অতিবর্ষণ ও আকস্মিক বন্যায় বিপর্যস্ত দেশ: ত্রাণ তৎপরতার পাশাপাশি জ্বালানি-বিদ্যুৎ খাতে নতুন চ্যালেঞ্জ

ঢাকা, ১৩ জুলাই ২০২৬ (রঙবেরঙ ডেস্ক) – টানা অতিবর্ষণ, উজানের ঢল এবং সক্রিয় মৌসুমি বায়ুর প্রভাবে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে আকস্মিক বন্যা পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। সিলেট, সুনামগঞ্জ, নেত্রকোনা, কুড়িগ্রাম, গাইবান্ধা, জামালপুর, শেরপুর, ফেনী, চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, বান্দরবান ও রাঙামাটিসহ বিস্তীর্ণ এলাকা পানিবন্দি হয়ে পড়েছে। রাজধানী ঢাকাসহ বিভিন্ন শহরেও জলাবদ্ধতায় জনজীবন মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে।

সরকার ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় জরুরি ত্রাণ ও উদ্ধার কার্যক্রম জোরদার করেছে। একই সঙ্গে বিদ্যুৎ, গ্যাস ও জ্বালানি সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোকে বিশেষ নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে এমন চরম আবহাওয়া এখন আর ব্যতিক্রম নয়; বরং এ ধরনের দুর্যোগ মোকাবিলায় দীর্ঘমেয়াদি অবকাঠামোগত প্রস্তুতি জরুরি হয়ে উঠেছে।

বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত বহু জেলা

নদ-নদীর পানি দ্রুত বৃদ্ধি পাওয়ায় উত্তর, উত্তর-পূর্ব ও দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের অনেক নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়েছে। হাজার হাজার পরিবার আশ্রয়কেন্দ্রে অবস্থান নিয়েছে। অনেক এলাকায় সড়ক যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে এবং কৃষিজমি পানির নিচে তলিয়ে গেছে। পাহাড়ি জেলাগুলোতে ভূমিধসের ঝুঁকিও বেড়েছে।

আবহাওয়া অধিদপ্তর জানিয়েছে, মৌসুমি বায়ু সক্রিয় থাকায় আগামী কয়েক দিনও দেশের বিভিন্ন স্থানে ভারী থেকে অতি ভারী বৃষ্টিপাত অব্যাহত থাকতে পারে। অন্যদিকে বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) জানিয়েছে, কয়েকটি প্রধান নদীর পানি বিপৎসীমার কাছাকাছি বা ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে।

সরকারের ত্রাণ ও উদ্ধার কার্যক্রম

দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয় ক্ষতিগ্রস্ত জেলাগুলোতে নগদ অর্থ, চাল, শুকনো খাবার ও শিশু খাদ্য বরাদ্দ দিয়েছে। জেলা প্রশাসন, সেনাবাহিনী, নৌবাহিনী, কোস্ট গার্ড, বিজিবি, ফায়ার সার্ভিস ও স্থানীয় প্রশাসন যৌথভাবে উদ্ধার ও ত্রাণ বিতরণ কার্যক্রম পরিচালনা করছে।

সরকারি নির্দেশনায় আশ্রয়কেন্দ্রে বিশুদ্ধ পানি, স্যানিটেশন, চিকিৎসাসেবা এবং নারী ও শিশুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর বন্যাপরবর্তী ডায়রিয়া, পানিবাহিত রোগ ও সাপের কামড় মোকাবিলায় মেডিক্যাল টিম প্রস্তুত রেখেছে।

বিদ্যুৎ খাতে বাড়তি চাপ

অতিবৃষ্টির কারণে অনেক এলাকায় বিদ্যুৎ বিতরণ ব্যবস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। নিরাপত্তার স্বার্থে প্লাবিত এলাকায় কোথাও কোথাও বিদ্যুৎ সংযোগ সাময়িকভাবে বন্ধ রাখতে হয়েছে। ফলে স্থানীয়ভাবে বিদ্যুৎ বিভ্রাট দেখা দিয়েছে।

বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (বিপিডিবি), পাওয়ার গ্রিড বাংলাদেশ পিএলসি (পিজিসিবি) এবং বিতরণ কোম্পানিগুলো জরুরি ভিত্তিতে ক্ষতিগ্রস্ত লাইন ও উপকেন্দ্র মেরামতের কাজ করছে। বিদ্যুৎ বিভাগ জানিয়েছে, জাতীয় গ্রিড সচল রাখতে প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে এবং পরিস্থিতি সার্বক্ষণিক পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। পল্লি বিদু্যত্‌ উন্নয়ন বোড ও অন্যান্য বিতরণ কোম্পানিগুলো বিশেষ টীম গঠন করে কাজ অব্যাহত রেখেছে।

গ্যাস ও জ্বালানি সরবরাহে সতর্কতা

জ্বালানি বিভাগ, পেট্রোবাংলা এবং গ্যাস বিতরণ কোম্পানিগুলো বন্যাকবলিত অঞ্চলের গ্যাস অবকাঠামো নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে। নদীভাঙন বা ভূমিধসের ঝুঁকিতে থাকা পাইপলাইন এলাকায় বিশেষ নজরদারি বাড়ানো হয়েছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, ভারী বৃষ্টিপাত ও বন্যা দীর্ঘস্থায়ী হলে জ্বালানি পরিবহন, বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্রের লজিস্টিকস এবং কয়লা ও তরল জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থায়ও চাপ সৃষ্টি হতে পারে। বিশেষ করে নদীপথে জ্বালানি পরিবহন ব্যাহত হলে কিছু বিদ্যুৎকেন্দ্রের জ্বালানি সরবরাহে বিলম্বের আশঙ্কা সৃষ্টি হয়েছে।

কৃষি ও অর্থনীতিতে প্রভাব

বন্যার কারণে আমন ধানের বীজতলা, সবজি ক্ষেত, মাছের ঘের ও গবাদিপশু ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। কৃষি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ বাড়লে খাদ্য উৎপাদন ও মূল্যস্ফীতির ওপরও এর প্রভাব পড়তে পারে।

ব্যবসায়ী মহলের আশঙ্কা, মহাসড়ক ও আঞ্চলিক সড়কে জলাবদ্ধতা এবং পরিবহন ব্যাহত হলে সরবরাহ ব্যবস্থা বিঘ্নিত হতে পারে, যা নিত্যপণ্যের বাজারে চাপ সৃষ্টি করবে।

জলবায়ু পরিবর্তনের সতর্ক বার্তা

জলবায়ু বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বাংলাদেশে স্বল্প সময়ে অতিবৃষ্টির প্রবণতা স্পষ্টভাবে বেড়েছে। এতে আকস্মিক বন্যা, নগর জলাবদ্ধতা এবং অবকাঠামোগত ক্ষতির ঝুঁকি বৃদ্ধি পাচ্ছে। তাই দুর্যোগ-সহনশীল অবকাঠামো, উন্নত নগর ড্রেনেজ ব্যবস্থা, নদী ব্যবস্থাপনা এবং জলবায়ু অভিযোজন বিনিয়োগ আরও জোরদার করার ওপর তারা গুরুত্বারোপ করেছেন।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

three − 1 =