আফগান বীরত্বে জয়বঞ্চিত বাংলাদেশ

সালেক সুফী

আবুধাবিতে অনুষ্ঠিত বাংলাদেশ-আফগানিস্তান একমাত্র টেস্ট ম্যাচের চতুর্থ দিন শেষে বাংলাদেশের জয় অনেকটাই নিশ্চিত বলে মনে হচ্ছিল। প্রথম ইনিংসে বাংলাদেশের ৩৪৬ রানের জবাবে হাসান মাহমুদ ও ইবাদত হোসেনের দুর্দান্ত বোলিংয়ে আফগানিস্তান গুটিয়ে যায় ২৪০ রানে। প্রথম ইনিংসে ১০৬ রানের লিড পাওয়ার পর দ্বিতীয় ইনিংসে লিটন দাস, নাজমুল হোসেন শান্ত, মুশফিকুর রহিম ও মেহেদী হাসান মিরাজের ব্যাটিং নৈপুণ্যে বাংলাদেশ ৩৭২/৭ রানে ইনিংস ঘোষণা করে। আফগানিস্তানের সামনে জয়ের জন্য লক্ষ্য দাঁড়ায় ৪৭৯ রান।

অনেকের ধারণা ছিল, জয় তো দূরের কথা, প্রায় সাড়ে চার সেশন ব্যাটিং করে ম্যাচ বাঁচানোও আফগানিস্তানের জন্য কঠিন হবে। কিন্তু টেস্ট ক্রিকেট যে অনিশ্চয়তার খেলা, তা আবারও প্রমাণ করল আফগান দল। অসাধারণ ধৈর্য, দৃঢ়তা ও লড়াকু মানসিকতার পরিচয় দিয়ে ১৪২ ওভার ব্যাটিং করে তারা ম্যাচ শেষ করে ৩৪৮/৮ রানে। ফলে নিশ্চিত মনে হওয়া জয় থেকে বঞ্চিত হয় বাংলাদেশ, আর ক্রিকেট বিশ্ব প্রত্যক্ষ করে আফগানিস্তানের অবিস্মরণীয় প্রতিরোধ।

বাংলাদেশ চাইলে গুরুত্বপূর্ণ সময়ে ক্যাচ মিস কিংবা রানআউটের সুযোগ নষ্ট হওয়ার কথা বলতে পারে। কিন্তু তাতে আফগান ব্যাটসম্যানদের কৃতিত্ব খাটো হবে না। প্রচণ্ড চাপের মুখে উইকেট আঁকড়ে থেকে যেভাবে তাঁরা বাংলাদেশের বোলারদের মোকাবিলা করেছেন, তার অকুণ্ঠ প্রশংসা করতেই হবে। প্রতিপক্ষকে বাগে পেয়েও ম্যাচ জিততে না পারার হতাশা বাংলাদেশকে দীর্ঘদিন তাড়িয়ে বেড়াবে।

বিভিন্ন কারণে এই টেস্ট স্মরণীয় হয়ে থাকবে। ব্যাট হাতে দুই ইনিংসে ৫৩ ও ১০২ রান করার পাশাপাশি উইকেটের পেছনে দুই ইনিংস মিলিয়ে নয়টি ক্যাচ ধরে অনন্য কৃতিত্ব দেখিয়েছেন লিটন কুমার দাস। বাংলাদেশের হয়ে প্রথম ইনিংসে হ্যাটট্রিকসহ পাঁচ উইকেট নিয়েছেন হাসান মাহমুদ। দুই ইনিংস মিলিয়ে ইবাদত হোসেন শিকার করেছেন সাত উইকেট। অন্যদিকে, আফগান অধিনায়ক রহমত শাহ দুই ইনিংসেই দায়িত্বশীল ব্যাটিং করে করেছেন ১০৫ ও ৫১ রান। আর তরুণ সেদিকুল্লাহ অতল ৩৩২ বল উইকেটে থেকে ১১১ রান করে দলের পরাজয় এড়াতে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন।

মরুভূমির তীব্র গরম ও তুলনামূলক নিষ্প্রাণ উইকেটে প্রথমে ব্যাট করতে নেমে দুর্দান্ত সূচনা করেছিল বাংলাদেশ। তানজিদ হাসান তামিমের ৮৩ এবং সাদমান ইসলামের ৬৭ রানের সুবাদে প্রথম উইকেট জুটিতে আসে ১২৪ রান। মোমিনুল হক ৩৯ ও নাজমুল হোসেন শান্ত ২৯ রান করে দলের অবস্থান আরও মজবুত করার ইঙ্গিত দিয়েছিলেন। একপর্যায়ে বাংলাদেশের সংগ্রহ দাঁড়ায় দুই উইকেটে ৩২০ রান। সেখান থেকে ইনিংসের চিত্র দ্রুত পাল্টে যায়। আফগান পেসারদের নিয়ন্ত্রিত বোলিংয়ে মাত্র ২২৭ রানেই ছয় উইকেট হারিয়ে চাপে পড়ে বাংলাদেশ। লিটন দাসের ৫৩, মেহেদী হাসান মিরাজের ২৪ এবং বিশেষ করে নাঈম হাসানের অপরাজিত ৩৫ রানের সহায়তায় শেষ পর্যন্ত বাংলাদেশের প্রথম ইনিংস থামে ৩৪৬ রানে। যেভাবে ইনিংস শুরু হয়েছিল, তাতে বাংলাদেশের স্কোর অনায়াসে ৪০০ থেকে ৪৫০ রানে পৌঁছাতে পারত। কিন্তু মাঝের দিকে দ্রুত উইকেট হারানোয় সেই সম্ভাবনা আর বাস্তবায়িত হয়নি।

আফগানিস্তানের প্রথম ইনিংসের শুরুটা ভালো হয়নি। তবে রহমত শাহের ১০৫ ও আব্দুল মালিকের ৬২ রানের জুটি বাংলাদেশকে কিছুটা চাপে ফেলে। দুই ব্যাটসম্যানের প্রতিরোধে আফগানিস্তান ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করলেও দ্বিতীয় নতুন বল হাতে নিয়ে ম্যাচের মোড় ঘুরিয়ে দেন হাসান মাহমুদ। টেস্ট ক্রিকেটে বাংলাদেশের প্রথম পেসার হিসেবে হ্যাটট্রিক করার পাশাপাশি তিনি পাঁচ উইকেট নেন। ইবাদত হোসেনও দুর্দান্ত বোলিং করে চার উইকেট শিকার করেন। ফলে আফগানিস্তানের প্রথম ইনিংস শেষ হয় ২৪০ রানে। বাংলাদেশ পায় ১০৬ রানের গুরুত্বপূর্ণ লিড। ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ তখন অনেকটাই বাংলাদেশের হাতে।

দ্বিতীয় ইনিংসে বাংলাদেশকে শক্ত অবস্থানে নিয়ে যান নাজমুল হোসেন শান্ত ও মুশফিকুর রহিম। শান্তর ৮২ এবং মুশফিকের ৮১ রানের দায়িত্বশীল ইনিংসের পর লিটন দাসের ১০২ রানের শতক বাংলাদেশের স্কোরকে বড় সংগ্রহের দিকে নিয়ে যায়। মেহেদী হাসান মিরাজ অপরাজিত ৫২ রান করে লিটনের সঙ্গে কার্যকর জুটি গড়েন। বাংলাদেশ ৩৭২/৭ রানে ইনিংস ঘোষণা করলে আফগানিস্তানের সামনে লক্ষ্য দাঁড়ায় ৪৭৯ রান। ম্যাচ জিততে হলে তাদের প্রয়োজন ছিল বড় রান তাড়া করা; আর পরাজয় এড়াতে হলে প্রতিকূল পরিস্থিতিতে দীর্ঘ সময় উইকেটে টিকে থাকা।

দ্বিতীয় ইনিংসে বাংলাদেশের সামনে দুটি বড় চ্যালেঞ্জ ছিল—প্রচণ্ড গরমে দীর্ঘ সময় বোলিং করা এবং ব্যাটসম্যানদের ধৈর্যশীল প্রতিরোধ ভেঙে দেওয়া। দুই মানসম্পন্ন পেসার ও তিন স্পিনার নিয়ে বাংলাদেশ সর্বোচ্চ চেষ্টা করেছে। ইবাদত হোসেন ও মেহেদী হাসান মিরাজ তিনটি করে উইকেটও নিয়েছেন। কিন্তু আফগান ব্যাটসম্যানদের দৃঢ়তা শেষ পর্যন্ত বাংলাদেশের জয় আটকে দেয়। সেদিকুল্লাহ অতল ৩৩২ বল মোকাবিলা করে ১১১ রান করেন। রহমত শাহের ৫১ এবং শেষদিকে কায়েস আহমেদের অপরাজিত ৪৯ রান আফগানিস্তানকে পরাজয় থেকে রক্ষা করে। হাসমাতুল্লাহ শহিদীর ৩৬ ও ইকরাম আলিখিলের ৩৩ রানও ছিল গুরুত্বপূর্ণ।

আফগানিস্তানের এই প্রতিরোধ তাদের টেস্ট ক্রিকেটে আত্মবিশ্বাস বাড়াবে। অন্যদিকে, ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ হাতে পেয়েও জয় নিশ্চিত করতে না পারা বাংলাদেশের জন্য বড় হতাশার। এই টেস্ট আবারও দেখিয়েছে, প্রতিপক্ষের শেষ উইকেটটি না পড়া পর্যন্ত টেস্ট ম্যাচের ফলাফল নিশ্চিত ধরে নেওয়ার সুযোগ নেই।

ম্যাচ শেষে স্বাভাবিকভাবেই কিছু প্রশ্ন সামনে আসছে। বাংলাদেশ কি দ্বিতীয় ইনিংসে আরও আগে ইনিংস ঘোষণা করতে পারত? আফগানিস্তানের দীর্ঘ প্রতিরোধ ভাঙতে তিন পেসার নিয়ে মাঠে নামা কি কৌশলগতভাবে বেশি কার্যকর হতো? গুরুত্বপূর্ণ সময়ে ক্যাচ বা রানআউটের সুযোগ কাজে লাগাতে না পারার প্রভাব কতটা ছিল? এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হলে আবেগের পরিবর্তে নিরপেক্ষ বিশ্লেষণ প্রয়োজন। তবে এটাও মনে রাখতে হবে, আফগানিস্তানের ব্যাটসম্যানরা কেবল বাংলাদেশের ভুলের কারণে ম্যাচ বাঁচাননি; নিজেদের অসাধারণ ধৈর্য ও দৃঢ়তার মাধ্যমেও তাঁরা এই ফল অর্জন করেছেন।

সব মিলিয়ে, ম্যাচটি বাংলাদেশের জন্য হাতছাড়া জয়ের আক্ষেপ আর আফগানিস্তানের জন্য বীরত্বপূর্ণ প্রতিরোধের স্মারক হয়ে থাকবে। লিটন দাসের ব্যাটিং ও উইকেটকিপিং, হাসান মাহমুদের হ্যাটট্রিক এবং ইবাদত হোসেনের বোলিংয়ের পাশাপাশি সেদিকুল্লাহ অতলের অবিশ্বাস্য ইনিংসও দীর্ঘদিন আলোচনায় থাকবে।

সংক্ষিপ্ত স্কোরকার্ড: বাংলাদেশ প্রথম ইনিংস—৩৪৬ অলআউট (তানজিদ হাসান তামিম ৮৩, সাদমান ইসলাম ৬৭, লিটন কুমার দাস ৫৩, মোমিনুল হক ৩৯, নাঈম হাসান ৩৫, নাজমুল হোসেন শান্ত ২৯, মেহেদী হাসান মিরাজ ২৪; মোহাম্মদ সেলিম ৪/৮২, ইসমাত আলম ২/২০, ইয়ামিন আহমেদজাই ৩/৭৯)। আফগানিস্তান প্রথম ইনিংস—২৪০ অলআউট (রহমত শাহ ১০৫, আব্দুল মালিক ৬২, ইকরাম আলিখিল ৩২; হাসান মাহমুদ ৫/৫৫, ইবাদত হোসেন ৪/৫৬, মেহেদী হাসান মিরাজ ১/৪১)। বাংলাদেশ দ্বিতীয় ইনিংস—৩৭২/৭, ইনিংস ঘোষণা (লিটন কুমার দাস ১০২, নাজমুল হোসেন শান্ত ৮২, মুশফিকুর রহিম ৮১, মেহেদী হাসান মিরাজ ৫২*, তানজিদ হাসান তামিম ৩১; মোহাম্মদ সেলিম ২/৬৯, ইয়ামিন আহমেদজাই ২/৯৬, জিয়াউর রহমান ২/৮৬)। আফগানিস্তান দ্বিতীয় ইনিংস—৩৪৮/৮ (সেদিকুল্লাহ অতল ১১১, রহমত শাহ ৫১, কায়েস আহমেদ ৪৯*, হাসমাতুল্লাহ শহিদী ৩৬, ইকরাম আলিখিল ৩৩; ইবাদত হোসেন ৩/৫০, মেহেদী হাসান মিরাজ ৩/৭৩)।

ফলাফল: ম্যাচ ড্র। ম্যাচসেরা: লিটন কুমার দাস।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

19 − nine =