বাংলাদেশ পাকিস্তান সিলেট টেস্ট: দ্বিতীয়  দিন শেষে ম্যাচের নিয়ন্ত্রণে বাংলাদেশ

সালেক সুফী

সিলেট টেস্টের দুই দিন শেষে বাংলাদেশ সিরিজে পাকিস্তানকে ধবল ধোলাই করার সুবাতাস পেতে শুরু করেছে। বোলিং সহায়ক সবুজ ঘাসে ঢাকা উইকেটে বাংলাদেশ প্রথম ইনিংসে সংগ্রহ করে ২৭৮।  পাকিস্তানকে নিজেদের উন্নত পেস স্পিন ভারসাম্য বোলিং দাপটে বিপর্যস্ত করে ২৩২ রানে সীমিত রেখে ৪৬ রানে এগিয়ে থাকে। দিনশেষে দ্বিতীয় ইনিংসে ১১০/৩ করে ১৫৬ রানে এগিয়ে থেকে চালকের আসনে পৌঁছেছে। যদি ম্যাচটির উল্লেখযোগ্য অংশ বৃষ্টিতে পরিত্যক্ত না হয় তাহলে এই টেস্ট এবং সিরিজে ধবল ধোলাই এড়ানো পাকিস্তানের জন্য সম্ভব হবেনা।

দুই ম্যাচ টেস্ট সিরিজের প্রথম টেস্ট জয়ী বাংলাদেশ সিরিজ ধবল ধোলাই অর্জনের মিশনে চা বাগান ঘেরা মনোরম সিলেট আন্তর্জাতিক ক্রিকেট স্টেডিয়ামে খেলছে দ্বিতীয় টেস্ট। আবহাওয়ার পূর্বাভাসে প্রথম দুইদিন বৃষ্টি খেলায় বিঘ্ন ঘটানোর কথা থাকলেও মেঘে ঢাকা আকাশের নিচে সবুজের আচ্ছাদনে ঢাকা বোলিং সহায়ক উইকেটে লিটন দাসের অতিমানবীয় ইনিংস (১২৬ রান) আর বাংলাদেশ দলের তাসকিন, তাইজুল, নাহিদ, মেরাজের সম্মিলিত সাঁড়াশি আক্রমণ বাংলাদেশকে চালকের আসনে পৌঁছে দিয়েছে।

সাধারণত টেস্ট জয়ী একাদশে কম্বিনেশন পরিবর্তন আনা হয়না। তবুও ম্যাচ পরিস্থিতি এবং দুই দলের ভারসাম্যের বিবেচনায় বাংলাদেশ এবাদাতকে বিশ্রাম দিয়ে বাম হাতি সীমার শরিফুলকে একাদশে অন্তর্ভুক্ত করে। প্রথম টেস্ট খেলা সাদমান আঘাত পাওয়ায়  অভিষেক হয় সাদা বল ফরম্যাটে ভালো খেলা তানজিদ তামিম।

প্রথম টেস্ট পরাজয়ের পর সিরিজ পরাজয় এড়ানোর জন্য বেপরোয়া পাকিস্তান বাবর আজম, খুররাম সাজ্জাদ আর সাজিদ খান তিন পরিবর্তন নিয়ে নিজেদের সেরা শক্তি নিয়ে টেস্ট শুরু করে। হাঁটুর ব্যাথার কারণে প্রথম টেস্ট না খেলা বাবর আজমের প্রত্যাবর্তন ছিল প্রত্যাশিত। প্রথম টেস্টে ভালো খেলা দুই অভিষিক্ত তরুণ আজান আইওয়াজ বা আব্দুল্লাহ ফজলকে পরিবর্তনের সুযোগ ছিলনা। বিশ্রাম দেয়া হলো ইমাম উল হককে। তবে সবচেয়ে সাহসী সিদ্ধান্ত ছিল পাকিস্তানের প্রিমিয়াম পেস বোলার শাহীন শাহ আফ্রিদিকে বিশ্রাম দিয়ে খুররাম সাজ্জাদকে একাদশে আনা। বাংলাদেশ দলে বাম হাতি ব্যাটসম্যানদের আধিক্য থেকেই বাম হাতি স্পিনার নোমান আলীর পরিবর্তে ডান হাতি অফ স্পিনার সাজিদ খানকে দলে নেয়া হয়।

টস জয়ী পাকিস্তান বোলিং সিদ্ধান্ত পরিস্থিতি, পরিবেশ আর উইকেট বিবেচনায় ছিল বিচক্ষণ সিদ্ধান্ত। উইকেটে বোলারদের জন্য পর্যাপ্ত সহযোগিতা ছিল। শুরুতেই পাকিস্তানী পেসাররা খুররাম সাজ্জাদ আর মোহাম্মদ আব্বাস সঠিক লাইন লেংথে বোলিং করে বাংলাদেশী ব্যাটসম্যানদের কোনঠাসা করে ফেলেছিলো। ০ রানে মাহমুদুল হাসান জয় ফিরে যাবার পর তানজিদ তামিম আর মোমিনুল হকের মাঝে ৪৪ রানের একটি পার্টনারশিপ গড়ে উঠেছিল। কিন্তু খুররাম সাজ্জাদ আর মোহাম্মদ আব্বাস উইকেটের সহায়তা কাজে লাগিয়ে তামিম, মোমিনুল, মুশফিক, মেহেদী মিরাজকে নিয়মিত বিরতিতে ফিরিয়ে দিলে একসময় বাংলাদেশের স্কোর দাঁড়ায় ১১৬/৬। উইকেটে স্বীকৃত ব্যাটসম্যান একমাত্র লিটন কুমার দাস সঙ্গে বাংলাদেশের ব্যাটিং লেজ। এদিন লিটন নিজের মেধা, মনন নিবেদন কাজে লাগিয়ে একটি বিশ্বমানের ইনিংস উপহার দেয়। দলের দায়িত্ব কাঁধে নিয়ে লিটন তাইজুল, তাসকিন, শরিফুলকে সাথী করে শেষ ৪ উইকেটে ১৬২ রান যোগ করে দলকে শুধু বিপদ মুক্ত করেনি। কঠিন উইকেটে ২৭৮ রানের একটি প্রতিদ্বন্দ্বী স্কোর গড়ে তুলে। লিটনের ১৫৯ বলে ১৬ চার আর দুই ছক্কায় সংগ্রহীত ১২৬ রানের ইনিংসটি গুনে মানে আকর্ষণে ছিল বিশ্বমানের। তাইজুল ইসলামের সঙ্গে ৭ম উইকেট জুটিতে সংগ্রহে ৬০ রান ম্যাচের গতি ধারা পাল্টে দেয়।  লিটন যেভাবে সঙ্গীদের আড়াল করে খেলেছে সেটি ছিল শিক্ষণীয়। ব্যাট হাতে তাইজুল, তাসকিন এবং শরিফুল যথেষ্ট দৃঢ়তার পরিচয় দেয়। এই ম্যাচে সুযোগ পাওয়া খুররাম সাজ্জাদ (৪/৮১ ) আর বরাবর ভালো বোলিং করা মোহাম্মদ আব্বাস (৩/৪৫) ছিল পাকিস্তান বোলিংয়ের মূল অস্ত্র। প্রথম দিন শেষে পাকিস্তানের দুই তরুণ আজান আর ফজল ইনিংস সূচনা করে ২১/০ শেষ করে।

দ্বিতীয় দিন:

অনেকের ধারণা ছিল বাবর আজম ফিরে আশায় এবং বাংলাদেশের প্রথম ইনিংস ২৭৮ রানে সীমিত রাখায় টেস্টে প্রতিদ্বন্দ্বিতা সৃষ্টি করবে পাকিস্তান। কিন্তু জয়ের নেশায় বাংলাদেশ শুরুতেই তাসকিন -মিরাজের যৌথ দক্ষতায় দ্রুত ৭৯ রান তুলতেই ৪ উইকেট তুলে নিয়ে চাপে ফেলে। বাবর সেখান থেকে সাউদ শাকিলকে সঙ্গী করে প্রতিদ্বন্দ্বিতা গড়ে তুলছিলো। ৮৪ বলে ৬৮ রান করা বাবরের ইনিংসে প্রতিশ্রুতি ছিল। কিন্তু নাহিদ রানার পরিকল্পিত ফাঁদে পা দিয়ে বাবর ফিরে যাবার পর নাহিদ তাইজুল ঝরে বিপর্যস্ত পাকিস্তান ২০৭ রানে হারিয়ে ফেলে ৯ উইকেট। শেষ উইকেটে বেপরোয়া ব্যাটিং করে সাজিদ খান (৪ ছক্কা আর ২ চারে ৩৮ রান) পাকিস্তানের স্কোর ২৩২ পৌঁছে দেয়। তবুও বাংলাদেশ ৪৬ রানের লিড পায়। বাংলাদেশের হয়ে নাহিদ (৬০/৩) তাইজুল (৬৭/৩), মিরাজ (২১/২), তাসকিন (৩৭/২) পাকিস্তান ইনিংসে বিভীষিকা সৃষ্টি করে। ভালো বোলিং করেও উইকেট পায়নি শরিফুল।

বাংলাদেশের দ্বিতীয় ইনিংসের সূচনায় তানজিদ তামিম শুরুতেই ফিরে গেলেও ছন্দে ফেরা মাহমুদুল হাসান জয় খেলে ৬৪ বলে ৫২ রানের আগ্রাসী ইনিংস। জয় মোমিনুল দ্বিতীয় উইকেট জুটির স্বচ্ছন্দ ৭৬ রান ম্যাচে বাংলাদেশের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করে। জয় আর মোমিনুল ফিরলেও উইকেটে আছে নাজমুল শান্ত। ১৭ উইকেট হাতে নিয়ে ১৫৬ রানে এগিয়ে থাকা বাংলাদেশ  আজ শান্ত, মুশফিক, লিটনদের অবদানে ৩২৫ -৩৫০ লিড পেলে প্রকৃতির সহায়তা ছাড়া টেস্ট আর সিরিজ ধবল ধোলাই পাকিস্তানের ভাগ্যে লিখা হয়ে গেছে বলা যায়।

সংক্ষিপ্ত স্কোরকার্ড:

বাংলাদেশ  প্রথম ইনিংস: ২৭৮ অল আউট (লিটন কুমার দাস ১২৬, নাজমুল হোসেন শান্ত ২৯, তানজিদ হাসান তামিম ২৬, মুশফিকুর রহিম ২৩, মোমিনুল হক ২২, তাইজুল ইসলাম ১৬, খুররাম সাজ্জাদ ৪/৮১, মোহাম্মদ আব্বাস ৩/৪৫, হাসান আলী ২/ ৪৯)

বাংলাদেশ দ্বিতীয় ইনিংস: ১১ও/৩ (মাহমুদুল হাসান জয় ৫২, মোমিনুল হক ৩০, খুররম সাজ্জাদ ২/১৯)

পাকিস্তান প্রথম ইনিংস: ২৩২ অল আউট (বাবর আজম ৬৮, সাজিদ খান ৩৮, শান মাসুদ ২১, সালমান আগা ২১, নাহিদ রানা ৩/৬০, তাইজুল ইসলাম ৩/৬৭, মেহেদী মিরাজ ২/২১, তাসকিন আহমেদ ২/৩৭)

দ্বিতীয় ইনিংসের ৭ উইকেট হাতে নিয়ে ১৫৬ এগিয়ে বাংলাদেশ।

বাংলাদেশের স্বস্তির কথা টেস্ট ক্রিকেটে ধারাবাহিকতা আসছে। দলে ব্যাটিং বোলিংয়ে দলগতভাবে অবদান রাখছে সবাই। সিরিজে দুই টেস্ট থেকে পূর্ণ পয়েন্ট পেলে আইসিসি টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপে বাংলাদেশের অবস্থান সুদৃঢ় হবে।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

ten − 4 =