সাগর বধূ কক্সবাজার আর নারিকেল জিঞ্জিরায় চার দিন

সালেক সুফী

জানুয়ারি ৩০, ২০২৪ সকাল  থেকে ফেব্রুয়ারি ০৩ দুপুর পর্যন্ত চিরজীবন মনে রাখার মতো অভিজ্ঞতা হলো পর্যটননগরী কক্সবাজার এবং প্রবাল দ্বীপ সেন্ট মার্টিনে। ৭০ বছরের জীবনে বাংলাদেশের একপ্রান্ত থেকে অপরপ্রান্ত নিবিড়ভাবে সফর করেছি, অন্তত ৪০টি দেশ ব্যাপক সফর করেছি। সাগর, পাহাড়, বনবনানী চষে বেড়িয়েছি। তবে এবারের সফরটি ছিল নানা কারণেই ব্যতিক্রমধর্মী। এবারের বাংলাদেশ সফরের অন্যতম উদ্দেশ্য ছিল নির্মাণাধীন মাতারবাড়ি গভীর সমুদ্রবন্দর, কোল পোর্ট, তাপ বিদ্যুৎ কেন্দ্র সরেজমিনে পরিদর্শন, দৃষ্টিনন্দন কক্সবাজার রেলওয়ে স্টেশন নির্মাণ শৈলী বিষয়ে অবহিত হওয়া।

একই সঙ্গে সংযুক্ত হলো বাংলাদেশের অন্যতম শীর্ষস্থানীয় পরামর্শক প্রতিষ্ঠান প্রকৌশলি সংসদ লিমিটেড বার্ষিক আয়োজন সেন্ট মার্টিন দ্বীপ পরিদর্শন। পিএসএলের সর্বস্তরের ৮২ জন (কয়েকটি পরিবারসহ) বার্ষিক আয়োজনে যোগদান করে। আমাদের ছোট দলে আমরা বুয়েটের তিনজন প্রকৌশলি, দুই জন স্থপতি এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্দালয়ের একজন অর্থনীতিবিদ ছিলাম। আমি ছাড়া বাকি সবার জন্য ছিল প্রথম মাতারবাড়ি-মহেশখালী সফর। কয়েকটি পর্বে লিখবো অভিজ্ঞতা।

জ্বালানি পেশাদার হিসেবে মাতারবাড়ি মহেশখালী জ্বালানি বিদ্যুৎ হাব নিয়ে গভীর আগ্রহ আছে। প্রকল্পের সূচনায় কয়েকবার পরিদর্শন করেছি। এনার্জি এন্ড পাওয়ার পত্রিকায় কয়েকবার লিখেছি। স্বাভাবিক কারণেই কোল পোর্ট, বিদ্যুৎ কেন্দ্র, এলএনজি টার্মিনাল নির্মাণের সম্ভাব্য স্থান দেখার আগ্রহ ছিল। একই সঙ্গে চট্টগ্রাম-কক্সবাজার রেলওয়ে লাইন বিশেষত দৃষ্টিনন্দন কক্সবাজার স্টেশন নির্মাণ শৈলী বিষয়ে জানার আগ্রহ ছিল।  রেল লাইনের অংশবিশেষ এবং স্টেশন নির্মাণ করেছে বুয়েট অনুজ প্রকৌশলি  গোলাম মোহাম্মদ আলমগীরের কোম্পানি ম্যাক্স গ্রুপ।  যথাসময়ে যথাযথ কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করে কক্সবাজার থেকে মাতারবাড়ি যাতায়াতের বিষয়টি নিশ্চিত করা হয়েছিল।

সময়টা শীতের শেষ আর বসন্তের সূচনা। আবহাওয়া ছিল মনোরম এবং উপযোগী। কোম্পানির শীর্ষস্থানীয় কর্মকর্তাদের সঙ্গে আমি ৩০ জানুয়ারি সকালে বিমান যোগে কক্সবাজার পৌঁছলাম। সূচি অনুযায়ী কক্সবাজার বিমানবন্দরে কোল পাওয়ার জেনারেশন কোম্পানির মাইক্রোবাস আমাদের জন্য অপেক্ষায় ছিল। এলএনজি আমদাান তদারকির দায়িত্বে থাকা পেট্রোবাংলার অন্যতম কোম্পানি আরপিজিসিএল কক্সবাজার ব্যাবস্থাপক ইমতিয়াজ আমাদের সঙ্গে যোগ দিলো।  আমার জানার তাগিদে আরপিজিসিএল এবং জিটিসিএলের স্থানীয় কর্মকর্তাদের সঙ্গে সময় কাটানোর সুযোগ হয়েছিল।

মহেশখালী থেকে জিটিসিএল সিটিএমএস ব্যাবস্থাপক হানিফ মোল্লা আমাদের সাথে মাতারবাড়িতে যোগদান করেছিল। স্পিড বোট নিয়ে কক্সবাজার থেকে সরাসরি মাতারবাড়ি যেতে হলে জোয়ারের সময় যেতে হয়। আমরা ভাটার সময় কক্সবাজার পৌঁছানোর কারণে আমাদের বোটে করে বদলখালী পৌঁছানো হয়। বোট যাত্রা নানা কারণে উপভোগ্য ছিল। যাত্রাপথে আমরা খুরুশকুলে ৬০ মেগাওয়াট ক্ষমতার বায়ু বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্র দূর থেকে দেখলাম।

সাগরে বিস্তৃত কক্সবাজার আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের রানওয়ে সম্প্রসারণ কাজ চোখে পড়লো। কাজটি শেষ হলে অনেক দৃষ্টিনন্দন হবে কক্সবাজার আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর। আমার সঙ্গীরা প্রশ্ন করে অনেক কিছুই জেনে নিলো পেট্রোবাংলা সহকর্মী ইমতিয়াজের কাছ থেকে। প্রবল ডেউয়ের তোড়ে তরঙ্গায়িত বোট ভ্রমণ ছিল উপভোগ্য।  নির্দিষ্ট সময়ে বদলখালী পৌঁছানোর পর সেখান থেকে আবারো সড়ক পথে আমাদের মাতারবাড়ি বিদ্যুৎ কেন্দ্রে নিয়ে যাওয়া হলো।  যাত্রা পথে আমরা মাতারবাড়ি গভীর সমুদ্রবন্দরের সঙ্গে সুপরিসর সংযোগ সড়কের বিশাল কর্মযজ্ঞ দেখলাম।  নির্দিষ্ট সময়ে মাতারবাড়ি পৌঁছানোর পর বিদ্যুৎ কেন্দ্রের প্রধান প্রকৌশলি সক্ষিপ্ত আকারে প্রকল্পের কারিগরী খুটিনাটি, নির্মাণ এবং পরিচালনাগত চ্যালেঞ্জ বর্ণনা করলেন। আমাদের দলে দুইজন যন্ত্রকৌশলি থাকায় জানার আগ্রহ ছিল গভীর।

মাতারবাড়ি কোল পোর্ট, কোল পাওয়ার প্লান্ট কারিগরি দৃষ্টিকোণ থেকে নিঃসন্দেহে একটি আইকনিক স্থাপনা। উপকূল থেকে ১৪ কিলোমিটার দীর্ঘ ৩০০ মিটার প্রশস্থ, ১৮.৫গভীরতার কৃত্রিম খাল খনন করে গভীর সাগরের সঙ্গে সংযুক্ত করায় কোল পোর্টে ৮০,০০০ টন ধারণক্ষম সামুদ্রিক জাহাজ আসতে পারবে। বাংলাদেশের আর কোনো বন্দর চট্টগ্রাম, মংলা বা পায়রায় এই সুবিধা নাই। আমরা সফর করার আগের দিন ৮০,০০০ টন কয়লা বহনকারী জাহাজ কয়লা খালাস করে চলে যায়।

বাংলাদেশে আলট্রা সুপারক্রিটিক্যাল টেকনোলজি ব্যাবহার করা এটি দ্বিতীয় বিদ্যুৎ কেন্দ্র। অপরটি আগে থেকেই চালু আছে পটুয়াখালীর পায়রায়। দুটি বিদ্যুৎ কেন্দ্রেই সম্পূর্ণ আচ্ছাদিত কয়লা সংরক্ষণাগার আছে।  দুনিয়ার হাতে গোনা মাত্র কয়েকটি বিদ্যুৎ কেন্দ্রেই এই সুবিধা আছে। জাহাজ থেকে আচ্ছাদিত কনভেয়র বেল্ট দিয়ে কয়লা জমা হয় আচ্ছাদিত সংরক্ষণাগারে।  এরপর পালভারাইজ করা কয়লা দিয়ে বয়লারে স্টিম তৈরি করে, টারবাইন দিয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদিত করা হয়।

একে উঁচু মানের  (কম সালফার, কম অ্যাশ, উঁচু হিটিং ভ্যালু কয়লা ব্যবহার) তারপরে সালফার দূরীকরণের জন্য এফজিডি এবং নাইট্রাস অক্সাইড দূরীকরণের জন্য বয়লারে লো নক্স বার্নার ব্যবহার করা হয়েছে।  বিদ্যুৎ কেন্দ্রে ব্যাবহৃত পানি শোধন করে ক্লোজ লুপ পদ্ধতিতে রিসাইকেল করা হয় এবং ব্যবহার শেষে সামান্য পানি জলাশয়ে ফেলা হয়। বিদ্যুৎ কেন্দ্রে ড্রাই অ্যাশ কালেকশন টেকনোলজি ব্যবহার করায় অধিকাংশ অ্যাশ সংগৃহীত হয়।  সীমিত পরিমাণ অ্যাশ ২৭৫ মিটার দীর্ঘ চিমনি দিয়ে বাতাসে ছাড়া হয়।  অস্ট্রেলিয়া, জার্মানি, ভারত কোথাও আমার এতো উঁচু চিমনি চোখে পড়েনি। প্লান্ট চালু থাকা অবস্থায় আমরা খালি চোখে অ্যাশ নির্গমন দেখতে পাইনি।

কারিগরি ব্রিফিংয়ের পর আমাদের কোল টার্মিনাল, কোল স্টোরেজ ফ্যাসিলিটি, বয়লার, টারবাইন সবকিছু দেখানো হয়। কর্মরত প্রকৌশলিরা সবার সব প্রশ্নের জবাব দেন। সুযোগ হয় বাংলাদেশের নির্মাণাধীন  অত্যাধুনিক  গভীর সমুদ্রবন্দর, কোল টার্মিনাল এবং সঠিক ভাবে নির্মিত এবং দক্ষ ভাবে পরিচালিত একটি আধুনিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র দেখলাম। জাপানিজ ইপিসি ঠিকাদার নির্মিত প্রতিটি খুঁটিনাটি বিষয়ে অনেক কুশলতার ছাপ দেখলাম।

আপাতত ২x ১২০০ মেগাওয়াট ক্ষমতার প্রথম পর্যায়ের ইউনিটের ৬০০ মেগাওয়াট চালু হয়েছে। অপর ৬০০ মেগাওয়াট ইউনিটটি কমিশনিং পর্যায়ে আছে। আপাতত ইপিসি ঠিকাদার কয়লা আমদানি করে প্লান্ট চালু করেছে।  তবে দীর্ঘস্থায়ী চুক্তির অধীনে কয়লা সরবরাহের জন্য দরপত্র আহ্বান করা হয়েছে। জাপানিজ সরকার একপর্যায়ে এসে দ্বিতীয় পর্যায়ে ১২০০ মেগাওয়াট ক্ষমতার কেন্দ্রটির জন্য অর্থায়ন বাতিল করায় অসুবিধায় পড়েছে বাংলাদেশি কোম্পানি সিপিজিসিবিএল।  কিছু কিছু স্থাপনা দুটি ইউনিটের জন্য স্থাপিত হয়েছে, একমাত্র মাতাবাড়িতেই কয়লা পরিবহনে কোনো সমস্যা নাই। জাতীয় স্বার্থেই বাংলাদেশ সরকার নিজস্ব অর্থায়নে হলেও দ্বিতীয় ১২০০ মেগাওয়াট ক্ষমতার ইউনিট স্থাপন জরুরি।

একটি ১২০০ মেগাওয়াট আল্ট্রা সুপার ক্রিটিকাল পদ্ধতির আধুনিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র দক্ষতার সঙ্গে পরিচালনার জন্য কমপক্ষে দক্ষ, আধা দক্ষ, স্বল্প দক্ষ নিদেনপক্ষে ৪০০-৪৫০ জন জনশক্তি প্রয়োজন। পায়েরা এবং রামপালের মতো কিন্তু মাতারবাড়ি জয়েন্ট ভেঞ্চার কোম্পানি নয়। দেশের স্বার্থে মাতারবাড়ি বিদ্যুৎ কেন্দ্রের জন্য পর্যাপ্ত সংখ্যক কারিগরী কর্মকর্তা নিয়োগ করে তাদের নিয়মিত প্রশিক্ষণের ব্যবস্থাগ্রহণ প্রয়োজন মনে করি। একইসঙ্গে কয়লা কেনার জন্য যেন সময় মতো প্রয়োজনীয় বৈদেশিক মুদ্রা প্রদান করা হয়।

মাতারবাড়ি বসেই সেখানে স্থাপিত এলএনজি ল্যান্ড বেসড টার্মিনাল লোকেশন নিয়ে সিদ্ধান্তহীনতা চোখে পড়ে। পেট্রোবাংলা এবং আরপিজিসিএল কিন্তু ইপিসিএম দরপত্র প্রস্তুত এবং ঠিকাদার সংক্ষিপ্ত তালিকা প্রস্তুত করে বসে আছে। শুরু থেকে এলবিটির জন্য নির্ধারিত স্থান আরপিজিসিএলকে বরাদ্দ দিয়ে উন্নয়ন কাজ প্রকল্পে অন্তর্ভুক্ত হলে কাজ অনেক এগিয়ে যেত।  গ্যাস সংকট থাকা সত্ত্বেও শুধু নির্মাণ স্থান নির্ধারিত না হওয়ায় প্রকল্প ২-৩ বছর পিছিয়ে পড়েছে। বিদ্যমান অবস্থায় দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়া না হলে ২০৩০ সালে নির্মাণ কাজ শেষ হবে কি না সন্দেহ।

পরিদর্শন শেষ হতে হতে আবারো জোয়ার শেষে ভাটা চলে আসায় একই ভাবে বদলখালী হয়ে কক্সবাজার সন্ধ্যার মধ্যে ফেরত আসি। অনুসন্ধানী মনের নানা প্রশ্নের জবাব মেলায় এবং বাংলাদেশের অত্যন্ত সম্ভাবনাময় গভীর সমুদ্রবন্দর দেখে আশাবাদী হওয়ার অনেক কারণ আছে। মাতারবাড়ি গভীর সমুদ্রবন্দর পূর্ণাঙ্গ রূপ নিলে আঞ্চলিক এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে।  ভূরাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ থাকবে। আশা করি ভারসাম্যপূর্ণ বিদেশ নীতি অবলম্বন করে মাতারবাড়ি গভীর সমুদ্রবন্দর, বিদ্যুৎ, জ্বালানি হাবের পূর্ণ সুবিধা নিতে পারবে বাংলাদেশ।

কক্সবাজার ফিরেই আমরা পূর্বনির্ধারিত সূচি অনুযায়ী কক্সবাজার রেল স্টেশন পরিদর্শন করি। ম্যাক্স গ্রুপের প্রকল্প ব্যাবস্থাপক এবং উর্ধ্বতন কারিগরি কর্মকর্তাবৃন্দ আমাদের আইকনিক রেল স্টেশনের অনবদ্য নির্মাণশৈলী বর্ণনা এবং ব্যাখ্যা করেন।  পূর্ণাঙ্গভাবে চালু হলে স্টেশনটি দর্শনীয় স্থাপনা হয়ে উঠবে।  মন ভরে গেলো দেখে বাংলাদেশের একটি প্রতিষ্ঠান এতো আকর্ষণীয় স্থাপত্য কৌশলের স্থাপনা নির্মাণ অংশীদার  দেখে।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

twelve − 4 =