বুড়িগঙ্গা-তুরাগ দূষণ রোধে সমন্বিত উদ্যোগের আহ্বান পরিবেশমন্ত্রীর

ঢাকা, ১৩ আগস্ট ২০২৬: রাজধানীর চারপাশের বুড়িগঙ্গা ও তুরাগ নদীর দূষণ বন্ধে সংশ্লিষ্ট সব সরকারি সংস্থা, শিল্পপ্রতিষ্ঠান ও অংশীজনকে সমন্বিতভাবে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তনমন্ত্রী আবদুল আউয়াল মিন্টু, এমপি।

বৃহস্পতিবার রাজধানীর আগারগাঁওয়ে পরিবেশ অধিদপ্তরের সম্মেলনকক্ষে ঢাকার চারপাশের বুড়িগঙ্গা ও তুরাগ নদী এবং নদী-সংযুক্ত খালগুলোতে শিল্প, পয়ঃবর্জ্য ও অন্যান্য বর্জ্যজনিত দূষণ নিয়ন্ত্রণে আয়োজিত মতবিনিময় সভায় তিনি এ আহ্বান জানান।

মন্ত্রী বলেন, ঢাকার চারপাশের নদীগুলোকে দূষণমুক্ত করতে শিল্প মালিকদের সহযোগিতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারখানার দূষিত পানি যাতে কোনোভাবেই খাল বা নদীতে না পড়ে, তা নিশ্চিত করতে কার্যকর বর্জ্য শোধনাগার (ETP) স্থাপন ও পরিচালনা জরুরি।

তিনি বলেন, ব্যবসায়ীদের অন্যতম দায়িত্ব হলো দেশের সম্পদ সৃষ্টি করা। শিল্প ও কলকারখানার সংখ্যা বাড়ানোর পাশাপাশি পরিবেশ দূষণ নিয়ন্ত্রণের বিষয়টিও গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করতে হবে। সমন্বিত উদ্যোগ ছাড়া কোনো কার্যক্রমই দীর্ঘমেয়াদে টেকসই হবে না।

সভায় বিজিএমইএ, বিকেএমইএ ও এফবিসিসিআইয়ের প্রতিনিধিরা শিল্প খাতের বিভিন্ন সমস্যা ও প্রতিবন্ধকতা তুলে ধরেন।

এর পরিপ্রেক্ষিতে পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন প্রতিমন্ত্রী শেখ ফরিদুল ইসলাম, এমপি বলেন, শিল্পাঞ্চলে কেন্দ্রীয়ভাবে ETP স্থাপনের বিষয়টি সরকার বিবেচনা করবে। তিনি বলেন, অন্যায়ভাবে ব্যবসায়ীদের হয়রানি কোনোভাবেই মেনে নেওয়া হবে না। একই সঙ্গে ETP পরিচালনায় ব্যবহৃত রাসায়নিক আমদানিতে শুল্ক কমানো বা শূন্যে নামিয়ে আনার বিষয়েও উদ্যোগ নেওয়া হবে।

প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব এ বি এম আব্দুস সাত্তার বিশেষ অতিথির বক্তব্যে বলেন, বুড়িগঙ্গাকে টেমস নদীর মতো পরিচ্ছন্ন ও নান্দনিক করে তোলা প্রধানমন্ত্রীর স্বপ্ন। সবাই সমন্বিতভাবে কাজ করলে বুড়িগঙ্গা, তুরাগ ও শীতলক্ষ্যাকে লন্ডনের টেমস নদীর মতো করে গড়ে তোলা সম্ভব।

তিনি বলেন, শুধু বুড়িগঙ্গার পানি দূষণমুক্ত করলেই হবে না; তুরাগের উজান থেকে আসা দূষণও বন্ধ করতে হবে। এ লক্ষ্যে নদীগুলোর দূষণের উৎস শনাক্ত করে সমন্বিতভাবে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

তিনি আরও জানান, গাবতলী ও আশুলিয়ায় নদীর ওপর ঝুলন্ত সেতু নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে। পাশাপাশি পর্যটকদের বিনোদনের জন্য নদীতে জাহাজ পরিচালনার উদ্যোগ নেওয়া হবে।

সভায় বাংলাদেশ নৌবাহিনীর পক্ষ থেকে ‘বুড়িগঙ্গা নদীর দূষণ নিয়ন্ত্রণে সমন্বিত কর্মপরিকল্পনা ও বাস্তবায়ন রূপরেখা’ উপস্থাপন করা হয়। এতে জানানো হয়, বুড়িগঙ্গা নদীর দূষণ নিয়ন্ত্রণে সমন্বিত কর্মপরিকল্পনা বাস্তবায়নের জন্য প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনায় মুখ্য সচিবের নেতৃত্বে একটি কেন্দ্রীয় সেল গঠনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

উপস্থাপিত তথ্যানুযায়ী, বুড়িগঙ্গা ও তুরাগ নদীতে মোট ২২৪টি বর্জ্য নিঃসরণের উৎস শনাক্ত করা হয়েছে। এর মধ্যে বুড়িগঙ্গায় ১৬৬টি এবং তুরাগে ৫৮টি উৎস রয়েছে। এসব দূষণের উৎসের সঙ্গে বিভিন্ন বেসরকারি শিল্পপ্রতিষ্ঠান, ঢাকা ওয়াসা, সিটি করপোরেশন ও স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানসহ বিভিন্ন সংস্থা জড়িত।

সভায় শিল্পবর্জ্যের উৎসভিত্তিক তালিকা তৈরি, শিল্পপ্রতিষ্ঠানে কার্যকর ETP স্থাপন ও পরিচালনা নিশ্চিত করা এবং অনুমোদনহীন ড্রেন শনাক্ত করে বন্ধ করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়। পাশাপাশি খাল ও ড্রেন থেকে বর্জ্য অপসারণ করে পানির স্বাভাবিক প্রবাহ ফিরিয়ে আনার বিষয়েও গুরুত্ব দেওয়া হয়।

মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার আওতায় প্রয়োজন অনুযায়ী খাল ও ড্রেনেজ ব্যবস্থার পাশে STP, ETP এবং Waste-to-Energy Plant স্থাপনের বিষয়ও কর্মপরিকল্পনায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।

সভায় বুড়িগঙ্গা ও তুরাগের দূষণের সব উৎস বন্ধ, খাল ও ড্রেনের বর্জ্য অপসারণ, পানির স্বাভাবিক প্রবাহ নিশ্চিত করা এবং নদীর তলদেশে দীর্ঘদিন ধরে জমে থাকা বর্জ্য অপসারণে সমন্বিত কর্মপরিকল্পনা বাস্তবায়নের ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়।

সভায় বন, পরিবেশ ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের ভারপ্রাপ্ত সচিব ড. ফাহমিদা খানম, পানি সম্পদ মন্ত্রণালয়ের সচিব ত. একেএম শাহাবুদ্দিন, শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. আব্দুর রহমান তরফদার, রাজউকের চেয়ারম্যান (সচিব) ইঞ্জিনিয়ার মো. রিয়াজুল ইসলাম, পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের জলবায়ু পরিবর্তন অনুবিভাগের অতিরিক্ত সচিব এবং পরিবেশ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক (রুটিন দায়িত্ব) মোহাম্মদ নাভিদ শফিউল্লাহসহ সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও দপ্তরের কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।

এ ছাড়া এফবিসিসিআই, বিজিএমইএ ও বিকেএমইএর নেতৃবৃন্দ, বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি সংস্থার প্রতিনিধি, পরিবেশ সংগঠনের প্রতিনিধি, স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তারা এবং প্রিন্ট, ইলেকট্রনিক ও অনলাইন গণমাধ্যমের সাংবাদিকরা সভায় অংশ নেন।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

5 × four =