অনন্য ইতিহাসের হাতছানি বাংলাদেশের ক্রিকেটে

২৩ বছর পর মাত্র দ্বিতীয়বারের মতো দ্বিপাক্ষিক টেস্ট সিরিজ খেলতে অস্ট্রেলিয়া সফরে এসেছে বাংলাদেশ। ডারউইনে সিরিজের প্রথম টেস্টে ৯ উইকেটের বিশাল জয় তুলে নিয়ে টেস্ট ক্রিকেটের অন্যতম পরাশক্তি অস্ট্রেলিয়াকে বিপর্যস্ত করেছে বাংলাদেশ। সেই জয়ের পর এখন ইতিহাসের আরও বড় অধ্যায় রচনার হাতছানি।

আগামীকাল কুইন্সল্যান্ডের নয়নাভিরাম মাকায় শহরে শুরু হবে সিরিজের দ্বিতীয় ও শেষ টেস্ট। বাংলাদেশ এই ম্যাচে জয় পেলে, কিংবা অন্তত ড্র করতে পারলেও, অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে সিরিজ জয়ের অনন্য কীর্তি গড়বে। বাংলাদেশের টেস্ট ক্রিকেটের ইতিহাসে সেটি হবে এক অবিস্মরণীয় অর্জন।

তবে কাজটি মোটেও সহজ হবে না। প্রথম টেস্টে বিধ্বস্ত অস্ট্রেলিয়া দ্বিতীয় টেস্টে আহত বাঘের মতোই ঘুরে দাঁড়ানোর সর্বোচ্চ চেষ্টা করবে। আগ্রাসী অস্ট্রেলিয়ার আক্রমণাত্মক ক্রিকেট সামলে বাংলাদেশ কতটা সফল হবে, তা নিয়ে ক্রিকেটবিশ্বে চলছে নানা বিশ্লেষণ ও আলোচনা। বাংলাদেশ ও অস্ট্রেলিয়া—দুই দলের অন্তর্নিহিত শক্তি ও সামর্থ্য সম্পর্কে আমার যতটুকু ধারণা, তাতে বলতে পারি, চ্যালেঞ্জ কঠিন হলেও বাংলাদেশের পক্ষে লড়াই করে টিকে থাকা অসম্ভব নয়।

ডারউইন থেকে মাকায় বাংলাদেশ দলের বিমান ভ্রমণে কেন এত দীর্ঘসূত্রিতা হলো, বিষয়টি আমার কাছে পরিষ্কার নয়। ক্রিকেট অস্ট্রেলিয়ার বিষয়টি পরিষ্কার করা উচিত। নর্দার্ন টেরিটরির ডারউইন বছরজুড়েই উষ্ণ। তাপমাত্রা ও পরিবেশ অনেকটাই বাংলাদেশের মতো। অন্যদিকে প্রশান্ত মহাসাগরীয় উপকূলের মাকায় তুলনামূলকভাবে শীতল। সাগরের সুশীতল বাতাস এখানে প্রায় সারা বছরই প্রবাহিত হয়। বাংলাদেশ দল কত দ্রুত নতুন পরিবেশের সঙ্গে মানিয়ে নিতে পেরেছে, তা সময়ই বলবে। তবে পেশাদার ক্রিকেটারদের জন্য আবহাওয়া বা পরিবেশকে অজুহাত হিসেবে ব্যবহারের সুযোগ খুব একটা নেই।

কৌশলগতভাবে অস্ট্রেলিয়া দ্বিতীয় টেস্টে পেসসহায়ক উইকেট বিবেচনায় নিয়ে চার পেসার নিয়ে মাঠে নামতে পারে। সে ক্ষেত্রে নাথান লায়নের পরিবর্তে স্কট বোল্যান্ডকে একাদশে দেখা যেতে পারে।

প্রথম টেস্টে বাংলাদেশ অবশ্য মিচেল স্টার্ক, প্যাট কামিন্স ও জশ হ্যাজেলউডকে ভালোভাবেই সামাল দিয়েছে। দীর্ঘ বিরতির পর টেস্টে ফেরা হ্যাজেলউড অবশ্য উইকেট শিকারে সফল হয়েছেন। তবে অস্ট্রেলিয়া নিশ্চয়ই বাংলাদেশের ব্যাটিং বিশ্লেষণ করে দুর্বলতাগুলো নিয়ে কাজ করেছে। অস্ট্রেলিয়ান ক্রিকেটের যে চরিত্র আমি জানি, তাতে তারা পরপর দুই টেস্টে একই ধরনের ভুল করবে না।

দ্বিতীয় টেস্টে অস্ট্রেলিয়ার পেসারদের বোলিংয়ের লেংথে পরিবর্তন আসতে পারে। বাংলাদেশের ব্যাটারদের শরীর লক্ষ্য করে ধারাবাহিক শর্ট বল করে অস্বস্তিতে ফেলার চেষ্টা থাকবে। এর সঙ্গে যোগ হতে পারে নানা ধরনের স্লেজিং। বাংলাদেশকে তাই মানসিকভাবে স্থির থাকতে হবে। নিজেদের শক্তি ও সামর্থ্যের সবটুকু কাজে লাগিয়ে দীর্ঘ সময় উইকেটে টিকে থাকতে হবে।

টপ অর্ডারে তানজিদ হাসান তামিম, সাদমান ইসলাম, মুমিনুল হক, নাজমুল হোসেন শান্ত ও মুশফিকুর রহিমকে দায়িত্ব নিতে হবে। প্রথম টেস্টে লোয়ার অর্ডারের ব্যাটারদের সঙ্গে নিয়ে দুর্দান্ত ব্যাটিং করেছেন মেহেদী হাসান মিরাজ। দ্বিতীয় ইনিংসে বল হাতেও ছিলেন দুর্দান্ত ছন্দে। তার কাছ থেকে আবারও বড় ভূমিকা প্রত্যাশিত।

প্রথম টেস্টে লিটন দাস ব্যর্থ হয়েছেন। তবে দ্বিতীয় টেস্টে তিনি ঘুরে দাঁড়াবেন—এমন বিশ্বাস রাখাই যায়। বাংলাদেশ প্রথমে ব্যাট করার সুযোগ পেলে অন্তত চার সেশন ব্যাটিং করে ৩৫০-এর বেশি রান করতে পারলে ম্যাচে অবশ্যই শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বিতা গড়ে তুলতে পারবে।

অস্ট্রেলিয়া তাদের ওপেনিংয়ে পরিবর্তনের ঘোষণা দিয়েছে। ওয়্যারল্যান্ডের পরিবর্তে অভিজ্ঞ ম্যাট রেনশকে ফিরিয়ে আনা হচ্ছে। রেনশ অস্ট্রেলিয়ার ব্যাটিংয়ে স্থিতিশীলতা আনার চেষ্টা করবেন। অন্যদিকে তুখোড় মারকুটে ওপেনার ট্রাভিস হেড প্রথম টেস্টের দুই ইনিংসেই ব্যর্থ হয়েছেন। দ্বিতীয় টেস্টে তিনি যে আরও আক্রমণাত্মকভাবে ফিরে আসার চেষ্টা করবেন, তা বলাই যায়।

তবে অস্ট্রেলিয়ার ব্যাটিংয়ের মূল স্তম্ভ নিঃসন্দেহে স্টিভ স্মিথ। বাংলাদেশ যদি দ্রুত স্মিথকে ফিরিয়ে দিতে পারে, তাহলে অস্ট্রেলিয়ার ব্যাটিং নিয়ন্ত্রণে রাখার সুযোগ অনেকটাই বেড়ে যাবে। ক্যামেরন গ্রিন ছাড়া অস্ট্রেলিয়ার মিডল ও লোয়ার অর্ডার বাংলাদেশের সুশৃঙ্খল বোলিং আক্রমণের বিরুদ্ধে কতটা সফল হতে পারবে, তা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যায়।

বাংলাদেশ চার পেসার নিয়ে খেলার কথা ভাবতে পারে। তবে উইকেটে পেস ও বাউন্স থাকলেও মেহেদী হাসান মিরাজ ও তাইজুল ইসলাম অস্ট্রেলিয়ার জন্য বড় মাথাব্যথার কারণ হতে পারেন। তাই একাদশ নির্বাচনের ক্ষেত্রে উইকেটের সর্বশেষ অবস্থা অত্যন্ত গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করতে হবে।

আমি মনে করি না, অস্ট্রেলিয়ার বেপরোয়া ও আগ্রাসী ক্রিকেটের সামনে বাংলাদেশ ভড়কে যাবে। তবে সমর্থকদেরও বাস্তবতার কঠিন মাটিতে দাঁড়িয়ে স্বপ্নের পরিসীমা আকাশছোঁয়া করার আগে পরিস্থিতি বিবেচনায় রাখতে হবে।

বাংলাদেশ যদি ডারউইন টেস্টের পারফরম্যান্সের পুনরাবৃত্তি ঘটাতে পারে, তাহলে টেস্ট ক্রিকেটের ইতিহাসে বাংলাদেশের নাম স্থায়ীভাবে লেখা হয়ে যাবে। অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে সিরিজ জয় শুধু একটি ট্রফি নয়—এটি বাংলাদেশের ক্রিকেটের জন্য হতে পারে অমরত্বের এক নতুন অধ্যায়।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

ten − one =