সিলেট টেস্ট জিতে ধবলধোলাই এড়াতে পারবে বাংলাদেশ?

সালেক সুফী

ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিরুদ্ধে দুই ম্যাচের টেস্ট সিরিজ শুরুর আগে বাংলাদেশ ছিল সুবিধাজনক অবস্থানে। আইসিসি টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপের চলমান পর্বে ফাইনাল খেলার ক্ষীণ স্বপ্নও দেখছিল দল। কিন্তু উইকেট প্রস্তুতি, একাদশ নির্বাচন এবং ম্যাচ পরিস্থিতি বিশ্লেষণে ভুলের সম্মিলিত ফল হিসেবে মিরপুর টেস্টে বড় পরাজয় সেই স্বপ্ন অনেকটাই ধূলিসাৎ করেছে। এখন শঙ্কা—সিলেট টেস্টেও হেরে ধবলধোলাইয়ের লজ্জায় পড়তে হবে না তো?

তবু আমি বিশ্বাস করি, সঠিক একাদশ নিয়ে স্পোর্টিং উইকেটে খেললে বাংলাদেশ দ্রুত ঘুরে দাঁড়াতে পারে। ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিরুদ্ধে টেস্ট জিতে সিরিজ সমতায় শেষ করার সামর্থ্য দলের রয়েছে।

সম্প্রতি বর্তমান টেস্ট চ্যাম্পিয়ন দক্ষিণ আফ্রিকা দুর্দান্ত খেলে অস্ট্রেলিয়ার বিরুদ্ধে সিরিজ জিতে আইসিসি টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপের পয়েন্ট তালিকায় পরিবর্তন এনেছে। শীর্ষে এখন নিউজিল্যান্ড, দ্বিতীয় দক্ষিণ আফ্রিকা এবং তৃতীয় অস্ট্রেলিয়া। বাংলাদেশকে পেছনে ফেলে ভারতও উঠে এসেছে ওপরের দিকে। অচিরেই নিউজিল্যান্ডের বিরুদ্ধে ভারতের গুরুত্বপূর্ণ সিরিজ শুরু হবে। শেষ পর্যন্ত শীর্ষে থাকা দলগুলোর মধ্য থেকে দুই দলই ফাইনালে উঠবে—এমনটাই ধারণা করা যায়। বাংলাদেশের ফাইনালে খেলার সম্ভাবনা এখন প্রায় নেই বললেই চলে।

অথচ সাম্প্রতিক অতীতে বাংলাদেশ সব ফরম্যাটেই ভালো খেলছিল। বিশেষ করে টেস্ট ক্রিকেটে দেশে ও বিদেশে কয়েকটি উল্লেখযোগ্য জয় সমর্থকদের নতুন করে স্বপ্ন দেখার সুযোগ করে দিয়েছিল। নাহিদ রানাসহ কয়েকজন বিশ্বমানের পেসারের বিকাশ, কয়েকজন ব্যাটসম্যানের ধারাবাহিক ভালো পারফরম্যান্স এবং দেশের উইকেটের গুণগত পরিবর্তন—সব মিলিয়ে দল এগিয়ে যাচ্ছিল।

তাহলে হঠাৎ সব ফরম্যাটে এই ছন্দপতন কেন? মিরপুরে ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিরুদ্ধে রক্ষণাত্মক পরিকল্পনায় স্পিন-নির্ভর উইকেট তৈরি করে বাংলাদেশ কেন নিজেরাই সেই ফাঁদে পড়ল? নাহিদ রানা না থাকলেও তাসকিন আহমেদ, হাসান মাহমুদ ও শরিফুল ইসলামের মতো পেসার দলে ছিলেন। স্পোর্টিং উইকেট হলে অন্তত বাংলাদেশের জন্য প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক অবস্থান তৈরি করা সম্ভব হতো।

মিরপুরে অসম বাউন্সের স্পিনিং উইকেটে বড় ব্যবধানে পরাজয়ের পেছনে ছিল ভুল পরিকল্পনা ও একাদশ নির্বাচন, ব্যাটসম্যানদের দৃষ্টিভঙ্গি ও কৌশলগত দুর্বলতা, স্পিনারদের ব্যর্থতা এবং দুর্বল ফিল্ডিং। এতগুলো ভুল থেকে দ্রুত বেরিয়ে এসে সিলেটে বাংলাদেশ সিরিজের দ্বিতীয় টেস্ট জিততে পারবে কি না, তা নিয়ে সংশয় থেকেই যাচ্ছে। প্রশ্ন জাগে, বাংলাদেশের ব্যাটসম্যানরা কি ওয়েস্ট ইন্ডিজের দ্রুতগতির বোলারদের ভয় পেয়েছিলেন?

স্বীকার করতেই হবে, বাংলাদেশের ব্যাটসম্যানরা মিরপুরে ভালো ব্যাটিং করেননি। তানজিদ তামিম ও নাজমুল হোসেন শান্ত দুই ইনিংসেই ব্যর্থ হয়েছেন। সাদমান ইসলাম, লিটন দাস, তাওহীদ হৃদয় ও মেহেদী হাসান মিরাজ কেউ এক ইনিংসে ভালো করলেও পরের ইনিংসে দায়িত্বশীলতার পরিচয় দিতে পারেননি। মোমিনুল হক চোটের কারণে দ্বিতীয় ইনিংসে ব্যাট করেননি। আর টেস্ট শুরুর ঠিক আগে চোট পেয়ে মুশফিকুর রহিম খেলতে পারেননি।

সিলেট টেস্টের দলে অমিত হাসানকে নেওয়া হয়েছে। তাঁকে সুযোগ দেওয়া যেতে পারে। মুশফিক ফিরে এলে মিডল অর্ডার আরও সুসংহত হবে। উইকেট যেমনই হোক, আগে ব্যাটিং পেলে বাংলাদেশকে অন্তত ৩৫০–৪০০ রান তুলতে হবে। ভালো সূচনার পর শান্ত, মুশফিক ও লিটনের মধ্যে অন্তত দুজনকে বড় ইনিংস খেলতে হবে। পাশাপাশি প্রয়োজন হবে দুটি বড় জুটি।

আমার পরামর্শ, তাসকিনকে নিয়ে তিন পেসার খেলানো হোক। সে ক্ষেত্রে তিন স্পিনারের মধ্যে নাঈমকে রেখে মিরাজ ও তাইজুল ইসলামের একজনকে বিশ্রাম দেওয়ার কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে হতে পারে। একই সঙ্গে বাংলাদেশের ফিল্ডিংয়ের মানও উল্লেখযোগ্যভাবে উন্নত করতে হবে।

সিলেট টেস্ট বাংলাদেশের জন্য শুধু সিরিজে ধবলধোলাইয়ের লজ্জা এড়ানোর লড়াই নয়; অচিরেই শুরু হতে যাওয়া দক্ষিণ আফ্রিকার বিরুদ্ধে টেস্ট সিরিজের প্রস্তুতিরও গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা। ভুল পরিকল্পনা ও দুর্বলতা কাটিয়ে দল কতটা ঘুরে দাঁড়াতে পারে, তার ওপরই নির্ভর করছে বাংলাদেশের পরবর্তী পথচলা।

সিলেট টেস্ট তাই বাংলাদেশের টেস্ট দলের জন্য এক কঠিন অগ্নিপরীক্ষা।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

eighteen + eleven =