ব্রণের সমস্যা থেকে মুক্তি পেতে

নীলাঞ্জনা নীলা

ত্বকের অনেক ধরনের সমস্যার মধ্যে ব্রণ বা একনে হলো সবচেয়ে কমন সমস্যা। ত্বক যতই ভালো হোক না কেন ব্রণের সমস্যায় কখনোই পড়তে হয়নি এমন কাউকে খুঁজে পাওয়া যাবে না। বিশেষ করে ব্রণ বিরক্তির কারণ হয়ে দাঁড়ায় যখন সামনে কোনো বিশেষ আয়োজন ঠিক তখনি ত্বকে উঁকি দেয় ব্রণ। মুখে ব্রণের উঁকিঝুঁকি দেখলে যেন মনে হয় যতই সাজসজ্জা করা হোক না কেন দেখতে ভালো লাগবে না। তবে রাতারাতি তো ব্রণ ভালো করা সম্ভব না, কিন্তু ত্বকের সঠিক যত্ন নিলে ব্রণ ওঠার প্রবণতা কমে আসে। ব্রণ উঠলেও দ্রুত তা সেরে যায়। অনেকে মনে করে থাকে ব্রণ বুঝি শুধু মুখে ওঠে, কিন্তু তা নয়। দেহের বিভিন্ন স্থানে ব্রণ উঠতে পারে, মুখের পাশাপাশি অনেকের পিঠেও প্রচুর ব্রণ উঠে থাকে। পিঠে ব্রণ উঠার কারণ হচ্ছে অতিরিক্ত ঘাম। গ্রীষ্মকালে দেহের বিভিন্ন স্থানে ঘামের কারণে ব্রণ ওঠার প্রবণতা বেড়ে যায়। জেনে নেওয়া যাক ব্রণ সমস্যা থেকে মুক্তি পাওয়ার উপায়।

ব্রণ কি

মূলত ব্রণ দেখা দেয় তেলগ্রন্থি বন্ধ হয়ে যাওয়ার ফলে। সেবাসিয়াস গ্রন্থি সেবাম নামে এক প্রকার তৈলাক্ত পদার্থ নিঃসরণ করে যা ত্বককে মসৃণ রাখে। কোনো কারণে সেবাসিয়াস গ্রন্থির নালির মুখ বন্ধ হয়ে গেলে সেবাম নিঃসরণে বাধার সৃষ্টি হয় এবং তা ভেতরে জমে ফুলে উঠে যা ব্রণ নামে পরিচিত। ব্রণ ওঠার বিভিন্ন কারণ রয়েছে তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য কারণগুলো হলো:

হরমোনাল

ব্রণ ওঠার অন্যতম কারণ হচ্ছে হরমোন। সেজন্য বয়সন্ধিকালে ছেলেমেয়েদের মধ্যে ব্রণের প্রবণতা খুব বেশি দেখা যায়। কারণ এ সময় শরীরে হরমোনের বড় একটি পরিবর্তন আসে। বয়স ১৪ থেকে ১৯ এর মধ্যে মুখে ব্রণ দেখা দিলেও সময় ও বয়স বাড়ার সাথে সাথে তা নিজে থেকেই কমে যেতে থাকে। এছাড়া আরো কিছু সময় হরমোনের পরিবর্তন হয়। যেমন মেয়েদের মাসিক ও গর্ভধারনের সময়। মাসিকের আগেও অনেকের মুখে ব্রণ দেখা দেয়। হরমোনের তারতম্য ঠিক হয়ে আসলে তা আবার ঠিক হয়ে যায়। এছাড়া কিছু হরমোনজনিত রোগ রয়েছে সেক্ষেত্রেও ব্রণের প্রবণতা লক্ষ্য করা যায়। বিশেষ করে পলিসিস্টিক ওভারি সিনড্রোমে আক্রান্ত হলে হরমোন রিলিজ হতে সমস্যা হয় ও যার প্রভাব ত্বকে পড়ে। পলিসিস্টিক ওভারির অনেকগুলো লক্ষণের মধ্যে মুখে অতিরিক্ত ব্রণ একটি লক্ষণ। চিকিৎসক আলট্রাসনোগ্রাফি ও রক্ত পরীক্ষার মাধ্যমে এ রোগ শনাক্ত করে থাকেন।

তৈলাক্ত ত্বক

সব ধরনের ত্বকেই ব্রণ দেখা দেয়। তবে সবচেয়ে বেশি ব্রণের সমস্যার মধ্যে পড়তে হয় তৈলাক্ত ত্বকের অধিকারীদের। ত্বকে থাকা সেবাসিয়াস গ্রন্থি থেকে অতিরিক্ত সিবাম উৎপাদনের জন্য ত্বক তৈলাক্ত হয়। এই গ্রন্থি ত্বক কোমল রাখতে সাহায্য করে। কিন্তু অতিরিক্ত পরিমাণে রিলিজ হলে ত্বকে নানা ধরনের সমস্যা দেখা দেয়। বিশেষ করে গ্রন্থি বন্ধ হয়ে গিয়ে অক্সিজেনের অভাবে ব্রণ ওঠা শুরু করে।

ভুল প্রসাধনী ব্যবহার

আমরা অনেক সময় লোভনীয় বিজ্ঞাপন দেখে কিংবা অন্য কেউ ব্যবহার করে উপকার পাচ্ছে শুনে যেকোনো ধরনের মেকআপ কিংবা স্কিন কেয়ার সামগ্রী ব্যবহার করা শুরু করি। কিন্তু এতে ত্বকের উপকার হওয়ার চেয়ে বরং ক্ষতি হয়। কারণ সব ধরনের সামগ্রী সবার জন্য উপযোগী না, ত্বকের ধরন ও সমস্যা না বুঝে হুটহাট যেকোনো ধরনের সামগ্রী ব্যবহার করলে ব্রণ উঠতে পারে। আবার অনেকে দীর্ঘদিন এক ধরনের সামগ্রী ব্যবহার করে হঠাৎ করে সামগ্রী পরিবর্তন করে ফেলে, এতেও মুখে ব্রণ উঠতে পারে।

জীবনযাত্রা

অনেক সময় ব্রণ হবার সঠিক কারণ খুঁজে পাওয়া যায় তখন খেয়াল করলে দেখা যায় জীবনযাত্রা এলোমেলো। যেমন পর্যাপ্ত পরিমাণে না ঘুমানো। অনেকেই রাত জেগে থাকে যার ফলে মুখে ব্রণ উঠতে পারে। আবার অতিরিক্ত জাংক ফুড কিংবা তৈলাক্ত খাবার ব্রণের প্রবণতা বাড়িয়ে দেয়। পানি কম পান করলে কোষ্ঠকাঠিন্যর মতো সমস্যা হতে পারে, কোষ্ঠকাঠিন্য থেকেও মুখে ব্রণ উঠতে পারে।

মানসিক চাপ

কোনো বিষয় নিয়ে অতিরিক্ত দুশ্চিন্তা করলে ও মানসিক চাপের মধ্যে থাকলে মুখে ব্রণ ওঠা সহ নানা ধরনের ত্বকের সমস্যা হতে পারে। উল্লেখযোগ্য কারণ ছাড়াও বিভিন্ন ঔষধের পার্শ্ব প্রতিক্রিয়া এবং ত্বকের বিভিন্ন অসুখের কারণে মুখে অতিরিক্ত ব্রণ দেখা দিতে পারে।

ফাংগাল একনে

এই ধরনের একনে ফাংগাস আক্রমণের কারণে হয়। আমাদের ত্বকে ম্যালাসিজিয়া ইস্টের মাত্রা বেড়ে যাওয়ার কারণে ফাংগাল একনে হয়ে থাকে, ম্যালাসিজিয়া এক ধরনের ফাংগাস। স্যাঁতসেঁতে আবহাওয়াতে ফাংগাল একনে বেশি হয়ে থাকে। দীর্ঘ সময় ধরে অ্যান্টি বায়োটিক সেবন কিংবা ত্বকে ব্যবহারের ফলে ফাংগাল একনে বেড়ে যেতে পারে। সঠিকভাবে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার অভ্যাস না থাকার কারণে ফাংগাল একনে হতে পারে। সাধারণ একনে থেকে ফাংগাল একনের তফাত হচ্ছে এটি ছোঁয়াচে। ফাংগাল একনে আছে এমন কারো সংস্পর্শে আসলে ফাংগাল একনে হতে পারে। ফাংগাল একনে অনেক বেশি চুলকায়। যাদের মাথায় বেশি খুশকি থাকে তাদের ফাংগাল একনে হতে পারে। শীতকালে চুলে খুশকির সমস্যা দেখা দেয়। তাই বছরের অন্যান্য সময়ের তুলনায় শীতকালে ফাংগাল একনে সবচেয়ে বেশি লক্ষ্য করা যায়।

ব্রণ থেকে মুক্তি পেতে করণীয়

১. পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতা

পরিষ্কার থাকার বিকল্প কিছু হতে পারে না। পানি দিয়ে নিয়মিত মুখ পরিষ্কার রাখতে হবে। এছাড়া ত্বকের ধরনের সাথে মানানসই ফেইসওয়াশ ব্যবহার করতে হবে। অনেকেই মেকআপ ঠিক করে তুলে না, ভালো করে ত্বক থেকে মেকআপ তোলা অনেক বেশি প্রয়োজন। ত্বকে মেকআপ থাকলে ব্রণ উঠতে পারে। তাই নারকেল তেল কিংবা অলিভ ওয়েল দিয়ে ভালো করে মেকআপ তুলে নিতে ফেলতে হবে। অতিরিক্ত ধুলাবালির মধ্যে গেলে মাস্ক ব্যবহার করতে হবে। এতে করে ত্বককে কিছুটা হলেও ময়লা থেকে রক্ষা করা যাবে। বাইরে থেকে ফিরে মুখ ভালো করে পরিষ্কার করে নিতে হবে। পিঠ, পেট সহ অন্যান্য স্থানের ব্রণ থেকে মুক্তি পেতে চাইলে প্রতিদিন গোসল করতে হবে ও ঘামযুক্ত পোশাক বেশিক্ষণ পরে থাকা যাবে না।

২. ঘরোয়া রূপচর্চা

একটা সময় মানুষ শুধু রান্নাঘরে থাকা উপাদান দিয়ে বিভিন্ন প্যাক বানিয়ে প্রাকৃতিকভাবে নিজেদের রূপচর্চা করত। ব্রণ সমস্যা দূর করার জন্যও ঘরোয়া পন্থা অবলম্বন করা যেতে পারে। যেমন খাঁটি মধু। মধু শুধু ব্রণ না ত্বকের যেকোনো সমস্যা থেকে মুক্তি দিতে পারে। মধুতে থাকে অ্যান্টি মাইক্রোবিয়াল প্রপার্টি, যা ব্রণ দূর করতে সাহায্য করে। তেল চিটচিটে ত্বকের জন্য শসার রস দিয়ে ঘরেই তৈরি করে নিতে পারেন প্রাকৃতিক টোনার। শসার রস ত্বককে হাইড্রেটিং রাখবে ও তেল দূর করতে সাহায্য করবে।

৩. জীবনযাত্রা ও খাদ্যাভ্যাস

জীবনযাত্রার একটি খুব বড় প্রভাব আমাদের ত্বকের উপর পড়ে থাকে। তাই খাদ্যাভ্যাসে পরিবর্তন নিয়ে আসা অনেক বেশি জরুরি। যদি মুখে ব্রণ ওঠার প্রবণতা থাকে তৈলাক্ত খাবার পুরোপুরি এড়িয়ে চলতে হবে। খাদ্য তালিকায় শাকসবজির পরিমাণ বেশি করে রাখতে হবে। ভিটামিন সি ত্বকের বিভিন্ন ইনফেকশন দূর করতে সাহায্য করে। তাই ফাংগাল একনের জন্য অবশ্যই ভিটামিন সি খেতে হবে। ফাংগাল একনে থাকলে প্রতিদিন এক বাটি টক দই খেতে হবে, টক দই ব্যাকটেরিয়ার বিরুদ্ধে লড়াই করে।

৪. হরমোনের চিকিৎসা নিতে হবে

হরমোনজনিত কারণে ব্রণ উঠলে ঘরোয়া বা অন্যান্য পদ্ধতি অবলম্বন করে খুব একটা উপকার হয় না। সেক্ষেত্রে চিকিৎসকের পরামর্শ নিয়ে হরমোনের চিকিৎসা নিতে হবে। চিকিৎসক পরীক্ষা-নিরীক্ষার মাধ্যমে হরমোনের সমস্যা আছে কি না তা শনাক্ত করবেন ও সঠিক চিকিৎসা দিবেন। হরমোনজনিত ঔষধ খেয়ে হরমোন ব্যালেন্স করার পরে এ ধরনের ব্রণ অনেকটা কমে আসে। মাসিকের আগে ব্রণ উঠলে তা নিয়ে খুব চিন্তিত হবার কারণ নেই, মাসিক শেষ হয়ে হরমোন ব্যালেন্স হলে এমনিতেই ব্রণ কমে যাবে।

লেখাটির পিডিএফ দেখতে চাইলে ক্লিক করুন: আরশি

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

one × two =