গাদ্দাফিতে শাদাবের মহাকাব্য, অবিশ্বাস্য জয়ে ফাইনালে পাকিস্তান

সালেক সুফী

লাহোরের গাদ্দাফি স্টেডিয়াম গতকাল একদিনের আন্তর্জাতিক (ওডিআই) ক্রিকেটের এমন এক অবিশ্বাস্য লড়াই দেখল, যা দীর্ঘদিন ক্রিকেটপ্রেমীদের স্মৃতিতে অমলিন হয়ে থাকবে। শেষ উইকেটে শাদাব খান ও হারিস রউফের অবিচ্ছিন্ন ৮৯ রানের বিশ্ব রেকর্ড গড়া জুটিতে নিশ্চিত পরাজয়ের মুখ থেকে এক উইকেটে জয় তুলে নিয়েছে পাকিস্তান। একই সঙ্গে তিন ম্যাচে টানা তিন জয়ে ত্রিদেশীয় ওডিআই টুর্নামেন্টের ফাইনাল নিশ্চিত করেছে স্বাগতিকরা। বিপরীতে টানা তিন ম্যাচ হেরে টুর্নামেন্ট থেকে ছিটকে পড়ার শঙ্কায় ইংল্যান্ড।

২৪২ রানের লক্ষ্য তাড়া করতে নেমে পাকিস্তান যখন ১৩১ রানে ৮ উইকেট এবং ১৫৪ রানে ৯ উইকেট হারিয়ে বসে, তখন ইংল্যান্ডের জয় ছিল সময়ের ব্যাপার। শেষ ব্যাটসম্যান হারিস রউফকে নিয়ে শাদাবের সামনে তখন পাহাড়সম লক্ষ্য। জয়ের জন্য প্রয়োজন আরও ৮৮ রান, আর ইংল্যান্ডের দরকার মাত্র একটি উইকেট। এমন পরিস্থিতিতে শাদাব যেভাবে চাপ সামলে দলকে জয়ের বন্দরে পৌঁছে দিয়েছেন, তা নিঃসন্দেহে ওডিআই ক্রিকেটের অন্যতম স্মরণীয় ইনিংস হিসেবে বিবেচিত হবে।

শাদাব খেলেছেন ক্যারিয়ারের প্রথম শতরানের ইনিংস। ৯৬ বলে ১৩টি চার ও পাঁচটি ছক্কায় ১১৩ রানে অপরাজিত থেকে ম্যাচসেরার পুরস্কারও জিতেছেন তিনি। অন্য প্রান্তে হারিস রউফের দায়িত্বশীল সঙ্গ তাঁর লড়াইকে পূর্ণতা দিয়েছে। শেষ উইকেটে ৮৯ রানের এই জুটি ওডিআই ক্রিকেটে নতুন বিশ্ব রেকর্ড গড়েছে। অবিশ্বাস্য প্রত্যাবর্তনের সাক্ষী হতে পারেননি অনেক দর্শকও। পাকিস্তানের পরাজয় নিশ্চিত ভেবে তাঁদের অনেকে খেলা শেষ হওয়ার আগেই গ্যালারি ছেড়ে চলে গিয়েছিলেন।

ডাকেটের শতকেও রক্ষা হয়নি ইংল্যান্ডের

এর আগে টসের পর প্রথমে ব্যাট করতে নেমে পাকিস্তানের নতুন বোলিং কোচ শন টেটের প্রভাবে ধারালো হয়ে ওঠা পেস আক্রমণের সামনে বিপর্যয়ে পড়ে ইংল্যান্ড। ১৯ রানে তিন উইকেট এবং ৫১ রানে চার উইকেট হারিয়ে বড় বিপদের মুখে পড়ে দলটি। সেখান থেকে বেন ডাকেট ও স্যাম কারেন পঞ্চম উইকেটে ৯৩ রানের জুটি গড়ে ইনিংস সামাল দেন।

ডাকেট ১০৫ রানের লড়াকু ইনিংস খেললেও অন্য ব্যাটারদের ব্যর্থতায় ৪৬.৪ ওভারে ২৪১ রানে গুটিয়ে যায় ইংল্যান্ড। কারেন করেন ৪২ রান। শেষ দিকে গাস অ্যাটকিনসনের অপরাজিত ৩৬ রান দলকে কিছুটা সম্মানজনক সংগ্রহ এনে দেয়। তা না হলে ইংল্যান্ডের ইনিংস আরও আগেই শেষ হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা ছিল।

পাকিস্তানের হয়ে দুর্দান্ত বোলিং করেন শাহিন শাহ আফ্রিদি। তিনি ৪৮ রান দিয়ে চার উইকেট নেন। অভিষিক্ত পেসার রাজাউল্লাহ দুটি এবং স্পিনার আরাফাত মিনহাজ দুটি উইকেট তুলে নেন। নতুন বল হাতে পাকিস্তানের পেসারদের আগ্রাসন ইংল্যান্ডের টপ অর্ডারকে কার্যত ধসিয়ে দিয়েছিল।

ইংল্যান্ডের দুর্ভাগ্য, পাকিস্তানের রূপকথা

সহজ লক্ষ্য দেখে পাকিস্তানের জয় নিয়ে অনেকেই আশাবাদী ছিলেন। কিন্তু ইংল্যান্ডের নিয়ন্ত্রিত বোলিং ও দুর্দান্ত ফিল্ডিংয়ে নিয়মিত বিরতিতে উইকেট হারিয়ে ম্যাচ কঠিন করে তোলে স্বাগতিকরা। একপর্যায়ে শাদাব ছাড়া আর কেউই দলকে জয়ের পথে রাখার মতো অবস্থায় ছিলেন না। শেষ পর্যন্ত সেই শাদাবই হয়ে উঠলেন পাকিস্তানের ত্রাতা।

এই টুর্নামেন্টে ইংল্যান্ডের দুর্ভাগ্যও কম নয়। পাকিস্তানের কাছে দুটি ম্যাচে পরাজয়ের পাশাপাশি শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে জিততে থাকা ম্যাচও হাতছাড়া করেছে তারা। টুর্নামেন্টে টিকে থাকতে হলে শেষ ম্যাচে শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে বড় ব্যবধানে জয় প্রয়োজন ইংল্যান্ডের। পাশাপাশি পাকিস্তানের কাছে শ্রীলঙ্কার পরাজয়ের দিকেও তাকিয়ে থাকতে হবে তাদের।

অন্যদিকে ফাইনাল নিশ্চিত করলেও পাকিস্তানের টপ অর্ডারের ভঙ্গুরতা উদ্বেগের কারণ হয়ে রয়েছে। প্রতিপক্ষের বোলিং চাপে বারবার ব্যাটিং বিপর্যয়ে পড়া দলটির জন্য ফাইনালের আগে এ দুর্বলতা কাটিয়ে ওঠা জরুরি।

তবে লাহোরের এই ম্যাচ আবারও প্রমাণ করল, ক্রিকেটে শেষ বলের আগে কোনো কিছুই নিশ্চিত নয়। টি-টোয়েন্টি ক্রিকেটের দাপটে ওডিআই ফরম্যাটের আকর্ষণ নিয়ে যখন প্রশ্ন উঠছে, তখন এমন রোমাঞ্চকর ম্যাচ একদিনের ক্রিকেটে নতুন প্রাণ সঞ্চার করতে পারে। এই টুর্নামেন্টের লড়াইও বলে দিচ্ছে, শেষ পর্যন্ত শিরোপা কার হাতে উঠবে, তা এখনই নিশ্চিত করে বলা কঠিন।

সংক্ষিপ্ত স্কোর

ইংল্যান্ড: ২৪১ অলআউট, ৪৬.৪ ওভার। বেন ডাকেট ১০৫, স্যাম কারেন ৪২, গাস অ্যাটকিনসন ৩৬*। শাহিন শাহ আফ্রিদি ৪/৪৮, রাজাউল্লাহ ২/৩৮, আরাফাত মিনহাজ ২/২৬।

পাকিস্তান: ২৪৩/৯। শাদাব খান ১১৩*, সাদ বেগ ৩২, সালমান আগা ২৬। জেমি ওভারটন ৩/৪৩, লিয়াম ডসন ২/৩০, গাস অ্যাটকিনসন ২/৬২।

ফল: পাকিস্তান ১ উইকেটে জয়ী।

ম্যাচসেরা: শাদাব খান।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

eleven − six =