সাগর সম্পদ হতে পারে বাংলাদেশের উন্নয়নের চাবিকাঠি

প্রাকৃতিক সম্পদে সমৃদ্ধ বঙ্গোপসাগরের বিপুল সম্পদ ( গ্যাস, তেল, মৎস্য, বায়ু বিদ্যুৎ সম্ভাবনা ) সঠিক পরিকল্পনা এবং আধুনিক প্রযুক্তিতে অনুসদ্ধান এবং আহরণ করা হলে বাংলাদেশের টেকসই অর্থনৈতিক উন্নয়নের চাবিকাঠি হতে পারে। যে যাই বলুক প্রতিবেশী ভারত এবং মায়ানমারের সঙ্গে সীমানা বিরোধ মীমাংসা করে বঙ্গোপসাগরে বিস্তীর্ণ এলাকার উপর বাংলাদেশের সার্বভৌম অধিকার প্রত্যাশা ছিল শেখ হাসিনা সরকারের বিশাল অর্জন।

একই সময়ে দীর্ঘ সময়ে সাগর সম্পদ আহরণে কার্যকরী উদ্যোগ গ্রহণ না করাও ছিল আমলা নির্ভর এবং সিন্ডিকেট প্রভাবিত সরকারের ব্যর্থতা। অনেকের মতে বাংলাদেশের মালিকানাধীন সাগর অঞ্চলে মাটির নিচে বিপুল পরিমাণ জ্বালানি সম্পদ পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। একই সঙ্গে গভীর সাগরে আছে বিপুল মৎস্য এবং অন্যানো জলজ সম্পদ। অনেকের মতে গভীর সাগর থেকে বায়ু বিদ্যুৎ উৎপাদনের সম্ভাবনা রয়েছে।

বঙ্গোপসাগর ঘিরে পরাশক্তিগুলোর প্রভাব বলয় সৃষ্টির মল্লযুদ্ধ এবং আমলা নির্ভর সরকারগুলোর বার্থতার কারণে দেড় যুগ ধরে বাংলাদেশ সাগর সম্পদ আহরণে নিদারুনভাবে ব্যর্থ হয়েছে। ভুল পরিকল্পনা এবং অতিরিক্ত রক্ষণশীলতার কারণে দীর্ঘ দেড় দশকেও বাংলাদেশ গভীর সাগরে গ্যাস তেল অনুসন্ধানের জন্য আন্তর্জাতিক তেল কোম্পানিগুলোকে নিয়োগ করতে পারেনি। অথচ একই সময়ে প্রতিবেশী দেশ মায়ানমার আর ভারত সাগরে অনুসন্ধান চালিয়ে বিপুল গ্যাসসম্পদ আহরণ করে লাভবান হয়েছে।

কনোকো ফিলিপ্স, দাইয়ু পস্কো, উডসাইড পেট্রোলিয়াম, টোটাল বা এক্সন মোবিলের মতো কোম্পানিগুলো আগ্রহ নিয়ে এগিয়ে আসলেও আমলাদের ভুল পরামর্শে সরকারগুলো সিদ্ধান্ত নিতে ব্যর্থ হয়েছে। নিজেদের সম্পদ আহরণ উপেক্ষা করে ক্রমান্বয়ে আমদানিকৃত জ্বালানি নির্ভর হয়ে পড়ায় সৃষ্টি হয়েছে মহাসঙ্কট। অনেকের ধারণা গভীর সাগরে আছে বিপুল মৎস্য  সম্পদ। আধুনিক প্রযুক্তির সহায়তায় গভীর সাগরে মৎস্য আহরণ করেই বাংলাদেশ বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা আহরণ করতে পারে। মৎস্য ছাড়াও সাগরে আছে নানা ধরনের জলজ সম্পদ। ডেনমার্ক সরকারের সঙ্গে সহায়তায় বাংলাদেশের একটি প্রতিষ্ঠান গভীর সাগর থেকে বায়ু বিদ্যুৎ উৎপাদনের উদ্যোগ নিলেও ভুল পরামর্শে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার সেই উদ্যোগ বাতিল করেছে। দুনিয়ার অনেক দেশ সাগর সম্পদ আহরণ করে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জন করেছে।

দেশে যখন জ্বালানি দুর্ভিক্ষ সেই মুহূর্তে নতুন সরকারের প্রাধিকারে এসেছে দ্রুত পিএসসি বিডিং রাউন্ড ঘোষণা করে আগ্রাসী জ্বালানি কূটনীতির মাধ্যমে বিশ্বের শীর্ষ আন্তর্জাতিক তেল কোম্পানিগুলোকে আগ্রহী করে জ্বালানি অনুসন্ধানের জন্য পিএসসি চুক্তি স্বাক্ষর।বিশেষ ক্ষেত্রে পেট্রোবাংলার কাছে সংরক্ষিত  সাগর সম্পদের তথ্য উপাত্ত উন্মুক্ত করে আগ্রহী কোম্পানিগুলোকে আগ্রহী   করে তোলা। ২০২৬ শেষ নাগাদ গভীর সাগর এবং অগভীর সাগরের ব্লকগুলোতে অনুসন্ধানের জন্য চুক্তি সম্পাদন করা সম্ভব হলে ৮-১০ বছরের মধ্যে বাংলাদেশ সাগরের জ্বালানি সম্পদ থেকে দীর্ঘস্থায়ী জ্বালানি নিরাপত্তা অর্জন করে নিশ্চিত করে বলা যেতেই পারে।

জানিনা বাংলাদেশের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পাদিত জ্বালানি চুক্তিতে সাগরের তেল গ্যাস অনুসদ্ধান বিষয়ে কোনো শর্ত জুড়ে দেওয়া আছে কিনা। না থাকলে উন্মুক্ত বিডিং করা হলে বিশ্বসেরা আন্তর্জাতিক তেল কোম্পানিগুলো বিশ্ব জ্বালান সংকটের বর্তমান মুহূর্তে জ্বালানি অনুসন্ধানে ঝুঁকি পূর্ণ বিনিয়োগে আগ্রহী হবে। মার্কিন কোম্পানি এক্সন মোবিল একাই গভীর সাগরে ১৫টি ব্লকে বিনিয়োগ করার আগ্রহ প্রকাশ করেছে।

এর আগে কনোকো ফিলিপ্স গভীর সাগরে কয়েকটি ব্লকে সাইসমিক সার্ভে করে গ্যাস প্রাপ্তির সম্ভাবনা দেখায় অনুসদ্ধানের আগ্রহ প্রকাশ করে পেট্রোবাংলার কাছে গ্যাস মূল্য বৃদ্ধির অনুরোধ করেছিল। অতি রক্ষণশীলতার জন্য সরকার রাজি হয়নি। সেই সময় সরকার আলোচনার মাধ্যমে বিষয়টি নিস্পত্তি করলে এখন হয়ত সাগরের গ্যাস জাতীয় গ্রিডে প্রবাহিত হত। বাংলাদেশকে বহুমূল্যের এলএনজি আমদানির জন্য হাপিত্যেশ  করতে হত না। পেট্রোবাংলা দাই ইউ পস্কো এবং টোটালকেও পাত্তা দেয়নি। এমনকি সরকার উডসাইড পেট্রোলিয়ামের স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে ৫ ব্লকে বিনিয়োগ প্রস্তাবকেও গুরুত্ব দেয়নি।  নিজেরা যথাযথ উদ্যোগ না নিয়েও একধরনের দুষ্ট চক্রের প্রভাবে সরকার ভ্রান্ত ধারণা নিয়ে বসে ছিল বাংলাদেশের সাগরে গ্যাস প্রপ্তির সম্ভাবনা সীমিত।

পরবর্তীতে মডেল পিএসসিতে বিনিয়োগের জন্য গ্যাস প্রাইস, উৎপাদন বন্টন, বিনিয়োগ পুনঃরুদ্ধার বিষয়ে  অনেক আকর্ষণীয় শর্ত আছে। অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে পেট্রোবাংলা আগ্রহী কোম্পানিগুলোর সঙ্গে আলোচনা করে মডেল পিএসসিতে পরিবর্তন এনেছে। এখন যদি পেট্রোবাংলা এবং জ্বালানি মন্ত্রণালয় খোলা মন নিয়ে আগ্রহী কোম্পানিগুলোর সঙ্গে আন্তরিকভাবে আলোচনা করে আমি মনে করি যুক্তরাষ্ট্র, পশ্চিম ইউরোপ, চীন, মালয়েশিয়া, দক্ষিণ কোরিয়া‍, রাশিয়ার কোম্পানিগুলো সাগরে গ্যাস অনুসন্ধানে আগ্রহী হবে।ৎ

সরকারকে স্বচ্ছতার নিশ্চয়তা দিতে হবে এবং বিডিং থেকে শুরু করে পিএসসি চুক্তি স্বাক্ষর পর্যন্ত আমলাতান্ত্রিক জটিলতা পরিহার করতে হবে। কিছু মানুষ বিদেশে রোড শো করার কথা বলছে, আধুনিক প্রযুক্তির যুগে বিশ্ব যখন হাতের মুঠোয় তখন লন্ডন, নিউয়র্কে রোড শো করার প্রয়োজন আছে বলে মনে করি না। বরং আগ্রহী কোম্পানিগুলোকে ঢাকায় আমন্ত্রণ জানিয়ে দুই দিনব্যাপী ওয়ার্কশপ হতে পারে। আমি মনে করি না শীর্ষ কোম্পানিগুলো সাগরে বিপুল পরিমাণ ঝুঁকিপূর্ণ বিনিয়োগের ক্ষেত্রে বাপেক্সকে অংশীদার করতে আগ্রহী হবে। বাপেক্স  নিজেদের উদ্যোগে এক বা একাধিক কোম্পানিগুলোর সঙ্গে মিলিত হয়ে যৌথ প্রস্তাব দিতে পারে। এই ক্ষেত্রে বাংলাদেশের বেসরকারি কোম্পানিগুলো বাপেক্সের সহযোগী হয়ে বিদেশি কোম্পানিগুলোকে আগ্রহী করতে পারে।

বাংলাদেশকে কিন্তু খোলা মন নিয়ে সকল কোম্পানিকে স্বচ্ছতার নিশ্চয়তা দিতে হবে। প্রস্তাবসমূহ মূল্যায়নের জন্য একটি দক্ষ কমিটি গঠন করে সল্পতম সময়ে মূল্যায়ন সম্পাদন এবং অনুমোদন প্রক্রিয়া তরান্বিত করে চুক্তি সম্পাদন করতে হবে। স্মরণে রাখতে হবে বিষয়টির সঙ্গে ভূ-রাজনীতি জড়িত আছে। সরকারকে অবশ্যই পিএসসি চুক্তিগুলো সঠিকভাবে পরিচালনার জন্য পেট্রোবাংলার দক্ষতা বহুগুন বৃদ্ধি করতে হবে।

বাস্তব অভিজ্ঞতা থেকে লিখছি পিএসসি ব্যাবস্থাপনা নিয়ে অতীত অভিজ্ঞতা কিন্তু শুভকর নয়। বাংলাদেশের কিন্তু গভীর সাগরে গ্যাস অনুসন্ধান  বিষয়ে অভিজ্ঞতা এবং দক্ষতা শূন্য।  এক ধরনের নেতিবাচক মনোভাব আছে সুশীল সমাজের কিছু মানুষের।

শেষ কথা বাংলাদেশকে যথা শীঘ্র সকল ব্যবস্থা সম্পাদন করে ২০২৬ শেষ নাগাদ অথবা ২০২৭ মার্চ এপ্রিলের মধ্যে পিএসসি চুক্তি সম্পাদন করতে হবে। মৎস্য, জলসম্পদ আহরণ এবং বায়ু বিদ্যুৎ নিয়ে পৃথকভাবে লিখবো। সাগর সম্পদের আহরণ এবং ব্যবহার বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে ব্যাপক ভূমিকা রাখবে।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

four − 1 =