জাতীয় সংলাপে বৈষম্য বিলোপ আইন দ্রুত প্রণয়নের আহ্বান

দেশের সকল নাগরিকের জন্য সংবিধানে ঘোষিত সমতা, মর্যাদা ও ন্যায়বিচারের অধিকার নিশ্চিত করতে এবং বৈষম্যের শিকার প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর সুরক্ষা জোরদার করতে একটি সমন্বিত বৈষম্যবিরোধী আইন দ্রুত প্রণয়নের আহ্বান জানিয়েছেন জাতীয় সংলাপের বক্তারা। রাজধানীর হোটেল সারিনায় নাগরিক উদ্যোগ, মানুষের জন্য ফাউন্ডেশন (এমজেএফ), বাংলাদেশ দলিত ও বঞ্চিত অধিকার আন্দোলন (বিডিইআরএম) এবং বাংলাদেশ লিগ্যাল এইড অ্যান্ড সার্ভিসেস ট্রাস্ট (ব্লাস্ট)-এর যৌথ উদ্যোগে “বৈষম্যবিরোধী আইন” শীর্ষক জাতীয় সংলাপ অনুষ্ঠিত হয়।

সংলাপে সভাপতিত্ব করেন নাগরিক উদ্যোগের চেয়ারপারসন ড. মেঘনা গুহঠাকুরতা। সূচনা বক্তব্য প্রদান ও আলোচনা সঞ্চালনা করেন মানুষের জন্য ফাউন্ডেশনের ভারপ্রাপ্ত নির্বাহী পরিচালক বনশ্রী মিত্র নিয়োগী। মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন নাগরিক উদ্যোগের প্রধান নির্বাহী জাকির হোসেন।

স্বাগত বক্তব্যে বনশ্রী মিত্র নিয়োগী বলেন, কেবল আইন প্রণয়ন করলেই নাগরিকদের অধিকার নিশ্চিত হয় না; কার্যকর বাস্তবায়নও সমান গুরুত্বপূর্ণ। তিনি এমন একটি বাস্তবসম্মত ও সহজলভ্য আইনি কাঠামোর প্রয়োজনীয়তার ওপর গুরুত্বারোপ করেন, যা বৈষম্যের শিকার মানুষকে কার্যকর প্রতিকার পাওয়ার সুযোগ দেবে।

মূল প্রবন্ধে জাকির হোসেন বাংলাদেশের বৈষম্যের কাঠামোগত ও প্রাতিষ্ঠানিক চরিত্র তুলে ধরেন। তিনি বলেন, দলিত, চা-শ্রমিক, বেদে জনগোষ্ঠী, ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী, প্রতিবন্ধী ব্যক্তি এবং জেন্ডার বৈচিত্র্যময় জনগোষ্ঠীসহ বিভিন্ন সম্প্রদায় এখনও নানাভাবে বৈষম্যের শিকার। সংবিধান ও বিভিন্ন নীতিমালায় সমতার অঙ্গীকার থাকা সত্ত্বেও বৈষম্য প্রতিরোধ ও প্রতিকারের জন্য দেশে এখনও কোনো সমন্বিত আইন নেই বলে তিনি উল্লেখ করেন।

বিশেষ অতিথির বক্তব্যে আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের লেজিসলেটিভ ও সংসদ বিষয়ক বিভাগের অতিরিক্ত সচিব ড. মোহাম্মদ মহিউদ্দিন বলেন, একটি সমন্বিত বৈষম্যবিরোধী আইন সংবিধানের মৌলিক চেতনা, আন্তর্জাতিক মানবাধিকার অঙ্গীকার এবং টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এসডিজি) বাস্তবায়নের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তিনি বৈষম্যের সুস্পষ্ট সংজ্ঞা, সহজলভ্য অভিযোগ ও প্রতিকার ব্যবস্থা এবং নাগরিকদের অধিকার সম্পর্কে সচেতনতা বৃদ্ধির ওপর গুরুত্বারোপ করেন।

বাংলাদেশ আইন কমিশনের সিনিয়র সহকারী সচিব (যুগ্ম জেলা জজ) নয়ন বড়াল বলেন, প্রস্তাবিত আইনে শুধু ক্ষতিপূরণের ব্যবস্থা নয়, বৈষম্যমূলক আচরণ ও সামাজিক চর্চার পরিবর্তন ঘটানোর কার্যকর ব্যবস্থা থাকতে হবে। তিনি আইনের বাস্তবায়নে শক্তিশালী প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো ও তদারকি ব্যবস্থার প্রয়োজনীয়তার কথাও তুলে ধরেন।

আলোচনায় অংশ নিয়ে বিভিন্ন প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর প্রতিনিধিরা বৈষম্য ও বঞ্চনার বাস্তব অভিজ্ঞতা তুলে ধরেন। সেন্টার ফর সার্ভিসেস অ্যান্ড ইনফরমেশন অন ডিজঅ্যাবিলিটি (সিএসআইডি)-এর নির্বাহী পরিচালক খন্দকার জাহুরুল আলম প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের বিচারপ্রাপ্তির ক্ষেত্রে বিদ্যমান প্রতিবন্ধকতার কথা উল্লেখ করেন। অন্যদিকে, বাংলাদেশ দলিত ও বঞ্চিত অধিকার আন্দোলনের সভাপতি উত্তম কুমার ভক্ত দলিত জনগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে চলমান সামাজিক বৈষম্য ও কলঙ্কজনক আচরণের বিষয়টি তুলে ধরেন।

সমাপনী বক্তব্যে ড. মেঘনা গুহঠাকুরতা বলেন, সংলাপে উঠে আসা বৈষম্যের বাস্তব অভিজ্ঞতাগুলো প্রস্তাবিত আইন প্রণয়ন ও বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে। সংলাপের বক্তারা একটি শক্তিশালী, কার্যকর ও অন্তর্ভুক্তিমূলক বৈষম্যবিরোধী আইন দ্রুত প্রণয়নের জন্য সরকারের প্রতি আহ্বান জানান, যাতে দেশের সকল নাগরিক সমান সুরক্ষা, ন্যায়বিচার এবং সুযোগ-সুবিধা লাভ করতে পারেন এবং একটি বৈষম্যহীন ও অন্তর্ভুক্তিমূলক বাংলাদেশ গড়ে তোলা সম্ভব হয়।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

one × four =