বলিউড কুইন ঐশ্বরিয়া

নাহিন আশরাফ

এইতো ৫০ এর কোঠায় পা দিলেন তিনি। কিন্তু দেখে বোঝা দায়। তিনি হলেন ভারতের শীর্ষ অভিনেত্রী, প্রাক্তন মিস ওয়ার্ল্ড ঐশ্বরিয়া রাই বচ্চন। ডাকনাম আ্যাশ। এই বিশ্বসুন্দরী অমিতাভ বচ্চনের ছেলে অভিষেক বচ্চনকে বিয়ে করে নিজের নামের শেষে পেয়েছেন বচ্চন উপাধি। অনেকে ঐশ্বরিয়া রাইকে বচ্চন পরিবারের পুত্রবধু হিসেবেই চিনে থাকেন।

ঐশ্বরিয়া রাই ১৯৭৩ সালে ১ নভেম্বর ভারতে জন্মগ্রহণ করেন। তার বাবার নাম কৃষ্ণরাজ রাই ও মায়ের নাম ভ্রিন্দা রাই। ছোটবেলায় ঐশ্বরিয়া খুব মেধাবি ছিলেন। তার প্রিয় বিষয় ছিল গণিত। রেজাল্ট ভালো থাকার কারণে স্থাপত্যশিল্পী হতে চেয়েছিলেন। এ বিষয় নিয়ে পড়াশোনাও শুরু করেছিলেন তিনি। কিন্তু ভাগ্য চেয়েছিল অন্যকিছু। তাই স্থাপত্যশিল্পী আর হয়ে ওঠা হয়নি তার। পড়াশোনা করা অবস্থাতেই তিনি সিনেমা ও মডেলিংয়ের প্রচুর প্রস্তাব পেতেন।

ঐশ্বরিয়া পড়ালেখা ছাড়াও সংস্কৃতি চর্চা বেশ জোর দিয়ে করতেন। তিনি ছোটবেলা থেকেই নাচে বেশ পারদর্শী ছিলেন। প্রথম ক্যামেরার সামনে আসেন ক্যামেলাইন পেন্সিলের বিজ্ঞাপনের মাধ্যমে। ১৯৯৩ সালে পেপসির বিজ্ঞাপনও করেন তিনি। তবে তার জীবনের মোড় ঘুরে যায় ১৯৯৪ সালে ‘বিশ্বসুন্দরী’ নির্বাচিত হবার পর। এর আগে টুকটাক কাজ করলেও তেমন লাইম লাইটে আসতে পারেনি তিনি। তবে বিশ্বসুন্দরী হবার পর বলিউডের রানী বলে তার পরিচয় হয়। পুরো পৃথিবীতে তিনি ভারতকে তুলে ধরেন। তিনি শুধু বিশ্বসুন্দরী নন, ভারতের গৌরবও।

দেখা গেছে বিশ্বসুন্দরী হবার পর অনেকেই মিডিয়া জগত থেকে হারিয়ে গেছে, ব্যস্ত হয়েছে ব্যক্তিজীবনে। কিন্তু ঐশ্বরিয়া রাইয়ের ক্ষেত্রে তা ঘটেনি। ১৯৯৭ সালে তামিল সিনেমা ‘ইরুভার’ দিয়ে সিনেমায় পথ চলা শুরু হয়। তিনি হিন্দি ও ইংরেজি ভাষা ছাড়াও তামিল ও বাংলা ভাষায় বেশ দক্ষ। তার প্রথম হিন্দি সিনেমা ছিল ‘অওর প্যেয়ার হো গায়া’, তার বিপরীতে ছিলেন ববি দেওল। বলিউডে কাজ করা শুরু করলেও তামিল সিনেমার মায়া তিনি ছাড়তে পারেননি। একের পর এক হিট তামিল সিনেমা করেছেন তিনি। ১৯৯৮ সালে ‘জিন্স’ নামের একটি তামিল ছবিতে তিনি অভিনয় করেন। এই ছবিতে অসাধারণ অভিনয়ের জন্য সবার প্রশংসা কুড়িয়েছিলেন। শুরুর দিকে বলিউডে বেশ কয়েকটি সিনেমা করার পরেও সিনেমা তেমন সফল হচ্ছিল না।

বলিউডে ঐশ্বরিয়ার প্রথম সফল সিনেমা ‘হাম দিল দে চুকে সানাম’। ‘ধুম ২’ সিনেমাটি বলিউডে প্রথম ব্যবসাসফল সিনেমা ছিল। তাকে এখানে ভিন্নধর্মী লুকে দেখা যায়। পরবর্তীতে একের পর এক সফল সিনেমা উপহার দেন বলিউডকে। তিনি বাংলায় ভালো কথা বলতে পারেন। তার প্রমাণ বাংলা ছবি ‘চোখের বালি’ ও ‘রেইনকোট’। চোখের বালি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের লেখা একটি উপন্যাস। এই ছবিতে বাল্যবিবাহ, বিধবা ও নানা কুসংস্কার তুলে ধরা হয়। ঋতুপর্ণ ঘোষের পরিচালনায় ঐশ্বর্য রাই সিনেমাটিতে অভিনয় করেন। রেইন কোট সিনেমাটিও ঋতুপর্ণ ঘোষ পরিচালিত। অসাধারণ এই দুটি সিনেমার কথা এখনো সবাই মনে রেখেছে।

‘যোধা আকবর’ এবং ‘উমরাও জান’ ঐশ্বরিয়ার ব্যবসাসফল সিনেমা। সিনেমা জগতে বেশ ভালোভাবেই রাজত্ব করেন তিনি। অন্যসব সেলিব্রিটিদের মতো তাকে নিয়েও কিন্তু আলোচনা-সমালোচনার শেষ নেই। অনেকে বলেন, সুন্দরী হলেও অভিনয়টা ঠিক আয়ত্ত করে উঠতে পারেননি তিনি। কিন্তু সমালোচনা তো লোকে করবেই। তাই বলে কিন্তু তিনি থেমে থাকেননি। অনেকবার নিজের কাজের জন্য পেয়েছেন সম্মাননা, হয়েছেন পুরস্কৃত। সৌন্দর্য ও কাজের মাধ্যমে তিনি শুধু বলিউড নয় বিশ্বের নামিদামি ইভেন্টে জায়গা করে নিয়েছেন। দেখা গেছে পৃথিবীর অনেক দেশের মানুষ ভারতবর্ষের আর কাউকে চেনে না শুধু চিনে বিশ্বসুন্দরী ঐশ্বরিয়া রাইকে। বিশ্বের বিভিন্ন বড় বড় অ্যাওয়ার্ড শো’য়ে লাল কার্পেটে হেঁটে বেড়াতে দেখা যায় তাকে।

ঐশ্বরিয়া রাই অভিনয় ও কাজ ছাড়াও প্রেম-ভালবাসা, বিয়ে ও ব্যক্তিজীবন নিয়ে বারবার শিরোনামে এসেছেন। অমিতাভ বচ্চনের ছেলে অভিষেক বচ্চনকে বিয়ে করা নিয়েও রয়েছে অনেক আলোচনা। ঐশ্বর্য রাই বলিউড ও পুরো বিশ্বে রাজত্ব করলেও অভিষেক বচ্চন তেমন উল্লেখযোগ্য কোনো কাজ করতে পারেননি। কিন্তু অমিতাভ বচ্চন ছিলেন বলিউডের সেরা অভিনেতা। তাই অনেকে বলেন, অমিতাভ বচ্চনের খ্যাতির লোভেই ঐশ্বর্য রাই তার পুত্রকে বিয়ে করেছেন। বলিউডের আরেক অভিনেতা সালমান খানকে নিয়েও রয়েছে তার প্রেমের গল্প। ২০০২ সালে ঐশ্বরিয়া রাই একটি সংবাদ সম্মেলনে বলেন, সালমানের সাথে তার কোনো ধরনের সম্পর্ক নেই। অনেক জায়গায় বলতে শোনা গেছে, সালমান তার উপর মানসিক অত্যাচার করেছেন। কোনো কারণ ছাড়াই সালমান তাকে সন্দেহ করতেন বলে জানান তিনি। তাই মূলত তিনি আলাদা হয়ে যাবার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন।

সালমানের সঙ্গে প্রেমের ইতি টেনে ঐশ্বরিয়া ২০০৭ সালে অভিষেক বচ্চনকে বিয়ে করেন। অভিষেক তাকে প্রথমে প্রেমের প্রস্তাব দিলে তিনি তা গ্রহণ করে কিছুদিনের মধ্যেই বিয়ে করে ফেলেন। বিয়ের পর তিনি সিনেমা ও কাজ থেকে বেশ কিছুদিন বিরতি নেন। বলিউড কুইন থেকে হয়ে উঠেন বচ্চন পরিবারের বউ। বেশ গুছিয়ে সংসার করা শুরু করেন। যেকোনো সামাজিক অনুষ্ঠানে তাকে শুধু দেখা যেত বচ্চন পরিবারের সাথেই। ২০১১ সালে তার কোলে আসে তাদের সন্তান আরাধ্য বচ্চন। অভিষেক বচ্চন ও তার সংসার নিয়েও গুঞ্জন কম হয়নি। কখনো কখনো ভুয়া সংবাদ করা হয় যে তাদের মধ্যে বিচ্ছেদ হয়ে যাচ্ছে। কিন্তু কোনো কিছুকে তারা গায়ে না মেখে নিজেদের মতো সংসার করে যাচ্ছেন। সন্তানকে নিয়েও বেশ যত্নশীল ঐশ্বরিয়া রাই। যেকোনো কিছুর আগে তার মেয়েই এখন তার প্রথম প্রায়োরটি বলে জানান বিভিন্ন গণমাধ্যমকে।

ঐশ্বরিয়ার ক্যারিয়ার ও ব্যক্তিজীবনের পর তার আরেকটি বিষয়ে সবার আগ্রহ তা হলো ফিটনেস ও সৌন্দর্য। পঞ্চাশের ঘরে পা দিয়েও কিভাবে তিনি এতো ফিট, তা নিয়ে কৌতুহলের শেষ নেই। বরাবরই তিনি জানান, তার ফিটনেসের রহস্য সঠিক খাদ্যাভ্যাস। সারাদিন তিনি নিজেকে অনেক নিয়মের মধ্যে রাখেন। সন্তান জন্ম দেওয়ার পর অন্যান্য মায়েদের মতো তিনিও কিছুটা মুটিয়ে গিয়েছিলেন। তখন কিছুদিন বিরতি নিয়ে আবার নিজের হারিয়ে যাওয়া ফিটনেস ফিরিয়ে আনেন। তার সকাল শুরু হয় গরম পানি ও লেবুর রস দিয়ে। যত ব্যস্ততাই থাকুক না কেন, সকালে ভরপুর নাস্তা করতে তিনি ভোলেন না। কারণ এতে সারাদিন তেমন ক্ষুধা লাগে না। দুপুরের খাবারে তিনি খান লাল চালের ভাত, ডাল ও এক বাটি সবজি। তিনি প্রতিদিন পর্যাপ্ত পরিমাণে প্রোটিন গ্রহণ করেন। প্রোটিনের মধ্যে মাছ তার সবচেয়ে পছন্দ, গ্রিল করে মাছ খেতে তিনি ভালোবাসেন। এছাড়া তিনি প্রতিদিন ডিম খান। দুপুরের মতোই হয়ে থাকে তার ডিনার। তবে তিনি ডিনারে প্রচুর সালাদ খান।

একটি সাক্ষাৎকারে ঐশ্বরিয়া বলেন, তিনি খেতে খুব একটা ভালোবাসেন না। শুধু শক্তি পাওয়ার জন্য যতটুকু খাবারের প্রয়োজন ততটুকু খেয়েই তিনি সন্তুষ্ট থাকেন। চা বা কফি তিনি খেতে পছন্দ করেন না। ফ্রেশ ফলের জুস তার বেশি পছন্দ। প্রতিদিন বিকালে তিনি গ্রিন টি পান করেন। খাবারের পাশাপাশি তার ফিট থাকবার আরেকটি কারণ হচ্ছে তিনি প্রতিদিন ব্যায়াম করেন। ঘুম থেকে উঠেই তিনি এক ঘণ্টা হেঁটে তার দিন শুরু করেন। তিনি জিমে যেতে পছন্দ করেন না। বাড়িতে যতটুকু করা সম্ভব তিনি তাই করেন। রোজ নিয়ম করে তিনি ইয়োগা করেন। নিজের স্কিনের যত্ন নিতেও তিনি ঘরোয়া জিনিস ব্যবহার বেশি করেন। হলুদ ও নিমপাতা ব্যবহার করে রূপচর্চা করেন। পেশার জন্য যেহেতু তাকে বেশিরভাগ সময় মেকআপ নিতে হয় তাই তিনি খেয়াল রাখেন যাতে খুব ভালোভাবে মেকআপ রিমুভ হয়। এছাড়া তিনি প্রচুর পরিমাণে পানি পান করেন, যা তাকে ফ্রেশ থাকতে সাহায্য করে।

লেখাটির পিডিএফ দেখতে চাইলে ক্লিক করুন: সেলিব্রেটি

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

7 + twelve =