তারকাদের ঈদ স্মৃতি

রোজ অ্যাডেনিয়াম

বড় আর ছোটবেলার ঈদের মধ্যে আকাশ-পাতাল তফাত। তাই সুযোগ পেলেই বড়রা শোনান তাদের ছোটবেলার ঈদের স্মৃতি। বড় বড় তারকাদের জীবনেও আছে কোরবানি ঈদের নানা মধুর স্মৃতি। বিশেষ করে কোরবানির ঈদে হাটে যাওয়া, গরু কিনে বাড়ি ফেরা, ঈদের দিনে কোরবানি করা, পরিবারের সবার সঙ্গে কাজ করা, মাংস বিতরণ করা; এ সবই যেন অদ্ভুত এক আনন্দের বিষয়। তারকাদের ছোটবেলার এমন নানা স্মৃতি নিয়ে এ আয়োজন।

শাকিব খান: ছোটবেলার কোরবানির ঈদের স্মৃতিগুলো এখনো খুব মনে পড়ে ঢালিউড সুপারস্টার শাকিব খানের। ছোটবেলার স্মৃতি মনে পড়লে এখনো তিনি আনমনে হাসেন। ছোটবেলায় একবার শাকিব খান তার বাবার কাছে বায়না ধরলেন, কোরবানির গরু কিনতে হাটে যাবেন। কিন্ত তাকে হাটে নিতে রাজি হচ্ছিলেন না বাবা। পরে তার কান্না দেখে আর না করতে পারেননি। বাড়ির কাছে একটি বড় গরুর হাটে বাবার সঙ্গে গেলেন শাকিব খান। সেখানে গিয়েই ঘটল বিপত্তি। হাটের একটি বিশাল গরু কীভাবে যেন দড়ি ছিঁড়ে দৌড় দিয়েছে। সেই গরুর গুঁতা থেকে বাঁচতে এমন জায়গায় শাকিব পালিয়েছিলেন যে পরে তাকে খুঁজে পেতে বেশ বেগ পেতে হয়েছিল তার বাবার।

মাহিয়া মাহি: চিত্রনায়িকা মাহিয়া মাহির কাছে শৈশবের ঈদই আসল ঈদ। শৈশবের ঈদের সময়গুলো অনেক মিস করেন এই নায়িকা। কোরবানির ঈদ মানেই অনেক স্মৃতি। কোরবানির ঈদ এলে বাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে থাকতেন মাহি। মানুষ গরু কিনে বাড়ি যাওয়ার পথে গরুগুলোকে দেখতেন। মাহির কান্নাকাটির কারণেই ঈদের দুই দিন আগেই তাদের বাড়িতে গরু কিনতে হতো। গরু কেনার পর দুই দিন গরুটাকে ঘাস-লতাপাতা খাওয়ানোর স্মৃতি আজও তরতাজা মাহির কাছে। কোরবানির গরুর খুব যত্ন নিতেন তিনি। ঈদের দিন ঘুম থেকে জেগে যখন দেখতেন গরু কোরবানি হয়ে গেছে, তখন খুব কষ্ট পেতেন। অনেক কান্না করতেন। সারা দিন না খেয়ে থাকতেন।

মেহজাবীন: কোরবানির ঈদে গরু কোরবানি নিয়ে সবাই ব্যস্ত থাকে। এই বিষয়টি খুব ভালো লাগে মেহজাবীন চৌধুরীর। ছোটবেলায় কোরবানি উপলক্ষ্যে বাসায় গরু-ছাগল কিনে আনার পর থেকেই আনন্দের বাঁধ ভেঙে যেত তার। কোরবানির ঈদ নিয়ে খুব মজার একটি স্মৃতি রয়েছে অভিনেত্রীর। বড়দের কাছে গরুর হাটের নানা গল্প শুনতে শুনতে একবার গরুর হাট দেখার খুব ইচ্ছা হলো তার। চাচাতো ভাইদের কাছে গরুর হাটে যাওয়ার আবদার করে বসলেন মেহজাবীন। তার ভাইয়েরা কিছুতেই রাজি হলেন না। কিন্ত মেহজাবীন ঠিক করে ফেললেন তিনি হাটে যাবেন। লুকিয়ে তাদের পিছু পিছু হাটের উদ্দেশে রওনা দিলেন। হাটে গিয়ে ভিড়ের মধ্যে ভাইদের হারিয়ে ফেলেন তিনি। ভাইদের খুঁজে না পেয়ে শুরু করে দিলেন কান্না। কিন্ত সবাই গরু কেনায় ব্যস্ত। তার দিকে তাকানোর কারও সময় যেন নেই। অনেকক্ষণ কান্না করার পর হঠাৎ দেখতে পেলেন তার ভাইয়েরা তার পাশ দিয়ে যাচ্ছে। লুকিয়ে লুকিয়ে ভাইদের পিছু পিছু বাসায় ফিরলেন। বাসায় ফিরে দেখেন সবাই তাকে খুঁজছে। তিনিও কিছু না ভেবে বলে দিলেন ভাইদের সাথে ছিলাম। এটা শুনে তার ভাইয়েরা যেন আকাশ থেকে পড়েছিল। সেই স্মৃতি মনে করে এখনো মেহজাবীন হাসেন।

নুসরাত ফারিয়া: অন্য সবার চেয়ে একটু আলাদাই বলতে হবে নুসরাত ফারিয়াকে। গরু দেখতে মানুষ কোরবানির হাটে যেতে অনেক পছন্দ করে। কিন্ত ফারিয়ার কখনোই হাটে যেতে ইচ্ছা করেনি। গরুটাকে যখন কোরবানি দেওয়া হয়, তখন তার খুব কষ্ট হয়, খুব কান্না পায়। ছোটবেলার মতো এখনও তার কান্না পায়। বুঝতে শেখার পর থেকেই নুসরাতের ঈদের দিন শুরু হতো কান্না দিয়ে। গরু জবাই দেওয়ার জন্য নিয়ে যাওয়ার পর থেকেই কাঁদতে থাকতেন। ছোটবেলায় সকালটা পার হলেই ঈদের আনন্দে মেতে উঠতেন। একান্নবর্তী পরিবারে বড় হয়ে উঠেছেন তাই সকলে মিলেই আনন্দ করতেন। এত মানুষ একসঙ্গে আনন্দ করছে দেখে অন্যরকম ভালো লাগা কাজ করতো। ফারিয়া মনে করেন, নিজে সুখি থাকলে পৃথিবীর যেকোনো স্থানেই আনন্দ খুঁজে নেওয়া যায়।

ফেরদৌস আহমেদ: এই নায়কের বেড়ে ওঠা ঢাকার ক্যান্টনমেন্টে। তার ঈদের সব স্মৃতিই ঢাকাকে ঘিরে। ফেরদৌস আহমেদ বলেন, ‘ছোটবেলা থেকে হাটে যাওয়ার খুব একটা নেশা আমার কখনই ছিল না। গরু নিয়ে আমার তেমন মজার কোনো অভিজ্ঞতা নেই। তবে ভালোবাসার ঘটনা আছে। কোরবানির গরু কিনে বাসায় আনার পর তার সঙ্গে আমার ভাব হয়ে যেত। কোরবানির আগ পর্যন্ত রাত-দিন আমি গরুর খাওয়া-দাওয়া থেকে শুরু করে সব খেয়াল রাখতাম। ছোটবেলা থেকেই আমি পশু-পাখি ভালোবাসি। তাই ওদের সঙ্গে আমার ভাব হতে সময় লাগত না। পশু-পাখির ক্ষতি হলে আমার মনও খারাপ হয়ে যেত। তাই কোরবানির গরুটি যখন জবাই করা হতো, তখন আমার ভীষণ মন খারাপ হতো, অনেক কান্নাকাটি করতাম।

সিয়াম আহমেদ: বেশ কয়েক বছর নিজেই কোরবানি দিচ্ছেন বর্তমান সময়ের অন্যতম জনপ্রিয় এবং ব্যস্ত অভিনেতা সিয়াম আহমেদ। ছোটবেলায় বাবার সঙ্গে কোরবানির পশু কিনতে হাটে যেতে খুব ভালো লাগতো সিয়ামের। বাবা অনেক দেখেশুনে গরু কিনতেন। গরু কেনার পর গরুর দড়ি ধরে বাসায় নিয়ে আসার আনন্দটা এখনও অনুভব করেন তিনি। সিয়ামের বাবা গরু কিনে যখন টাকা দিতেন, তখন অভিনেতা ভাবতেন যদি তিনি বাবাকে গরু কেনার টাকাটা দিতে পারতেন। সেই স্বপ্ন পুরণ করেছেন তিনি। উপার্জনের পর থেকে প্রতি ঈদে কোরবানির গরু কেনার জন্য বাবাকে আলাদা করে টাকা দেন সিয়াম। এই কাজটা করতে খুবই ভালো লাগে তার। কিন্ত ছোটবেলার ঈদের যে আনন্দ তার ছিটেফোঁটাও যেন এখন অনুভব হয় না।

ফারুক আহমেদ: ফারুক আহমেদ বলেন, ‘দাদাবাড়ি ও নানাবাড়ি দুই বাড়িতেই ঈদ করতাম। আমার দাদার পরিবার ছিল অর্থনৈতিকভাবে একটু দুর্বল। অন্যদিকে নানাবাড়ির পরিবার ছিল ধনী। নানাবাড়িতে ধুমধামে কোরবানি হতো কিন্তু সেই সময়ে দাদাবাড়িতে কোরবানি করতে দেখিনি। বাবা ছিলেন সরকারি স্কুলের শিক্ষক। তিনি সেই সময় ৫০০-৭০০ টাকা বেতন পেতেন। এই টাকা দিয়েই আমাদের চার ভাইবোনের পড়াশোনাসহ যাবতীয় খরচ চলত। বাবা চাইতেন আমরা যেন মানুষের মতো মানুষ হয়ে নিজের পায়ে দাঁড়াতে পারি। সেখানে হয়তো আমরা ভাইবোনেরা সফল হয়েছি। সন্তান পরিবার নিয়ে সবাই ভালো আছি।’ এই অভিনেতা আরও বলেন, ‘পরে আব্বা কোরবানি দিয়েছেন। তখন অদ্ভুত এক রীতি ছিল। আমরা ছিলাম মোল্লা বংশের। যে কারণে তখন গ্রামের নিয়ম ছিল যে কোরবানি দিবে সে গরুর মাথা পাবে। আমরা তখন বাড়িতে মাথা নিয়ে আসতাম।’

মিশা সওদাগর: মিশা সওদাগর বলেন, ২০০৬ বা ২০০৭ সালের ঘটনা। শীতের মধ্যে কোরবানির ঈদ। গরু কিনতে হাটে গিয়েছিলাম আগের দিন রাতে। মূলত ঈদের আগের দিন বা দুদিন আগেই হাটে যাওয়া হয়। যাই হোক, ওই সময় শীতের দিন মুখে মাফলার পেঁচিয়ে হাটে ঢুকলাম। অনেক ঘুরলাম গরু পাচ্ছি না। হঠাৎ খেয়াল করলাম, মাফলার খুলে গেছে। নতুন করে বাঁধার আর সুযোগ পেলাম না। চারদিকে তখন শুধু ‘মিশা ভাই, মিশা ভাই’ বলে চিৎকার শুরু হয়ে গেছে। আর চারদিক থেকে লোকজনও আমাকে ঘিরে ফেলল। শেষে হাট কমিটির সাহায্যে রক্ষা পেলাম। এরপর একটা গরু কিনে কোনো মতো বাসায় ফিরলাম।

ব্যান্ডশিল্পী মাকসুদ: বাবার সঙ্গে ছোটবেলায় গরু কিনতে যেতাম। গরু কেনার অনেক মজার অভিজ্ঞতা আছে আমার জীবনে। ছোটবেলা একবার গরু কিনতে গিয়ে বিপাকে পড়তে হয়েছে। সালটা মনে নেই, সেদিন প্রচণ্ড বৃষ্টি হচ্ছিল। বৃষ্টিতে ভিজেই কয়েক ঘণ্টা ধরে গরু খুঁজলাম। একটা সময় দাম মিলে যায় আর গরুও কেনা হয়। এরপর গরু কিনে বাড়ি ফিরছিলাম। হঠাৎ হ্যাঁচকা টানে কাদাপানিতে পড়ে গেলাম। আমিও কাদার মধ্যে উপুড় হয়ে পড়লাম। ওঠার চেষ্টা করেও উঠতে পারছিলাম না। সবাই আমার দিকে তাকিয়ে হাসছিল। সেদিন কী যে লজ্জা পেয়েছি, যা আজও মনে পড়লে হাসি পায়।

তাহসান: ছোটবেলায় বাবার সঙ্গে গরুর হাটে যেতাম। কিন্তু বেশি ভেতরে ঢুকতাম না। কারণ গরুর গুঁতো খাওয়ার একটা ভয় কাজ করত। তবে গরু কেনার বিষয়গুলোর মজার ছিল। আবার বেশিক্ষণ হাটে থাকতে ইচ্ছাও করত না। আমার কথা, হাটে যাব, গরু কিনব, আর বাসায় চলে আসব। কিন্তু বিষয়টি তো আর এত সহজ না। সবচেয়ে বেশি মজা লাগত জিজ্ঞাসা করতে, ‘ভাই গরুর দাম কত’ আর সবচেয়ে বিরক্ত লাগত অন্যরা যখন আমাকে জিজ্ঞাসা করত!

হৃদয় খান: ছোটবেলায় বাবার সঙ্গে গরু কেনাটা ছিল নেশার মতো। আর গরু কেনার আগে থেকেই বিভিন্ন হাট ঘুরে বেড়াতাম। বিশাল সাইজের গরুর জন্য বেশি সময় দাঁড়িয়ে থাকতাম। সেসময় কোরবানির ঈদ মানে অন্যরকম একটা উৎসব কাজ করত। গরু কিনে কখনো একা বাসায় ফিরতাম না, কয়েকজন মিলে সেটা নিয়ে আসতাম। একবার এক দুষ্টু গরু কিনে হাট থেকে বাসায় ফিরছিলাম। রাস্তায় গাড়ির শব্দ শুনে দড়ি ছুটে গরু সেই দৌড়। আমরা সবাই মিলে ওকে ধরে রাখতে পারলাম না। আমাদের অবস্থাও কাহিল। যে দৌড় সেদিন দিয়েছি, তা আজও মনে পড়লে হাসি পায়।

সোহেল মণ্ডল: ঈদ বরাবরই পরিবারের সঙ্গে কাটান সোহেল মণ্ডল। ‘হাওয়া’খ্যাত এই অভিনেতা বলেন, ‘সকালে ঈদের নামাজ পড়ে কোরবানির প্রস্তুতি শুরু হতো। আমাদের বাড়ির পাশেই কোরবানির মাঠ। ছোটবেলায় আমরা কাজিনরা মিলে ওখানে চলে যেতাম। কোরবানির পর মাংস কাটা, ভাগ করা; এসব নিয়ে আলাদা একটা উৎসাহ থাকত। ঈদের দিনটা এসব নিয়েই পার করতাম। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে সেসবে পরিবর্তন এসেছে, উৎসাহ-উদ্দীপনাও কমে এসেছে। কোরবানির সময়ে কাজিনদের সঙ্গে গরু বা ছাগল কিনতে হাটে যাওয়ার স্মৃতিগুলো মনে পড়ে। এখন আর গরু কিনতে যেতে পারি না।’

লেখাটির পিডিএফ দেখতে চাইলে ক্লিক করুন: হলি বলি টলি

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

one × three =