গর্ভবতী মায়ের যত্ন

আশরোফা ইমদাদ: সন্তান ধারণ থেকে শুরু করে সন্তান পৃথিবীর আলো দেখা পর্যন্ত একজন মাকে বিভিন্ন শারীরিক ও মানসিক পরিবর্তনের মধ্যে দিয়ে যেতে হয়। এ সময় মায়ের বিশেষ যত্নের কোনো বিকল্প নেই। মর্জিনা, ৪ মাসের অন্তঃসত্ত্বা সে। কিশোরগঞ্জের ঝিনাইগাতি গ্রামে বসবাস তার। গত বছর ৫ মাসের সময় প্রচন্ড রক্তক্ষরণে তার পেটের সন্তানটি নষ্ট হয়ে যায়। এবারও যত দিন যাচ্ছে, ততই এক অজানা ভয় তাকে গ্রাস করছে। না জানি এবার কি হয়! কারন তার স্বামী বা শ্বশুরবাড়ির লোক ডাক্তারের কাছে যাওয়া পাপ মনে করে। খাওয়ার কষ্টতো আছেই। সবাই বলে, মা যত কম খাবে, বাচ্চা ভূমিষ্ট হতে ততো কম কষ্ট হবে। তাই এ সময় মর্জিনাকে কম খেতে দেয় সবাই। পেটে ক্ষুধা থাকলেও কিছু বলতে পারে না মর্জিনা। অনেক কষ্টে নয়মাস অতিবাহিত হলেও মর্জিনা সুখের মুখ দেখলো না। ব্যাথা ওঠার দুইদিন পরও ডাক্তারের কাছে না নিয়ে বাসায় অপ্রশিক্ষিত দাই এনে সন্তান প্রসবের চেষ্টা করার ফলে এক মৃত ছেলের জন্ম হলো। মৃত সন্তান জন্মের দায় বর্তালো মর্জিনার উপর। অথচ, এ দায় সম্পুর্ণই মর্জিনার পরিবারের। তারা গর্ভবতী মায়ের সঠিক যত্ন নেয় নাই।

গর্ভকালীন যত্নের প্রধান উদ্দেশ্য হলো গর্ভবতী মাকে মানসিক ও শারীরিকভাবে সুস্থ রাখা, যেন তার স্বাভাবিক প্রসব হয় এবং সুস্থ ও স্বাভাবিক বাচ্চা জন্ম দিতে পারেন। সন্তানকে বুকের দুধ দিতে পারেন এবং সন্তোষজনকভাবে নিজের এবং সন্তানের যত্ন নিতে পারেন। এক কথায়, মায়ের স্বাস্থের কোনো অবনতি না করে সমাজকে একটি সুস্থ শিশু উপহার দেয়াই গর্ভকালীন যত্নের মূল লক্ষ্য। একজন গর্ভবতী মায়ের গর্ভকালীন সময়ে নিয়মিত স্বাস্থ্যসেবা, নিরাপদ প্রসব এবং প্রসব পরবর্তী স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা গর্ভবতীর স্বামীসহ পরিবারের সকলের দায়িত্ব।  অনুযায়ী, একজন ী, একজন তখনই মাধ্যমে গর্ভকানি এবার কি হয়। গর্ভকালীন সময়ে অর্থাৎ ঋতুশ্রাববন্ধ হওয়া থেকে শুরু করে নয় মাস সাত দিন পর্যন্ত এর মাঝখানে গর্ভবতী মা ও তার পেটের সন্তানের যত্ন নেয়াকে গর্ভকালীন যত্ন বলা হয়। নিয়মিত পরীক্ষা, ডাক্তারের উপদেশ, ঠিকমত খাওয়া দাওয়া করা, সঠিক খাদ্যাভ্যাস,  নিজেকে পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন রাখা ইত্যাদির মাধ্যমে গর্ভকালীন যত্ন নেয়া হয়। গর্ভবতী মায়েদের অবশ্যই পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন, আরামদায়ক, সহজে পরিধানযোগ্য ও ঢিলেঢালা পোশাক পরা উচিৎ। সঠিক মাপের এবং নরম জুতা পরা উচিত। হিলজুতা পরিহার করতে হবে এ সময়। এছাড়াও, গর্ভধারনের প্রথম ও শেষ দিকে ভ্রমণের ব্যাপারে সাবধান হওয়া দরকার। ঝুঁকিপূর্ণ ভ্রমণ থেকে বিরত থাকা উচিত এসময়।

হবু মায়ের খাবার সম্বন্ধে কিছু ভ্রান্ত ধারণা সমাজে প্রচলিত রয়েছে এখনো। অজ্ঞাতাবশত অনেকসময় বাড়ির বয়োজ্যেষ্ঠরা হবু মাকে বাড়তি খাবার দিতে নিষেধ করেন। তাদের ধারণা, বাড়তি খাবার দিলে গর্ভের সন্তান বড় হয়ে যাবে; ফলে নরমাল ডেলিভারি সম্ভব হবে না, সিজার করতে হবে। ফলে মা অপুষ্টিতে ভোগেন। এতে করে ফলশ্রুতিতে শিশু কম ওজোন নিয়ে অপরিণত অবস্থায় ভূমিষ্ট হয়। এছাড়াও প্রায়ই বাড়ির মুরব্বিদের বলতে শোনা যায় যে, মৃগেল মাছ খেলে সন্তানের মৃগী রোগ হয়, বোয়াল মাছ খেলে সন্তানের চোয়াল বড় হয়, শিং বা শোল মাছ খেলে সন্তানের দেহ সর্পাকৃতির হয়, শসা জাতীয় সবজি খেলে সন্তানের দেহের চামড়া ফাটা হবে। কিন্তু এসবই অজ্ঞতা এবং কুসংস্কার।

সুস্থ স্বাভাবিক সন্তান জন্মদানের প্রধান শর্ত হলো গর্ভবতী মায়ের যথাযথ পরিচর্যা। গর্ভকালীন প্রথম তিন মাস অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। এ সময় প্রসূতি নারীর খাবারে অরুচি, বমি বমি ভাব, অনেকক্ষেত্রে ওজোন কমে যাওয়া, এমনকি রক্তশূন্যতাও দেখা যায়। তাই হবু মায়ের সুস্বাস্থ্য ও সুষম খাদ্য নিশ্চিত করতে হবে আর তা করতে হবে পরিবারের মানুষকেই। এ সময় গর্ভবতী মা’র ভারি কোনো কাজ করা উচিত না। গর্ভবতী মাকে এ সময় পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন ও হাসিখুশি থাকা প্রয়োজন এবং দিনে ১ থেকে ২ ঘন্টা বিশ্রাম ও রাতে অন্তত ৮ ঘন্টা ঘুমানো প্রয়োজন। বেশি করে পুষ্টিকর খাবার ও প্রচুর পরিমান পানি পান করা উচিত। বিশেষ করে ৫ মাস থেকে মায়ের খাবার সুষম হওয়া জরুরি। কারণ এ সময় ভ্রুণের বৃদ্ধি ঘটে। আমিষ, ক্যালসিয়াম, ভিটামিন, খনিজ পদার্থ ও পর্যাপ্ত পানি প্রয়োজন হয় মার। সে সাথে পর্যাপ্ত ঘুম বা বিশ্রাম নিশ্চিত করা আবশ্যিক। হবু মায়ের খাদ্য তালিকায় নিয়মিতভাবে ডিম, দুধ, সবজি, মৌসুমী ফল, মাছ, মাংস, সামুদ্রিক মাছ, সালাদ, লেবু, ডাল, বাদাম থাকা উচিত। কাঁচা ডিম, অর্ধসিদ্ধ মাংস, অপাস্তুরিত দুধ, কলিজা ও কলিজার তৈরি খাবার, অতিরিক্ত ক্যাফেইন, কাঁচা বা আধা পাকা পেঁপে ইত্যাদি গ্রহণ করা থেকে বিরত থাকা উচিত। শরীরে ঝাঁকি লাগে, এমন কোনো কাজ করা উচিত না, তামাক, গুল, ধূমপানসহ অন্যান্য নেশা জাতীয় দ্রব্য গ্রহণ করা যাবে না। গর্ভবতী মায়েদের মনে রাখা প্রয়োজন, গর্ভের সন্তান পুষ্টি পায় তার মায়ের কাছ থেকে। অনাগত সন্তান আর মায়ের ভবিষ্যৎ সুস্থতাও অনেকক্ষেত্রে মা’র গর্ভকালীন খাবারের উপর নির্ভর করে। প্রকৃতপক্ষে সুস্থ মা-ই পারে সুস্থ শিশুর জন্ম নিশ্চিত করতে।

হবু মায়ের উচিত নিয়মিত চিকিৎসকের কাছে যাওয়া। কারো কোনো জটিলতা থাকলে যখনই সমস্যা দেখা দিবে, তখনই চিকিৎসকের কাছে যাওয়া প্রয়োজন। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সুপারিশ অনুযায়ী, একজন অন্তঃসত্ত্বা নারীকে অবশ্যই কমপক্ষে চারবার চিকিৎসকের শরনাপন্ন হতে হবে। হবু মার প্রথম ভিজিট ১৬ সপ্তাহে, দ্বিতীয় ভিজিট ২৪-২৮ সপ্তাহে, তৃতীয় ভিজিট ৩২ সপ্তাহে এবং চতুর্থ ভিজিট ৩৬ সপ্তাহে করতে চিকিৎসকের শরণাপন্ন হওয়া উচিত। মায়ের কোনো অসুখ থাকলে এসময় তা নির্ণয় ও প্রয়োজনীয় চিকিৎসা নেয়া জরুরি। গর্ভাবস্থার ০৫-০৮ মাসের মধ্যে ২টি টিটেনাসের টিকা নিতে হয়। নিয়মিত ওজন নেয়া প্রয়োজন। গর্ভবতী মাকে স্বাস্থ্য শিক্ষা দেয়া, শরীরে রক্ত কম আছে কিনা তা পরীক্ষা করা, ব্লাড প্রেসার পরিমাপ করা, পা অথবা মুখ ফোলা অর্থাৎ পানি আছে কিনা, তা দেখা, পেট পরীক্ষা করা, শারীরিক অসুবিধা আছে কিনা, তা পরীক্ষা করা উচিত।

গর্ভাবস্থায় বেশিরভাগ ক্ষেত্রে গর্ভস্থ শিশুর শরীরে লৌহের চাহিদা মেটানোর পর মায়েদের রক্তে হিমোগ্লোবিনের ঘাটতি দেখা যায়। ফলে দেখা যায় রক্তস্বল্পতা। এসময় গর্ভবতী মায়েদের লৌহসমৃদ্ধ খাবারের পাশাপাশি ক্যালরিসমৃদ্ধ খাবারও বেশি দেয়া আবশ্যক।

অন্তঃসত্ত্বা মায়ের শুধু শারীরিক যত্নই নয়, প্রয়োজন মানসিক সুস্থতাও। এ অবস্থায় প্রতিটি নারীর শারীরিক পরিবর্তনের পাশাপাশি মানসিক পরিবর্তন দেখা যায়। তাই এ সময় নারীর যথার্থ যত্নের প্রতি মনোযোগী হওয়া প্রয়োজন। অন্তঃসত্ত্বা নারীদের শারীরিক ও মানসিক অবস্থা খুব নাজুক থাকায় এ সময় তাকে মানসিকভাবে আঘাত করা বা সে কষ্ট পেতে পারে, এমন আচরণ করা ঠিক নয়। কারন, গর্ভবতী মায়ের মানসিক অবস্থা তার গর্ভস্থ শিশুর ওপর দারুনভাবে প্রভাব ফেলে বলে গবেষনায় জানা গেছে। এ সময় নারীদের শরীর দুর্বল থাকার কারনে তাদের মনও দুর্বল হয়ে যায়। শরীরে হরমোনের পরিবর্তনের কারনে অনেকের মেজাজ খিটখিটে থাকতে পারে। অনেকের মধ্যে সন্দেহ প্রবণতা বেড়ে যায়। এ ধরণের পরিস্থিতি মোকাবেলা করতে স্বামী স্ত্রী দুজনের মধ্যে বিশ্বাস ধরে রাখতে হবে, স্ত্রীকে বোঝার ও বোঝানর চেষ্টা করতে হবে।

মা ও শিশুর শারীরিক ও মানষিক সুস্থতার কথা বিবেচনা করে নারীর প্রতি পরিবারের সকলের ইতিবাচক হওয়া দরকার। কোনো অবস্থাতেই গর্ভাবস্থায় মা’র প্রতি রূঢ় হওয়া যাবে না। তার সঙ্গে হেসে কথা বলতে হবে এবং ভালো ব্যাবহার করতে হবে। গর্ভবতী মা শ্বশুরবাড়িতে অনেক সময় একাকীত্বে ভোগেন, অসহায় অনুভব করতে পারেন। এ সময় সম্ভব হলে তার কাছের কাউকে পাশে রাখলে মন ফুরফুরে থাকে। অনেক ক্ষেত্রেই নারীর বাড়ির লোক বা আত্মীয় স্বজনকে রাখা সম্ভব হয়না। এক্ষেত্রে শ্বশুর বাড়ির মানুষজনকে তার সাথে বন্ধুর মতো আচরণ করতে হবে। এসময় মন ভালো রাখার জন্য পরিবারের সকলের সাথে আন্তরিক সম্পর্ক রাখা, প্রফুল্লচিত্তে থাকার চেষ্টা করা, ভালো ভালো বই পড়া, ছবি দেখা, সব সময় ইতিবাচক চিন্তা করা প্রয়োজন।

গর্ভাবস্থায় কিছু জটিলতা যেমন- অস্বাভাবিক পেট বড় হওয়া বা ছোট হওয়া, হঠাৎ রক্ত ভাঙা, খুব বেশি জ্বর আসা,  অতিরিক্ত রক্তচাপ ইত্যাদি এমন কিছু হলে যত দ্রুত সম্ভব মা’কে চিকিৎসকের কাছে নিতে হবে, অথবা চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে।

একটি সুস্থ মা-ই পারে একটি সুস্থ সন্তানের জন্ম দিতে। আর একটি সুস্থ সমৃদ্ধ জাতি গঠনে সুস্থ শিশু জন্মের বিকল্প নাই। সুস্থ ও স্বাভাবিক শিশুর জন্ম নিশ্চিত করতে মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয় বিভিন্ন কাজ করে যাচ্ছে। বর্তমানে মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে বাংলাদেশ সরকার প্রায় ৮ লক্ষ দরিদ্র গর্ভবতী নারীকে মাতৃত্বকালীন ভাতা প্রদান করা হচ্ছে। সাধারনত ২০-৩৫ বছরের প্রথম অথবা দ্বিতীয় গর্ভধারণকারীরা এই ভাতার প্রাপ্যতা অর্জন করে থাকে। এই মাতৃত্বকালীন ভাতাপ্রতি মাসে সরকার কর্তৃক নির্ধারিত ৫০০ টাকাহারে প্রতি ৬ (ছয়) মাস অন্তর ৪ (চার) বার ২৪ মাস অর্থাৎ ২ (দুই) বছর ব্যাপী এ ভাতা প্রদান করা হয়।

একজন নারী নিরাপদে মা হবেন, সুস্থ ও স্বাভাবিক শিশুর জন্ম দিবেন-এ দায়িত্ব পরিবার ও সমাজের সবার। নিরাপদ মাতৃত্ব প্রতিটি গর্ভবতী নারীরই প্রাপ্য। প্রতি বছর ২৮ মে বিশ্বজুড়ে নিরাপদ মাতৃত্ব দিবস হিসেবে পালিত হয়। কিন্তু শুধুই মাতৃত্ব দিবসেই নয়, পৃথিবীর সকল মায়ের জন্য আমাদের সকলের ভালোবাসা থাকুক আজীবন।

 লেখক: তথ্য অফিসার, পিআইডি

 

 

 

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

five + nine =