বাংলাদেশের এখন প্রাধিকার সুষম জ্বালানি মিশ্রণ

বহুদিনের পুঞ্জীভূত ভুল পরিকল্পনা, অসৎ সিন্ডিকেট দূষিত দুর্বৃত্তায়নের পরিণতি চলমান জ্বালানী বিদ্যুৎ অতিমারী থেকে মুক্তির একমাত্র পথ সময়পোযোগী সঠিক এবং টেকসই জ্বালানি নিরাপত্তা অর্জন। আর সেই লক্ষ্যে প্রাধিকার পাওয়া জরুরি সঠিক এবং সুষম জ্বালানি মিশ্রণ। বাংলাদেশের মত ঘনবসতি পূর্ণ বিশাল জনগোষ্ঠীর দেশ কখনো আমদানিকৃত জ্বালানি বিদ্যুৎ নির্ভর হয়ে টেকসই জ্বালানি নিরাপত্তা অর্জন করতে পারবে না। করোনা অতিমারী, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ, চলমান ইরান-যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাযেল যুদ্ধ, হুতি-সৌদি আরব সংঘাতের প্রতিক্রিয়ায় বাংলাদেশ জ্বালানি সঙ্কট মহামারীর রূপ নিয়েছে। ভঙ্গুর অর্থনীতি কিছুতেই বিশ্ব জ্বালানি বাজারের অগ্নিমূল্য দীর্ঘ সময়  সামাল দিতে পারবে না।

বাংলাদেশের জন্য এখন অবশ্য করণীয় হয়ে দাঁড়িয়েছে নিজেদের আবিষ্কৃত কয়লা সম্পদ দ্রুত  উন্নয়ন করে কাজে লাগিয়ে জ্বালানি আমদানি কমিয়ে আনা, স্থল এবং সাগরে গ্যাস তেল আহরণ কার্যক্রম জোরদার করে ২০৩০ নাগাদ দেশীয় ও আমদানিকৃত জ্বালান অনুপাত ৭০:৩০ সীমিত রাখা। একইসঙ্গে কারিগরি এবং ব্যাবস্থাপনা বাধা পেরিয়ে নবায়নযোগ্য জ্বালানির যোগান বাস্তবতার নিরিখে সম্প্রসারিত করা।

আমি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি কৃষি জমি পুনরুদ্ধার, সঠিক পানি ব্যবস্থাপনা এবং ক্ষতিগ্রস্ত জনগোষ্ঠীকে পরিকল্পিতভাবে পুনর্বাসন করে  পরিবেশ সম্মত উপায়ে কয়লা ক্ষেত্র উন্নয়ন করে ব্যবহারের প্রমাণিত টেকনোলজি আছে। বাংলাদেশের উঁচু মানের কয়লা সম্পদ আহরণ করে অন্তত ১০,০০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ ৪০-৫০ বছর উৎপাদনের সুযোগ আছে।

সঠিক টেকনোলজি ব্যবহার করে পরিবেশ দূষণ কিভাবে গ্রহণযোগ্য মাত্রায় রাখা যায় তার প্রমাণ পায়রা, রামপাল, মাতারবাড়ি আমদানিকৃত কয়লা বিদ্যুৎ কেন্দ্র।  আমার মনে হয় কিছু অনভিজ্ঞ এক্টিভিস্টদের প্ররোচনায় বিভ্রান্ত না হয়ে সরকারের উচিত দ্রুত কয়লা আহরণের রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ। তবে এই ক্ষেত্রে সরকারের একটি শক্তিশালী দক্ষ নিজস্ব প্রতিষ্ঠান থাকতে হবে যারা ঠিকাদারদের কার্যক্রম দক্ষতার সাথে নিবিড়ভাবে মনিটরিং করতে পারবে এবং ক্ষতিগ্রস্ত জনগোষ্ঠীর পুনর্বাসন ও পরিবেশ দূষণ বিষয়াবলী নিয়ন্ত্রণ করবে।

গ্যাস তেল উন্নয়ন কার্যক্রম পরিচালনা ও মনিটরিং দায়িত্বে নিয়োজিত পেট্রোবাংলা এবং কোম্পানিগুলোকে দ্রুত অতি প্রয়োজনীয় সংস্কার করে স্থলে ও সাগরে অনুসন্ধান কার্যক্রম ত্বরান্বিত করতে হবে। কাজগুলো কারিগরি ঘন কার্যক্রম বিধায় দক্ষ যোগ্য কারিগরি কর্মকর্তাদের সঠিক পদে পদায়ন করে স্বাধীনভাবে কাজের সুযোগ দিতে হবে।

অনুসন্ধান এবং উন্নয়ন কার্যক্রমগুলোর অনুমোদন প্রক্রিয়ার আমলাতান্ত্রিক জটিলতা, প্রকল্পের ডিপিপি অনুমোদন প্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রতা সংক্ষিপ্ত এবং সহজ করতে হবে। কোম্পানিগুলোর কার্যক্রমে স্বচ্ছতা এবং জবাবদিহিতা বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের রেগুলেশন নিয়ন্ত্রণেল মাধ্যমে নিশ্চিত করতে হবে। ভোক্তা পর্যায়ে জ্বালানির মূল্য বাস্তব নির্ভর করতে হবে।

সরকার নবায়ন যোগ্য জ্বালানির অবদান বৃদ্ধির জন্য কিছু প্রশংসনীয় উদ্যোগ নিয়েছে। কিন্তু বিদ্যমান অবস্থায় দক্ষ সরকারি সংস্থার যথাযথ তদারকির অভাবে তড়িঘড়ি ব্যবস্থা কিন্তু হিতে বিপরীত হতে পারে। বা বাংলাদেশের মতো বিপুল চাহিদার দেশে নবায়ন যোগ্য জ্বালানি কখনও বিশাল অবদান রাখতে পারবে না। আর এই কাজে রেগুলেটরি নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে সঠিক মান বজায় রাখতে না পারলে কার্যক্রম দ্রুত জনতার আস্থা হারাবে।

রুফ টপ সোলার, ভাসমান সোলার, সোলার ইরিগেশন ও কিছু এলাকায় বায়ু বিদ্যুৎ উন্নয়নের সুযোগ আছে। তবে মনে রাখতে হবে এখন এবং সুদূর ভবিষ্যতে জাতীয় বিদ্যুৎ গ্রিড কিন্তু একটি নির্দিষ্ট মাত্রার অতিরিক্ত নবায়ন যোগ্য বিদ্যুৎ সঞ্চালন করতে পারবে না। আর এই ক্ষেত্রে বিদ্যুৎ সরবরাহ ব্যাবস্থায় স্পিনিং রিজার্ভ থাকতে হবে।

বাংলাদেশ জলবায়ু দূষণের অন্যতম প্রধান ক্ষতিগ্রস্ত দেশ হলেও নিজেদের কার্বন দূষণ ইনডেক্স নিতান্তই সীমিত। দূষণ কমানোর কোন দায় নেই, তাই নিজেদের জ্বালানি সম্পদ সর্বোচ্চ পরিমানে আহরণ করে ব্যবহার করার বিষয়ে কোন দায়বদ্ধতা নেই।

নিজেদের অর্থনৈতিক উন্নয়নের ধারা বজায় রাখার তাগিদে বাংলাদেশের জন্য তাই সুষম জ্বালানি মিশ্রণ নিশ্চিত করা জরুরি। দেশীয় ও আমদানি জ্বালানি মাত্রা তাই ২০৪০ পর্যন্ত ৭০:৩০ সীমিত রাখার সুপারিশ করছি। আর এটি নিশ্চিত করার জন্য পেট্রোবাংলা এবং কোম্পানিগুলোর কারিগরি দক্ষতার ব্যাপক উন্নয়ন জরুরি।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

sixteen + twenty =