টেস্ট ক্রিকেটে বাংলাদেশের পরিবর্তনের সুবাতাস

টেস্ট ক্রিকেটে দীর্ঘদিন তলানিতে  অসহায়ভাবে গড়াগড়ি করার পরার পর সম্প্রতি ঘুরে দাঁড়াচ্ছে। দেশের উইকেট গুলো রূপান্তর এবং বোলিং আক্রমণে বিচিত্রতা বিশেষত পেস আক্রমণ শক্তিশালী হয়ে ওঠায় এই পরিবর্তন এটা বলাই বাহুল্য। বাংলাদেশকে আগেও দেশের মাটিতে অস্ট্রেলিয়া, ইংল্যান্ডের মতো দলের বিরুদ্ধে টেস্ট জিতেছে। কিন্তু সেই জয়গুলোর জন্য অনেকেই ধীর, নিচু, ঘ‍ূর্ণি উইকেট ফাঁদকে কৃতিত্ব দিয়ে থাকে। ৎ

কিন্তু ২০২৪ পাকিস্তান সফরে পাকিস্তানকে ধবল ধোলাই করা আর চলতি সিরিজে প্রথম টেস্টে বাংলাদেশের দাপুটে জয় প্রমাণ করেছে টেস্ট ক্রিকেটে বাংলাদেশের শুভ দিনের সূচনা হয়েছে। ক্রিকেট ব্যাবস্থাপনার মানসিকতার পরিবর্তন আর টিম ম্যানেজমেন্টের বাস্তবসম্মত কার্যক্রম টেস্ট ক্রিকেটে বাংলাদেশের উন্নয়নের ধারা অক্ষুণ্ন রাখবে বলে আশাবাদী।

এমনিতেই আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে এটি স্বীকৃত যে দলের বোলিং আক্রমণ বহুমুখী আর শক্তিশালী তাদের ব্যাটিং স্বয়ংক্রিয়ভাবে শক্তিশালী হয়ে যায়। বাংলাদেশে ইতিপূর্বে একজন বা দুই জন মধ্যম মানের পেস বলার থাকলেও বর্তমান দলের মতো ৪-৫ জন বিশ্বমানের পেসার একসঙ্গে উঠে আসেনি। মাশরাফির মতো উঁচু মানের পেস বোলার একের পর এক ইনজুরির শিকার না হলে বাংলাদেশ হয়তো আগেও বেশ কিছু টেস্ট জয়ী হত।

বাংলাদেশের দৃষ্টিভঙ্গি এবং পরিকল্পনায় গলদ ছিল। দেশের উইকেটগুলো এবং ঘরোয়া ক্রিকেট পরিবেশ উন্নত পেস বোলার গড়ে ওঠার উপযোগী ছিল না। দেশের মাটিতে স্পিন বোলিং ফাঁদে ফেলে টেস্ট জয় ছিল মূল লক্ষ্য। আর তাই দেশের মাটিতে কিছু সাফল্য আসলেও বিদেশে সফরকালে হালে পানি পেতো না। অ্যালেন ডোনাল্ড, কোর্টনি ওয়ালশ থেকে শুরু করে বর্তমান শন টেটের হাত ধরে পেস বোলিংয়ে বৈপ্লবিক পরিবর্তন এসেছে।  ‍

সেইসঙ্গে ঢাকা, সিলেট, চট্টগ্রাম উইকেট এখন স্পোর্টিং হওয়ায় বাংলাদেশ টেস্ট ক্রিকেট সহ অন্যান্য ফরম্যাটেও জেগে উঠছে। তাসকিন, এবাদত, মুস্তাফিজ, নাহিদ রানা, শরিফুল, হাসান মাহমুদ, খালেদ একঝাঁক উন্নতমানের পেস বোলার বাংলাদেশের বোলিং সমৃদ্ধ করেছে।বিশেষত নাহিদ রানার মতো ১৪০+ কিলোমিটার গতির আক্রমণাত্মক বোলারের আবির্ভাব বাংলাদেশ দলকে ভীতিপ্রদ করে তুলেছে।

এখন থেকে অস্ট্রেলিয়া, ইংল্যান্ড, দক্ষিণ আফ্রিকার মতো দলগুলো বাংলাদেশের বিরুদ্ধে নিজেদের দেশের মাটিতে গ্রিন টপ পেসি উইকেট বানাতে কিছুটা বিচলিত থাকবে। পাশাপাশি ভালো মানের ফিঙ্গার স্পিনারদের পাশাপাশি রিশাদ হোসেনের মতো রিস্ট স্পিনার পাওয়া গেছে। দেশের মাটিতে বগুড়া, খুলনা, কক্সবাজার, রাজশাহী, বরিশালে আরো কয়েকটি স্পোর্টিং উইকেট বানিয়ে নিয়মিত ঘরোয়া ক্রিকেটের আয়োজন করা হলে সমগ্র দেশের ক্রিকেট রসায়ন পাল্টে যাবে।

প্রয়োজন ব্যাটিং সমৃদ্ধ করার। টপ অর্ডার আর মিডেল অর্ডারে নবীন প্রবীনের সমাহারে ব্যাটিং বিকশিত হতে থাকলেও ওপেনিং ব্যাটিং এখনো উন্নত হচ্ছে না। জয় এবং সাদমান শুধু টেস্ট খেলে। ওরা তরুণ দীর্ঘ দিন পর পর একটি দুটি টেস্ট খেলে ওদের স্কিল বা ব্যাটিং কৌশল উন্নত হওয়ার সুযোগ সীমিত। ব্যাটিং অন্য পজিশনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা থাকলেও টেস্ট ওপেনিংয়ে বিকল্প সৃষ্টি হচ্ছে না।

অনুর্ধ ১৯ বা ডেভেলপমেন্ট স্কোয়াড থেকে কেউ উঠে আসছে না। দলের দুই ব্যাটিং স্তম্ভ মোমিনুল আর মুশফিকের স্থানে ২-৩ বছর পর বিকল্প প্রয়োজন হবে। বাংলাদেশের ৭-১১ ব্যাটিং লেজ নড়বড়ে। টেস্ট ক্রিকেটে ধারাবাহিক জয় পেতে হলে অন্তত দুইজন ভালো মানের অল রাউন্ডার প্রয়োজন হবে।

বাংলাদেশ কিছু দিনের মধ্যেই অস্ট্রেলিয়া দক্ষিণ আফ্রিকায় খেলতে যাবে। এর মাঝেই বাংলাদেশের কিংবদন্তি সাকিব আল হাসানের যাবতীয় সমস্যা মিটিয়ে দলে ফিরিয়ে আনলে দলের অনেক উপকার হবে। আমি সব সময় খেলাধুলাকে রাজনীতি থেকে আলাদাভাবে বিবেচনা করি। আশা করি ক্রিকেটের স্বার্থে দেশের স্বার্থে বর্তমান সরকার সাকিবের বিষয়ে সঠিক সিদ্ধান্ত নিবে।

অচিরেই অস্ট্রেলিয়া এবং ভারত সাদা বলের ক্রিকেট খেলতে বাংলাদেশ সফর করবে। বাংলাদেশ বিশ্ব সেরা দুই দলের বিরুদ্ধে জয় পেলে হবে বিশাল অর্জন।

বাংলাদেশের সামনে কিন্তু সুবর্ণ সুযোগ উন্নয়নের ধারা অব্যাহত রেখে টেস্ট ক্রিকেটে সেরা পাঁচের মধ্যে ঢুকে পড়ার। দেশের মানুষ ক্রিকেট নিয়েই একতাবদ্ধ। আমি বাংলাদেশ ক্রিকেটের অব্যাহত জয়যাত্রা কামনা করি।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

eighteen − fifteen =