পাশাপাশি দুইটি বাড়ির রঙ আলাদা

রঙবেরঙ ডেস্ক

ভেনেটিয়ান বা ভেনিস লেগুনে (লবণাক্ত পানির হ্রদ বা উপহ্রদ) অবস্থিত জেলেদের এক দ্বীপ বুরানো। ভেনিসের অন্যান্য অংশের মতো এর ভেতর দিয়ে বয়ে গেছে বেশ কিছু খাল-নালা। তবে দ্বীপটির আরও একটি বিশেষত্ব আছে, বলা চলে এ কারণেই এটি বেশি পরিচিত, তা হলো উজ্জ্বল সব রঙে রাঙানো এখানকার ঘর-বাড়ি। বুরানো আসলে একক কোনো দ্বীপ নয়, বরং চারটি দ্বীপ মিলে এটি। দ্বীপগুলোকে জোড়া লাগিয়েছে বেশ কিছু সেতু। তবে প্রতিটি দ্বীপের ঘরবাড়িগুলোতেই পাবেন নানা রঙের ছোঁয়া। আর এগুলো এত উজ্জ্বল, দেখলেই মন ভালো হয়ে যাবে আপনার।

এখানকার বাড়িগুলো এভাবে নানা ধরনের রঙে বর্ণিল করে তোলা নিয়ে একটি গল্প প্রচলিত আছে। বলা হয়, বহু আগ থেকেই দ্বীপে জেলেদের বাস। যখন গোটা উপহ্রদ বা লেগুন কুয়াশায় ঢেকে যেত, তখন পথ চিনে বাড়ি ফেরা মুশকিল হয়ে পড়ত তাদের। তাই ঘর-বাড়িতে বিভিন্ন রঙ করতে শুরু করেন জেলেরা, যেন কুয়াশার মধ্যেও উজ্জ্বল এসব ঘরবাড়ি দেখে পথ চিনতে পারেন।

তবে মাঝখানে নতুন করে রঙ না করায় দ্বীপের বর্ণিল বাড়িগুলোর চেহারা মলিন হতে শুরু করে। এ অবস্থা চলতে থাকলে হয়তো দ্বীপটি এতটা পরিচিতিই পেত না। তবে সৌভাগ্যক্রমে একপর্যায়ে আবার রঙ করা শুরু হয় ঘরগুলো। তারপর থেকেই রঙ ফিরতে শুরু করে এখানকার দালানকোঠার। এখন তো দুই বছর পরপরই রঙ করা হয়। এতে এখন গোটা দ্বীপটিই যেন ঝলমল করছে বলে মনে হয়।

লাল, নীল, হলুদ, বেগুনি, সবুজ নানা ধরনের রঙ শোভা পায় বাড়িগুলোতে। পাশাপাশি দুটি বাড়ির রঙ কখনো এক হয় না। মজার ব্যাপার, এখন চাইলেই নিজের ইচ্ছামতো রঙ করতে পারেন না দ্বীপবাসী। নিজের বাড়ি নতুন রঙ করতে চাইলে স্থানীয় কমিউনিটি গভর্নমেন্টের অনুমতি নিতে হয়। আরেকটু পরিষ্কারভাবে বুঝিয়ে দিচ্ছি, আপনার বাড়ির রঙ এখন সবুজ, আপনি চাইছেন এটাকে সবুজে-নীল কিংবা ফিরোজা রঙে রাঙিয়ে দেবেন। সে ক্ষেত্রে অবশ্যই অনুমোদনের জন্য কমিউনিটি গভর্নমেন্টের বরাবর দরখাস্ত করতে হবে।

দ্বীপটিতে এখন প্রায় ৩ হাজার মানুষের বাস। প্রচুর পর্যটক আসেন খাল-নালার দুপাশে দাঁড়িয়ে থাকা নানা রঙের ঘর-বাড়িময় দ্বীপটি দেখতে। তাই পুরোনো পেশা মাছ ধরার বদলে দ্বীপবাসীর কেউ কেউ ঝুঁকছেন পর্যটনসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন পেশার দিকে।

বুরানো অবশ্য শত শত বছর ধরে আরেকটি জিনিসের জন্য পরিচিত, সেটি এখানকার লেইস বা ফিতা। ধারণা করা হয়, পনেরো শতকে এখানে ফিতা বানানোর চল শুরু হয়। এখানকার বাহারি সব লেইস দেখে মুগ্ধ হবেন আপনি। বুরানোর লেইস তৈরির ইতিহাস ও লেইস সম্পর্কে আরও জানতে একটবার ঢুঁ মারতে পারেন লেইস মিউজিয়ামে।

বুরানোর হেলানো বেল টাওয়ার বা ঘণ্টা স্তম্ভও পর্যটকদের টানে। সতেরো শতকে নির্মিত সান মার্টিনো গির্জার অংশ এই টাওয়ার। তৈরির সময় ওজনের হিসাবে তারতম্যের কারণে এটি একটু হেলে পড়ে। তারপর এভাবেই রেখে দেওয়া হয়। পিসার হেলানো টাওয়ারের মতো বিখ্যাত না হলেও দ্বীপে গেলে একে একনজর দেখার সুযোগ হাতছাড়া করা উচিত নয়।

সরু খাল, চমৎকার সব সেতু আর নানান রঙের ঘর-বাড়ি মিলিয়ে বুরানো আলোকচিত্রীদের জন্য যেন এক স্বর্গরাজ্য। গোটা একটা দিন ছবি তুলেই কাটিয়ে দেওয়া যায়। জায়গাটি সি ফুডের জন্যও পরিচিত। এখানকার পিৎজাও বিখ্যাত।

দ্বীপটিতে পৌঁছাতে চাইলে ভেনিসের ফনডামেন্ট নোভা থেকে ১২ নম্বর লাইনের ওয়াটার বাসে চেপে বসতে হবে। মোটামুটি ৪০ মিনিটে পৌঁছে যাওয়া যায় দ্বীপে। পথে অবশ্য মুরানো নামে একটি দ্বীপে যাত্রাবিরতি দেয় ওয়াটার বাস। নানা ধরনের কাচ তৈরির জন্য বিখ্যাত জায়গাটি। বংশানুক্রমে কাচ তৈরির শিক্ষা পেয়ে আসছে এখানকার মানুষ। আছে কাচ তৈরির জাদুঘর ও কারখানা। এখানে কিছুটা সময় ঘুরেফিরে আরেকটি ওয়াটার বাসে চেপে বুরানোতে পৌঁছাতে পারেন।

গ্রামটির একমাত্র রাস্তার দুপাশে থাকেন বাসিন্দারা

পোল্যান্ডের আলকাসকা আপল্যান্ডের এক গ্রাম সুবোশকা। মজার ব্যাপার হলো, গ্রামটির ৬ হাজার বাসিন্দার সবাই থাকেন একটি রাস্তার দুপাশে বাড়ি-ঘর বানিয়ে। ক্রাকুফ শহর থেকে ৩০ কিলোমিটার উত্তর-পশ্চিমে গ্রামটির অবস্থান। এখন যেভাবে আছে, মোটামুটি সেভাবেই আছে অনেক বছর ধরে। তবে তখন একে নিয়ে কোনো মাতামাতি ছিল না, আরও পরিষ্কারভাবে বললে এর কথা খুব বেশি মানুষ জানতও না। তবে ইদানীং ড্রোনে তোলা কিছু ছবি ও ভিডিও ভাইরাল হওয়ার পর গ্রামটি নজর কাড়ে বিশ্ববাসীর।

পাখির চোখে দেখা এসব ছবি আসলেই মন কেড়ে নেয়। এগুলোতে দেখা যায় একটি রাস্তার দুপাশে গড়ে উঠেছে শত শত বাড়ি। তারপর যত দূর চোখ যায়, নানারঙা ফসলের ক্ষেত। সবকিছু মিলিয়ে জন্ম দিয়েছে আশ্চর্য এক সৌন্দর্যের। গ্রামটি সম্পর্কে মানুষের আগ্রহ আরও বাড়ে, যখন জানা যায়, এখানকার প্রায় ৬ হাজার বাসিন্দার সবাই ৯ কিলোমিটারের বেশি দীর্ঘ একটি রাস্তার দুপাশেই থাকে ঘর-বাড়ি বানিয়ে।

ওপর থেকে তোলা সুবোশকা গ্রামের ছবি পোল্যান্ডে ভাইরাল হয় দুই বছর আগে, অর্থাৎ ২০২১ সালে। তবে এ মাসেই গ্রামটির একটি ড্রোন ভিডিও নজর কাড়ে সারা পৃথিবীর মানুষের। একটিমাত্র রাস্তার দুই ধারে সব বাড়ি, চারপাশ ঘিরে থাকা ফসলের ক্ষেত, সব মিলিয়ে রীতিমতো মন্ত্রমুগ্ধ করে ফেলেছে গ্রামটি সৌন্দর্যপিয়াসী মানুষকে।

এভাবে এক রাস্তার দুপাশের গ্রামের সব ঘর-বাড়ির অবস্থানকে অদ্ভুত বলেছে মেইল অনলাইন কিংবা দ্য সানের মতো আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম। তবে পোল্যান্ডের বিভিন্ন নিউজ ওয়েবসাইটে পোলিশরা মন্তব্য করেছেন, একটি রাস্তাকে ঘিরে এভাবে গ্রাম গড়ে ওঠা একেবারে অস্বাভাবিক নয় মধ্য ইউরোপের দেশটিতে। ওপর থেকে তোলা ছবিটি একে অসাধারণ করে তুলেছে।

সাধারণত রাস্তা ঘিরে যেসব গ্রাম গড়ে ওঠে, এরকমই এটা। তবে পার্থক্য হলো, গ্রামটি অনেকটাই লম্বা। মন্তব্য করেন একজন। একজন আমাকে বুঝিয়ে বলেন, এর মধ্যে খুব অস্বাভাবিক কী আছে? সাধারণ একটি রাস্তা। আরেক জন লেখেন। এবার বরং গ্রামটির একজন বাসিন্দার কাছ থেকে জেনে নেওয়া যাক হঠাৎ জনপ্রিয় হয়ে ওঠার ব্যাপারে তাদের অনুভূতি ও গ্রামটি সম্পর্কে।

ইন্টারনেটে ওপর থেকে তোলা ছবিটি দেখেছি আমি। আমি জানি লোকেরা আমাদের নিয়ে কথা বলছে। অবশ্য এতে অবাক হইনি, দৃশ্যটি আসলেই অসাধারণ। বলেন স্থানীয় একটি দোকানের মালিক এদিতা। একজনকে মালসামাল বুঝিয়ে দিতে দিতে এই নারী বলেন, ‘এখানে চমৎকার একটি কমিউনিটি আছে। আমরা স্ট্রবেরি ডে উদযাপন করি, তখন একসঙ্গে নতুন ফসলের তৈরি খাবারের স্বাদ নিই আর গান-বাজনা করি। তেমনি পটেটো ডেতে সবাই একত্র হয়ে একই ধরনের উৎসব করি।আমাদের এখানকার বাসিন্দারা গল্প করতে পছন্দ করি। সবাই সবাইকে চিনি। আরও বলেন তিনি।

যে যাই বলুন, গ্রামটি অবশ্যই আর দশটি সাধারণ গ্রামের চেয়ে আলাদা। হয়তো ইউরোপে এক রাস্তার এমন গ্রাম খুব অস্বাভাবিক নয়। তবে এ রকম বর্ণিল সব ফসলি জমির প্রাকৃতিক নকশার মধ্যে এক রাস্তার দুপাশে শত শত ঘর-বাড়ি, সব মিলিয়ে যে ছবিটি পাওয়া যায় এটা আসলেই অনন্য। চমৎকার এই গ্রাম সম্পর্কে জেনে আর ছবি দেখে সম্ভবত পরের ইউরোপ সফরে গ্রামটিতে যেতে আগ্রহী হয়ে উঠেছেন। সেক্ষেত্রে আপনার জন্য বাড়তি পাওয়া হতে পারে দ্য রেড ট্রেইল অব দ্য ইগল নেস্টসে একটি ভ্রমণ। ওই পথে চৌদ্দ শতকে তৈরি চমৎকার সব দুর্গ আর প্রাসাদের দেখা পাবেন।

লেখাটির পিডিএফ দেখতে চাইলে ক্লিক করুন: বিচিত্র

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

seventeen + 19 =