সোনালি শিশুকাল আর দুরন্ত কৈশোরের কথা মনে পড়ছে

সালেক সুফী: নাতি-নাতনিদের সাথে কুইন্সল্যান্ডের লোগান সিটিতে গতকালের আনন্দমুখর ঈদের দিন কাটানোর পর আজ অফুরন্ত অবসর।  জানি আজ বাংলাদেশে ঈদ।প্রিয়জনদের কথা মনে পড়ছে। ভাবতেই কষ্ট লাগছে মাতৃসম বোন শিউলি আপা পরপারে।  গত বছর ঈদের দিনটিতেও দূরালাপনীতে অনেক কথা হয়েছিল। সারাটি জীবন ছাত্রীদের আর ছেলে মেয়েদের নিয়ে সময় কাটানো শিউলি আপা করোনার আঘাত কাটিয়ে আমাদের আরো নিঃস্ব করে ফিরে গেলেন বিধাতার ডাকে সাড়া  দিয়ে। প্রার্থনা করি পরপারে বিধাতার কৃপায় ভালো থাকবেন।

মনে পড়ছে সোনালি শৈশব আর দুরন্ত কৈশোরে ফরিদপুরের ছায়া সুনিবিড়, শান্তির নীড় ইফফাত মঞ্জিলে কাটানো স্মৃতিময় দিন গুলোর কথা।  প্রতিটি মানুষের জীবনেই আসে সোনালি সকাল। প্রিয়জনের আদরে, স্নেহ মমতায় ঘেরা শৈশবের পর আসে সূর্যকিরণে উদ্ভাসিত দুরন্ত কৈশোর। ১৯৬০ দশকের মধুকর গুঞ্জরিত সেই সময়টি কেটেছে আমার ফরিদপুরে। মায়ের নামে নাম “ইফফাত মঞ্জিল” ছিল পুষ্প পল্লবে সুসজ্জিত স্বর্ণ কুঠির। মায়ের সাথে ফুল, সবজির বাগান করতাম।

শীত মৌসুমে ডালিয়া, কসমস, জিনিয়া, দোপাটি ছিল। পুরো বছর জুড়ে ছিল হরেক রকম গোলাপ, বেলি, জুঁই, চামেলি। হাস্নাহেনা, কামিনীর গাছ ছিল। খুব সকালে সূর্য ওঠার আগে ঘুম থেকে উঠে নামাজ পড়তাম, মায়ের কাছে কোরান পড়তাম। এর পর দই চিড়া নাস্তা করে আমাদের হাঁসগুলোর জন্য শামুক কুড়িয়ে এনে চলে যেতাম শ্রদ্ধেয় তারাপদ স্যারের কাছে কোচিং করতে। ফিরে এসে দ্রুত প্রস্তুত হতাম নাস্তা খেয়ে স্কুলে যেতে। আমি যখন স্কুলে ৫-৬ পড়ি বড় আপা শেফালির  বিয়ে হয়ে গাছে। বড় ভাই খুলনায় চাকরি করেন। শিউলি আপা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ছেন। বাবা সদ্য অবসর নিয়ে ফরিদপুর এসে ইনকাম ট্যাক্স ওকালতি করেন আর মডার্ন ফার্মেসি নামের একটি ওষুদের দোকান দিয়েছেন।

আমাদের পাড়াটা ছিল কিন্তু অনেক সমৃদ্ধ। পল্লী কবি জসীম উদ্দীনের শহরের বাড়িটি ছিল আমাদের মহল্লায়, ওনার ভাইয়ের বাড়িও ছিল কাছাকাছি। খান বাহাদুর মোহাম্মদ ইসমাইল নানার বাড়িটিও ছিল কাছাকাছি। ওনার ছেলে মেয়েরা বাংলাদেশ বিখ্যাত ছিলেন। প্রখ্যাত নজরুল সংগীতশিল্পী ফিরোজা খালা এবং দাপুটে আমলা-সংগীতশিল্পী আসিফ দোলা ওনার সন্তান। পাকিস্তান জাতীয় সংসদের স্পিকার তমিজউদ্দিন খানের বাড়িটিও ছিল আমাদের মহল্লায়। আমাদের পাশের বাড়ির প্রতিবেশী নাসিম ( মুক্তিযুদ্ধে শহীদ), তাসলিম, সেলিম, শামীম ইরানি, আরবিদের সঙ্গেই আমাদের ছিল ঘনিষ্ট যোগাযোগ।

স্কুল সময় ছাড়া বাকি সময় কাটতো মূলত পাবলিসিটি মাঠে প্রতিবেশীদের নিয়ে ক্রিকেট, ফুটবল সহ নানা খেলায় আর মানুষের ফল বাগান থেকে ফল চুরি, মার্বেল খেলা, ঘুড়ি উড়ানো নিয়ে। আমাদের মহল্লার অনাথ দাদার বড়ই আচার দেশখ্যাত  ছিল। শাহীন, বাঁকা, রাকা, খুদু, মানুদের কথা মনে আছে। আমাদের একটি ভালো ক্রিকেট, ফুটবল দল ছিল।

তখন পাবলিসিটি অফিস থেকে দেশের নানা তথ্য প্রচারিত হতো।  আরো মনে আছে ডাক হরকরা চিঠি বিলি করতো। একমাত্র সিনেমা হল অরোরা টকিজের নতুন সিনেমার বিজ্ঞাপন প্রচার করতো রিক্সায় করে। প্রতিবেশী বন্ধুদের নিয়ে উত্তম-সুচিত্রার কত সিনামা  বার বার দেখেছি। ছুটির দিনে পুকুরে সাঁতার কাটাতাম, ওয়াটার পোলো জাতীয় কিছু খেলতাম। বন্যায় প্লাবিত হতো প্রতি বছর, ঘরে বসেই বড়শি দিয়ে মাছ ধরা যেত। পুঠি, কৈ,   সিং, পাবদা, টেংরা, সোল্ কত মাছ না ধরেছি বড়শি, টাডা, পলো দিয়ে। সে কি আনন্দ। সেলিম আর আমি একটু বেশি দুরন্ত ছিলাম।

রোজার মাসে সবাই রোজা রাখতাম। আমাদের বারান্দায় কখনো ইমামতি করে নামাজ পড়াতাম, চাঁদ রাতে সবাইকে সালাম করে সালামি নিতাম, তারাবাতি জ্বালাতাম। দল  বেঁধে ঈদ জামাতে যেতাম।

একটি গান শুনতাম ” শিশুকাল ভালোই ছিল, যৌবন কেন আসিল, বাগানে ফুল ফুটিল, কোকিল কেন ডাকিল”। জানিনা এই প্রজন্মের ছেলে মেয়েরা আমাদের মতো নির্মল বাতাস, অনুকূল পরিবেশে এখন শিশুকাল বা কৈশোরে ঈদ উদ্‌যাপন করতে পারে কিনা?

 

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

1 × two =