হ্যাটট্রিক সাফ ফুটবল  শিরোপা জয় অধরা রইলো বাংলাদেশের

সালেক সুফী

২০২২ আর ২০২৪ পর পর দুবার দক্ষিণ এশিয়ার  সাফ ফুটবল শিরোপা জয়ী বাংলাদেশের প্রমীলা ফুটবল দল হ্যাটট্রিক শিরোপা জয়ের সম্ভাবনা নিয়ে এবার ভারত গিয়েছিলো আকাশ ছোয়ার প্রত্যাশা নিয়ে। এশিয়া কাপের চূড়ান্ত পর্বে খেলার অভিজ্ঞতা, পর্যাপ্ত প্রাক টুর্নামেন্ট প্রস্তুতি কিছুরই ঘাটতি ছিলনা। কিন্তু কেন জানি এবারের টুর্নামেন্টের শুরু থেকেই ছন্দ হীন এলোমেলো ছিল বাংলাদেশের মেয়েরা। সূচনা ম্যাচে মালদ্বীপকে ৪-২ ব্যাবধানে সহজে হারালেও খেলায় স্বতঃস্ফূর্ততা ছিলনা। দ্বিতীয় ম্যাচে ভারতের কাছে ০-৩ ব্যাবধানে বিপর্যস্ত হওয়ার পর শিউলী আজিমের স্নেহময়ী মায়ের তিরোধানের বেদনাকে শক্তিতে পরিণত করে কিছুটা ভাগ্যের সহায়তায় ২-১ নেপালকে হারিয়ে ফাইনালে আবারো মুখোমুখি হয় এবারের টুর্নামেন্টের সেরা দল স্বাগতিক ভারতের।

ভারতের পর্যটন নগরী গোয়ার মারগাওয়ের জওহরলাল নেহরু স্টেডিয়ামে সাফ নারী চ্যাম্পিয়নশিপের ফাইনালে বাংলাদেশকে ১-৩ গোলে হারিয়ে শিরোপা পুনরুদ্ধার করে স্বাগতিক ভারত। ২০১৯ সালের পর ফের শিরোপা জিতেছে ভারত। সেবার দলটি চ্যাম্পিয়ন হয়েছিল নেপালকে ৩-১ গোলে হারিয়ে।  বাংলাদেশ সর্বশেষ দুই আসরে শিরোপা জিতেছিল নেপালের মাটিতে নেপালকে হারিয়ে। ২০২৪ সালে নেপালকে হারিয়েছিল ২-১ গোলে এবং ২০২২ সালে ৩-১ গোলে। ২০১৬ সালে ভারতের বিপক্ষে ফাইনাল খেলেছিল বাংলাদেশ। ভারতের মাটিতে ফাইনালে তখন তারা হেরেছিলেন ১-৩ গোলে। ২০১০ সালে শুরু আসরের এবার অষ্টম। ভারত টানা পাঁচটিসহ ছয়বার শিরোপা জিতল এবং বাংলাদেশ জিতেছে দুবার।

টুর্নামেন্টের গতিধারা থেকে অনুমিত ছিল ভারত এবার শিরোপা জয় করবে। কাল একতরফা খেলা হয়েছে বলবো না। বাংলাদেশ কাল এবারের টুর্নামেন্টে তাদের সেরা পারফরমেন্স করে ভারতের আক্রমণ ভাগে বেশ কিছু গোল সম্ভবা আক্রমণ চালিয়েও কুশলী গোলদাতার অভাবে তুলনামূলকভাবে অধিক শক্তিশালী ভারতের কাছে হেরে গাছে। আর এখানেই অনুভূত হয়েছে সাবিনা, সানজীদা, সুমাইয়াদের অনুপস্থিতি।

ভারতের মাটিতে এখন পর্যন্ত কোনো ফাইনালে বাংলাদেশ জিততে পারেনি। এবার সুযোগ ছিল নারী চ্যাম্পিয়নশিপে। কিন্তু স্ট্রাইকারদের ভুলে সেই সুযোগ হাতছাড়া করেছে পিটার বাটলারের দল।

এবারের টুর্নামেন্টে অপরাজেয় ভারত কিন্তু ফাইনালে ঋতু পর্ণার গোলটির আগে একটি গোলও হজম করেনি। কাল কিন্তু ম্যাচের প্রথমার্ধে অনেকটা সেয়ানে সেয়ানে লড়াই করেছে বাংলাদেশ আর ভারত। বাংলাদেশ দলে শুরু থেকে সেমিফাইনালে শেষ মুহূর্তে গোল করে দলকে জেতানো সাগরিকাকে না খেলানো ভুল সিদ্ধান্ত ছিল কিনা সেটি বিবেচনা সাপেক্ষ। আক্রমণাত্মক ফুটবল খেলতে থাকা বাংলাদেশের সামনে কয়েকটা গোল করার সুযোগ আসলেও কাজে লাগাতে পারেনি তহুরা বা অন্য কেউ। এগুলো একটি থেকে গোল পেলে ম্যাচের ভাগ্য ভিন্ন ভাবে নির্ধারিত হতে পারতো। ম্যাচের ১২ মিনিটে প্রথম বড় সুযোগ পায় বাংলাদেশ। ঋতুপর্ণার ক্রসে পা ছোঁয়াতে পারেননি তহুরা খাতুন। দুই মিনিট পর বক্সে ঢুকে ফাঁকায় বল পেলেও লক্ষ্যে ঠিকঠাক শট নিতে পারেননি এই ফরোয়ার্ড। ৪১ মিনিটে তহুরার নেয়া শট অল্পের জন্য দূরের পোস্ট ঘেঁষে বাইরে চলে যায়।

অথচ প্রথমার্ধের ৪২ মিনিটে এগিয়ে যায় স্বাগতিক ভারত। কাউন্টার অ্যাটাকে ভারতকে এগিয়ে নেন পেয়ারি জাজা। ডি বক্সের ডান প্রান্ত থেকে বল পেয়ে শট নেন জাজা। বাংলাদেশের রক্ষণভাগের সুরভী ব্লক করেন। বল তার পায়ে লেগে হাওয়ায় ভেসে আগুয়ান গোলরক্ষক মিলির মাথার ওপর দিয়ে জালে প্রবেশ করে (১-০)। কিছু করার ছিল না মিলির। পিছিয়ে পড়ে গোল শোধে মরিয়া হয়ে ওঠে বাংলাদেশ। প্রথমার্ধে যোগ করা সময়ে সমতা আনে বাংলাদেশ (১-১)। আনিকা থেকে বল পেয়ে তহুরা দারুণভাবে ডিফেন্স ছেড়া পাস দেন ঋতুপর্ণাকে। ঋতুপর্ণা বাঁ প্রান্ত দিয়ে বক্সে ঢুকে ডান পায়ে মাটি কামড়ানো আড়াআড়ি শট নেন এবং ভারতের গোলরক্ষককে ফাঁকি দিয়ে বল জড়িয়ে যায় জালে। প্রথমার্ধ শেষ ১-১ গোলে।

দ্বিতীয়ার্ধের সূচনায় আবারো পিছিয়ে পরে বাংলাদেশ। পেয়ারি জাজার ক্রসে দারুণ হেডে গোল করেন সানফিদা (২-১ )। এর পর ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ ছিল ভারতের কাছে। বাংলাদেশ ক্রমাগত নিষ্প্রভ হয়ে পড়ে। ৮২ মিনিটে মালাভিকাকে আটকাতে ব্যর্থ হন আফঈদা। মালাভিকা বল ঠেলে দেন বক্সের মাথায়। লিন্দা কম সহজেই বল পাঠিয়ে দেন জালে। ৩-১ ব্যাবধানে বাংলাদেশকে হারিয়ে যোগ্যতম দল হিসাবেই শিরোপা জয় করে ভারতের মেয়েরা।

আমি বাংলাদেশের অদম্য কিশোরীদের বাহবা দিবো। নানা প্রতিকূলতার মাঝেও সামর্থ্যের সব কিছু দিয়ে লড়াই করেছে সন্দেহ নেই। বাস্তবতা হলো ভারত নেপাল যখন পরিকল্পিত পথে সেরা খেলোয়াড়দের নিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে বাংলাদেশ কেন এখনো সক্রিয় সাবিনা, সানজীদা, কৃষ্ণা, মাসুরা,সুমাইয়াদের দূরে সরিয়ে রেখেছে? কেন বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশন উদ্যোগী হয়ে  দেশের স্বার্থে সমস্যার সমাধান করছে না ?

বাংলাদেশকে এগিয়ে যেতে হলে নিজেদের দৃষ্টিভঙ্গি পাল্টাতে হবেই। ভুল থেকে শিক্ষা নিতেই হবে।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

thirteen + fifteen =