জাফলং যাবেন যেভাবে

নিবিড় চৌধুরী

কোথাও বেড়াতে যাওয়ার আগে একটি গল্প আমি বারবার পড়ি। এখন তো প্রায় সবাই ভ্রমণ কাহিনী লিখছে বা ভিডিও করছে। কোথাও গেলে ভøগ বানাচ্ছে। সোশ্যাল মিডিয়ায় দিচ্ছে। আজ থেকে প্রায় তিনশ বছর আগে যখন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ঠাকুরদা প্রিন্স দ্বারকানাথ ঠাকুর প্রথম বাঙালি হিসেবে উচ্চশিক্ষার জন্য বিলেতে গেলেন, কেমন ছিল সে ভ্রমণ? মাসের পর মাস সমুদ্র পাড়ি দিয়ে আরেকটি দেশে যাওয়া চাট্টিখানি কথা ছিল না। এখন তো যোগাযোগ কত সহজ। কয়েক ঘণ্টায় পাড়ি দেওয়া যায় এক মহাদেশ থেকে আরেক মহাদেশ। তবে বাঙালির অভ্যেস হলো, কোথাও গিয়ে দুই দিনের জন্য সবটা দেখে ফেলার তাড়না ও অস্থিরতা। তাতে বোধহয় চোখকে আরাম দেওয়া যায়, মনকে নয়। কখনো কখনো দুই ইন্দ্রিয়ের কাউকেই সন্তুষ্ট করা যায় না। সে যা হোক, যা বলছিলাম শুরুতে, এক গল্পের কথা। সেই গল্পের নাম ‘তেলানোপোতা আবিষ্কার’। লেখকের নাম প্রেমেন্দ্র মিত্র। অমন গল্প বাংলাসাহিত্য তো বটে বিদেশি সাহিত্যেও হয়েছে কিনা সন্দেহ। ফিউচার টেন্সে লেখা এ এক বিরল গল্প বটে। এই ঘটনার অবতারণার কারণ, সিলেটে যেতে যেতে এই গল্পটিই ছিল আমার বিশেষ সঙ্গী। রাতে ট্রেনের বগিতে শুয়ে শুয়ে এই গল্পই আরেকবার পড়লাম। যেন আমিও তেলানোপোতা আবিষ্কার করতে যাচ্ছি। যাচ্ছি তো সিলেটে। সিলেটে নয়, নামব শ্রীমঙ্গলে। সেখান থেকে সিলেট শহর, রাতারগুল, টাঙ্গুয়ার হাওড়, মাধবকুণ্ড ঝরনা আর অতি অবশ্যই জাফলং। সেখান থেকে ফের ফিরব আগের ঠিকানায়।

জাফলং যাত্রা

আমাদের শেষ গন্তব্য। সাগরে দিনের পর দিন ভাসতে ভাসতে নাবিক যেমন কোনো বন্দর বা দ্বীপ দেখে উৎফুল্ল হয়ে নোঙর করে, আমরাও পাঁচ দিনের সফরের শেষে এসেছি জাফলংয়ে। পাথরে আচ্ছাদিত স্বচ্ছ জলরাশিতে পা ডুবিয়ে এখানেই নোঙর করেছি। এর আগে শ্রীমঙ্গলের চা বাগান, মণিপুরিদের আবাস, রাতারগুল বন, টাঙ্গুয়ার হাওড়, মাধবকুণ্ডের ঝরনা, বিছানাকান্দি দেখে এখানে এসেছি। খুব নির্দিষ্টভাবে ঘুরাঘুরি করছি না। অনেকটা এলোমেলোভাবে যাচ্ছি এদিক ওদিক। সঙ্গের গাড়ি সকালবেলা ইচ্ছেমতো যেখানে নিয়ে যাচ্ছে সেখানে যাচ্ছি। রাতে হোটেলে ফিরছি। খেয়ে, বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা দিয়ে ঘুমিয়ে পড়ছি। আর সকালে আবারও বেরিয়ে পড়ছি যেদিকে দুচোখ যায়।

আমরা সিলেট শহরের এক আবাসিক হোটেলেই উঠলাম। মোটামুটি মানের হোটেল। ভ্রমণের চতুর্থদিনে সকালে পাশের এক খাবারের হোটেলে চা-নাস্তা খেয়ে রওনা দিলাম জাফলংয়ের উদ্দেশ্যে। আমাদের মতো অনেকে বন্ধু-পরিজন নিয়ে জাফলংয়ে যেতে সিলেট সদর স্টেশন চত্বরে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করছেন অটো রিকশার জন্য। ভাড়া নিয়ে ড্রাইভারের সঙ্গে দরদাম করছেন। ভাড়ায় মিললে উঠে পড়ছেন। পর্যটকদের আনাগোনায় বেশ ব্যস্ত স্টেশন। এই দৃশ্য দেখতেই দেখতেই আমরা রওনা হলাম। আমাদের ড্রাইভারের নাম জগন্নাথ। বয়স খুব বেশি নয়। ২৫-২৬ হবে। তার বাড়ি সুনামগঞ্জে। দীর্ঘদিন ঢাকায় গাড়ি চালানোর পর সিলেটে এসে নিজের গাড়ি নিয়ে নেমে পড়েছে। এখান থেকেই তার আয়-ইনকাম, সংসার চলে। চারদিন ধরে আমরা তার গাড়িতেই আসছি-যাচ্ছি। গাড়ি ছাড়তেই পুরানো দিনের বাংলা গান বাজিয়ে দিয়ে আরামসে সিটে হেলান দিয়ে বসেন তিনি। তারপর সিলেটের আঁকাবাঁকা, উঁচু-নিচু পাহাড়ি রাস্তা পাড়ি দিতে থাকেন। আমরা জনগন্নাথকে মজা করে বলছি, ‘মুই তোরে ভালা পাই’। এই কদিনে সিলেটে এই একটি বাক্যই শিখেছি। বুঝতে পেরেছিও কেবল এইটুকু। জগন্নাথ সেই কথা শুনে হাসেন। আমাদের সঙ্গে তার সখ্যতাও হয়ে গেছে। উত্তরে তিনিও বলেন, ‘মুই তোরে ভালা পাই’। অর্থাৎ, ‘আমি তোমাকে পছন্দ করছি’।

ভ্রমণ ও গল্পের ফাঁকে এবার একটু গুরুত্বপূর্ণ কথা বলে নিই। জাফলংয়ে যারা যেতে চান, তাদের জন্য এই তথ্য; সিলেট থেকে ৬২ কিলোমিটার উত্তর-পূর্বদিকে সিলেটের গোয়াইনঘাট উপজেলায় অবস্থিত প্রকৃতির কন্যা নামে পরিচিত জাফলং। সেখানেও থাকা ও খাওয়ার মতো আবাসিক হোটেল ও রেস্টুরেন্ট পাবেন। তবে সংখ্যায় সেসব খুবই কম। বিকল্প দৃষ্টিভঙ্গিতে জাফলংয়ের সৌন্দর্য রক্ষার এটাই ইতিবাচক দিক। নয়তো চারদিকে প্লাস্টিক ও দূষিত ময়লা ফেলে মানুষ সব নোংরা করে রাখত। জাফলং তার প্রাকৃতিক শ্রী হারাত।

দেশের ভিন্ন অঞ্চল থেকে কীভাবে জাফলং যাবেন? খুবই সহজ। শুধু মনস্থির করুন আর ঘুরতে বেরিয়ে পড়ুন। ঘুরাঘুরির জন্য অদম্য বাসনা থাকাটায় গুরুত্বপূর্ণ। তবু কিছু দিকনির্দেশনা তো থাকে। সেটিই আমি বরং পাঠক ও ভ্রমণপিয়াসুদের সুবিধার্থে একটুখানি এখানে পেশ করলাম। সিলেট সদর থেকে জাফলংয়ের সড়ক পথে দূরত্ব মাত্র ৫৬ কিলোমিটার। সিলেট শহরের যেকোনো স্টেশন থেকে সিএনজি অটো রিকশা, লেগুনা, মাইক্রোবাস বা বাসে যেতে পারেন জাফলং। সময়ের হিসেবে লাগবে ঘণ্টা দেড়েক। রাস্তায় অপ্রীতিকর কোনোকিছু না ঘটলে বা সময়টা বর্ষাকাল না হলে আশা করি এই সময়ের মধ্যে পৌঁছে যাওয়ার কথা। তবে বর্ষায় ঢলে পাহাড়ি মাটি নেমে আসায় রাস্তা পিচ্ছিল ও দুরূহ করে ফেলতে পারে। যেমন আমাদের হলো। ফেরার সময় প্রচণ্ড ঝড়ের মাঝে গাড়ির হেডলাইট গেল নষ্ট হয়ে। পরে অন্য গাড়ির আলো অনুসরণ করে আসতে হলো। এমনটা ঘটলে অতি অবশ্যই রাস্তায় কারও সাহায্য চাইবেন অথবা গাড়ি চলন্ত অবস্থায় মোবাইলের আলো জ্বালিয়ে নেবেন। তাতে অন্ধকারে বিপরীত দিক থেকে আসা গাড়ি সাবধান হবে। দুর্ঘটনা এড়িয়ে চলায় উত্তম।

সিলেট থেকে  জাফলং যেতে জনপ্রতি বাসভাড়া পড়বে ৮০-১০০ টাকা। মূলত জাফলং থেকে যারা সিলেট সদরে বিভিন্ন কাজে আসেন তারা বাসে যাতায়াত করেন। তবে দল বেধে বেড়াতে গেলে মাইক্রোবাস বা সিএনজি অটো রিকশা ভালো বিকল্প। এক্ষেত্রে মাইক্রোবাসের ভাড়া পড়বে ৩০০০-৩৫০০ টাকা। সিএনজি অটো রিকশার ভাড়া পড়বে ১০০০-১২০০ টাকা। সিলেট শহরের যে কোনো অটো রিকশা বা মাইক্রোবাস স্ট্যান্ড থেকে গাড়ি রিজার্ভ করে যাওয়া যাবে জাফলংয়ে। তবে দর কষাকষি করে নিশ্চিত হয়ে যাবেন। রিজার্ভ নিয়েও যেতে পারেন। আবার ফেরার সময়ও সিএনজি অটো রিকশা পাবেন। যদি অনেকক্ষণ জাফলংয়ে থাকতে চান তবে রিজার্ভ করে না যাওয়াই ভালো। আর সন্ধ্যা নামার আগেই ফিরে আসা উত্তম। এক্ষেত্রে লম্বা জার্নিতে বিপদের আশঙ্কা থাকে কম। গাড়িও পেলেন আর সোজা রাস্তায় কোনো বিপদ ঘটল না!

জাফলংয়ের সৌন্দর্য

জাফলং যাওয়ার পথে জৈন্তাপুরের দুই পাশের বিশাল খোলা সবুজ মাঠ আপনাকে হাতছাতি দিয়ে ডাকবে। মাইলের পর মাইল দেখবেন শুধু সবুজ। সেখানে কাদায় পা ডুবিয়ে চরে বেড়াচ্ছে শত শত মহিষ। ধবল মেঘের নিচে সাদা বকের যুথবদ্ধ মাছ খোঁজাও চোখে পড়বে। এসব দেখতে দেখতে দেখতে আপনি পৌঁছে যাবেন জাফলং। মনে হবে, এই তো অবশেষে ‘তেলানোপোতা আবিষ্কার’ করে ফেললাম। খাসিয়া জৈন্তা পাহাড়ের পাদদেশে অবস্থিত জাফলং যেন এক রূপবতী তরুণী। ওপাশে ভারতের জৈন্তা পাহাড় থেকে ক্রমাগত ঝরে পড়া ঝরনা সারি দেখে অবাক না হয়ে উপায়। সেই জলে সৃষ্টি স্বচ্ছ পিয়াইন নদী। স্তরে স্তরে গভীর অগভীর জলে ছোট বড় হরেক রঙ ও আকারের বিছানো নুড়ি আর পাথর। সেসব ঘুরে দেখার জন্য ভাড়ায় পাওয়া যায় ইঞ্চিনচালিত নৌকা। পর্যটকেরা সৌন্দর্য উপভোগ করতে ঘুরে বেড়াচ্ছে, প্রতিজন ২০০-৩০০ টাকায়। এখানে রয়েছে ভারতের সীমানা। সেখানে পাহারা দিচ্ছে সীমান্তরক্ষীরা। অতি উৎসাহী হয়ে ভুলেও ভারতের সীমানায় পা বাড়াবেন না। ভারতের সীমান্তে পাহাড়টির নাম ডাউকি। সেই পাহাড়ে অবস্থিত ঝুলন্ত ব্রিজটির নাম ডাউকি ব্রিজ। পাহড়ের গায়ে দেখতে পাবেন একের পর জলপ্রপাত। বিশাল বিশাল সেইসব পাহাড় থেকে অবিরাম ধারায় ঝরছে জল। যেন পাহাড়ের কান্নাকে কোনো শিল্পী তার তুলিতে ধরে রেখেছেন। সেসব পাহাড় এতোটাই সবুজ, মনে হবে গহীন অরণ্য। সেই অরণ্যে কার না হারাতে মন চাইবে। এসব জলপ্রপাত যেন হিমালয়ের বরফ গলে আসছে আর ভাটির দেশে মিশে যাচ্ছে। জাফলংয়ে পর্যটকদের জন্য বেশ বড়সড় এক বাজারও রয়েছে। সেখানে ভারতীয় পণ্যই বেশি। লোকজন হরেদরে কিনছে আর কেউ ঝালমুড়ি খাচ্ছে। তারপর এসব দেখতে দেখতে সন্ধ্যা নামলে কখন যে বাতাস বইয়ে বৃষ্টি নামবে বুঝতেই পারবেন না। আশ্রয় নিতে আপনাদের নৌকার ছাউনিতে গিয়ে বসুন। বৃষ্টি থামবে কিছুক্ষণ পর। এবার ফেরার পালা।

লেখাটির পিডিএফ দেখতে চাইলে ক্লিক করুন: কোথায় কি

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

thirteen + 5 =