বাঙালি পোশাকশিল্পী সব্যসাচী

নীলাঞ্জনা নীলা

বলিউডে যেকোনো তারকার বিয়ের পোশাক কে ডিজাইন করেছেন তা যেন চোখ বন্ধ করেই বলে দেওয়া যায়। তিনি আর কেউ নয়, ভারতের জনপ্রিয় বাঙালি ডিজাইনার সব্যসাচী মুখোপাধ্যায়। ভিন্নধর্মী সব ডিজাইনের মাধ্যমে নিজেকে ও তার ব্র্যান্ড সব্যসাচীকে নিয়ে গেছেন ভিন্ন মাত্রায়। তাই প্রায় সব নারীদেরই স্বপ্ন সব্যসাচীর ডিজাইন করা পোশাক পরা। আজকের এই সব্যসাচী কিন্তু একদিনে হননি, তাকে পোড়াতে হয়েছে বহু কাঠকয়লা।

২৩ ফেব্রুয়ারি ১৯৭৪ সালে কলকাতায় সব্যসাচী জন্মগ্রহণ করেন। তার মা সন্ধ্যা মুখার্জী একটি আর্ট কলেজের শিক্ষিকা ছিলেন। হঠাৎ করে সব্যসাচীর বাবা সুকুমার মুখার্জীর চাকরি চলে যায়। তখন তাদের অনেক অভাব-অনটনের মুখোমুখি হতে হয়। কলেজে এডমিশন নেওয়ার জন্য সব্যসাচীকে নিজের বই বিক্রি করে দিতে হয়েছিল। তার পড়ালেখার শুরুর বিষয় ছিল ডিজাইনিং, পড়া শেষ করেছিলেন অর্থনীতি নিয়ে। পড়ার বিষয় নিয়েও তিনি ভীষণ হতাশা ও বিভ্রান্তিতে ভুগছিলেন। পরবর্তীতে ন্যাশনাল স্কুল অব ফ্যাশন টেকনোলজিতে পড়ালেখা করেন। ডিজাইনিং নিয়ে পড়ালেখার শুরুতে মা-বাবার তেমন সহযোগিতা পাননি তিনি। কারণ তারা চাননি সব্যসাচী পোশাক নিয়ে কাজ করুক।

জীবনের একপর্যায়ে কোনো কিছুর সাথেই তিনি নিজেকে মানিয়ে নিতে পারছিলেন না। ক্যারিয়ারের দিকটা ছিল তার অজানা। কারণ নিজের ভেতরে সৃজনশীলতা থাকলেও তা প্রকাশ করার সঠিক জায়গা খুঁজে পাচ্ছিলেন না। ফলে খুব অল্প বয়সেই বিষণ্নতা ঘিরে ধরে তাকে। তিনি সবসময়ই একঘেয়েমি থেকে বের হয়ে নতুন কিছু করতে চাইতেন। মানুষ হিসেবে ভীষণ চুপচাপ সব্যসাচী, নিজেকে সহজে অন্যের সামনে তুলে ধরতেন না। আজ এতো খ্যাতি পাওয়ার পরেও নিজেকে আড়ালে রাখতে ভালোবাসেন তিনি। তাই তো তার পোশাক পরে সবাই ঝলমলে হয়ে থাকলেও ক্যামেরার সামনে খুব বেশি দেখা যায় না তাকে।

এই চুপচাপ থাকার অভ্যাসের কারণেই তিনি বিষণ্নতার শিকার হয়েছিলেন বলে জানান একটি সাক্ষাৎকারে। ১৭ বছর বয়সে বিষণ্নতার জন্য আত্মহত্যার চেষ্টাও করেছিলেন তিনি। কিন্তু মা টের পেয়ে এসে তাকে জোরে থাপ্পড় মেরেছিলেন। সেই থাপ্পড়ই নাকি তার জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দিয়েছে। নিজেকে আবার নতুন করে ফিরে পেয়েছিলেন। জীবনের প্রায় প্রতি পদেই তিনি আলোচনা সমালোচনার শিকার হয়েছেন। একবার তিনি নিজের আউটলুকে কিছুটা পরিবর্তন এনেছিলেন। তিনি ম্যাডোনার ফ্যাশন দ্বারা অনুপ্রাণিত হয়ে টর্ন জিন্স অর্থাৎ ওয়ান শট বা ছেঁড়া স্টাইলের জিন্স পরা শুরু করেছিলেন। চুল নানা রং দিয়ে রঙিন করে তুলেছিলেন। তার এই পরিবর্তনের জন্য সমালোচনার মুখোমুখি হতে হয়েছিল তাকে।

ইন্সটাগ্রামে তার এক পোস্টের জন্য রীতিমতো সমালোচনার ঝড় উঠেছিল। তিনি লিখেছিলেন ‘যে নারী ভারী পোশাক পরিধান করে ও চড়া মেকআপ করে হয়তো তার ভেতরটা রক্তাক্ত। নিজের মনের কথা প্রকাশ করতে না পেরে হয়তো সে রক্তাক্ত হয়েছে। তাই এমন নারীদের অবসাদ থেকে বেরিয়ে আসতে সাহায্য করুন, তাদের পাশে থাকুন।’ তার এই পোস্ট অনেকেই ভালোভাবে নেননি, ট্রলের শিকার হতে হয়েছিল তাকে। তিনি মনে করেন, বেশিরভাগ মানুষের বিষণ্নতার কারণ নিজের কথা মনের মধ্যে চেপে রাখা। যখন কেউ অন্যের সাথে খোলাখুলি কথা বলে তখন সে বুঝতে পারে এই পৃথিবীতে অনেকেই তার মতো নানা ধরনের সমস্যার মধ্যে আছে এবং সবাই যে যার মতো লড়াই করছে। তখন নিজেকে আর একা মনে হয় না, কিছুটা হালকা অনুভব হয়। ২০১৯ সালে একটি অনুষ্ঠানে তাকে প্রশ্ন করা হয়, এখনও কি বিষণ্নতা তাকে ঘিরে ধরে? জবাবে তিনি বলেন, এখন তিনি নিজের সৃজনশীলতার মাধ্যমে নিজেকে ফুটিয়ে তোলার সুযোগ পান, তাই আগের চেয়ে কম বিষণ্নতায় আক্রান্ত হন। তবে মন খারাপ হলে তিনি নিজের পছন্দের খাবার খান ও লম্বা একটি ঘুম দেন; তাতে তিনি অনেকটা ভালো অনুভব করেন।

১৯৯১ সালে পরপর দুটি প্রদর্শনী করেন সব্যসাচী। তারপর চলে যান সোজা মুম্বাই। সে বছরই তিন জন কারিগর নিয়ে তৈরি করেন নিজের পোশাক ব্র্যান্ড ‘সব্যসাচী’। এরপর আর তাকে পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি, সফলতা আপন করে নিয়েছিল তাকে। দিল্লি, মুম্বাইয়ের ‘ফ্যাশন উইক’ তো আছেই ভারতীয় হিসেবে আমন্ত্রিত হয়েছেন সিঙ্গাপুর, লন্ডন, নিউ ইয়র্কের বহু অভিজাত ফ্যাশন শো’তে। প্রায় প্রতি বছরই তিনি পুরো বিশ্বে নিজের কাজ নিয়ে হাজির হন। ২০২১ সালে ভারতের প্রথম পোশাক শিল্পী হিসেবে নিজের কাজ দেখানোর সুযোগ পান নিউ ইয়র্কের ১২২ বছরের পুরানো ঐতিহাসিক ফ্যাশন বিপণি ‘বার্গডর্ফ গুডম্যান’-এ। ২০০৫ সালে ‘ব্ল্যাক’ সিনেমায় পোশাক ডিজাইনের মাধ্যমে সিনেমাতে কাজ করা শুরু করেন। এরপর ‘বাবুল’, ‘লাগা চুনরি মে দাগ’, ‘রাবণ’, ‘গুজারিশ’, ‘পা’, ‘ নো ওয়ান কিলড জেসিকা’, ‘ইংলিশ ভিংলিশ’-এর মতো বিভিন্ন ছবিতে পোশাক পরিকল্পনার দায়িত্ব পেয়েছিলেন সব্যসাচী। শ্রেষ্ঠ পোশাক পরিকল্পক হিসেবেও পুরস্কার পান তিনি।

আলিয়া ভাট, দীপকা পাড়ুকোন, আনুস্কা শর্মা, ক্যাটরিনা কাইফ থেকে শুরু করে বলিউডের সব অভিনেত্রী ও অভিনেতারা নিজের যেকোনো বিশেষ দিনের দায়িত্ব নিশ্চিতে তার উপর দিয়ে রাখেন। তার প্রতিটি ডিজাইনেই বোঝা যায় দেশীয় নকশার প্রতি তার কতটা প্রেম! কখনো খাদি সাথে জামদানি, কখনো বেনারসি ও নেট সবকিছুর মিশ্রণে তিনি তৈরি করেন সম্পূর্ণ নিজের সৃষ্টি। তিনি শাড়ি, লেহেঙ্গা, ওয়েস্টার্ন পোশাক, গয়না, ব্যাগসহ সকল ফ্যাশন অনুষঙ্গ ডিজাইন করে থাকেন। সব্যসাচীর বেশিরভাগ ডিজাইনেই দেখতে পাওয়া যায় ফুল, পাতা ও প্রকৃতি। তার সব পোশাকে প্রাকৃতিক রঙ ব্যবহার করা হয়। তার ডিজাইন করা পণ্য নিয়ে আলোচনাও কম হয় না। তার পোশাকের মডেলদের মধ্যেও রয়েছে ভিন্নতা। গতানুগতিক মডেল বলতে সবাই যাদের বোঝে; লম্বা, রোগা, সুন্দরী, তেমন মডেলদের বাইরে গিয়ে তিনি কাজ করিয়েছেন সব ধরনের মডেল দিয়ে। যাদের দেখে সাধারণ মেয়েরা আত্মবিশ্বাসের পাবে ও হীনমন্যতায় ভুগবে না।

যার পোশাক পরেন বলিউডের সব তারকারা, পুরো বিশ্ব যার ডিজাইনের প্রশংসা করে; কিন্তু যে কলকাতা শহরের ছেলে তিনি সে শহরে কেন তার পোশাক তেমন দেখতে পাওয়া যায় না? এ নিয়েও কিন্তু রয়েছে বহু আলোচনা। কলকাতার নায়িকাদেরও তার পোশাকে তেমন দেখা যায় না। এর কারণ হিসেবে অনেকে মনে করেন, সব্যসাচীর পোশাকের মূল্য অনেক। যা কলকাতার সিনেমার বাজেটের চেয়ে অনেক বেশি। আবার অনেকে মনে করেন, কলকাতার বাঙালিদের মধ্যে ডিজাইনার পোশাক পরার প্রবণতা কম। তাই হয়তো সব্যসাচীর পোশাকের জনপ্রিয় হয়নি কলকাতা শহরে।

এ বছর এপ্রিলে মুম্বাইয়ে নতুন স্টোর শুরু করেছেন সব্যসাচী। তিনতলা ভবনের স্টোরটি প্রায় ২৫ হাজার বর্গফুটের। নানা নকশা করে সাজানো হয়েছে স্টোরটি, যা যেকারো নজর কাড়তে বাধ্য। তবে এই স্টোরে কোনো বাংলাদেশি গেলে অবশ্যই গর্ব অনুভব করবে। সাব্যসাচী ছোটবেলা থেকে বাংলাদেশের সংগীতশিল্পী রুনা লায়লাকে ফ্যাশন আইকন মনে করেন। তাই মুম্বাইয়ে সেই আউটলেটের দেয়ালে ‘টু উইমেন’ লিখে ফলক ঝুলিয়েছেন। একজন তার মা আরেকজন উপমহাদেশের কিংবদন্তি সংগীতশিল্পী রুনা লায়লা। রুনা লায়লার গানের ভক্ত ছিলেন তিনি, গান ছাড়াও রুনা লায়লার ফ্যাশন সেন্স তাকে খুব আকৃষ্ট করতো। রুনা লায়লাকে দেওয়া সব্যসাচীর এ সম্মান মুহূর্তের মধ্যেই সোশ্যাল মিডিয়াতে ভাইরাল হয়ে যায়। বাঙালিরা জানান এটি তাদের জন্য একটি গর্বের মুহূর্ত। গণমাধ্যমকে রুনা লায়লা বলেন, ‘সব্যসাচী যে একজন অসাধারণ ডিজাইনার তাতে কারো কোনো সন্দেহ নেই। তার সাথে আমার মাঝেমধ্যেই কথা হতো, আমি জানতাম যে আমার গানের ভক্ত। কিন্তু সে আমাকে এতো বড় সম্মান দিবে সেটা বুঝতে পারিনি।’

লেখাটির পিডিএফ দেখতে চাইলে ক্লিক করুন: ব্র্যান্ড

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

4 × three =