স্পেনে এ বছর দ্বিতীয়বারের মতো দু’টি দ্রুতগতির ট্রেনের সংঘর্ষে ৬৮ জনের প্রাণহানি ও বিপুল সংখ্যক মানুষ আহত হয়েছে। স্পেনের উর্দা থেকে বার্তা সংস্থা এএফপি এ খবর জানিয়েছে।
এই মর্মান্তিক ঘটনায় দেশটিতে বৃহস্পতিবার (২৯ অক্টোবর) থেকে তিন দিনের রাষ্ট্রীয় শোক শুরু হয়েছে। আহতদের স্বজনদের খোঁজে মরিয়া হয়ে অপেক্ষা করছেন নিখোঁজ পরিবারের সদস্যরা।
চলতি শতাব্দীতে ইউরোপের অন্যতম ভয়াবহ রেল দুর্ঘটনাগুলোর একটি এটি। দুর্ঘটনার কারণ হিসেবে পরিবহনমন্ত্রী ‘ত্রুটি’ ও ‘ব্যাখ্যাতীত পরিস্থিতির’ কথা জানানোর পর দেশটির রেল যোগাযোগ ব্যবস্থার নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে।
বুধবার সকালে স্পেনের মধ্যাঞ্চলীয় কাস্তিয়া-লা মাঞ্চা এলাকায় এ সংঘর্ষ ঘটে। রাষ্ট্রীয় রেল পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠান রেনফের একটি ট্রেন অপর একটি দাঁড়িয়ে থাকা ট্রেনের পেছনে ধাক্কা দেয়। দাঁড়িয়ে থাকা ওই ট্রেন ছিল বেসরকারি স্প্যানিশ প্রতিষ্ঠান ইরিওর।
এএফপি’র সাংবাদিকেরা জানান, মাদ্রিদ থেকে দক্ষিণাঞ্চলীয় শহর সেভিলের সংযোগকারী গুরুত্বপূর্ণ রেলপথে দুর্ঘটনাস্থলে রাতে উদ্ধারকাজ চালান জরুরি সেবাকর্মীরা।
ধ্বংসস্তূপের মধ্যে আরও হতাহত ব্যক্তির সন্ধানে ক্রেন দিয়ে দুমড়েমুচড়ে যাওয়া ধাতব কাঠামোর অংশ সরানো হয়।
স্পেনে বান্ধবীকে নিয়ে ছুটি কাটাতে আসা ৩১ বছর বয়সী পেরুভীয় নাগরিক জোসিমার মেদিনা জানান, তিনি রেনফের ট্রেনে ঘুমিয়ে ছিলেন। তিনি বলেন, ‘আমি ঘুম থেকে উঠে দেখি, শূন্যে ভাসছি।’
৪২ বছর বয়সী পাবলো মেহিয়া মাথায় আঘাত পেলেও প্রাণে বেঁচে যান। তিনি এএফপিকে জানান, শেষ মুহূর্তে আসন পরিবর্তন করায় তার জীবন রক্ষা পেয়েছে।
রক্তমাখা ধূসর সোয়েটার পরা ও ছেঁড়াফাটা স্যুটকেস হাতে মেহিয়া দুর্ঘটনার ভয়াবহতা বর্ণনা করে বলেন, ‘খুব জোরে একটা ধাক্কা লেগেছিল। অনেক মানুষ মেঝেতে একে অপরের ওপর পড়ে ছিলেন। আসনগুলো উপড়ে গিয়েছিল, চারদিকে স্যুটকেস ছড়িয়ে ছিল। সবকিছু চরম বিশৃঙ্খল হয়ে পড়ে।’
মাদ্রিদ থেকে প্রায় ১৩০ কিলোমিটার দক্ষিণে উর্দার কাছের একটি বিদ্যালয়ে দুর্ঘটনায় নিখোঁজ স্বজনদের খোঁজ নিতে আসা পরিবারের সদস্যদের অবস্থানের ব্যবস্থা করা হয়েছে।
সেখানে আসা বিভিন্ন দলের মানুষকে সহায়তা দেন রেড ক্রসের কর্মীরা। তাদের মধ্যে কেউ কেউ কান্নায় ভেঙে পড়েন। এ সময় ঘটনাস্থলে পুলিশ ও বিশ্বের বিভিন্ন দেশের সাংবাদিকদের ভিড় ছিল।
রেড ক্রসের মনোবিজ্ঞানী কারমেন গার্সিয়া বলেন, সামনে ‘দীর্ঘ ও কঠিন সময়’ অপেক্ষা করছে। কারণ, প্রত্যেক মানুষ নিজের মতো করে পরিস্থিতি সামাল দেবেন।
তিনি আরও বলেন, ‘আমাদের কাছে এমন মানুষ রয়েছেন, যারা এখনো মানসিক আঘাতের ঘোরে আছেন এবং কী ঘটেছে তা বুঝে উঠতে পারেননি। কেউ ক্ষুব্ধ, কেউ দুঃখিত, আবার কেউবা উদ্বিগ্ন। তাদের শোক কাটিয়ে ওঠা কঠিন হবে।’
পরিবহনমন্ত্রী অস্কার পুয়েন্তে বুধবার জানান, রেলপথের ৬৯ কিলোমিটার অংশে স্বয়ংক্রিয় নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা অচল হয়ে পড়েছিল। এর ফলে ওই অংশে সব ট্রেন চলাচল বন্ধ করে দেওয়া হয়।
পুয়েন্তে বলেন, রেনফের ট্রেনটি ইরিওর ট্রেনটিকে ধাক্কা দেওয়ার আগে ২৫ কিলোমিটার পথ অতিক্রম করে। তিনি আরও বলেন, ‘নিয়ন্ত্রণকেন্দ্রের কাছে ত্রুটিটি শনাক্ত করার জন্য পর্যাপ্ত সময় ছিল। কিন্তু তারা সেটি ঠিক করেনি।’
এর আগে গত জানুয়ারিতে দক্ষিণাঞ্চলীয় আন্দালুসিয়া অঞ্চলে দুটি দ্রুতগতির ট্রেনের সংঘর্ষে ৪৬ জন মারা যান। ওই দুর্ঘটনায় একটি ট্রেন লাইনচ্যুত হয়ে পাশের রেললাইনে উঠে পড়লে অন্য ট্রেনটির সঙ্গে সংঘর্ষ ঘটে।