অদ্যাবধি শুভাক‍াঙ্ক্ষী হিসেবে আনন্দের সীমা আকাশ ছুঁয়েছে।

আমি আশা করি বাংলাদেশ দল আনন্দ নিয়ন্ত্রণ করে দ্বিতীয় টেস্টেও নিজেদের আত্মবিশ্বাস ধরে রাখবে। অহমে আঘাত রাখা অস্ট্রেলিয়া কিন্তু ঘুরে দাঁড়িয়ে মরণ কামড় দিতে চেষ্টা করবে। আমি বাংলাদেশের ইলেকট্রনিক মিডিয়াগুলো ঐতিহাসিক মুহূর্তগুলো জাতির সামনে তুলে না ধরার জন্য বিস্ময় প্রকাশ করছি।

সংক্ষিপ্ত স্কোরকার্ড :

অস্ট্রেলিয়া ১৯৮ অল আউট (স্টিভ স্মিথ ৭১, জেক ওয়েদারাল্ড ২৩, ট্রাভিস হেড ২২। হাসান মাহমুদ ৬/৫৫, ইবাদাত হোসেন ২/৩৯, তাসকিন আহমেদ ২/৫৫)

অস্ট্রেলিয়া দ্বিতীয় ইনিংস ২৮৪ অল আউট  (স্টিভ স্মিথ ৪৪, ক্যামেরুন গ্রিন ১০৪  আলেক্স কারি ৩০। মেহেদী হাসান মিরাজ ৫/৬৬ , হাসান মাহমুদ ৩/৫৬)

বাংলাদেশ ৪২৬ অল আউট  (তানজিদ তামিম ১০১, নাজমুল হোসেন শান্ত ৮৪, মোমিনুল হক ৪৯, মুশফিকুর রহিম ৩৬, মেহেদী হাসান মিরাজ ৬৫। মিচেল স্টার্ক ২/৭৯, জশ হেজেলউড ৬/৮৯)

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

2 × 5 =