মালিহা, বয়স ৮। বাড়ি পটুয়াখালীর রাঙাবালী উপজেলায়। সাগরের পাশে তাদের বাড়ি। সমুদ্রের লবনাক্ত পানি ব্যবহারে মালিহা বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত। ডায়রিয়া শ্বাসকষ্টসহ বিভিন্ন রোগ তার নিত্যদিনের সঙ্গী। রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কম হওয়ায় অন্যান্য প্রাণঘাতী রোগে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি বেশি থাকে। পুষ্টিহীনতায় ভোগারও ঝুঁকি থাকে এসব শিশুর।
পাহাড়ি অঞ্চল ও উপকূলীয় এলাকার শিশুরা মারাত্মকভাবে জলবায়ু ঝুঁকির মুখে রয়েছে। জলবায়ু পরিবর্তনে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত শিশুদের মধ্যে বাংলাদেশের শিশুরাও রয়েছে। বাংলাদেশে প্রতি তিন জন শিশুর মধ্যে এক জন মারাত্মকভাবে জলবায়ু ঝুঁকির মুখে রয়েছে। তাদের মধ্যে ৫০ লাখ শিশুর বয়স পাঁচ বছরের কম। ১ কোটি ২০ লাখ শিশু বন্যাপ্রবণ এলাকার কাছাকাছি বাস করে এবং উপকূলীয় এলাকায় বসবাসকারী ৪৫ লাখ শিশু তীব্র ঘূর্ণিঝড়ের কবলে পড়ার ঝুঁকিতে রয়েছে।
বৈশ্বিক উষ্ণায়ন, বৃক্ষনিধন, শিল্পকারখানা স্থাপন, দূষণ ও নগরায়নের ফলে আবহাওয়ায় একটি দীর্ঘস্থায়ী বিরূপ প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হচ্ছে। আর এটাকে বলা হয় জলবায়ু পরিবর্তন। তবে বৈশ্বিক উষ্ণায়নই জলবায়ু পরিবর্তনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কারণ।
তাপমাত্রা বৃদ্ধি ও জলবায়ুর পরিবর্তন ঘটায় বিশ্বে আবহাওয়াগত মারাত্মক বিপর্যয় শুরু হয়েছে। বিশ্বের প্রতিটি দেশেই বিশেষ করে বাংলাদেশের স্বাভাবিক আবহাওয়া ও জলবায়ুর পরিবর্তন ঘটায় বন্যা, টর্নেডো ঝড়ের মাত্রা আশঙ্কাজনক হারে বৃদ্ধি পেয়েছে এবং ঘটেছে পরিবেশ বিপর্যয়। এ বিপর্যয়ের ফলে মানুষের জীবন আজ হুমকির সম্মুখীন। বিশেষ করে শিশুদের জীবন বেশি শঙ্কায় পড়েছে।
ইউনিসেফের শিশুদের জন্য জলবায়ু ঝুঁকি সূচক বা চিলড্রেনস ক্লাইমেট রিস্ক ইনডেক্সে বাংলাদেশের অবস্থান ১৬৩ দেশের মধ্যে ১৫তম। বিভিন্ন গবেষক ও প্রতিষ্ঠানের গবেষণায় দেখা গেছে, জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে সৃষ্ট নেতিবাচক প্রভাবের দিক থেকে বাংলাদেশ বিশ্বের অন্যতম অরক্ষিত দেশগুলোর একটি। জলবায়ু পরিবর্তন যেভাবে সামাজিক সমস্যাগুলোকে প্রকট করছে, তাতে সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে পড়ছে শিশুরা। ইউনিসেফের ২০১৯ সালের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে সম্পর্কিত বিধ্বংসী বন্যা, ঘূর্ণিঝড় ও অন্য পরিবেশগত বিপর্যয়গুলো বাংলাদেশে ১ কোটি ৯০ লাখের বেশি শিশুর জীবন ও ভবিষ্যৎকে হুমকির মুখে ফেলছে। প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, জলবায়ু পরিবর্তন একটি গুরুত্বপূর্ণ অনুষঙ্গ, যা দরিদ্র বাংলাদেশিদের ঘরবাড়ি, আত্মীয়-স্বজন ও নিজ সামাজিক গোষ্ঠীদের ফেলে অন্যত্র নতুন করে জীবন শুরু করার চেষ্টার দিকে ঠেলে দিচ্ছে।
বাংলাদেশে ইউনিসেফের প্রাক্তন প্রতিনিধি শেলডন ইয়েট বলেছেন, ‘বাংলাদেশের শিশুরা জলবায়ু সংকট এবং একটি নিরাপদ স্বাস্থ্যকর পরিবেশে বেঁচে থাকার ও বিকশিত হওয়ার অধিকার লঙ্ঘনের দ্বৈত চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন, যার স্বীকৃতি দেয়া খুবই গুরুত্বপূর্ণ। শিশু ও তরুণরা যেন তাদের ভবিষ্যৎ গঠনের কার্যক্রমে সক্রিয় অংশগ্রহণকারী হয়, তা নিশ্চিত করার মাধ্যমে তাদের কথা জোরালোভাবে তুলে ধরার প্রতিশ্রুতিতে ইউনিসেফ অটল রয়েছে।’
ইউনিসেফ বাংলাদেশ শিশু, সংসদ সদস্য ও সিদ্ধান্ত গ্রহণকারীদের মধ্যে নিয়মিত সংলাপের আয়োজন করে যাতে শিশুরা তাদের জীবনকে প্রভাবিত করা বিষয়গুলো সম্পর্কে নিজেদের মতামত প্রকাশ করতে পারে। সংশোধিত ‘শিশুদের জলবায়ু ঘোষণায়’ জোর দিয়ে উল্লেখ করা হয়েছে যে জলবায়ু সংকট মৌলিকভাবে শিশু অধিকারের জন্য একটি সংকট।
বাংলাদেশে ইউনিসেফ শিশুদের জন্য জলবায়ু-অভিযোজিত শিক্ষা, স্বাস্থ্য, পুষ্টি, পানি, স্যানিটেশন ও স্বাস্থ্যবিধি সেবা জোরদার করতে, কমিউনিটিগুলোতে জলবায়ু সহনশীলতা তৈরি করতে এবং জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলায় শিশুদের প্রস্তুত করতে সরকারের সঙ্গে কাজ করে।
ইতোমধ্যেই দেশে ৬০ লাখ জলবায়ু পরিবর্তনজনিত অভিবাসী রয়েছে, যা ২০৫০ সালের মধ্যে বেড়ে দ্বিগুণেরও বেশি হতে পারে। এছাড়া উপকূলীয় অঞ্চলে বসবাসকারী আরও ৪৫ লাখ শিশু নিয়মিত শক্তিশালী ঘূর্ণিঝড় দ্বারা আক্রান্ত হয়।
বস্তুত প্রতিটি সংকটে শিশুরাই সবচেয়ে বেশি অসহায়। জলবায়ু পরিবর্তনও এর ব্যতিক্রম নয়। যে সময়টাতে মানুষ বিকশিত হয়, সে বয়সটাই শিশু বয়স। নিঃসন্দেহে জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে যে বহুমুখী পরিবর্তনগুলো হচ্ছে, তা থেকে শিশুরা রক্ষা পাবে না। সেজন্য জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি মোকাবিলার পরিকল্পনার ক্ষেত্রে শিশুদের বিষয় আলাদা করে বিবেচনায় নেওয়া দরকার।
শিশুদের ঝুঁকি বড়দের চেয়ে বেশি। গরম ও অন্যান্য জলবায়ুসংক্রান্ত সমস্যার সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেওয়ার সক্ষমতা বড়দের তুলনায় তাদের কম। রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কম হওয়ায় তাদের ডায়রিয়া ও অন্যান্য প্রাণঘাতী রোগে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি বেশি থাকে। পুষ্টিহীনতায় ভোগারও ঝুঁকি থাকে এসব শিশুর। প্রাকৃতিক দুর্যোগে আক্রান্ত পরিবারগুলো যখন ঘরবাড়ি হারাচ্ছে, তখন সেই পরিবারের শিশুরা অর্থ-উপার্জনের জন্য কোনো না কোনো কাজে যোগ দিতে বাধ্য হচ্ছে। এর ফলে শিশুদের নানা ধরনের নির্যাতনের শিকার হওয়ার আশঙ্কা বাড়ছে বলে ইউনিসেফের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে। দায়িত্ব নিতে না পেরে মেয়ে শিশুদের অনেক পরিবার দ্রুত বিয়ে দিয়ে দিচ্ছে।
সারা দেশে ২০ জেলার শিশুরা সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে। দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের তিন জেলা খুলনা, সাতক্ষীরা ও ভোলায় জলবায়ু পরিবর্তন ব্যাপকভাবে প্রভাব ফেলছে। ঘনঘন দুর্যোগের সম্মুখীন হচ্ছে এ জেলাগুলো। বঙ্গোপসাগরের উপকূল ঘেঁষে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি এ সংকটকে আরও ঘনিভূত করছে। পানির লবণাক্ততাও একটি প্রধান সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। উপকূলের অনেক এলাকা এখন এ সমস্যায় আক্রান্ত।
এসবের ফলে শিশুদের স্বাস্থ্য ও শিক্ষার সম্ভাবনা নস্যাৎ হয়ে যায়। শোষণমূলক শিশুশ্রম, শিশু বিয়ে ও পাচারের ফাঁদে আটকা পড়ছে লাখ লাখ শিশু।
জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষতিকর প্রভাব থেকে শিশুদের সুরক্ষা প্রদানে বেশকিছু উদ্যোগ বাস্তবায়নে সরকারকে সহযোগিতা দিতে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় ও অন্য অংশীদারদের প্রতি আহ্বান জানানো হয়েছে। পরিবেশগত অবক্ষয়, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বিশ্বের প্রতিটি দেশের শিশু-কিশোরের ভবিষ্যৎ হুমকির মুখে পড়েছে।
জলবায়ু পরিবর্তন সম্পর্কে বিভিন্ন আলোচনা পাঠ্যসূচিতে অন্তর্ভুক্ত করা দরকার। যখন শিশুরা একবার তাদের চারপাশে পরিবেশগত সমস্যাগুলোর অস্তিত্ব ও জরুরি দাবি সম্পর্কে জানতে পারবে, তখন তারা আরও সচেতন হবে, পরিবেশ বিপর্যয় থেকে রক্ষায় কৌশলী হতে পারবে এবং বিশ্বের পরিবেশ রক্ষায় তারাও ভূমিকা রাখতে পারবে।
বৈশ্বিক এ সংকট মোকাবিলায় সরকারি-বেসরকারি ও আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর একযোগে কাজের কোনো বিকল্প নেই। সরকারের পাশাপাশি প্রত্যেকে নিজ নিজ অবস্থান থেকে ভূমিকা রাখলে হয়তো আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে জলবায়ু পরিবর্তনজনিত ক্ষতি থেকে রক্ষা করা সম্ভব হবে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে কম বয়সিরাই সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে; নিরাপদ থাকছে না গর্ভের শিশুও।
জীববৈচিত্র্যে আমরা সমৃদ্ধ। কিন্তু নিজের স্বার্থে যারা পরিবেশ-প্রকৃতি ধ্বংস করে, বড় বড় শিল্পপতি হয়েও যারা পরিবেশের ক্ষতির দিকটি মাথায় রাখে না, বরং ধ্বংস করে, নদীর মৃত্যু ঘটায়, তারা দেশ, জাতি ও মানুষের শত্রু।
গত কয়েক বছরে সরকার দুর্যোগ ঝুঁকি কমানোর (ডিআরআর) ক্ষেত্রে অনেক অগ্রগতি অর্জন করেছে। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে সৃষ্ট ঝুঁকিগুলোকে শনাক্ত করেছে বাংলাদেশ সরকার।
উপকূলীয় এলাকায় বাংলাদেশ বহু ভবন নির্মাণ করেছে, যা ঘূর্ণিঝড়ের সময় আশ্রয়কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহৃত হয়। এর ফলে দুর্যোগে মৃত্যুহার উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। তবে সম্পদের ক্ষয়ক্ষতি ও উপার্জন হারানোর হার ক্রমেই বাড়ছে।
পরিশেষে বলা যায়, একটি শিশুর স্বাভাবিক বিকাশ ও সুন্দর ভবিষ্যতের জন্য আমাদের সকলেরই উচিত পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা করা এবং জলবায়ু পরিবর্তনে যথাপোযুক্ত পদক্ষেপ গ্রহণ করা।