বদলে যাওয়া বাংলাদেশে তিন মাসের ব্যস্ত সফর

সালেক সুফী

চতুর্থ পর্ব

২০২২-২৩ দু দফায় ৪ মাস এবং ২০২৩-২৪ তিন মাস বাংলাদেশ সফরের অন্যতম মূল উদ্দেশো ছিল বাংলাদেশের জ্বালানি এবং বিদ্যুৎ সেক্টর নিয়ে আমার অব্যাহত গভীর আগ্রহ, স্বরূপ দর্শন, সম্ভাবনা এবং সংকটের বিষয়গুলো খতিয়ে দেখা। এমনিতেই ১৯৭৭-২০০৫ বাংলাদেশের জ্বালানি বিদ্যুৎ সেক্টরের তৃণমূল থেকে ব্যাবস্থাপনা স্তরে নিবিড়ভাবে জড়িত ছিলাম জ্বালানি বিদ্যুৎ সেক্টরের সাপ্লাই চেন ম্যানেজেমেন্টে।  কাজ করেছি অনেক চ্যালেঞ্জিং অবকাঠামো নির্মাণ প্রকল্প বাস্তবায়নে।

পেট্রোবাংলার অন্তত ৬টি কোম্পানিতে সরাসরি এবং অন্যান্য কোম্পানিতে পরোক্ষভাবে কাজ করেছি। আন্তর্জাতিক তেল কোম্পানিগুলোর কাজ পেট্রোবাংলার প্রতিনিধি হয়ে মনিটরিং করেছি। জ্বালানি বিদ্যুৎ সেক্টর নিয়ে প্রচুর লিখেছি। দেশে এবং বিদেশে সভা, সেমিনার, ওয়ার্কশপে বাংলাদেশ জ্বালানি সেক্টরকে প্রতিনিধিত্ব করেছি।

২০০৫ থেকে প্রবাসী হয়েও নানা ভাবে নিজেকে বাংলাদেশের জ্বালানি বিদ্যুৎ সেক্টরের কর্মকাণ্ড বিষয়ে অবহিত রেখেছি। অস্ট্রেলিয়ান সরকারের আর্থিক সহায়তায় বাংলাদেশ জ্বালানি বিদ্যুৎ সেক্টরের কর্মকর্তাদের প্রশিক্ষণ কাজে সম্পৃক্ত থেকেছি। বাংলাদেশ জ্বালানি বিদ্যুৎ সেক্টর নিয়ে জানার পরিধি তাই আমার কম সমৃদ্ধ না। সাম্প্রতিক সময়ের সফরকালে আমি অধিকাংশ জ্বালানি বিদ্যুৎ মেগা প্রকল্প সমূহ পরিদর্শন করেছি,কর্মকর্তাদের সঙ্গে নিবিড়ভাবে মত বিনিময় করেছি, গ্যাস বিদ্যুৎ ব্যবহারকারীদের সঙ্গে আলাপ করেছি। বিশেষজ্ঞ, মিডিয়া কর্মীদের সঙ্গে মত বিনিময় করেছি।

আমার সম্যক ধারণা আর উপলব্ধি হলো সুশাসনের অভাব, ভ্রান্ত নীতি-কৌশল, নিরংকুশ আমলাতান্ত্রিক নিয়ন্ত্রণ; বিদ্যমান এবং সম্ভাব্য জ্বালানি বিদ্যুৎ সংকটের মূল কারণ। অনেকেই আশংকা করছে ২০২৪, ২০২৫ বাংলাদেশে তীব্র জ্বালানি বিদ্যুৎ সংকটে পড়বে।  এমনিতেই নানা বৈষয়িক কারণে অর্থনীতি ভঙ্গুর হয়ে পড়েছে। একটা বস্তায় জ্বালানি বিদ্যুৎ সংকট গভীর ক্ষতের সৃষ্টি করার আশংকা সৃষ্টি করেছে।

দেশে গ্রিড নন গ্রিড মিলিয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদন ক্ষমতা ২৯,০০০ মেগাওয়াট ছাড়িয়ে গেছে। গড় বার্ষিক চাহিদা ৯০০০-১০০০০ মেগাওয়াট।  নিবিড় সেচ মৌসুম, রোজা এবং গ্রীষ্মকালে চাহিদা বেড়ে সর্বোচ্চ চাহিদা ১৬,৫০০ মেগাওয়াট হতে পারে।  ইদানিং বিদ্যুৎ সঞ্চালন এবং বিতরণ নেটওয়ার্ক অনেক আধুনিকায়ন হয়েছে।  বিপুল পরিমাণ বিদ্যুৎ উৎপাদন ক্ষমতা নিয়েও প্রাথমিক জ্বালানি সরবরাহ সংকটে সর্বোচ্চ চাহিদা মেটানো এখন অসম্ভব।

মূল সঙ্কট দীর্ঘদিন নিজেদের জ্বালানি সম্পদ গ্যাস ও কয়লা আহরণ এবং উন্নয়ন অবহেলা। দেশে গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদন ক্ষমতা ১১০০০ মেগাওয়াটের অধিক। প্রয়োজন ১৮০০-২০০০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস। কিন্তু প্রমাণিত গ্যাস সম্পদ নিঃশেষ হতে থাকায় অন্যান্য গ্রাহকদের চাহিদা মিটিয়ে পেট্রোবাংলার পক্ষে বিদ্যুৎ উৎপাদনে ১২০০-১৩০০ মিলিয়ন ঘনফুটের বেশি গ্যাস সরবরাহ সম্ভব না। ফলে পিক চাহিদার সময়েও ৪৫০০-৫০০০ মেগাওয়াট গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদন ক্ষমতা অলস পড়ে থাকবে।

বিকল্প হিসেবে চালু রাখতে হবে কয়লা, তরল জ্বালানি ভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদন। সেখানেও আছে ডলার সংকট, টাকার সংকট। সরকারি প্রতিষ্ঠান সমূহ বিপিডিবি, পেট্রোবাংলা, বিপিসি দেনার দায়ে ন্যূজ হয়ে পড়েছে।  বার বার বিদ্যুৎ গ্যাসের দাম বাড়িয়েও ক্রয় বিক্রয়ে ঘাটতির কারণে সাবসিডি অপরিহার্য হয়ে রয়েছে।  অথচ সরকার আইএফসি থেকে ঋণ নেওয়ার সময় জ্বালানি বিদ্যুৎ থেকে সাবসিডি পর্যায়ক্রমে তুলে নেওয়ার অঙ্গীকার করেছে। সরকার পেট্রোবাংলা কোম্পানিগুলো থেকে ওদের নিজেদের গচ্ছিত তহবিল তুলে নিয়েছে।

সবাই বলছে নিজেদের জ্বালানি উন্নয়ন অবজ্ঞা করে ভুল পরামর্শে আমদানিকৃত জ্বালানির পিছনে চোটে বর্তমান সঙ্কটের প্রধান কারণ। বিপুল পরিমাণ বিদ্যুৎ উৎপাদন ক্ষমতা অলস থাকায় সরকারকে ক্যাপাসিটি চার্জ হিসাবে গচ্চা দিতে হচ্ছে। উৎপাদন খরচ বেড়ে যাচ্ছে, দায় চাপানো হচ্ছে গ্রাহকদের উপর। বিদ্যুৎ জ্বালানি সেক্টরের অব্যাবস্থাপনার কারণে সবাই ক্ষতিগ্রস্ত হলেও লাভবান হয়েছে একশ্রেণির সরকার ঘনিষ্ট ব্যাবসায়ী, কিছু দুর্নীতি পরায়ণ আমলা, প্রযুক্তিবিদ।

দেরিতে হলেও সরকারের বোধোদয় হয়েছে দ্রুত নিজেদের গ্যাস কয়লা সম্পদ উঠানোর বিষয়ে। আমলাতান্ত্রিক নিয়ন্ত্রণে দুর্বল পেট্রোবাংলা ২০২৮ সালের মধ্যে ১০০ নতুন কূপ খনন করতে চায়। বর্তমান অবস্থায় এটি বিলাসী এবং অবাস্তব বলার যথেষ্ট কারণ আছে।  তবে টেস্ট করে যদি ৫০% অর্জন করা যায় সুফল মিলবে। তার আগে ২০২৫র মধ্যে ৪৮টি কূপ খনন শেষ করার চ্যালেঞ্জ রয়েছে। মার্চ ২০২৪ দীর্ঘ প্রতীক্ষিত গভীর সাগর গ্যাস অনুসন্ধানের জন্য দরপত্র আহবান করা হবে। অনেকেই স্থলভাগে পিএসসি করার সুপারিশ করছে। শাসক দলের নির্বাচন প্রতিশ্রুতিতে কয়লা উত্তোলনের কথা বলা হলেও আপাতত নড়াচড়া নাই।

পাশাপাশি এলএনজি আমদানি বৃদ্ধির তোড়জোড় চলছে। ২০২৬ থেকে আরো অন্তত চারটি চুক্তির মাধ্যমে অতিরিক্ত এলএনজি আসবে কাতার, ওমান থেকে। মার্কিন কোম্পানি এক্সেলেরেট এবং বাংলাদেশি কোম্পানি সামিট এলএনজি আমদানি করে সরবরাহ করবে। ভারত থেকে পাইপ লাইনে আর এলএনজি আমদানির তোড়জোড় চলছে, কেউ কিন্তু ভাবছে না বাংলাদেশের আর্থিক সামর্থ নিয়ে।

সামিট এবং এক্সেলেরেট দুটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল স্থাপন করবে। সরকার মাতারবাড়িতে ভূমি ভিত্তিক টার্মিনাল স্থাপন করার কথা। নানা কারণে সেটি বিলম্বিত হচ্ছে। এতদিনে সরকারের হুশ হয়েছে ভোলার আবিষ্কৃত গ্যাস জাতীয় গ্রিডে নেওয়ার। সময় লাগবে অন্তত ৩ বছর। এদিকে গ্যাস সরবরাহ নিশ্চিত না করেই জিটিসিএলকে দেশব্যাপী গ্যাস সঞ্চালন নেটওয়ার্ক স্থাপন করে বাধ্য করায় কোম্পানির আর্থিক পরিস্থিতি নাজুক হয়ে পড়েছে।

বিষয়গুলো নিয়ে উর্ধ্বতন কর্মকর্তা, কোম্পানি সমূহ এবং প্রকৌশলীদের সঙ্গে আলাপ করেছি। মিডিয়ায় কথা বলেছি।  আশা করি ব্যাবহারে কৃচ্ছতা, জ্বালানি দক্ষতা নিশ্চিত করা এবং অপচয় রোধ করে পরিস্থিতি সহনীয় রাখা হবে। প্রকল্প প্রণয়নে সার্বিক দিক বিবেচনা করা হবে। আমলাতান্ত্রিক নিয়ন্ত্রণ শিথিল করে প্ৰকৃত পেশাদারদের স্বাধীনভাবে কাজ করতে দেওয়া হবে। দীর্ঘস্থায়ী জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত না হলে জাতীয় উন্নয়ন মুখ থুবড়ে পড়বে।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

5 − five =