সরল আবেগের ঘরে ফেরার এক গান

ঋষিকা 

‘ঈদে বাড়ি যাচ্ছেন? কানে হেডফোন? কোন গান শুনছেন?’ এই তিনটি প্রশ্ন ছুড়ে দিয়ে যদি একটা জরিপ করা হয় তাহলে হয়তো বেশিরভাগ মানুষই বলবেন একটি গানের কথা। ঈদে বাড়ি ফেরা বেশিরভাগ মানুষের প্লে লিস্টে এই গানটি গত কয়েক বছর যাবত আছেই আছে। গানটি কী বলতে পারেন? হ্যাঁ, ‘স্বপ্ন যাবে বাড়ি’। ‘স্বপ্ন যাবে বাড়ি’ শিরোনামের গানটি শুনলে ঘরে ফেরা যেকোনো মানুষের মনে হবে গানটিতে আমার কথাই বলা হয়েছে। গানটিতে আছে এক অদ্ভুত মাদকতা, এক আচ্ছন্ন করার যাদু। এই যাদু ঘরে ফেরা যেকোনো মানুষকে বশ করে। সবাইকে ইমোশনাল করে, তার অতীতের সরল কৈশোরে নিয়ে যায়। সেই শহরের খুব কাছাকাছি নিয়ে যায় যে শহরে সে বড় হয়েছে। একটা সময় পর শহর, বাড়ি বদলালেও ঈদে যখন মানুষ এই শহরটাতেই ওই মানুষগুলোর কাছেই ফেরে, তখন এই গানটাই যেন আসলেই হয়ে ওঠে তাদের ঘরে ফেরার গান।

আবেগের এই গানের জন্ম

গানটি বানানো হয় বিজ্ঞাপন প্রচারের জন্য। খুব ছোট্ট একটি বিজ্ঞাপন ভিডিও। যেখানে যোগাযোগকে সহজ করার কথা বলে একটি সিমের বিজ্ঞাপন করা হয়েছিল। ২০০৯ সালে গ্রামীণফোনের জন্য এমন এই গানের সুর বাঁধেন হাবিব ওয়াহিদ। গানটির সংগীতায়োজনও তারই করা। গানের কথা লেখেন গ্রামীণফোনের তৎকালীন কর্মকর্তা আনিকা মেহজাবীন। গানটিতে কণ্ঠ দেন সংগীতশিল্পী মিলন মাহমুদ। একটি ছোট্ট চিত্রনাট্য তৈরি করে স্বাভাবিক নিয়মেই তৈরি হয় ঈদের ঘরে ফেরার গল্প নিয়ে একটি বিজ্ঞাপনচিত্র। যেখানে দেখা যায় জীবিকার তাড়নায় নিজের শহরের বাইরে থাকা মানুষ ঘরে ফিরছে। কেউ বাসে, কেউ ট্রেনে, কেউবা ট্রাকে করে। সবার গন্তব্য এক, বাড়ি ফেরা। সেখানেই আছে ছোট ছোট অসংখ্য গল্প। বিজ্ঞাপনচিত্রটি টেলিভিশনে প্রচারের পরপরই দর্শকমহলে সাড়া ফেলে। শেকড়ের টানে ঘরে ফেরা মানুষ এই গানের মধ্য দিয়ে তাদের আবেগকে খুঁজে পায়। যার ফলে অল্প সময়ের ব্যবধানে গানটি দর্শকের হৃদয়ে গেঁথে যায়।

বছর ঘুরে গানের পুনর্জন্ম

২০১৬ সালে গানটি আবারও ঘুরে আসে দর্শকদের সামনে। এবারেও হাবিব ওয়াহিদের সুর ও সংগীতায়োজনে তৈরি হয় ‘স্বপ্ন যাবে বাড়ি ২’ শিরোনামে আরও একটি গান। এবারে গানটি লেখেন রাসেল মাহমুদ আর গানটিতে কণ্ঠ দেন শিল্পী মিঠুন চক্র। এবারেও গানটি ছুঁয়ে যায় দর্শকের মন। এবারের গানটি আরও অনেক আবেগ আর স্মৃতি মনে করিয়ে দেয় মানুষকে। ২০২২ সাল থেকে গ্রামীণফোন প্রতিবছর ঈদের এই গানটি নিয়ে বিজ্ঞাপনচিত্র করে আসছে। প্রতি বছরেই নতুন নতুন থিম আর গল্প নিয়ে তৈরি হয় এই গানের ভিডিওচিত্র।

এক ঝলকে ফেলে আসা স্মৃতি

‘স্বপ্নটানে দিলাম পাড়ি, অচিন পথে আপন ছাড়ি’ এমন কথা দিয়ে শুরু হয় গানটি। ধীরে ধীরে গানটি বলে যায় কিভাবে জীবিকার তাগিদে মানুষ তার প্রিয় মুখ আর চিরচেনা শহরটাকে ছেড়ে একটা অজানা পথে পাড়ি দেয়। তার চোখে থাকে অপার স্বপ্ন আর পরিবারকে ভালো রাখার অদম্য ইচ্ছা। গানের কথাতেই আছে, ‘পেছন ফেলে উঠান বাড়ি, প্রিয় মুখ আর স্মৃতির সারি’।  সারা মাস কাজ করে সেই মানুষটা অপেক্ষা করে ঈদে বাড়ি ফিরে যাওয়ার। যিনি হতে পারেন একজন রিকশা চালক, হতে পারেন একজন ডাক্তার, একজন শিক্ষার্থী অথবা যেকোনো পেশার কেউ। সবার স্বপ্ন একটাই, পরিবারকে ভালো রাখা। পরিবারের জন্য মাসের পর মাস কষ্ট করে তাদের ছেড়ে থাকা এই মানুষগুলো যখন বাড়ি ফেরে, তখন তাদের ভেতরে চলতে থাকে অসীম এক আবেগ, যার কোন মূল্য হয় না। অন্যদিকে তার বাড়ি ফেরা নিয়ে অধীর আগ্রহে অপেক্ষায় থাকে তার পরিবার। তার বাবা, মা, ভাই, বোন, স্বামী কিংবা স্ত্রী আর আদরের সন্তান। অবশেষে, ‘মন ভরে চল ফিরে আবার, স্বপ্ন যাবে বাড়ি আমার।’

যাদের শুধু স্বপ্নই বাড়ি যায়!

শুধুমাত্র যারা বাড়ি ফেরেন তাদের কথাই গানটিতে বলা হয়েছে এমন না। এখানে তাদের কথাও বলা হয় যারা পেশা কিংবা অন্যকোনো কারণে বাড়ি ফিরতে পারেন না। তারা না ফিরলেও তাদের বাড়িতে ঠিকই চলে যায় তাদের ভালোবাসা। এই ভালোবাসার বহিঃপ্রকাশ হিসেবে সন্তানের খেলনা, মায়ের জন্য শাড়ি, বাবার জন্য পাঞ্জাবি, বোনের জন্য জামা, ভাইয়ের জন্য শার্ট আর স্বামী কিংবা স্ত্রীর জন্য তার প্রিয় জিনিসটা ঠিকই পৌঁছে যায় বাড়িতে।  বিজ্ঞাপনচিত্রের মাধ্যমে প্রতিবছর এমন কিছু গল্প তুলে ধরা হয় দর্শকের সামনে। এমন মানুষগুলোর গল্পও সেখানে থাকে যারা সশরীরে বাড়ি ফিরতে না পারলেও তাদের স্বপ্নটা ঠিকই বাড়ি ফিরে যায়। সেই উঠান, সেই মানুষ, সেই বাড়ি আর সেই স্মৃতির কাছে।

লেখাটির পিডিএফ দেখতে চাইলে ক্লিক করুন: সুরের মূর্চ্ছনা

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

eleven − 5 =