বৈশাখী পূর্ণিমায় গন্ধেশ্বরী পূজা

ইরানী বিশ্বাস

কথায় আছে বাঙালি হিন্দুদের বারো মাসে তের পার্বণ। তার মধ্যে অন্যতম একটি হলো গন্ধেশ্বরী দেবী পূজা। দেবী দুর্গার একটি রূপভেদ হলো শ্রী শ্রী মাতা গন্ধেশ্বরী। বাঙালি গন্ধবণিক সম্প্রদায়ের উপাস্য দেবী তিনি। বৈশাখ মাসের পূর্ণিমা তিথিতে বাৎসরিক এ পূজার আয়োজন করা হয়। কথিত আছে, তিনি গন্ধাসুরের হাত থেকে গন্ধবতীকে রক্ষা করেছিলেন। দেবী গন্ধেশ্বরী ত্রিনয়নী, চতুর্ভূজা, শঙ্খ-চক্র-ধনুর্বাণ ধারিণী এবং সিংহবাহিনী। কেয়ুর হার, বলয়, শব্দায়মান চন্দ্রহার শোভিত চরণে নূপুর, রত্নখচিত উজ্জ্বল কুন্ডল পরিহিত। দেবী গন্ধেশ্বরীর পূজা হয় বৌদ্ধ পূর্ণিমাতে। তাই বৌদ্ধ ধর্মালম্বীদেরও এই পূজা করতে দেখা যায়। বাংলাদেশের পাহাড়পুর বৌদ্ধ বিহারে অন্যান্য হিন্দু দেব দেবীর সঙ্গে গন্ধেশ্বরী দেবীরও একটি মূর্তি আছে। তবে সেটি বৌদ্ধ বিহারের মতো খুব প্রাচীন নয়।

গন্ধেশ্বরী হলেন সুগন্ধ বহনকারী দেবী। বৈশাখী পূর্ণিমার দিন মূলত গন্ধবণিক সম্প্রদায়ের মানুষেরাই এই পূজা করে থাকেন। গন্ধবণিক সম্প্রদায় এই দিনে দেবীর সামনে তাদের ব্যবসায়িক সামগ্রী, হিসাবের খাতা, ওজন যন্ত্র রেখে তাদের ব্যবসায়ের সমৃদ্ধি প্রার্থনা করেন। চৈনিক পর্যটক ফা-হিয়েন ভারতবর্ষে যখন এসেছিলেন তখন অখণ্ড বাংলায় একটি সমাজের কথা জানতে পেরেছিলেন। তা হলো গন্ধবণিক সমাজ।

গন্ধবণিক হলো বাঙালি হিন্দু বণিক সম্প্রদায়। যারা মূলত গন্ধদ্রব্যের ব্যবসা করেন। যেমন সুগন্ধী প্রসাধনী, ধূপ, ফারফিউম সহ দেশ বিদেশের মসলা। এই গন্ধবণিক সম্প্রদায়ের কূলদেবী হলেন গন্ধেশ্বরী। মাতৃশক্তির প্রতীক হিসেবে গন্ধেশ্বরী দেবীকে পূজা করা হয়। প্রচীনকালে বণিকেরা ময়ূরপঙ্খী ভাসিয়ে বাণিজ্যে যেতেন। পথে ঝড়, বৃষ্টি, বন্যা ইত্যাদি আশঙ্কা ছিল। তেমনই ডাকাত, বন্য জীবজন্তুর ভয়ও ছিল। এসব বিপদ থেকে দেবী তাদের রক্ষা করবেন এই বিশ্বাসে তারা গন্ধেশ্বরী দেবীর পূজা করেন।

গন্ধবণিকেরা শুরুতে শৈবধর্মের উপাসক ছিলেন অর্থাৎ শিবের উপাসক হলেও পরবর্তীকালে শাক্ত উপাসক হয়ে ওঠেন। গন্ধেশ্বরী দেবীর প্রকৃতির সাথে দেবী দুর্গার অনেক সাদৃশ্য আছে। উভয়েই সিংহবাহিনী এবং অসুরমর্দিনী। পৃথিবীতে বণিক সমাজ এই পঞ্চভূতের পণ্যরূপ নিয়েই বাণিজ্য করেন। বাণিজ্য করার সময় ভুলবশত যদি কোনো পাপ কর্ম করে থাকেন তবে সেই পাপের প্রায়শ্চিত্ত করা হয়ে যায় পূজার মাধ্যমে। গন্ধবণিক সমাজে অনেক সেবামূলক কর্মযজ্ঞ আছে।

শ্রী শ্রী চণ্ডীতে আদি শক্তি পরমেশ্বরী দেবীগণে পরিবৃত হয়ে যখন শুম্ভাসুরের সাথে যুদ্ধ করেছিলেন তখন শুম্ভদেবীকে ক্রুদ্ধ হয়ে বলে, রে অহঙ্কারী! তুমি অন্য দেবীদের সাহায্য নিয়ে যুদ্ধ করে চলেছো। অতি মানিনী হয়ো না। তা শুনে মহাশক্তি বলেন, আমি ছাড়া এ জগতে দ্বিতীয় কে আছে? দেখ, এই সবই আমার বিভূতি। তাই এরা সবাই আমার মধ্যে লীন হচ্ছে। এরপর সকল দেবী মূল আদি শক্তির মধ্যে বিলীন হয়ে যায়। শাক্ত মতে, এর তাৎপর্য হলো, এই যে ভিন্ন রূপে প্রতীয়মান হলেও তত্ত্বত সব কিছুই মহাশক্তির বহিঃপ্রকাশ। সকল দেবী একটি মহাশক্তি হতে নির্গত হয়েছেন। গন্ধেশ্ব^রী দেবী দুর্গতী নাশিনী।

মহানন্দীশ্বর পুরাণে পাওয়া যায়, সুভূতির ঔরসে ও তপতী-নাম্নী রাক্ষসীর গর্ভে মহাদেবের বরে ত্রিভুবন বিজয়ী ও মহাবলশালী হয়ে জন্মগ্রহণ করেন গন্ধাসুর। বৈশ্যকন্যা সুরূপাকে হরণ করতে গিয়ে বৈশ্যগণ কর্তৃক অপমানিত তিরস্কৃত ও হৃতসর্ব্বস্ব হন গন্ধাসুরের পিতা সুভূতি। পিতার সেই অপমানের প্রতিশোধ নিতে গন্ধাসুর বৈশ্যবংশ ধ্বংস করতে প্রবৃত্ত হন। তার অনুচরগণ একদিন সুবর্ণবট নামক এক বৈশ্যকে বধ করেন। তার পূর্ণগর্ভা পত্নী চন্দ্রাবতী গর্ভস্থ শিশুকে রক্ষা করতে অরণ্যে প্রবেশ করেন। পথশ্রমে ক্লান্ত হয়ে তিনি অরণ্য মধ্যে একটি কন্যা প্রসব করেন।

সর্ব্বজ্ঞ মহর্ষি কশ্যপ ধ্যানযোগে জানতে পারেন, চন্দ্রাবতীর গর্ভে দেবী বসুন্ধরার অংশাবতার জন্মগ্রহণ করেন। তাই চন্দ্রাবতীর কন্যাকে নিজের আশ্রমে প্রতিপালন করতে থাকেন। গুণজ্ঞ মহর্ষি সৌরভময়ী কন্যার নাম রাখেন গন্ধবতী। পঞ্চদশী গন্ধবতী পিতার নিধন ও অরণ্য মধ্যে মাতার শোচনীয় মৃত্যুর কারণ অসুরগণের বিনাশকামনায় মহামায়ার তপস্যায় নিমগ্ন হন। গন্ধাসুর গন্ধবতীর রূপ-লাবণ্যে আকৃষ্ট হয়ে সসৈন্যে তার আশ্রমে উপস্থিত হন। সেখানে তপস্যা নিমগ্ন গন্ধবতীকে উদ্দেশ্য করে অনেক চাটুবাদ ও ভয়ভীতি প্রদর্শন করেন। তথাপিও গন্ধবতীর তপস্যা ভঙ্গ হলো না। অতপর গন্ধাসুর গন্ধবতীর কেশ স্পর্শ করলো। এবারও তপস্যা ভঙ্গ হলো না। কিন্তু গন্ধবতীর সামনে প্রজ্জ্বলিত হোমকুণ্ড থেকে বহ্নিরাশি প্রজ্জ্বলিত হলো। বহ্নিশিখা সমস্ত আশ্রম ঘিরে ধরলো। এতে গন্ধাসুর ভয় পেয়ে স্থান ত্যাগ করে আশ্রমের বাইরে অপেক্ষা করলেন।

তখন অসুরপতি দেখতে পেলেন, প্রজ্জ্বলিত বহ্নিরাশির মধ্যে সিংহবাহিনী চতুর্ভূজা এক নারীমূর্তি হোমকুণ্ডের পাশে গন্ধবতীর সামনে দাঁড়িয়ে আছেন। অসুর তখনই অস্ত্র নিয়ে সিংহবাহিনী দেবীকে আক্রমণ করলেন। প্রচণ্ড যুদ্ধে দেবী শূলাঘাতে অসুরকে বিনাশ করেন এবং তার দেহ সমুদ্রে নিক্ষেপ করেন। দেবীর ইচ্ছায় অসুরের দেহ গন্ধদ্রব্যেও আকর ভূমি গন্ধ দ্বীপরূপে পরিণত হলো। ভগবান ব্রহ্মা, বিষ্ণু এবং অন্যান্য দেবতাগণ মিলে দেবীর পূজা করলেন। এভাবে গন্ধাসুর নাশিনী দেবী গন্ধেশ্বরী নামে পরিচিতি লাভ করলেন।

বর্তমানে গন্ধেশ্বরী দেবীর পূজা হয় ভক্তের মনে শক্তি জোগানোর জন্য। যাতে বাণিজ্যে বুদ্ধি বাড়ে, ক্রয়-বিক্রয় বাড়ে, আমদানি-রপ্তানি বাড়ে, চাহিদা ও সরবরাহ বাড়ে, সঞ্চয় বাড়ে এবং ব্যবসায়িক শুভবুদ্ধি যেন বাড়ে।

লেখাটির পিডিএফ দেখতে চাইলে ক্লিক করুন: নিবন্ধ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

two × 5 =