ভূমি পুনরুদ্ধার ও খরা মোকাবিলায় বৈশ্বিক পদক্ষেপ জোরদারে মঙ্গোলিয়ায় শুরু কপ১৭

উলানবাটোর, ১৭ আগস্ট ২০২৬: ভূমি অবক্ষয়, খরা ও পানির সংকট মোকাবিলা এবং টেকসই ভূমি ব্যবস্থাপনায় বৈশ্বিক পদক্ষেপ জোরদারের লক্ষ্য নিয়ে মঙ্গোলিয়ার উলানবাটোরে শুরু হয়েছে মরুকরণ প্রতিরোধে জাতিসংঘের কনভেনশনের (ইউএনসিসিডি) ১৭তম কনফারেন্স অব দ্য পার্টিজ (কপ১৭)।

সোমবার শুরু হওয়া দুই সপ্তাহব্যাপী এ সম্মেলন চলবে ১৭ থেকে ২৮ আগস্ট পর্যন্ত। এতে ১৯৬টি দেশ ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের প্রতিনিধিদের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক সংস্থা, আর্থিক প্রতিষ্ঠান, ব্যবসায়ী, বিজ্ঞানী, নাগরিক সমাজ এবং ভূমিনির্ভর জনগোষ্ঠীর প্রতিনিধিরা অংশ নিচ্ছেন।

ভূমি পুনরুদ্ধার ও খরা মোকাবিলায় সরকারি ও বেসরকারি বিনিয়োগ বাড়ানো এবারের সম্মেলনের অন্যতম প্রধান অগ্রাধিকার। একই সঙ্গে খরা সহনশীলতা, চারণভূমি, টেকসই কৃষি, মাটি, অর্থায়ন এবং বেসরকারি খাতের অংশগ্রহণ নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেওয়ার কথা রয়েছে।

ভূমি অবক্ষয় ও খরার কারণে বিশ্ব অর্থনীতিতে বছরে প্রায় ৯০০ বিলিয়ন মার্কিন ডলার ক্ষতি হচ্ছে। বিশ্বের প্রায় ৪০ শতাংশ ভূমি এবং ৩২০ কোটি মানুষ এর প্রভাবে ক্ষতিগ্রস্ত। ২০০০ সালের পর থেকে খরার ঘটনা প্রায় এক-তৃতীয়াংশ বেড়েছে। বর্তমানে খরার কারণে বছরে অন্তত ৩০০ বিলিয়ন ডলার অর্থনৈতিক ক্ষতি হচ্ছে।

২০২৬ সালে অনুষ্ঠিত তিনটি ‘রিও কনভেনশন’-ভিত্তিক সম্মেলনের প্রথমটি হওয়ায় কপ১৭ ভূমি অবক্ষয়, জীববৈচিত্র্য হ্রাস, জলবায়ু পরিবর্তন, খাদ্য ও পানি নিরাপত্তা এবং পানির সহনশীলতার মতো আন্তঃসম্পর্কিত বিষয়গুলোতে জাতিসংঘের মরুকরণ প্রতিরোধ কনভেনশন, জীববৈচিত্র্য ও জলবায়ু কনভেনশনের মধ্যে সহযোগিতা বাড়ানোর সুযোগ তৈরি করেছে।

আয়োজক দেশ মঙ্গোলিয়ায় পরিস্থিতি আরও উদ্বেগজনক। দেশটির প্রায় ৭৭ শতাংশ ভূমি অবক্ষয়ের শিকার। দেশটির প্রায় এক-তৃতীয়াংশ মানুষের জীবিকা পশুপালননির্ভর। ২০২৩ ও ২০২৪ সালে তীব্র গ্রীষ্মকালীন খরার পর ভয়াবহ ‘জুদ’ শীত নেমে আসায় ৭০ লাখের বেশি গবাদিপশু মারা যায়। এতে শুষ্ক অঞ্চলের জনগোষ্ঠীর ঝুঁকি এবং জলবায়ু সহনশীলতা বাড়ানোর প্রয়োজনীয়তা স্পষ্ট হয়েছে।

সৌদি আরবের রিয়াদে অনুষ্ঠিত কপ১৬-এর অগ্রগতির ভিত্তিতে কপ১৭-তে খরা মোকাবিলায় বৈশ্বিক নীতিকাঠামো নিয়ে আলোচনা অব্যাহত থাকবে। পাশাপাশি জাতীয় খরা পরিকল্পনা বাস্তবায়নে প্রয়োজনীয় প্রযুক্তি, অংশীদারিত্ব ও অর্থায়ন ব্যবস্থা নিয়েও আলোচনা হবে। প্রস্তুতি, আগাম সতর্কীকরণ ব্যবস্থা, ঝুঁকি ও ভঙ্গুরতা মূল্যায়ন এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতা আলোচনায় গুরুত্ব পাবে।

২০১৩ সালে মাত্র তিনটি দেশের জাতীয় খরা পরিকল্পনা থাকলেও বর্তমানে ৭০টির বেশি দেশ এ ধরনের পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে। জাতিসংঘের মরুকরণ প্রতিরোধ কনভেনশনের তথ্য অনুযায়ী, খরা সহনশীলতায় বিনিয়োগ করা প্রতি এক ডলার থেকে সর্বোচ্চ ১০ ডলার পর্যন্ত অর্থনৈতিক সুফল পাওয়া যেতে পারে। কিছু প্রকৃতিনির্ভর সমাধানে বিনিয়োগের বিপরীতে সুফল পাওয়া যায় বিনিয়োগের ২৭ গুণ পর্যন্ত।

কপ১৭-তে রিয়াদ গ্লোবাল ড্রট রেজিলিয়েন্স পার্টনারশিপ, ড্রট রেজিলিয়েন্স ইনভেস্টমেন্ট ফ্যাসিলিটি এবং ইন্টারন্যাশনাল ড্রট রেজিলিয়েন্স অবজারভেটরির মতো উদ্যোগও গুরুত্ব পাবে।

ভূমি পুনরুদ্ধার ও খরা মোকাবিলায় অর্থায়ন সম্মেলনের অন্যতম প্রধান আলোচ্য বিষয়। ভূমি অবক্ষয় ও খরা মোকাবিলায় প্রতি বছর আনুমানিক ৩৫৫ বিলিয়ন ডলার প্রয়োজন হলেও বর্তমানে বিনিয়োগ হচ্ছে মাত্র প্রায় ৭৭ বিলিয়ন ডলার। ফলে বছরে প্রায় ২৭৮ বিলিয়ন ডলারের অর্থায়ন ঘাটতি রয়েছে।

স্বাস্থ্যকর ভূমি ও নির্ভরযোগ্য পানি সরবরাহের ওপর ব্যবসায়িক খাতের ব্যাপক নির্ভরতা থাকলেও ভূমি পুনরুদ্ধার ও খরা সহনশীলতায় বৈশ্বিক অর্থায়নের মাত্র প্রায় ৬ শতাংশ আসছে বেসরকারি খাত থেকে। কপ১৭-তে সরকারি ও বেসরকারি বিনিয়োগ বাড়ানো, টেকসই ভূমি ব্যবস্থাপনায় প্রণোদনা শক্তিশালী করা, বিনিয়োগের ঝুঁকি কমানো এবং ভূমি পুনরুদ্ধার ও সহনশীলতার লক্ষ্যগুলোর সঙ্গে বিনিয়োগকে আরও কার্যকরভাবে সমন্বয়ের উপায় নিয়ে আলোচনা হবে।

২৪ আগস্ট অনুষ্ঠিতব্য বিজনেস ফর ল্যান্ড ফোরামে সরকার, ব্যবসা ও বিনিয়োগকারীরা অংশ নিয়ে পুনরুদ্ধারমূলক ভূমি ব্যবস্থাপনায় বেসরকারি বিনিয়োগ বাড়ানোর উদ্যোগ নিয়ে আলোচনা করবেন। জাতিসংঘের মরুকরণ প্রতিরোধ কনভেনশন জানিয়েছে, পুনরুদ্ধারমূলক ভূমি ব্যবস্থাপনা বিষয়ক কর্মসূচিতে অংশ নেওয়া প্রতিষ্ঠানগুলো ইতোমধ্যে ৯ বিলিয়ন ডলারের বেশি বিনিয়োগের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে, যা ২১ কোটি হেক্টরেরও বেশি ভূমিকে অন্তর্ভুক্ত করবে।

‘আন্তর্জাতিক চারণভূমি ও পশুপালক বর্ষ’ উপলক্ষে কপ১৭-তে বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ কিন্তু দীর্ঘদিন উপেক্ষিত বাস্তুতন্ত্র চারণভূমিকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। বিশ্বের মোট স্থলভাগের প্রায় ৫৪ শতাংশ চারণভূমি। প্রায় ২০০ কোটি মানুষের জীবিকা এ অঞ্চলের ওপর নির্ভরশীল। চারণভূমি বিশ্বের প্রায় এক-ষষ্ঠাংশ খাদ্য এবং গবাদিপশুর প্রায় ৭০ শতাংশ খাদ্য সরবরাহ করে। একই সঙ্গে জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ, জলবায়ু সহনশীলতা এবং পশুপালক জনগোষ্ঠীর জীবিকার জন্য এসব ভূমি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

তবে বিশ্বের প্রায় অর্ধেক চারণভূমি ইতোমধ্যে অবক্ষয়ের শিকার অথবা ঝুঁকিতে রয়েছে। এসব চারণভূমির প্রায় ৭৮ শতাংশ শুষ্ক অঞ্চলে অবস্থিত, যেখানে খরা, জলবায়ু পরিবর্তন ও অনিয়ন্ত্রিত ভূমি ব্যবহারের কারণে চাপ বাড়ছে। সরকারগুলো চারণভূমি ও পশুপালকদের জন্য নতুন নীতিকাঠামো এবং টেকসই চারণভূমি ব্যবস্থাপনায় দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ ও পশুপালকদের জীবিকা শক্তিশালী করতে রেঞ্জল্যান্ডস ফ্ল্যাগশিপ ইনিশিয়েটিভ চালুর বিষয়টি বিবেচনা করবে।

কপ১৭ শুরুর দিনেই ইউরেশিয়াজুড়ে পরিচালিত সিল্ক রোড কারাভানের সমাপ্তি হয়েছে। এই বহুদেশীয় কর্মসূচিতে সরকার, বিজ্ঞানী, পশুপালক, স্থানীয় জনগোষ্ঠী ও তরুণরা অংশ নিয়ে ভূমি পুনরুদ্ধার, টেকসই চারণভূমি ব্যবস্থাপনা ও খরা মোকাবিলার বাস্তব অভিজ্ঞতা বিনিময় করেছেন।

আনুষ্ঠানিক আলোচনার পাশাপাশি কপ১৭-এর কর্মসূচিতে বাস্তবভিত্তিক উদ্যোগ ও সমাধান তুলে ধরা হবে। এতে সরকার, আর্থিক প্রতিষ্ঠান, ব্যবসা, বিজ্ঞানী, নাগরিক সমাজ, আদিবাসী জনগোষ্ঠী, পশুপালক, স্থানীয় জনগোষ্ঠী, নারী ও তরুণরা অংশ নেবেন। ২৪ আগস্ট অর্থায়ন দিবসে ভূমি পুনরুদ্ধার ও খরা সহনশীলতায় বিনিয়োগ বাড়ানো, ২৫ আগস্ট পানি দিবসে খরা সহনশীলতা ও ভূমি-পানি সম্পর্কিত সহযোগিতা, ২৬ আগস্ট ভূমি ও মানুষ দিবসে পশুপালক, আদিবাসী জনগোষ্ঠী, স্থানীয় জনগোষ্ঠী, নারী ও তরুণদের ভূমিকা এবং ২৭ আগস্ট খাদ্যব্যবস্থা ও মাটির স্বাস্থ্য দিবসে স্বাস্থ্যকর মাটি ও টেকসই খাদ্যব্যবস্থা নিয়ে আলোচনা হবে।

সম্মেলনের উচ্চপর্যায়ের অধিবেশনে খরা সহনশীলতা, টেকসই চারণভূমি, ভূমি পুনরুদ্ধারে অর্থায়ন, খাদ্যব্যবস্থা, মাটির স্বাস্থ্য, অভিবাসন ও নিরাপত্তা, বালু ও ধূলিঝড় এবং বেসরকারি খাতের অংশগ্রহণ নিয়ে মন্ত্রী পর্যায়ের আলোচনা হবে।

সম্মেলনে ‘দ্য ইকোনমিকস অব রেঞ্জল্যান্ডস রেস্টোরেশন’, ‘ড্রট ইন নাম্বারস ২০২৬’, ‘গ্লোবাল ল্যান্ড আউটলুক ফর স্মল আইল্যান্ড ডেভেলপিং স্টেটস’ এবং ‘সয়েল হেলথ: দ্য বিজনেস কেস ফর ইনভেস্টিং ইন আওয়ার ফাউন্ডেশন’-সহ গুরুত্বপূর্ণ বৈজ্ঞানিক ও নীতিগত প্রতিবেদন প্রকাশ করা হবে।

আগামী ২৮ আগস্ট কপ১৭ শেষ হবে। ওই দিন অংশগ্রহণকারী দেশগুলো জাতিসংঘের মরুকরণ প্রতিরোধ কনভেনশনের ভবিষ্যৎ কার্যক্রম পরিচালনা এবং ভূমি পুনরুদ্ধার ও খরা সহনশীলতায় বৈশ্বিক উদ্যোগের পরবর্তী ধাপ নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গ্রহণ করবে বলে আশা করা হচ্ছে।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

four × 3 =