‘গণমানুষের দলটি বর্তমানে বেশিমাত্রায় আমলাতন্ত্র নির্ভর হয়ে পড়েছে’

আওয়ামী লীগ স্বাধীনতা এনেছে, দেশের সবচেয়ে বেশি উন্নয়ন করেছে। তবে গণমানুষের দলটি বর্তমানে বেশিমাত্রায় আমলাতন্ত্র দ্বারা পরিচালিত হচ্ছে বলে মনে করেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা। দলটিতে ভবিষ্যতের আদর্শিক নেতাও তৈরি হচ্ছে না বলে মনে করেন তারা।

দেশের গণমাধ্যমের সম্পাদকদের শীর্ষ সংগঠন এডিটরস গিল্ড আয়োজিত ‘আওয়ামী লীগের ৭৫ বছরের রাজনীতি’ শীর্ষক এক গোলেটেবিল বৈঠকে এসব কথা বলেন বক্তরা। অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন এডিটরস গিল্ডের সভাপতি ও একাত্তর টেলিভিশনের প্রধান সম্পাদক মোজাম্মেল বাবু।

দেশের সবচেয়ে পুরনো ও বর্ণাঢ্য রাজনৈতিক দল বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ। গত ৭৫ বছর দলটি অসাম্প্রদায়িক ও বাঙালি সংস্কৃতির ধারায় রাজনীতি করে দেশের স্বাধীনতা এনেছে, করেছে সবচেয়ে বেশি উন্নয়নও। কিন্তু বিগত বছরগুলোতে আদর্শিক সেই বিষয়গুলোর সাথে আওয়ামী লীগ অনেক বেশি ছাড় দিয়েছে বলে মনে করেন অনেকে।

সাবেক পররাষ্ট্র সচিব শমসের মবিন চৌধুরী বলেন, কম্প্রোমাইজ যখন রাজনীতিবিদরা শুরু করেন তখন কোথায় শেষ করবেন সেটা খুব মুশকিল। এটা বিপজ্জনক পার্ট। আওয়ামী আমলাতন্ত্র, আমি বলবো আমলাতন্ত্রের আওয়াম লীগ- এটা হলো বড় কম্প্রোমাইজ।

ইতিহাসবিদ, লেখক ও গবেষক অধ্যাপক মমতাজ উদ্দীন পাটোয়ারী বলেন, মুক্তিযুদ্ধের অপরাধীদের বিচারের মতো কঠিন দায়িত্ব পালন করতে গিয়েই আওয়ামী লীগকে নাস্তিকের পার্টিতে পরিণত করার যে চেষ্টা করলো…ধর্ম নিয়ে যখন আওয়ামী লীগকে চিৎপটাং করে ফেলা সম্ভব হলো, তখনই আওয়ামী লীগ বিভিন্ন শক্তির সঙ্গে কম্প্রোমাইজে গেলো।

উন্নয়ন ও মানবাধিকার কর্মী খুশি কবির বলেন, সব জায়গায় যদি আপস করতে থাকে বিভিন্ন শক্তির সাথে; এটা সামরিক হোক বেসামরিক হোক, ব্যবসায়ী বা ধর্মীয় হোক- এগুলো করতে গেলে ওটাই যদি প্রদান হয়ে যায়, তখন দলের আর অস্তিত্ব থাকে না।

১৯৭৫ এর নেতৃত্বশূন্য অবস্থা থেকে শেখ হাসিনার নেতৃত্বে আজ আওয়ামী লীগ যে অবস্থানে পৌছেছে, তা ধরে রাখতে ভবিষ্যত আওয়ামী লীগের নেতৃত্ব কতটুকু তৈরি হয়েছে তা নিয়ে প্রশ্ন আছে অনেকের।

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিকক সম্পর্ক বিভাগের শিক্ষক অধ্যাপক ড. শাহাব এনাম খান বলেন, বাংলাদেশে এ মুহূর্তে সবচেয়ে ঘাটতির জায়গা ইন্টেলেকচুয়াল জায়গাটা। ফলে আপনি কোনো পলিটিক্যাল ইডিওলজি (রাজনৈতিক আদর্শ) তৈরি করতে পারছেন না। ছাত্রলীয় বা যুবলীগ এদের কে যদি একটু বসিয়ে, পলিটিক্যাল ইডিওলজিটা কেন ছিলো। কালচারাল রেভুলেশন কেন হলো এবং পলিটিক্যাল সোসাইটি এই দুই অ্যাক্টরের সাথে কেন কাজ করেছে- তাহলে আমার দারণা আপনি হতাশ হবেন।

রাজনীতি বিশ্লেষক অধ্যাপক আব্দুল মান্নান বলেন, এখন জনগণের আওয়ামী লীগ কি আছে? এখন আছে ব্যক্তি ও গোষ্ঠী স্বার্থের আওয়ামী লীগ। আশরাদের আওয়ামী লীগ।

আন্তর্জাতিক সম্পর্ক ও নিরাপত্তা বিশ্লেষক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব) এম সাখাওয়াত হোসেন বলেন, দলের গণতন্ত্রায়ন এবং রাজনীতির গণতন্ত্রায়ন – এটা যদি করতে পারতো তাহলে আজকে আমলাতন্ত্রের কথাটা আসতো না। যে কারণে এখন চিন্তা হচ্ছে, হু ইজ আফটার শেখ হাসিনা (শেখ হাসিনার পরে কে)? এটা যদি আওয়ামী লীগ করে যেতে পারতো, একটা গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা করে যেতে পারতো তাঞের বাংলাদেশের যেকোনো পার্টি সেটা অনুসরণ করতো।

অনুষ্ঠানের সঞ্চালক এডিটরস গিল্ডের সভাপতি মোজাম্মেল বাবু বলেন, বঙ্গবন্ধু কন্যা তার জীবদ্দশাতেই আওয়ামী লীগকে তার আদর্শের ভিত্তিতে আবার পূর্ণাঙ্গভাবে প্রতিষ্ঠিত করে যাবেন এবং তার অবর্তমানে নতুন নেতৃত্ব রেখে যাবেন যারা সত্যি সত্যি বাঙালি, বাঙালিয়ানা, অসাম্প্রদায়িকতা এবং সাধারণ মানুষের অর্থনৈতিক মুক্তি নিশ্চিত করবে।

উন্নয়নের পাশাপাশি দেশের সাংস্কৃতিক ও নৈতিক মনন তৈরিতে আওয়ামী লীগকেই কাজ করতে হবে বলে মনে করেন বিশ্লেষকরা।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

twelve − eleven =