যে জীবন অধিকারের মুখ দেখেনি আজও

ঋষিকা

সমাজে নানান পেশার মানুষ বসবাস করেন। তাদের জীবনের গল্প আর পরিণতি এক এক রকম। একটা সুস্থ জীবন বলতে আমরা বুঝি, সুস্থ স্বাভাবিক স্বাস্থ্য, জীবিকার জন্য একটা চাকরি আর একটি পরিবার। অনেকের জীবনের এই সমীকরণটা ঠিক মেলে না। তাদের জীবনের সমীকরণ বা পরিণতি কিছুটা ভিন্ন। এই ভিন্নতাই তাদের সমাজের চোখে অন্যরকম করে তোলে। সমাজের কেউ কেউ তাদের ব্যবহার করে, আবার তাদেরকে সভ্য সমাজ থেকে অপমান করে সমাজ ছাড়া করতেও দ্বিধা করে না। অনেকে পেটের দায়ে, অনেকে নিয়তির কাছে হেরে গিয়ে সমাজের এমন কিছু পেশা বরণ করতে বাধ্য হন যা সমাজের কাছে সমাজ ও নিয়ম বহির্ভূত। তাদের কষ্টের কথা গল্প সিনেমা হিসেবে বিক্রি হলেও তাদের সমাজে কেউ জায়গা দেয় না। তারা অচ্ছুৎ, অসামাজিক। তারা সমাজের একটা শ্রেণির মানুষের কাছে প্রয়োজনীয়। তবে দিনের আলোতে তারা সমাজের কলঙ্ক। তাদের পরিচয় তারা যৌনকর্মী।

ইতিহাস ঘাটলে দেখা যায়, প্রাচীনকাল থেকেই যৌনপেশা চলে আসছে। বাংলা সাহিত্যের আদি নিদর্শন চর্যাপদেও এ পেশার উল্লেখ রয়েছে। এ ছাড়া বিভিন্ন ধর্মগ্রন্থেও এ পেশা সম্পর্কে সতর্ক করা হয়েছে। ধর্মীয় বা সামাজিক দৃষ্টিতে যৌনপেশা নিকৃষ্ট কাজের অন্তর্গত। এদেরকে সমাজে ঠাঁই দেওয়া না। কী দরকার তাদের মতো নষ্ট-ভ্রষ্টদের? তারচেয়ে বরং এদের আস্তা-কুড়ে ফেলে দেওয়া হোক; এমন মনোভাব পোষণ করে সমাজ। তবে মানবিক দৃষ্টিভঙ্গিতে এ পেশাকে অনেক দেশ স্বীকৃতিও দিয়েছে।

১৯৭০ এর দশকে ফরাসি পুলিশ যৌনকর্মীদের কাজ গোপনে করতে বাধ্য করেছিল। যার কারণে যৌনকর্মীদের সুরক্ষা কমে যায়। এতে করে তাদের সমস্যার মুখে পড়তে হচ্ছিল। দীর্ঘদিন বিভিন্ন সমস্যা সইতে হয় তাদের। এক পর্যায়ে এই অত্যাচার সহ্য করতে না পেরে তারা মিলিতভাবে আওয়াজ তোলেন। এক পর্যায়ে যৌনকর্মীরা তাদের জীবনযাপনের অবস্থা তুলে ধরেন। ন্যায় বিচারের দাবিতে অনড় থেকে ১৯৭৫ সালে ২ জুন ফ্রান্সের লিওনে প্রায় ১০০ জন যৌনকর্মী সেন্ট নিজিয়া চার্চ দখল করে ধর্মঘট শুরু করেন। এই পদক্ষেপ একটি জাতীয় আন্দোলনের জন্ম দেয়। সেন্ট নিজিয়ার চার্চের যৌনকর্মীরা পুলিশি হয়রানির অবসান, তাদের কাজের জন্য হোটেল পুনরায় চালু করা ও যৌনকর্মীদের হত্যার সঠিক তদন্তের দাবিতে ধর্মঘট করেন। দখলের ৮ দিন পর, ১০ জুন, পুলিশ জোরপূর্বক গির্জা থেকে নারীদের সরিয়ে দেয়। কিন্তু এই ঘটনার মাধ্যমে যৌনকর্মীদের অধিকারের জন্য তাদের একটি আন্তর্জাতিক আন্দোলনের সূচনা হয়। ১৯৭৬ সাল থেকে প্রতি বছর ২ জুন দিনটি ইউরোপ এবং সারাবিশ্বে আন্তর্জাতিক যৌনকর্মী অধিকার দিবস হিসেবে পালিত হয়। ২ জুন আন্তর্জাতিক যৌনকর্মী দিবস। যৌনকর্মীরা প্রতিমুহূর্তে কঠিন সমস্যার সম্মুখীন হচ্ছেন, সেই বিষয়ে সচেতনতা বাড়ানোই এ দিবস পালনের উদ্দেশ্য।

জার্মান ভাষায়, এটি ‘হারানট্যাগ’ (পতিতা দিবস) নামে পরিচিত। স্প্যানিশ ভাষায় বলা হয় ‘দিয়া ইন্টারন্যাশনাল ডি লা ট্রাবাজডোরা সেক্সুয়াল’। ২০১১ সালের ২৯ মে জার্মানির বোখুমে, ‘ঘর ছাড়া নারী’ শিরোনামের একটি পাঠচক্রে দেখানো হয়েছে যে ১৯৭৫ সাল থেকে যৌনকর্মীদের অবস্থার কোনো উন্নতি হয়নি। পাঠটি প্রতিবেশী শহর ডর্টমুন্ডের সেই যৌনকর্মীদের জন্য উৎসর্গ করা হয়েছিল, যারা ১৯৭৫ সালে লিয়নের যৌনকর্মী হিসেবে নির্যাতিত হয়েছিল। ২ জুন ছাড়াও ৩ মার্চ, আন্তর্জাতিক যৌনকর্মী অধিকার দিবস। ১৭ ডিসেম্বর যৌনকর্মীদের বিরুদ্ধে সহিংসতা বন্ধের আন্তর্জাতিক দিবস।

ভারতে কলকাতায় ২০০১ সালের ৩ মার্চ কয়েক হাজার যৌনকর্মী তাদের অধিকার আদায়ে এক বিরল সমাবেশের আয়োজন করেন। বিক্ষোভে অংশ নিয়েছিল তিন হাজারের উপর যৌনকর্মী। সঙ্গে ছিল তাদের সন্তানরা। ভারতের একজন শীর্ষস্থানীয় এইচআইভি বিশেষজ্ঞ ড. স্মরজিৎ জানা কলকাতার যৌনকর্মীদের সাহায্য করেছিলেন এই সমাবেশ আয়োজনে। সেটি ছিল দক্ষিণ এশিয়ায় যৌনকর্মীদের নিজ উদ্যোগে এধরনের প্রথম আন্দোলন এবং ওই আন্দোলনের ফলশ্রুতিতে এরপর থেকে প্রতিবছর ৩ মার্চ পালন করা হয় যৌনকর্মীদের অধিকার দিবস। ১৯৯০ থেকে ড. জানা কলকাতার যৌনকর্মীদের সাহায্য করে আসছেন। ১৯৯৫ সালে তার সহায়তা নিয়ে যৌনকর্মীরা গড়ে তোলেন ‘দুর্বার মহিলা সম্বন্বয় কমিটি’ নামে একটি সংস্থা। যাতে এর মাধ্যমে তারা তাদের দাবিদাওয়া তুলে ধরতে পারেন। ২০২২ সালে ভারতের সুপ্রিম কোর্ট যৌনকর্মকে পেশা হিসেবে স্বীকার করে নির্দেশিকা জারি করে। তারা যৌনকর্মীদের মর্যাদা এবং সাংবিধানিক অধিকারের কথা তুলে ধরে।

সেলুলয়েডের পর্দায় নানাভাবে নানা আঙ্গিকে বারবার ফুটে উঠেছে যৌনপল্লীর ভয়ংকর গল্পগুলো। উঠে এসেছে দেশভাগ আন্দোলনের মতো বড় বড় বিপ্লবে তাদের অবদানের গল্প। উঠে এসেছে সমাজে নিভৃতে কিছু মানুষের চাহিদা পূরণের জন্য ধীরে ধীরে বড় হয়ে ওঠা যৌনপল্লীর রাতের গল্প। তাদের জীবনের বিল্পব, জীবন নিয়ে তাদের দর্শন; তাদের এই অভিশপ্ত জীবনের শুরুর দিকের ঘটনা। কিন্তু কোথাও যেন কোনো কাজের কথা হচ্ছে না। কেউ বলছে না তাদের অধিকারের কথা। তাদের মৌলিক চাহিদাগুলো পূরণ করার কথা। গণস্বাস্থ্য সংস্থার জরিপ অনুযায়ী, দৌলতদিয়া যৌনপল্লিতে প্রায় ১ হাজার ৩০০ জন যৌনকর্মীসহ প্রায় চার হাজার মানুষ বাস করেন। তারা প্রত্যেকে এইচআইভি/এইডসসহ নানা যৌন রোগের ঝুঁকিতে আছেন। সর্বশেষ গত আগস্ট মাসের সমীক্ষা অনুযায়ী, দৌলতদিয়ায় তিনজন যৌনকর্মী এবং স্থানীয় দুজন পুরুষ খদ্দেরসহ মোট পাঁচজন এইচআইভি সনাক্ত হয়েছেন।

যৌনকর্মী নারীদের অবদান ও জীবনের কঠিন সত্য গল্পগুলো অবশ্যই উঠে আসা উচিত। ইতিহাস তাদের অবদানকে অস্বীকার করলেও তাদের অবদান যুগে যুগে মানুষের মনে গল্প, উপন্যাস কিংবা সিনেমার মাধ্যমে উঠে আসাও বাঞ্ছনীয়। তবে কেন বলা হবে না তাদের অধিকারের কথা। মানুষ হিসেবে তাদের মানবাধিকারের কথাও উঠে আসা উচিত ব্যাপক আকারে। লালন ফকির বলেছিলেন, ‘গোপনে যে বেশ্যার ভাত খায় তাতে ধর্মের কী ক্ষতি হয়?’ হ্যাঁ, গোপনে গোপনে অনেকেই যৌনকর্মী লালন-পালন করছেন। তাদের দিয়ে টাকা রোজগার করে গাড়ি-বাড়ির মালিক হচ্ছেন। তারা কিন্তু এই সমাজেরই অংশ হয়ে আছেন। তাদের কোনো ক্ষতিই হয় না। তাদের ধর্মেরও কোনো ক্ষতি হয় না। তাদের কোনো দোষও নেই! এই মনোভাব থেকেও বেরিয়ে আসতে হবে আমাদের সমাজকে। আজও যৌনপল্লী থেকে মাসহারা আসে অনেকের কাছে, তবুও তারা থেকে যান পাপের উর্ধ্বে।

লেখাটির পিডিএফ দেখতে চাইলে ক্লিক করুন: নিবন্ধ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

16 + 17 =