বাংলাদেশ পাকিস্তান সিলেট টেস্ট: চতুর্থ দিনে ব্যাট বলের উপভোগ্য লড়াই দেখলো ক্রিকেট বিশ্ব

সালেক সুফী

সিলেটের নয়নাভিরাম আন্তর্জাতিক ক্রিকেট স্টেডিয়ামে গতকাল ছিল উত্তেজনায়  টম্বুর টেস্ট ক্রিকেটের একটি স্মরণীয় দিন। দ্বিতীয় ইনিংসে ১০ উইকেট হাতে নিয়ে বিশ্ব রেকর্ড স্থাপন করে  ইতিহাস সৃষ্টির মিশনে খেলা শুরু করেছিল সিরিজে ০-১ পিছিয়ে থাকা পাকিস্তান। বাংলাদেশের মিশন ছিল যত দ্রুত সম্ভব ১০ উইকেট তুলে নিয়ে টেস্ট তথা ২-০ সিরিজ জিতে আরো একবার পাকিস্তানের বিরুদ্ধে বাংলা ওয়াশ অর্জন। সারাদিন ব্যাট বলে তীব্র লড়াই হয়েছে। দিনশেষে পাকিস্তানের স্কোর ৩১৬/৭। টেস্ট জিততে বাংলাদেশের প্রয়োজন ৩ উইকেট।  পাকিস্তানকে ইতিহাস সৃষ্টি করে সমতায় সিরিজ শেষ করতে হলে প্রয়োজন আরো ১২১ রান। উইকেটে আছে ৭৫ রান করা মোহাম্মদ রিজওয়ান। সাথে সাজিদ খান। বাংলাদেশ আজ মাত্র ৬ ওভার পুরোনো নতুন বল দিয়ে শুরু করবে। স্বাবাবিক পরিণতি বাংলাদেশের জয়। কিন্তু খেলাটার নাম যখন ক্রিকেট তখন শেষ বল পর্যন্ত অপেক্ষা করতেই  হবে। তবে এটি নিশ্চিত লেখাটি পাঠকের হাতে পৌঁছানোর আগেই খেলা শেষ হয়ে যাবে।

জানা আছে সবার বাংলাদেশের করা প্রথম ইনিংসের ২৭৮ রানের জবাবে পাকিস্তানের ইনিংস শেষ হয়েছিল ২৩২ রানে। ৪৬ রানে এগিয়ে থাকা বাংলাদেশ দ্বিতীয় ইনিংসে করে ৩৯০। পাকিস্তানের সামনে দাঁড়ায় দুই দিন ৬ সেশনে ৪৩৭ রান করে বিশ্ব রেকর্ড গড়ে টেস্ট জয়ের চ্যালেঞ্জ।

সিলেট স্টেডিয়ামের উইকেট ১০০% টেস্ট উপযোগী প্রমাণিত হয়েছে। এই উইকেটে ভালো ব্যাটসম্যান, ভালো বলার সবার সমান সুযোগ আছে। আকাশ মেঘে ঢাকা, চার দিনই বৃষ্টির পূর্বাভাস থাকলেও মুহূর্তের জন্য বৃষ্টি বিঘ্ন ঘটায়নি দিন শুরু করেছিল পাকিস্তান দুই তরুণ ওপেনার আজান আইওয়াজ আর আব্দুল্লাহ ফজলের মাদ্ধমে। বাজ পাখির মতোই শিকারের জন্য ঝাঁপিয়ে পড়েছিল তাসকিন, শরিফুল, নাহিদ। দুই তরুণ বুক চেতিয়ে লড়েছিল ক্ষণকাল। নাহিদের বলে পয়েন্ট থেকে দর্শনীয় ক্যাচ তুলে নিয়ে ফজলকে বিদায় করে প্রথম আঘাত হানলো মেহেদী মিরাজ। কিছু সময় পায় মিরাজ নিজেই ভুলের ফাঁদে ফেলে ফিরিয়ে দিলো আজানকে। ৪১ রানে ২ উইকেট হারিয়ে দেয়ালে পিঠ থাকা অবস্থায় অধিনায়ক শান মাসুদ, বাবর আজমকে সঙ্গী করে শুরু করলো প্রতিরোধ সংগ্রাম। তৃতীয় উইকেট জুটিতে দ্রুত ৯২ রান সংগ্রহ করে এই জুটি খেলায় প্রতিদ্বন্দ্বিতা নিয়ে এসেছিলো। স্বভাব সুলভ ছন্দে ৫২ বলে ৪৭ রান করা বাবর আজম তাইজুলের লেগ স্ট্যাম্পের বাইরে পড়া একটি বল ফ্লিক করার বার্থ প্রয়াসে লিটনের কাছে ধরা পড়ায় বিশাল ধাক্কা খেলো পাকিস্তান। সাউদ শাকিল নাহিদ রানার দ্রুত গতির সঙ্গে সামাল দিতে না পারে লিটনের কাছে ধরা পড়লো। কিছু ক্ষণ পরে ১১৬ বলে ৭১ রান করে ভালো খেলতে থাকা শান মাসুদ তাইজুলের বলে শর্ট লেগে মাহমুদুল জয়ের দারুন রিফ্লেক্স কাচের শিকার হলে মাত্র ২৯ রানে ৩ উইকেট হারালো পাকিস্তান। এর পরে পাকিস্তানের শেষ দুই স্বীকৃত ব্যাটসম্যান সালমান আগা এবং মোহাম্মদ রিজওয়ান চমৎকার ব্যাটিং করে ৬ষ্ট উইকেট জুটিতে দ্রুত ১৩৬ যোগ করে পাকিস্তানী সমর্থকদের জাগিয়ে তুলেছিল। বাংলাদেশ দলনায়ক শান্ত নতুন বল  নিলো.নতুন বল স্পিনার তাইজুলের হাতে তুলে দেয়া ছিল শান্তর মাস্টার ষ্টোক। তাইজুলের আর্মার বল সালমান আগার ব্যাট প্যাডের দুয়ার গলে উইকেটে আঘাত হানলে ফিরে ৭১ রানের আশা জাগানীয়া ইনিংস খেলা সালমান। তাইজুল এর পর দ্রুত হাসান আলীকে ফিরিয়ে দিলে দিনশেষে পাকিস্তানের স্কোর ৩১৬/৭। এখনো পিছিয়ে ১২১ রানে। ৭৫ রানে অপরাজিত রিজওয়ান লেজের দিকের ব্যাটসম্যানদের নিয়ে অসাদ্ধ সাধন করবে বলে মনে হয় না. আরো সুবিধা বাংলাদেশের প্রায় নতুন বল নিয়ে শুরু করবে বাংলাদেশ। বাংলাদেশের টেস্ট ক্রিকেটের সর্বাধিক উইকেট শিকারী তাইজুল ইসলাম ১১৩ রানের বিনিময়ে ৪ উইকেট তুলে নিয়েছে। বাংলাদেশের পোষ্টার বয় নাহিদ নিয়েছে ৫৮ রানে ২ উইকেট।  সিরিজে দুই জনের সংগ্রহ ১১ উইকেট। খেলার স্বাভাবিক পরিণতি বাংলাদেশের টেস্ট এবং সিরিজ জয়. তবে পাকিস্তানের সামনেও আছে ইতিহাস সৃষ্টির দুর্লভ কিন্তু কঠিন চ্যালেঞ্জ।

সংক্ষিপ্ত স্কোরকার্ড।

সংক্ষিপ্ত স্কোরকার্ড,

বাংলাদেশ  প্রথম ইনিংস : ২৭৮ অল আউট ( লিটন কুমার দাস ১২৬, নাজমুল হোসেন শান্ত ২৯, তানজিদ হাসান তামিম ২৬, মুশফিকুর রহিম ২৩, মোমিনুল হক ২২, তাইজুল ইসলাম ১৬। খুররাম সাজ্জাদ ৪/৮১ , মোহাম্মদ আব্বাস ৩/৪৫. হাসান আলী ২/ ৪৯)

বাংলাদেশ দ্বিতীয় ইনিংস ৩৯০ অল আউট  ( মুশফিকুর রহিম   ১৩৭,  .লিটন কুমার দাস ৬৯,  মাহমুদুল হাসান জয় ৫২, মোমিনুল হক ৩০, তাইজুল ইসলাম ২২, খুররম সাজ্জাদ ৪/৮৬, সাজিদ খান ৩/ ১২৬)

পাকিস্তান প্রথম ইনিংস : ২৩২ অল আউট ( বাবর আজম ৬৮, সাজিদ খান ৩৮, শান মাসুদ ২১, সালমান আগা ২১, নাহিদ রানা ৩/৬০, তাইজুল ইসলাম ৩/৬৭.মেহেদী মিরাজ ২/২১ ,তাসকিন আহমেদ ২/৩৭)

পাকিস্তান দ্বিতীয় ইনিংস  ৩১৬/৭ ( মোহাম্মদ রিজওয়ান ৭৫* ,শান মাসুদ ৭১, সালমান আলী আগা ৭১, বাবার আজম ৪৭, তাইজুল ইসলাম ৪/১১৩, নাহিদ হাসান রানা ২/৫৮)

বাংলাদেশের প্রয়োজন ৩ উইকেট। পাকিস্তানের প্রয়োজন ১২১ রান.

খেলার যেই ফলাফল হোক না কেন সিলেটের এই টেস্ট ম্যাচটি নানা কারণেই স্মরণীয় হয়ে থাকবে। এটি ইতি মধ্যেই প্রমাণিত যে পরিবর্তিত বাংলাদেশ এখন পাকিস্তান থেকে অনেক ভালো টেস্ট ক্রিকেট খেলছে। টেস্ট এবং সিরিজ জয়ের আত্মবিশ্বাস নিয়ে বাংলাদেশ আগামী মাসে শক্তিশালী অস্ট্রেলিয়ার বিরুদ্ধে দেশে সাদা বলের সিরিজ আর অক্টোবরে অস্ট্রেলিয়ায় টেস্ট সিরিজ খেলবে।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

five × 5 =