সালেক সুফী
প্রাকৃতিক গ্যাস, বিদ্যুৎ ও অন্যান্য পেট্রোলিয়াম পণ্যের সংকটের পাশাপাশি বাংলাদেশে এখন চলছে এলপিজি সংকট। বাজারে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের (বিইআরসি) নির্ধারিত দামে এলপিজি পাওয়া যাচ্ছে না। সম্প্রতি এলপিজির দাম সমন্বয় করা হলেও ভোক্তাদের প্রতি ১২ কেজির সিলিন্ডার কিনতে হচ্ছে নির্ধারিত দামের চেয়ে ৫০০–৬০০ টাকা বেশি দিয়ে। প্রশ্ন উঠেছে, এই সংকটের জন্য দায়ী কে বা কারা?
বাংলাদেশে ব্যবহৃত এলপিজির প্রায় পুরোটাই আমদানি করতে হয়। দেশে ৫২টি প্রতিষ্ঠানকে এলপিজি ব্যবসার লাইসেন্স দেওয়া হলেও বাজারে রয়েছে ২৯টি বেসরকারি অপারেটরের। নিজস্ব টার্মিনাল ও প্রয়োজনীয় অবকাঠামোর সীমাবদ্ধতার কারণে কার্যত ২৩টি কোম্পানি আমদানি ও বোতলজাতকরণের মাধ্যমে বাজারে এলপিজি সরবরাহ করে। তবে সব প্রতিষ্ঠান নিয়মিত আমদানি করে না।
মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের কারণে আন্তর্জাতিক বাজারে এলপিজির দাম ও জাহাজভাড়া বেড়েছে। কয়েক বছর ধরে বিইআরসি সৌদি আরামকোর ঘোষিত কন্ট্রাক্ট প্রাইসের (সিপি) সঙ্গে সমন্বয় করে প্রতি মাসে এলপিজির দাম নির্ধারণ করছে। ফলে আন্তর্জাতিক বাজারের মূল্য পরিবর্তনের প্রভাব দেশীয় বাজারেও পড়ে। তবে এ ক্ষেত্রে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, আমদানিকারক থেকে শুরু করে ডিস্ট্রিবিউটর ও খুচরা বিক্রেতা—সরবরাহ শৃঙ্খলের বিভিন্ন পর্যায়ে পরিচালন ব্যয় ও মুনাফার মার্জিনের মধ্যে অসামঞ্জস্য রয়েছে বলে সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ। এসব ব্যয় বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ না হলে নির্ধারিত দামে ভোক্তা পর্যায়ে এলপিজি পৌঁছানো কঠিন হয়ে পড়ে।
প্রশ্ন হচ্ছে, ভারতের মতো বিশাল বাজারে হাতে গোনা কয়েকটি কোম্পানি এলপিজি ব্যবসা পরিচালনা করলেও বাংলাদেশে কেন ৫০টির বেশি প্রতিষ্ঠানকে এই ব্যবসার লাইসেন্স দেওয়া হয়েছে? আবার ২৯টি অপারেটরের মধ্যে ২৩টির আমদানির সক্ষমতা থাকলেও বাকি প্রতিষ্ঠানগুলোর ভূমিকা কী? জানা গেছে, ২০২৬ সালের আগস্টে মাত্র ১৩টি কোম্পানি এলপিজি আমদানি করেছে। সেপ্টেম্বরে এ সংখ্যা ছিল ১০। তাহলে অন্য কোম্পানিগুলোর বোতলজাতকরণ ও সরবরাহ সক্ষমতা কতটা কাজে লাগছে? তাদের কার্যক্রম কি বাজারে প্রতিযোগিতা বাড়াতে পারছে, নাকি লাইসেন্সের সংখ্যা ও কার্যকর সরবরাহকারীর সংখ্যার মধ্যে বড় ব্যবধান রয়ে গেছে?
এলপিজি অপারেটরদের সংগঠন লোয়াব (LOAB) দাবি করছে, বাজারে চাহিদার তুলনায় বেশি এলপিজি সরবরাহ করা হচ্ছে। যদি এই দাবি সঠিক হয়, তাহলে ভোক্তারা বিইআরসি নির্ধারিত দামে সিলিন্ডার পাচ্ছেন না কেন? অতিরিক্ত দাম দিলেই যদি সিলিন্ডার পাওয়া যায়, তাহলে সরবরাহ শৃঙ্খলের কোথায় সমস্যা হচ্ছে, তা খতিয়ে দেখা জরুরি। সরবরাহ ও বিপণনের কোনো পর্যায়ে অনিয়ম বা অসাধু চক্রের তৎপরতা রয়েছে কি না, তা নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে নির্ধারণ করতে হবে। একই সঙ্গে সরকারি মনিটরিংয়ের ঘাটতি এবং সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের মধ্যে সমন্বয়হীনতার অভিযোগও গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা প্রয়োজন।
এখানে চাহিদা বৃদ্ধির বিষয়টিও উপেক্ষা করা যায় না। গত জুলাই-আগস্ট থেকে দেশে প্রাকৃতিক গ্যাসের সংকট আরও ঘনীভূত হওয়ায় গৃহস্থালি ও শিল্প খাতে এলপিজির চাহিদা বেড়েছে। ফলে আমদানি, মজুত, বোতলজাতকরণ ও পরিবহনের ওপর বাড়তি চাপ তৈরি হয়েছে। আন্তর্জাতিক বাজারে মূল্যবৃদ্ধির পাশাপাশি অভ্যন্তরীণ চাহিদার এই পরিবর্তনও বর্তমান পরিস্থিতিকে জটিল করেছে।
এ অবস্থায় বিইআরসির এলপিজির মূল্য নির্ধারণ পদ্ধতি পুনর্মূল্যায়ন করা প্রয়োজন। আমদানিকারক ও অপারেটরদের প্রকৃত ব্যয়, ডিস্ট্রিবিউটর এবং খুচরা বিক্রেতাদের যৌক্তিক মার্জিনসহ সরবরাহ শৃঙ্খলের প্রতিটি পর্যায়ের ব্যয় পর্যালোচনা করে গনশুনানির মাধ্যমে মূল্য কাঠামো পুনর্নির্ধারণ করা যেতে পারে। তবে ব্যয় বৃদ্ধির অজুহাতে অযৌক্তিক মূল্যবৃদ্ধির সুযোগ যেন তৈরি না হয়, সেটিও নিশ্চিত করতে হবে।
ভবিষ্যতে গৃহস্থালি ও শিল্প খাতে প্রাকৃতিক গ্যাসের সরবরাহ চাহিদা অনুযায়ী বজায় রাখা সরকারের জন্য আরও কঠিন হয়ে উঠতে পারে। সে ক্ষেত্রে গৃহস্থালি কাজে এলপিজির ব্যবহার বাড়বে। শিল্প খাতেও এলপিজি ও সিনথেটিক ন্যাচারাল গ্যাসের (এসএনজি) মতো বিকল্প জ্বালানির চাহিদা বাড়তে পারে। তাই এলপিজি সরবরাহব্যবস্থার বর্তমান দুর্বলতা দূর করা শুধু ভোক্তাদের স্বার্থেই নয়, দেশের সামগ্রিক জ্বালানি নিরাপত্তার জন্যও জরুরি।
এলপিজি সংকটের দায় এককভাবে কোনো একটি পক্ষের ওপর চাপিয়ে দিলে সমস্যার প্রকৃত সমাধান হবে না। আমদানি ও সরবরাহের সক্ষমতা, লাইসেন্স ব্যবস্থাপনা, মূল্য নির্ধারণ, ডিস্ট্রিবিউশন, খুচরা বিক্রয় এবং বাজার তদারকির প্রতিটি স্তর পর্যালোচনা করতে হবে। সরকারকে বাজার মনিটরিং জোরদার করার পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের মধ্যে সমন্বয় নিশ্চিত করতে হবে।
দীর্ঘমেয়াদে সরকারি উদ্যোগে এলপিজি আমদানি, বোতলজাতকরণ ও সরাসরি ভোক্তা পর্যায়ে বিতরণের সম্ভাবনাও বিবেচনা করা যেতে পারে। তবে এ ধরনের উদ্যোগ নেওয়া হলে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি) বাণিজ্যিক ভূমিকা ও নিয়ন্ত্রক দায়িত্বের মধ্যে স্পষ্ট পৃথকীকরণ নিশ্চিত করতে হবে, যাতে স্বার্থের সংঘাত তৈরি না হয়।
সব মিলিয়ে, এলপিজির সংকট সমাধানে প্রয়োজন বাস্তবভিত্তিক মূল্য কাঠামো, প্রতিযোগিতামূলক বাজার, নির্ভরযোগ্য সরবরাহব্যবস্থা এবং কার্যকর তদারকি। ভোক্তাদের নির্ধারিত দামে এলপিজি পাওয়ার অধিকার নিশ্চিত করতে হলে সমস্যার প্রতিটি স্তরে জবাবদিহি প্রতিষ্ঠা করতে হবে।
সালেক সূফি, জ্বালানি বিশেষজ্ঞ